E-Paper

পাজি কুকুর বিরজু

উত্তরে বলি, “জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছে, এই অ্যাপার্টমেন্টের মানুষগুলোর মন ছোট। ওর একা-থাকা নিয়ে সবাই ফিসফিস-গুজগুজ করে, তাই এখানে কিছু করবে না।”

সৈকত মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৪১
ছবি: সৌমেন দাস।

ছবি: সৌমেন দাস।

মিলাদিদিকে আমার ভীষণ ভাল লাগে। কী ‘সোয়াগ’, চিন্তা করা যায় না! কী ‘কুল’! দেখতেও তেমনই সুন্দর।

মায়ের মোবাইলটা হাতিয়ে মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় ওর পোস্টগুলো পড়ে দেখি— কবে রূপনারায়ণের তীরে সূর্যাস্ত দেখতে গেল, কবে রবীন্দ্রসদনে আবৃত্তি করল, কোথায় বাচ্চাদের দিয়ে নাটক করাল। ছবি খুব কম থাকে। থাকলেও সেল্ফি। অবশ্য ছবি দেখে আমি কী করব, ইচ্ছে করলেই যখন ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে জ্যান্ত মিলাদিদিকে দেখে আসতে পারি! আমাদের হাউজ়িংয়েই থাকে তো; একাই থাকে, সি-ব্লকের চব্বিশ নম্বর ফ্ল্যাটে।

মাঝে মাঝে মিলাদিদির কোনও পোস্ট মাকেও পড়ে শোনাই। মা শুনে বলে, “সত্যি, কী গুণী মেয়ে! আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের বাচ্চাগুলোকে দিয়ে কিছু অনুষ্ঠান করায় না কেন বল তো? নিজেও তো পার্টিসিপেট করতে পারে।”

উত্তরে বলি, “জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছে, এই অ্যাপার্টমেন্টের মানুষগুলোর মন ছোট। ওর একা-থাকা নিয়ে সবাই ফিসফিস-গুজগুজ করে, তাই এখানে কিছু করবে না।”

মা বলে, “তা বললে হয়? ডিভোর্সের পর পর আমাকে নিয়েও তো অমন কত ফিসফিসানি চলত। তাই বলে কি আমি খোলসে ঢুকে গেছি? শোন, হিয়া! তুই মাঝে মাঝে ওর কাছে যাবি।”

যাই তো। কিন্তু যত ঘন ঘন যেতে পারতাম, তত ঘন ঘন যাই না। তার কারণ বিরজু। অবশ্য মাকে বিরজুর কথা বলিনি কখনও।

বিরজু মিলাদিদির পোষা কুকুর। জাতে স্পিৎজ়। ওকে আমি খুব ঘৃণা করি, কারণ, ও প্রায়ই মিলাদিদিকে আঁচড়ে দেয়। কতটা অসভ্য কুকুর হলে প্রভুকে আঁচড়ে দিতে পারে!

যখনই মিলাদিদির ফ্ল্যাটে যাই, দেখি বিরজু দুটো থাবার মধ্যে মুখটা গুঁজে দিয়ে ঘরের এক কোণে শুয়ে আছে। গায়ের লোম ঝুলঝাড়ুর মতো নোংরা। অন্য সব স্পিৎজ়ের যেমন চকচকে চোখ হয়, ওর চোখ সে রকম নয়… ঘোলাটে। আমি ঘরে ঢুকলেও উঠে আসে না, ডাকে না। শুধু পিটপিট করে তাকায়, আর পুটপুট করে লেজটা নাড়ে। এত দুঃখী ওর মুখটা, ইচ্ছে করে ভালবাসি। ভালবাসতেই পারতাম, যদি না জানতাম ও মিলাদিদিকে ওরকম করে কষ্ট দেয়।

মিলাদিদি বাইরে বেরোলে সব সময় শাড়ির সঙ্গে ফুলস্লিভ ব্লাউজ় পরে, বাড়িতে ঢোলা হাতার কিমোনো কিংবা হাউসকোট। যখনই পোশাকের হাতা একটু উঠে যায়, দেখতে পাই কব্জি থেকে কনুই অবধি লম্বা-লম্বা আঁচড়ের দাগ। কখনো টাটকা… রক্ত চোঁয়াচ্ছে। কখনো একটু মামড়ি-পড়া… পুরনো।

বিরজুর নখ নিশ্চয় খুব ধারালো, আঁচড়গুলোও তাই নতুন ব্লেডের কাটমার্কের মতো সরু। মিলাদিদির নরম চামড়ার উপরে ওই লাল ডটপেনের দাগের মতো ইনজুরিগুলো দেখলে আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আমি বলি “মিলাদিদি, আবার বিরজু তোমাকে আঁচড়ে দিয়েছে?”

হাউসকোটের হাতাটা নীচের দিকে টেনে নিতে-নিতে মিলাদিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “হ্যাঁ রে। ভীষণ বদমাশ কুকুর।”

আমি বিরজুর দিকে কড়াচোখে তাকিয়ে বলি, “তুমি খুব পাজি কুকুর, বিরজু। কী করেছ এটা?”

বিরজু ঘরের সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে এক বার কেঁদে উঠেই চুপ করে যায়। মিলাদিদি বলে, “থাক হিয়া, ওকে বোকো না।”

মিলাদিদি হাঁটুর উপরে থুতনি রেখে মুখ নিচু করে বসে থাকে। নড়াচড়া করতে গিয়ে যদি মুহূর্তের জন্যে ওর ড্রেসের বর্ডার উঠে যায়, দেখতে পাই ওর সুন্দর সাদা পায়ের গোছেও কয়েকটা আড়াআড়ি আঁচড়ের দাগ।

মা আমাকে ওর বাড়ি ঘন ঘন যেতে বলে ঠিকই, কিন্তু এই কারণেই যাই না। মিলাদিদির শরীরের লুকনো আঁচড়ের দাগগুলো আমার ভীষণ মনখারাপ করে দেয়।

অনেক দিন অবধি মাকে কিছু বলিনি, কিন্তু এক দিন সব কথা বলতেই হল।

এমনিতে নানা ব্যস্ততায় মা মোবাইল ঘাঁটার সময়ই পায় না। কিন্তু সেদিন কী কারণে যেন অফিস থেকে ফিরেই ফোনটা নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ নিজের মনেই বলে উঠল, “আশ্চর্য তো!”

“কী হল মা?” আমি কাছে ঘেঁষে বসলাম।

“মিলা কী লিখছে দেখ। লিখছে ‘এই মুহূর্তে কলেজবেলার বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ সময় কাটাচ্ছি। এত সুখস্মৃতি, এত ভালবাসা কোথায় রাখব?’ দেখি তো। হ্যাঁ, মাত্র তিন মিনিট আগের পোস্ট।”

“তো?” আমি মায়ের অবাক হওয়ার কারণ বুঝতে পারলাম না।

মা বলল, “মিথ্যে কথা লিখেছে। এইমাত্র দেখে এলাম, অন্ধকার ঘরে জানলার গ্রিলে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে।”

আর পারলাম না। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। বললাম, “মিলাদিদিকে নিয়ে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে, মা। শি ইজ় বিয়িং হন্টেড, শি ইজ পজ়েসড। ওর উপর ভূতে ভর করেছে।”

মা আমার দু’কাঁধ ধরে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে বলল, “তুমি একটা চোদ্দো বছরের মেয়ে, হিয়া। বাচ্চাদের মতো বিহেভ কোরো না। কী হয়েছে, ঠিক করে বলো।”

আমি প্রথমে পাজি কুকুর বিরজুর সব কথা মাকে খুলে বললাম। তার পর বললাম, “বিরজু এক মাস আগে মারা গেছে, মা। ওকে ডগ বেরিয়াল-গ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল মিলাদিদি। কিন্তু এখনও মিলাদিদির হাতে-পায়ে প্রতিদিন আগের মতোই আঁচড়ের দাগ পড়ছে। কাল ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী ভাবে সম্ভব মিলাদিদি? মিলাদিদি বলল, ‘বিরজু আমাকে ছেড়ে থাকতে পারছে না রে। ঘুমের মধ্যে এসে আমাকে আঁচড়ে দিয়ে যাচ্ছে’। কী হবে মা মিলাদিদির? বিরজুর পাজি প্রেতাত্মা যদি এক দিন ওর টুঁটি ছিঁড়ে নেয়?” বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেললাম।

মা খানিকক্ষণ গম্ভীর মুখে কী যেন ভাবল। তার পর পার্সটা নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমার ফিরতে দেরি হলে তুই খেয়ে নিস।”

“কোথায় যাচ্ছ সেটা তো বলে যাও!” আমি পিছন থেকে চেঁচালাম।

“তোর মিলাদিদিকে ভূতের ওঝার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। বোকা মেয়েটা নিজেকে কেন এভাবে শাস্তি দিচ্ছে জানি না।”

এ-সব তিন মাস আগের কথা। সত্যিই তার পর থেকে বিরজুর ভূত আর মিলাদিদির গায়ে আঁচড়ে বসাতে পারেনি। এখন মিলাদিদি ছোটহাতা টপ পরে, স্লিভলেস কুর্তা পরে। আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, ওর হাত-পায়ের ত্বক চাঁপার পাপড়ির মতো নিদাগ, মসৃণ।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy