অশ্বিনী সেন হঠাৎ থমকে গেলেন। তিনি ঠিক পড়লেন তো? হতে পারে না, নিশ্চয়ই পড়ায় ভুল হয়েছে। বছর ঘুরলেই পঁচাত্তরে পা দেবেন। এখন ভুল হবে না তো আর কবে হবে? চোখ থেকে চশমা খুলে ফতুয়ায় ভাল করে মুছলেন অশ্বিনীবাবু। আবার পড়লেন। এক বার নয়, পড়লেন আরও তিন বার। না, ভুল তো হয়নি!
অশ্বিনী সেন এ-বাড়ির গৃহকর্তা। রবিবার সকালে ঘড়ি দেখে পৌনে দু’ঘণ্টা ধরে খবরের কাগজ পড়েন এবং পৌনে তিন কাপ চা খান। তাঁর দাবি, এই অভ্যেস তাঁর পিতা-পিতামহের কাছ থেকে পাওয়া। খবরের কাগজের বড়, মেজ, সেজ, ছোট কোনও আকারের খবরকেই তিনি ফস্কে যেতে দেন না। তার পর ঢোকেন বিজ্ঞাপনে। সেখানেও তিনি নির্দয়, কারও ছাড় নেই।
পড়া শেষে কাগজ ভাঁজ করে টেবিলে রেখে ইজ়িচেয়ারে হেলান দেন। মিনিট পনেরো ঝিম মেরে থাকেন। এতক্ষণ ধরে যা পড়েছেন, সবটা মাথা থেকে বার করে দেন। হার্ড ডিস্ক থেকে ফাইল ক্লিয়ারের মতো। এও নাকি তাঁর পিতা-পিতামহের শিক্ষা। মাথা বেশিক্ষণ ভারী রাখা যাবে না। তাতে দুশ্চিন্তা আসে, আর সেই দুশ্চিন্তা থেকে আসে নানা রকম অসুখ।
আজ কিন্তু বিজ্ঞাপনপর্বে ঢুকে থমকে গিয়েছেন। ব্যক্তিগত কলমে, বক্সের ভিতর মাত্র দু’টি লাইন—
“এক খেলনা সংগ্রহশালার জন্য পুরনো দিনের কাঠের তরবারি চাই। তরবারির বয়স বুঝে লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্য দেওয়া হতে পারে।”
বলে কী! কাঠের তরোয়াল তো সেই ছেলেবেলার খেলনা। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে খেলনাওয়ালারা বিক্রি করতে আসত পাড়ায় পাড়ায়। মাটির বেহালা, ঢোল, বাঁশি, তালপাতার সেপাই, ঝুমঝুমি, ব্যাঙের ডাক, খেলনা তরোয়াল, আরও কত কী! সস্তার রং করা রাংতা মোড়া সেই তলোয়ারের দাম লাখ টাকা! নিশ্চয়ই ভাঁওতা। কত রকম ভাঁওতায় যে জগৎ ভরে গিয়েছে! ছি ছি! অশ্বিনীবাবু মনে মনে ব্যথিত হলেন।
পনেরো মিনিট চোখ বুজে ইজ়িচেয়ারে হেলান দিয়ে রইলেন তিনি। এত ক্ষণ ধরে যা পড়েছেন সব ভুলে গেলেন। এমনকি চমকে দেওয়া সেই দু’লাইনের বিজ্ঞাপনটিও। ঘোর কাটল পাশের টেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনের ঝনঝনানিতে।
অশ্বিনীবাবুর স্ত্রী কনকলতা, বড় পুত্র তীর্থঙ্কর, বড় পুত্রবধূ শ্রেয়সী, ছোট পুত্র শুভঙ্কর, ছোট পুত্রবধূ অনসূয়ার মোবাইল ফোন রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। নাতিনাতনি যাদের বয়স দশ ও এগারো বছর, ডাকনাম ঝাঁপাই ও কাঁপাই, তারাও মোবাইল ঘাঁটার কাজে বিশেষ মাতব্বর। কিন্তু অশ্বিনীবাবু ল্যান্ডফোন ছাড়েননি। শুধু ল্যান্ডফোন নয়, বাড়ির সকলের আপত্তি নিয়েও আঁকড়ে ধরে আছেন একটা কালো রঙের অ্যাম্বাসাডর গাড়ি আর ফড়েপুকুরের এই শ্যাওলা রঙের তিনতলা মজবুত বাড়িটি। বাড়ির বয়স কেউ জানে না। মোটা দেওয়াল, উঁচু সিলিঙের বড় বড় ঘর। চওড়া সিঁড়ি, মস্ত উঠোন, তিন ধাপের ছড়ানো-ছিটানো ছাদ। ঝাঁপাই, কাঁপাই সকাল-বিকেল দাপাদাপি করে। ছাদের এক পাশে চিলেকোঠা। তার মাথায় টেলিভিশনের বাতিল অ্যান্টেনা আজও ঘাড় কাত করে ড্যাবড্যাব করে দুনিয়া দেখছে। আর চিলেকোঠার ভিতরে যে কত বছরের এবং কত রকমের ভাঙা, আস্ত, অকেজো, বাতিল, হারিয়ে যাওয়া, লুকিয়ে রাখা জিনিস রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই চিলেকোঠাতেই আজ এক বার যাবেন অশ্বিনীবাবু। ক’দিন ধরে ইজ়িচেয়ারে শুয়ে গড়গড়া খাওয়ার শখ হচ্ছে। তাঁর পিতা-পিতামহের গড়গড়া ছিল। সেগুলো গেল কোথায়?
ফোন বেজে চলেছে। ভুরু কোঁচকালেন অশ্বিনীবাবু। এই সকালে বিরক্ত করে কে?
“কাবু বলছি জেঠুমণি। কিছু ভাবলেন?”
অশ্বিনীবাবু শান্ত অথচ কড়া গলায় বললেন, “দেখ বাবু না গাবু, তুমি আমাকে যতই জেঠুমণি, কাকাসোনা বলো না কেন, আমার ভাবা হয়ে গেছে। বাড়ি আমি বিক্রি করব না। যত দিন বেঁচে আছি, এই বাড়িতেই বাঁচব। মরে গেলে ছেড়ে চলে যাব। তখনকার কথা তখন হবে। সুতরাং আর বিরক্ত কোরো না।”
“জেঠুমণি, আপনার দুই ছেলে কিন্তু আমাকে তাগাদা দিচ্ছে। বলছে, কাবুদা, বাবাকে বুঝিয়ে বলো... ওঁকে রাজি করাতেই হবে। ”
অশ্বিনীবাবু কড়া গলায় বললেন, “এই বাড়ি এখন আমার। আমি মরে গেলে ছেলেদের। তখন ওরা যা খুশি করবে। আমি দেখতে আসব না।”
কাবু একটু চুপ করে থেকে গলার সুর পাল্টে বলল, “তা হলে তো আমাকে এবার কড়া হতে হয় স্যর। ওস্তাদকে ঘটনা জানাতে হয়।”
অশ্বিনীবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ওস্তাদের ভয় দেখাচ্ছ?”
কাবু ঠান্ডা গলায় বলল, “তা একটু দেখাতে হচ্ছে বইকি। আমার ওস্তাদ লোক ভাল নয়, সঙ্গে আর্মস রাখে। আর্মস বোঝেন? ছুরি-চাকু, রিভলভার... যাক, তাকেই এক বার আপনার কাছে যেতে বলব।”
অশ্বিনীবাবু দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “বেশ, তাই আসতে বলো।”
কনকলতা নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাড়ি বিক্রির বিষয়টা তাঁর জানা বলেই স্বামীর কথা শুনে বুঝতে পারলেন, ফোনের ওপাশে কে কথা বলছিল। কাঁপা গলায় বললেন, “ওরা কিন্তু গুন্ডা। আর ছেলেরাও যখন চাইছে, বাড়িটা না- হয়...”
অশ্বিনীবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে নরম গলায় বললেন, “আর তো ক’টা দিন নাতিনাতনিরা উঠোনে লাফালাফি করবে কনক, বৌমারা লুকিয়ে ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবে, তুমি বারান্দায় বড়ি শুকোতে দেবে... আর তো ক’টা দিন। সারা সপ্তাহে না পারি, ছুটির দিনে বাড়ির সবাই এক সঙ্গে খেতে বসাও হাতে গোনা আর ক’টা দিনের ব্যাপার... এই লম্বা বারান্দায় ইজ়িচেয়ারে বসে ঝিমোনোর সুযোগই বা আর ক’দিন জুটবে? ক’দিন আর গায়ে রোদ, বৃষ্টি এসে পড়বে বলো, তার পর তো ছাড়তেই হবে। এক দিন সবই ছাড়তে হয়। সেদিন দেখবে ছেলেদেরও মন কেমন করবে। ওদের বুঝিয়ে বলো। তার পরেও যদি না বোঝে, তখন না-হয় বাধ্য হব।”
*****
চিলেকোঠায় পিতা-পিতামহের আমলের অনেক জিনিসই গড়াগড়ি খাচ্ছে, তবে গড়গড়া নেই। কিন্তু টিনের সুটকেসের আড়াল থেকে চকচকে ও কে উঁকি দেয়! চমকে উঠলেন অশ্বিনী সেন। সকালবেলার মতোই ভাবলেন, এ হতেই পারে না, ভুল দেখছেন। চশমা খুলে ফতুয়া দিয়ে ভাল করে মুছলেন।
না ভুল দেখেননি। এমন ‘সমাপতন’ কি তাঁর দীর্ঘ জীবনে আগে কখনও ঘটেছে? মনে পড়ছে না। ম্যাজিকের মতো লাগছে। কে জানে, হয়তো জীবনটা আসলে ম্যাজিকই!
অশ্বিনী সেন হাত বাড়ালেন।
তরোয়াল। কাঠের তরোয়াল একটা। কোন ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া খেলনা। ফুটখানেক লম্বাও নয়। হাতল লাল, সবুজ ফলা। জায়গা জায়গায় রং চটে গিয়েছে। খানিকটা রুপোলি রাংতায় মোড়া। কালচে হয়ে যাওয়া সেই রাংতার চকচকানি কমলেও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। ঝেড়েপুঁছে নিতে হবে।
বোঝাই যাচ্ছে, অনেক পুরনো। কত? পঞ্চাশ বছর? একশো? লক্ষ টাকা দাম হবে না?
*****
খেতে বসে তীর্থঙ্কর বলল, “বাবা, ভেবে দেখলাম বাড়ি বিক্রির ব্যাপারটা এখন থাক।”
শুভঙ্কর বলল, “ঠিকই। বয়স হলেও বাড়িটা এখনও খুব মজবুত।”
শ্রেয়সী বলল, “তা-ই ভাল। ছাদে বাগান করেছি। অনেক গাছে সবে কুঁড়ি আসছে।”
অনসূয়া বলল, “আমি তো ভেবেছি, এই বাড়ি নিয়ে ভ্লগ বানাব, মিনিমাম কুড়ি এপিসোড। এরকম পুরনো বড় বাড়ি আজকাল আর কোথায়!”
কনকলতা বললেন, “খুব ভাল। কিন্তু ওই কাবু আর তার ওস্তাদ তো গোলমাল পাকাবে... ছুরি, বন্দুক আছে ওদের...”
অশ্বিনীবাবু সহজ ভাবে বললেন, “ও নিয়ে চিন্তা কোরো না কনক, অস্ত্র আমারও আছে। ভেবেছিলাম, বিক্রি করে লাখখানেক টাকা উপার্জন করব, এখন ঠিক করলাম, না, ও-জিনিস এখানেই থাকবে, এত দিন যেমন ছিল। আমাদের কাছে ওর দাম অনেক বেশি। তা ছাড়া অস্ত্র নানা কারণে প্রয়োজনও হয়। তুমি বরং আর এক হাতা ভাত দাও দেখি।”
কাঁপাই এবং ঝাঁপাই বলে উঠল, “কী অস্ত্র দাদু?”
অশ্বিনী সেন মৃদু হাসলেন, তার পর বললেন, “খেয়ে উঠে দেখাব।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)