পূর্বানুবৃত্তি: শরদিন্দুবাবুর কথায় উঠে এল কী ভাবে যৌবনকালে তাঁরা স্ত্রীশিক্ষার জন্য লড়াই করেছিলেন। আড্ডা দিতে দিতে কথায় কথায় শরদিন্দুবাবু জানালেন যে সে বছর পুজো উপলক্ষে জনমেজয়বাবুরা পালা অভিনয় করবেন। নানা গল্প, কাহিনি, মনীষীদের জীবনবৃত্তান্ত শুনিয়ে নাতির মনকে শোক থেকে যথাসম্ভব সরিয়ে রাখছেন জ্যোৎস্নাদেবী। তাঁর তত্ত্বাবধানে যাবতীয় নিয়মকানুন মেনে সম্পন্ন হল পল্লবীর পারলৌকিক কাজ। অন্য দিকে, অফিস যাওয়ার পথে রফিককে ডেকে কাছে বসিয়ে নানা অভিজ্ঞতার ঝুলি খুললেন জনমেজয়। বাকিরা যদিও ঠাট্টা-তামাশায় রফিককে উত্ত্যক্ত করে তুলতে ছাড়ল না।
আজ বিকেলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের ফেয়ারওয়েল।
সুচারু ভাবে সাজানো হয়েছে। কয়েক দিন ধরে তিনি শুধু দিন গুনতেন। এক মাস, কুড়ি দিন, তিন দিন... আর কমতে কমতে অবশেষে আজ হল সেই দিন, হয়তো কাঙ্ক্ষিত।
সভায় বসে খুব ক্লান্ত লাগছিল ওঁকে। জনমেজয় রয়েছেন, দীপঙ্করও গেলেন। মন্দ লাগত না ওঁর মানুষটিকে। বাড়ি থেকে বৌ, ছেলে এসেছে ওঁর। ফ্ল্যাটে গোছগাছ চলছে।
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন, “এ বার বাড়ি গিয়ে কয়েক দিন ঘুমোব। অনেক দিন, অনেক বছর ঘুম হয়নি। চাকরির দীনতা এই যে, সব সময় মালিকের আজ্ঞা শিরোধার্য করতে করতে ক্লান্তি আসে কিন্তু ঘুম হয় না। স্বপ্ন দেখা হয়, কিন্তু সবই এলোমেলো, সাযুজ্যহীন। দীর্ঘ বছরগুলি চাকরি করতে করতে কেটে গেছে। চাকরি করা ছাড়া আর যে কিছু করতে হয়, ভুলেই গেছি। একটু-আধটু লিখি, তেমন কিছু নয়। আপনারা সকলে ভাল থাকবেন। গুপ্ত বৃন্দাবন বিষ্ণুপুরে বেশ কাটল।”
এই সময় লাইব্রেরিয়ান এলেন, বিশ্বজিৎবাবু।
দেখে হাসলেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব।
বললেন, “লাইব্রেরিয়ান সাহেব এসেছেন। আমি পাঠাগারে যেতাম, দেখতাম মানুষ আসছে, বই পড়ছে। আমাদের সময় গ্রামীণ পাঠাগারে বই পড়ার জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত। স্কুলেও লাইব্রেরি ছিল। আমরা বই নিতাম, পড়তাম। বোধহয় বই পড়াটাও হারিয়ে যাচ্ছে। যা হারিয়ে যায় তা ফেরানো কঠিন। বই পড়ার মতো গ্রামে গ্রামে যাত্রার দল আসত, সে সব এখনও মনে আছে। ‘নটী বিনোদিনী’র রাঙাদাকে পরের দিন বাজারে ইলিশ মাছ কিনতে দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেছিলাম। তার পর সাইকেলের প্যাডেলে পা দেওয়ার সময় একে একে রামকৃষ্ণ, বিনোদিনীদের দেখতে পেয়ে গেছিলাম।
“জনমেজয়বাবুও যাত্রা করেন, দীপঙ্করবাবু করবেন। আমার শুভেচ্ছা রইল। সকলের প্রতি শুভেচ্ছা রইল।”
হাততালি পড়ল। কিছু উপহার ওঁরা দিলেন।
ফেরার সময় দীপঙ্কর মুখোমুখি হলে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন, “নবকার্তিকের সংবাদ পেলেন?”
দীপঙ্কর সংক্ষেপে বললেন তাঁর বাবার টপ্পাগুলির কথা। নবকার্তিক ভেবে তিনি গাইতেন, যেন তিনিই নবকার্তিক।
শুনে অবাক হলেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। তার পর বললেন, “আপনার বাবা তা হলে নবকার্তিক সম্পর্কে ভালই জানতেন!”
জনমেজয় বললেন, “স্যর, আমরা ‘ম্যাকবেথ’ করছি পুজোর পর পর।”
“পুরুলিয়ায়? না কলকাতায়?”
“পুরুলিয়ায় হরিমণ্ডপে।”
“মণ্ডপ ঘিরে দেবেন?”
“হ্যাঁ স্যর। আপনি আসবেন?”
“ইচ্ছে রইল।”
বলে তিনি একটু একটু করে এগিয়ে গেলেন। গাড়িতে ওঠার আগে অফিস বিল্ডিংটা দেখলেন। সেই কবে আত্রেয়ী নদী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই কুমারগঞ্জ। তার পর ভিন্ন ভিন্ন জেলা। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। অনেকে বলেন, ইদানীং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কখনও ভাল ছিল না। ভয় ছিল বরাবর। ভয় দেখানো ছিল। মানুষকে অনুদান দিয়ে ভিক্ষুক বানিয়ে দেওয়া ছিল না।
তিনি ভাবলেন, এটা কি মুক্তি!
না, মুক্তি নয়। শেষ মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে কি পারবেন! ভয় পাবেন না!
জানেন না, জানা যায়ও না।
বাড়ি ফিরে গিয়ে দীপঙ্কর জ্যোৎস্নাদেবীকে বললেন ওঁর কথা। নবকার্তিকের কথা।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, “জানো তো, সবারই কাজ থেকে অবসর মানে মৃত্যুর দিকে যাত্রা শুরু হয়ে গেল।... তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী... তোমার বাবা প্রায় বলতেন রবীন্দ্রনাথের এই শেষ কবিতাটি। কবি ভাবছেন, আরোগ্য লাভ করে তিনি ফিরে আসবেন। তখন কবিতাটি আরও ঠিকঠাক করে নেবেন।”
সত্যি, বিচিত্র ছলনাজাল।
এত বড় অভিনেতা, কোনও মানুষই নেই। কোথায় গেল সেই সব অগুনতি করতালি দেওয়া নরনারী। যেন অগোচরে চলে গেলেন তিনি, বাংলা যাত্রাপালার অবিসংবাদিত নায়ক।
দীপ বলল, “ঠাম্মা, আমাদের বাড়িটার নাম মিনার্ভা। তাই না?”
জ্যোৎস্নাদেবী বললেন, “দেখেছ দীপঙ্কর, দাদুভাই কতটা ভালবেসে ফেলেছে বাড়িটাকে!”
হাসলেন দীপঙ্কর।
“মিনার্ভা। তোমার দাদু রেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, বাড়িটাও হবে মঞ্চ। এই মঞ্চ থেকেই তিনি বিদায় নেবেন।”
দীপঙ্কর বললেন, “বাবার মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত পরিতৃপ্ত হাসি ছিল।”
“তুমি দেখেছিলে, তাই না?”
“হ্যাঁ মা।”
দীপঙ্কর বললেন, “মা এ বার দীপকে কয়েক দিনের জন্য চন্দননগর নিয়ে যেতে হবে। প্রাইভেট টিউশন কিছুটা নিতে হবে।”
জ্যোৎস্নাদেবীকে খুব অসহায় দেখাল। “পুজোর মুখে চলে না গেলে হত না!” তিনি বললেন।
দীপঙ্কর বললেন, “তুমিও যাবে।”
দীপ বলল, “হ্যাঁ ঠাম্মা, তোমাকেও যেতে হবে।”
এই সময় একটা ফোন এল। দীপঙ্কর একটু আশ্চর্য হলেন। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব, “কেমন আছেন? আমাকে মনে আছে তো?”
“নিশ্চয়ই স্যর। আপনি কেমন আছেন?”
“ভাল। নবকার্তিককে মনে আছে তো?”
হেসে উঠলেন দীপঙ্কর, “আমার মাকে দেব, কথা বলবেন?”
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন, “জ্যোৎস্নাদেবী! উফ, আমার সৌভাগ্য!”
দীপঙ্কর বললেন, “মা আমাদের সদ্য অবসর নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব কথা বলবেন। তোমাকে বলেছি না, উনি নবকার্তিকের কথা বলেন।”
জ্যোৎস্নাদেবী বললেন, “নমস্কার স্যর।”
“ছি ছি! আমাকে আর স্যর বলবেন না। আমার প্রণাম আপনাকে।”
জ্যোৎস্নাদেবী বললেন, “নবকার্তিকের কথা আমার স্বামীর মুখ থেকে শুনি। উনি স্মৃতি হারিয়ে ফেলে নিজেকে নবকার্তিক ভাবতেন। আর টপ্পা, খেউড় গাইতেন।”
“আশ্চর্য। উনি তো আর বেঁচে নেই, তাই না?”
“না, আর বেঁচে নেই। আসুন এক দিন আমাদের বাড়িতে। আসার আগে ফোন করে নেবেন।”
“নিশ্চয়ই ফোন করে নেব।”
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বৌকে বললেন, “চলো, এক বার জ্যোৎস্নাদেবীর সঙ্গে দেখা করে আসি।”
“তিনি আবার কে?”
“এক সময়ের যাত্রাসম্রাজ্ঞী।”
“তুমি আবার যাত্রার ফ্যান হলে কবে!”
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব টপ্পা-খেউড় গান আর জ্যোৎস্নাদেবীর কথা সংক্ষেপে বললেন।
“জানতাম, তুমি কিছুতেই বাড়িতে বসে থাকতে পারবে না।”
তিনি বললেন, “না, না, খুব কম বেরোব। এটা ইচ্ছে করছে।”
বৌ বলল, “আহা! মাঝে মাঝে বেরোবে। ইচ্ছে হলে আবার চাকরি করবে!”
“আমি আর চাকরি করব না। অমলের মতো সারা জীবন আমি বলতে চেয়েছি, আমি কখনও পণ্ডিত হব না, তা হইনি। কিন্তু চাকরির যন্ত্রণা বয়ে বেড়ালাম। এখন একটু বিশ্রাম। তার পর ভাবব।”
ছেলের ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে ওঁর খুব খারাপ লাগল। খুব অসহায়ও মনে হল নিজেকে। ও এখনও বেকার, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের এমবিএ। এ ছাড়াও কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি আছে। প্রায় দিনই ইন্টারভিউ দিতে যায়, ফেরে অনেক রাতে শূন্য হাতে। এই রাজ্যের হাজার হাজার যুবক-যুবতীর নিয়তি এরকমই।
পুরুলিয়ায় বীণাপাণি অপেরা কোজাগরী পুর্ণিমার রাতে করবে ‘ম্যাকবেথ’। কারণ দীপাবলি অবধি তিনি থাকতে পারবেন না। এ ছাড়াও দীপঙ্কর সাহেব ছাড়া উনি তো আসবেন না। নতুন নাটমন্দির উদ্বোধিত হবে জ্যোৎস্নাদেবীর পাদস্পর্শে, আর হয়তো তাঁর পরিচালনায় শেষমেশ হবে মহাকবি ও নাট্যকার শেক্সপিয়র সাহেবের অমর ট্র্যাজেডি ‘ম্যাকবেথ’। এখানে না এলে জানা কি যেত, এক জন সৎ মা হয়েও জ্যোৎস্নাদেবীর হৃদয়ে কেমন করে জাগ্রত ছিল মাতৃত্বের চিরন্তন ক্ষুধা, আর গর্ভদায়িনী না হয়েও সন্তানের সঙ্গে মিলনের মধ্যে তিনি অর্জন করলেন এক অনন্য ঐহিক সুখ!
গাড়ি চলতে শুরু করল বারাসতের পথে।
শরদিন্দুবাবু কিছু দিনের জন্য দিল্লি যাবেন। ছোট ছেলে বৌমা নাতিকে নিয়ে দিল্লি আসবে দাদার কাছে। পুজোর দিনগুলি ভরে উঠবে। ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে ওঁরা সকলে মিলে এক দিন দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে দুর্গোপুজো দেখতে যাবেন, আর এক দিন যাবেন দিল্লির বাঙালি কালীবাড়িতে। মন্দ লাগবে না, কিন্তু সেখানে কি পাবেন বাবার হাত ধরে দেখা কলকাতার পুজো! ফোস্কা ওঠা পায়ের ব্যথা অগ্রাহ্য করে নেবুতলার অলোক সেনের আশ্চর্য দেবীমূর্তি। কলেজ স্কোয়ারে রমেশ পালের হাঁ করা অসুর। আর বিষ্ণুপুরে ষষ্ঠীর দিনের যাত্রা। সাজঘরে রাবণের সেই বেদনায় বিধৃত পিতার কণ্ঠস্বর, “জানিস রামচন্দ্র, আমার মেয়েটার খুব জ্বর।”
সেই নকল রামের আসল নামও কি রামচন্দ্র ছিল! তিনি কি কৃত্তিবাসের নবদূর্বাদলশ্যাম! না কি তিনি বাল্মীকির রাম, বাঙালির থেকে কিছুটা দূরের!
মনে পড়ে, ছেলেবেলায় পল্লিবধূদের মনের আনন্দের গান— ‘সীতার মতো সতী হব/ রামচন্দ্র পতি পাব/ লক্ষ্মণের মতো দেওর হবে/ কৌশল্যার মতো শাশুড়ি হব/ দশরথের মতো শ্বশুর হবে।’
এ সব কি আর এই যুগে বলা যায়! গৃহাশ্রম সমস্ত সমাজকে এক দিন ধারণ করে রাখত। আর যাত্রাপালার কবি রামায়ণী কথায় বা রামযাত্রায় তা শুনিয়ে শুনিয়ে এক অপূর্ব কল্পলোক নির্মাণ করত একান্নবর্তী পরিবারের।
বাবা বলতেন, “রামায়ণের পৃথিবী দু’টি। একটি সর্বাঙ্গসুন্দর। আলো জল বাতাস গাছপালা পশুপাখি সবটাই বিশ্বাসের। আর একটা পৃথিবী যেন মায়ার। সেখানে মানুষ নেই, মায়াবী রাক্ষসের বাস। সাদা আর কালোর সংঘাত, দুটো সভ্যতার সংঘাত।”
বিভীষণ রাবণকে বলেন, “দাদা, তুমি ভুল করছ। সীতাহরণের পর লঙ্কানগরীতে নানা অশুভ দেখা যাচ্ছে। সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়াই শ্রেয়।”
আর রাবণ বলছেন, “আমি ভয়ের কিছু দেখছি না। বীরের মতো যুদ্ধ করতে হবে।”
সাজঘরের রাবণ বলেছিলেন, মেয়েটির খুব জ্বর। তবু তিনি স্টেজে দশানন। তাঁর মৃতদেহ ঘিরে আসে রাবণকাটার দল। বিষ্ণুপুরের নিজস্ব ঘরানা। কালো পশুচর্মে ঢাকা ওরা না-মানুষ। বাদ্যি বাজে, তার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে-বাতাসে। ল্যাটেরাইট উপত্যকার মানুষের জীবনের ছন্দের সঙ্গে তার বড্ড মিল।
ফিরে যাবেন পুজোর পরই। তাঁকে যেতে হবে কোজাগরীর দিন পুরুলিয়ার এক নাটমন্দিরে। সেখানে আসবেন যাত্রাজগতের সেই অনন্যা নায়িকা জ্যোৎস্নাদেবী। কোজাগরীর রাতে তাঁর পুনঃপ্রকাশ হবে। বীণাপানি অপেরা করবে ‘ম্যাকবেথ’। আমন্ত্রণ আছে যাওয়ার।
কাজের মেয়েটা এসেছে বাজার নিয়ে। বেশ মিষ্টি করে ডাকে, “জেঠু, জেঠু।”
পুজোর পর পর হবে ‘ম্যাকবেথ’। পানসদার কড়া হুকুম, পুজোতেও হবে রিহার্সাল। তনুশ্রী জ্যোৎস্নাদেবীর কথা শুনে বলেছে, লেডিম্যাকবেথ করবে। তবে সবটাই নির্ভর করবে পরিচালকের উপর।
৩০
নাতিকে নিয়ে গোন্দলপাড়া, ফরাসডাঙায় গিয়ে দেখলেন, যাত্রার আর কোনও স্মৃতি বেঁচে নেই। ইস্পাত সঙ্ঘ রয়েছে। তারা আধুনিক ধারার নাটক করে। গল্পমেলা রয়েছে গল্পকারদের। সেখানে এক জন প্রাক্তন অভিনেত্রীর কি কোনও মূল্য আছে! তাঁরা কি জানেন না তিনি এসেছেন! না, তেমন কেউ আর নেই। নাতির হাত ধরে দেখে এসেছেন ঝিলের ধারের সেই কেয়াবন। অযত্নে আপনা আপনি বেড়ে উঠেছে। সেই কামার্ত গন্ধ, আর দেখেছেন সর্পদম্পতিকে। ওরাও দেখল তাঁকে, গ্রহণও করল। হাওয়ায় চিত্রল ফণা দুলিয়ে অভিনন্দন জানাল। অবাক হয়ে দেখল দীপ।
ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করে, “ওরা তোমাকে চেনে?”
তিনি বলেন, “দাদুভাই, ওরা তো রাতের রানির পাহারাদার। তাই হয়তো আমার মতো রাতের রানিকে চেনে।”
“তুমিও ঠাম্মু রাতের রানি ছিলে!”
“সাজঘরে সাজতুম যে, সত্যিকারের রানি নয়, নকল রানি।”
দীপ ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি সত্যিকারের রানি। একটা কথা বলব ঠাম্মা?”
“বলো না দাদুভাই।”
“তোমার গায়ে সবসময় যেন কেয়া ফুলের গন্ধ। কী মিষ্টি!”
“দূর বোকা, ও রকম হয় নাকি! তোর মনে হয়। পাগল ছেলে আমার!”
“ঠাম্মা, কেয়া ফুলের গন্ধে সাপ আসে?”
“কখনও মনে হয় আসে, কখনও মনে হয় আসে না। ভ্রমর তো আসে কেয়াবনে, ফিরে যায় মধু নেই বলে। কেয়ার বুকে প্রচুর কীট আসে, ওরা দংশন করে কেয়াকে। আবার কাঁটার আঘাতে মারাও যায়। সাপের ঘ্রাণশক্তি কম, সে কি কীটপতঙ্গের টানে আসে! পৃথিবীতে আমরা জানি খুব কম, ফলে সাপের ঘ্রাণশক্তি কম কি না, তেমনটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবে কেয়াবনে সাপ যে কীটপতঙ্গের টানে আসে, এটা ঠিক। এ রকমই ভাবতে যুক্তিবাদী মানুষ ভালবাসে।”
আজ শনিবার, ছুটির দিন। অনেক শনিবার যেতে হয়, আজ হয়নি। দীপঙ্কর বাজার করে ফিরলেন। কচুরি-তরকারি নিয়ে এসেছেন।
তিন জনে মিলে খাওয়া হল।
দীপঙ্কর বললেন, “মা, আমাদের অগোছালো ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছ। আমি ভাবি প্রায়, পল্লবী কেন এমন বদলে গেল! কী সর্বনাশটানিজের করল।”
“বাবা, মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার মন। যুধিষ্ঠির বলেছেন, মন সবচেয়ে দ্রুতগামী। সেই দ্রুতগামী মনে পল্লবী নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেনি। ওর নিয়তি ওকে টেনে নিয়ে গেছে।”
ক্রমশ
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)