E-Paper

নিষিদ্ধকরণ

কুন্তলা নিজের ফোনটা নাড়েচাড়ে, “হ্যাঁ রে আমার ফোনটাও একেবারে বন্ধ। সুইচ অন করা যাচ্ছে, কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না।”

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৪৬
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

গতকাল রাতে বারুদের মতো ফেটেছে ঘোষণাটা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সব কিছু গুটিয়ে নিয়েছে ইন্টারনেট। আজ সকাল থেকেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ওয়টস্যাপের যাবতীয় কাজকর্ম বন্ধ। সরকারের তরফে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মোবাইল ফোনের যাবতীয় ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হল।”

নতুন নির্বাচিত সরকারের এই ঘোষণাকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কেননা দিনটি ছিল পয়লা এপ্রিল। এই দিনে সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে জোরালো একটা ঠাট্টা করেছেন, এমনটাই ভেবেছিল সকলে।

ঠিক সকাল সাতটায় টুবলুর চিৎকার ভেসে এল দোতলার শোওয়ার ঘর থেকে।

“মা তুমি মোবাইলে অ্যালার্ম দাওনি! এখন সাতটা বাজে। সাড়ে ছ’টায় অঙ্কের টিউশন ক্লাসটা মিস করলাম।”

কুন্তলা চেঁচায় একতলা থেকে, “দিয়েছি। মোবাইলটা চেক কর।”

টুবলু এবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে, “মা, মোবাইলে কোনও সাড়াশব্দ নেই। তোমার ফোনটা দেখো তো!”

কুন্তলা নিজের ফোনটা নাড়েচাড়ে, “হ্যাঁ রে আমার ফোনটাও একেবারে বন্ধ। সুইচ অন করা যাচ্ছে, কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না।”

এবার মোহনও তোয়ালে পরেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে, “কুন্তলা, কী হল বলো তো? মোবাইলটা ফাংশন করছে না কেন?”

কুন্তলার এতক্ষণে মনে হয়, বেশ হয়েছে। বারণ করলেও শোনে না, বাথরুমে যাবে মোবাইল নিয়ে। যা হয়েছে ঠিক হয়েছে।

স্নান সেরে মাধবীদেবী মোবাইল অন করলেন। চালু হলেও ফোন করা গেল না। বারংবার বোতাম টেপেন। গোবিন্দের নিত্যপুজোর ঠাকুরমশাই না এলে তিনি তো জলগ্রহণ করতে পারবেন না। অগত্যা ভারী শরীর নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে অপেক্ষায় দাঁড়ান। দাঁড়াতেই চোখে পড়ে অনেক দিন আগের মতো পাড়ার রকে ছোকরা, বুড়ো, মাঝবয়সি সবাই জড়ো হয়েছে। কী নিয়ে যেন জোর আলোচনা চলছে। এক জন আবার জোরে জোরে কাগজ পড়ে শোনাচ্ছে। ‘মোবাইল’ কথাটা কানে এল।

প্রতিদিন মণি সাইকেলের সিটে লাফিয়ে উঠে কানে তার গোঁজে। ওর সিটের পিছনের ক্যারিয়ারে থাকে কাগজের বান্ডিল। সকালে কাগজ দিতে দিতে মোবাইলে একটু রেডিয়ো শোনে ও। সেদিন সুইচ অন করার পরেও কানে কিছু আসছিল না। ঝুমাদের বাড়িতে কাগজটা ফেলার সময় দেখে, ওর ঠাকুমা ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে নীচের রকের কথা শোনার চেষ্টা করছেন।

রকের ওখানে জটলা চলছে। মণি ওদিকেই এগিয়ে যায়। কী বলছে ওরা?

ভিড়ের মধ্যে হাত-পা নেড়ে ভানুদা বলছিলেন, “তখনই বলেছিলাম এদের ভোট দিয়ো না। শুনলে না তো, এবার মজা দেখো। এরা তো মোবাইলের কথাবার্তাই বন্ধ করে দিল।”

একটা কুকুর জটলার পাশে ঘুরঘুর করছিল। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারমশাই নির্মল মিত্র কুকুরটাকে পকেট থেকে একটা বিস্কুট ছুড়ে দিয়ে বলেন, “যাঃ যাঃ!” তার পর ভিড়ের দিকে ফিরে তাকান, “কালই তো ঘোষণা হয়েছিল। তাই আমি গতকালই শিলিগুড়িতে আমার মামার বাড়িতে ফোন করে অসুস্থ মামির খবর নিয়েছি। তোমরা কেউ আপডেট রাখো না।”

হিলু গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে, “নির্ঘাত যুদ্ধ লাগছে।”

গুলবাজ বলে হিলুর খ্যাতি আছে। ওর কথাকে কেউ পাত্তা দেয় না।

চায়ের দোকানের মদন ভিড়ের কাছে কাঁদো-কাঁদো গলায় জানতে চায়, “মোবাইলটার কী হল বলুন তো? জোগাড়ে ছোকরাটা এখনও এল না, দুধওয়ালা দুধ দিয়ে গেল না। কাউকে ফোন করতে পারছি না। মিলের বাঁশি বেজেছে। এবার চায়ের সাপ্লাই দেব কী করে?”

তখনই বাচ্চার গলায় কান্নার আওয়াজ শুনে সবাই তাকিয়ে দেখে, দুষ্টুকাকার ছেলের বৌ মেয়েকে টানতে টানতে স্কুলের বাস ধরাবে বলে নিয়ে যাচ্ছে। মুখে জোরালো গজগজানি চলছে, “মারব এক থাপ্পড়! পাক্কা বদমাশ একটা! মোবাইলে ছবি না দেখলে উনি খাবেন না। থাক উপোস করে।”

মধু বিছানায় শুয়ে শুয়েই আড়মোড়া ভাঙে। ও নানা ধরনের কাজ করে। ওর বৌ বলে, “কী গো! কাজে যাবে না?”

মধু হাসে, “পার্টি কালই পেমেন্ট করেছে। আজ ডুব দেব। মোবাইল চলছে না। বাবুরা ডাকতে পারবে না। একটা চোখ টিপে ও বৌকে ইশারা করে, আয় না, তোকে জড়িয়ে একটু শুয়ে থাকি।”

তরঙ্গ হেসে বলে, “মরণ!”

রেডিয়োতে খবরে বলল, মোবাইলের পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় চারদিকে অবরোধ হচ্ছে। বারাসতে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা মিছিল বার করেছে। তারা চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে, “মোবাইলের পরিষেবা বন্ধ করা চলবে না, চলবে না। নতুন সরকার নিপাত যাক।”

কর্পোরেটের বড়কর্তা হাত কামড়াচ্ছেন। ছেলে ইভটিজ়িং-এর জন্য থানায় আটক। মোবাইলে প্রভাবশালী কোনও নেতাকে ধরতে পারছেন না। ছেলেকে ছাড়াবেন কী করে?

দু’বেলা অফিসে যাতায়াতের সময় দিলীপবাবু মোবাইলে ভক্তিগীতি শোনেন। আজ ট্রেনে উঠে তিনি হতবাক। অন্য দিন সবাই মোবাইলে মগ্ন থাকে। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না। আজ ট্রেনে যেন মাছের বাজার বসেছে। সবাই চিৎকার করে কথা বলছে। যাত্রীদের বেশির ভাগই মোবাইল নিষিদ্ধকরণের জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে এই নয়া সরকারের মুণ্ডপাত করছে।

নিত্যযাত্রী দু’টি পঁচিশ-ছাব্বিশের মেয়ে কানে ক্লিপ লাগিয়ে অন্যদিন নিচু গলায় যে-যার ফিয়াঁসের সঙ্গে প্রেমালাপ করে। আজ ম্লানমুখে বসে আছে। দিলীপবাবু দৃষ্টি সরিয়ে নেন।

কিছুক্ষণ আগের রাতের শেষ টিভি নিউজ়ে বলল, “প্রধানমন্ত্রী নিজের এবং বিরোধী পক্ষের সদস্যদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেছেন। মোবাইল পরিষেবা বন্ধের ব্যাপারে আলোচনা করে পুনরায় সিদ্ধান্তে আসা হবে বলে জানিয়েছেন।”

রাত বাড়ছে। আকাশের চাঁদ উঁকি মারে জানালায়। বুকের কাছে বন্ধ মোবাইলে একটি হাত রেখে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখের কোলে জলের দাগ।

চাঁদ টুক করে নেমে এসে কপালের টিপ হয়। তার পর তার নরম জোছনা দিয়ে ধীরে ধীরে সবটুকু জলের দাগ মুছিয়ে দেয়।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy