পূর্বানুবৃত্তি: সাপ দেখলেই সকলে দৌড়ে পালায়, কিন্তু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে মন্টু, অর্থাৎ জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক মনোতোষ লাহিড়ী। সাপের চিত্র-বিচিত্র সৌন্দর্যে কেমন নেশা লেগে যায় তার। শিবুকাকার পাশে মাছ ধরতে বসে জীবনে প্রথম একটা পুঁটিমাছ ধরে ফেলেছিল মন্টু। কিন্তু বঁড়শি থেকে ছাড়িয়ে ফের জলে ফেলে দেওয়ার আগেই মরে যায় সেটি। মনখারাপ হয় ওর। শিবুকাকার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে মন্টুরই কলেজের সহপাঠিনী নন্দার। এখনও তাদের সন্তানাদি হয়নি। এক দোলপূর্ণিমার সন্ধেয় সংসার জীবনের নানা অভাব-অভিযোগের ঝুলি মন্টুর কাছে খুলে ধরেছিল নন্দা। সংসার এবং স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন শিবুকাকা মাছ ধরার সুযোগ পেলে দুনিয়া ভুলে যায়। সেদিনও সে গেছে বিরাজপুরে।
অবাক হয়েছিল মন্টু, “কেন? বিরাজপুরে কী?”
একটু চুপ করে থেকে নন্দা বলল, “আজকের দিনেও তোর কাকা মাছ ধরার নেশা ছাড়তে পারল না। রাজদিঘিতে টিকিট কেটে মাছ ধরবে। সব সাজসরঞ্জাম নিয়ে সকালেই বেরিয়ে গেছে। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ফিরবে। শরীর জুড়ে চারের মশলার গন্ধ। সাবান মেখে স্নান করলেও শরীর থেকে গন্ধ যায় না।”
মন্টু বলল, “আজকের দিনটা বাদ দিতে পারল না! এর চেয়ে তো মদ-গাঁজার নেশাও ভাল। প্রথম থেকেই তোর কড়া হাতে ট্যাকল করা উচিত ছিল। প্রথম রাতে বেড়াল মারতে পারিসনি, এখন আর কন্ট্রোল করা মুশকিল। তোর মতো সুন্দরীও ওকে ঘরে রাখতে পারছে না! রুই-কাতলার চকচকে শরীরটাই বেশি আকর্ষণের হল!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নন্দা বলে, “অনেক রাগারাগি করেছি। ছিপ-হুইল লুকিয়ে রেখেছি। প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছে। ক’দিন বন্ধ রেখেছে। তার পর আবার চোর-চোর মুখ করে বেরিয়েছে। কী বলে জানিস? বলে, এক দিকে যদি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরা থাকে, আর অন্য দিকে বড় কোনও দিঘিতে মাছ ধরার সুযোগ— তবে সে ওই দিঘিতেই যাবে। এটা নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গেম। এর মতো উত্তেজনা অন্য কোনও গেমে নেই। আরও বলে, মাছ-ভর্তি পুকুরে মাছ ধরে নাকি সুখ নেই। অনেক সাধ্যসাধনা করে চারে মাছ টেনে আনা, টোপ খাওয়ানো, তার পর খেলিয়ে খেলিয়ে ডাঙায় টেনে তোলা, তার সঙ্গে নাকি অন্য কোনও নেশার তুলনাই হয় না। এখন আর কিছু বলি না। পয়সাও তো কম খরচ হয় না! একগাদা জাপানি ফাইবারের ছিপ। দামি হুইল। কী বলব তোকে মন্টু, আমাদের বিবাহবার্ষিকীর দিনেও অনেক রাত করে ফিরল। আমি ভাবতেই পারিনি। শুধু রাত করে ফেরাই নয়, বাবু আবার ঢুকু ঢুকু করে এসেছেন! ও সব নাকি গায়ের ব্যথা মারার ওষুধ। কিচ্ছু বলিনি। মিষ্টির প্লেট সামনে দিলাম। বলে কিনা, ‘কিসের মিষ্টি!’ বল মন্টু, কেমন সুখে আছি। তাই না?”
“কিছু মনে করিস না নন্দা, তুই সম্পর্কে আমার কাকি, কিন্তু আমরা তো বন্ধুই। বিয়ের আগে থেকে তোকে আমি চিনি। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কর, কী জিজ্ঞেস করবি।”
“ইস্যু নিচ্ছিস না কেন? দেরি হয়ে যাচ্ছে না? বেশি বয়সে কিন্তু সমস্যা হয়। তোর একটা ছানা থাকলে কিন্তু বেশ হত।”
অনেক ক্ষণ চুপ করে রইল নন্দা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মন্টুও দেখল, দোলপূর্ণিমার মস্ত চাঁদ সোনার থালার মতো ভাসছে। বাতাসে আবিরের গন্ধ। রাধামাধবের মন্দির থেকে খোল-মন্দিরার শব্দ ভেসে আসছে। নন্দা তার কথার কোনও উত্তর দিল না। কে জানে, কথাটা তার বলা উচিত হল কি না। একেবারেই পার্সোনাল কথা। সন্তান হওয়ার কথার অনুষঙ্গে নরনারীর গোপন কথা থাকে। পুরুষের সক্ষমতার কথা, বীজ উপ্ত হওয়ার কথা, নারীর উর্বর শরীরের কথা, অনুকূল সময়ের কথা, কত শর্ত-সমীকরণ পূর্ণ হলে সার্থক সঙ্গমের পর গর্ভাধান হলেও হতে পারে।
“জানি না মন্টু। দু’জনেই বেশ ক’বার পরীক্ষা করিয়েছি। অল ইজ় ওয়েল, কারও কোনও সমস্যা নেই, বাট... জানি না মন্টু।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। চল, বাইরে চল। বাইরে আজ শুভ্রজ্যোৎস্নাপুলকিত যামিনী... এমন রাতে ঘরে বসে থাকলে ঠাকুর পাপ দেয়।”
“তুই যা, আমার ভাল লাগছে না।”
ভাল লাগছিল না মন্টুরও। ছিপ মাটিতে ফেলে রেখে ছাতিমগাছের ছায়ায় একটা উঁচু ঢিবির উপর গিয়ে বসল। অক্টোবরের আজ পাঁচ তারিখ। তার স্কুলে গতকাল থেকে পুজোর ছুটি পড়েছে। ভালই হয়েছে, নইলে আজ এ বাড়ি আসা হত না। নন্দা তাকে নিজে ফোন করে আসতে বলেছে। নন্দার আজ জন্মদিন। এ বাড়িতে শেষ বার এসেছিল যত দূর মনে পড়ে গত দোলপূর্ণিমায়। সেদিন নন্দার মুড অফ ছিল। বাড়িতে উৎসব ছিল, লোকজনের ভিড়। সবাই এসে নন্দার কাছেই শিবুর খোঁজ করছিল। কাঁহাতক আর সবাইকে একই কথা বলা যায়। নন্দার মনে হচ্ছিল আজকের দিনেও শিবু বাড়ি নেই, এটা যেন নন্দারই বড় একটা অপরাধ। সবার চোখে যেন সে কথা দেখতে পাচ্ছিল নন্দা। হয়তো যে যার মতো করে গল্প বানিয়ে নিচ্ছিল। ভিতরে ভিতরে ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছিল নন্দা। অসহায় ক্রোধে ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছিল। শেষে চোখে জল এসে গিয়েছিল। মন্টু তার খোঁজে ঘরে ঢুকলে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে ফেলেছিল। নন্দার সঙ্গে শিবুকাকার সম্পর্কটা ইদানীং বোধহয় একটু গড়বড় হয়েছে।
এই রোদে শিবুকাকা যে কী ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কে জানে। এ সময়ের রোদে চামড়া কেমন চিটপিট করে ওঠে। জ্বালা ধরে। সূর্য সামান্য দক্ষিণে হেলেছে। মন্টুর ঘরে দক্ষিণের জানালা দিয়ে এক টুকরো রোদ ইদানীং তেরছা হয়ে তার বিছানায় এসে পড়ছে। আকাশের দিকে তাকাল মন্টু। পরিষ্কার নীল আকাশ। রাতে তাকালে মনে হয় আকাশে তারা অনেক বেশি, উজ্জ্বলতাও বেশি।
সামনে শেয়ালকাঁটা আর দণ্ডকলসের ঝোপ। কতগুলো প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটবেলায় শিবুকাকার সঙ্গে দণ্ডকলসের সাদা সাদা ফুলগুলো ছিঁড়ে মধু চুষে খেত। শিবুকাকা বলত, শেয়ালের গর্তে ধোঁয়া দিলে ওরা বেরিয়ে আসে। গর্তের সামনে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শিবুকাকা প্রস্তাব দিয়েছিল, মনসাতলার পিছনের মাঠে শেয়াল মারার অভিযানে যাওয়ার। মন্টু সাহস পায়নি। বিপদে পড়ে যদি শেয়াল মারমুখী হয়ে ওঠে! নিশ্চিত আঁচড়ে কামড়ে দেবে। শিবুকাকা তাকে ভিতু-টিতু বলে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিল। মন্টু সাহস পায়নি।
তখনই মন্টু সাপটাকে দেখতে পেল। খয়েরি রঙের শুকনো পাতার সঙ্গে ওর কালচে-খয়েরি ছিট-ছিট শরীরটা মিশে ছিল। অনেকগুলো ‘ইউ’ এর মত কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল সাপটা। যত ক্ষণ স্থির হয়ে ছিল, মন্টু দেখতেই পায়নি। লতাপাতার সঙ্গে এমন ভাবে মিশে ছিল, যেন পরিবেশের অন্তর্গত কোনও নিশ্চল বস্তু হিসেবেই রয়েছে। নড়েচড়ে উঠতেই ওর কালচে-খয়েরি শরীর থেকে আলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। মসৃণ খোলস থেকে আলো ফিরে আসছে, সহজেই তখন চোখে পড়ে। খুব আস্তে আস্তে ঘাসের উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে যাচ্ছে সাপটা। একদম নিশ্চল হয়ে বসে রইল মন্টু। সাপ দেখলেই চিরকাল তার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। কেমন যেন বিবশ হয়ে যায় হাত-পা। পা-দু’টো মনে হয় মাটির সঙ্গে গেঁথে আছে। পালানোর কথাও মনে পড়ে না। একটা ঘোর লেগে যায় মাথার ভিতরে। ওর শরীরের নকশা দেখে মুগ্ধ হতে শুরু করে মন্টু।
“শিবুকা, সরে যাও! সাপ!”
হঠাৎ ঘোর ভাঙলে চিৎকার করে উঠল মন্টু। এখন আর ধীরেসুস্থে নয়, বেশ জোরেই সাপটা এগোচ্ছে। একটু দূরে যেতেই মসৃণ খোলসের উপর সাদা ফুটকির ডিজ়াইন অস্পষ্ট হয়ে গেল। মন্টু বুঝল, এখন সে নড়তে পারবে। মগজ বোধহয় বুঝেছে, বিপদ কেটে গেছে। শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ছে। মোহমুক্ত মন্টু এখন বুঝতে পারছে, কিলবিল করে যাওয়া কাকে বলে। শিবুকাকার জন্য তার ভয় করে উঠল। চিৎকার নিজের কানে যেতেই ধাতস্থ হল মন্টু। যেন দীর্ঘ দিনের কোমা থেকে জেগে উঠে স্বাভাবিক পৃথিবী দেখল।
“ওই যে, তোমার বাঁ দিকে!”
শিবু তাকাল। সাপটা দেখতে পেয়েছে শিবু। সেদিকেই তাকিয়ে আছে। মন্টু দেখতে পাচ্ছিল, শিবু তার হাতে একটা ভাঙা গাছের ডাল তুলে নিয়েছে। পা দিয়ে মাটিতে ধুপধাপ আওয়াজ করছে। এ বার লাঠি হাতে একটু এগিয়ে আসতেই সাপটা থেমে গেল। মাথা ঘুরিয়ে নিয়েছে এ বার। খুব দ্রুত দিক পাল্টে পুকুরের জলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, ভয় পেয়েছে সাপটা।
মন্টু শুনেছে, সাপ স্থির বস্তু দেখতে পায় না। নড়াচড়া হলেই বস্তুর উপস্থিতি বুঝতে পারে। মন্টু আরও শুনেছে, জীবন্ত প্রাণীদের শরীরের তাপশক্তি সাপ ইনফ্রা-রেড তরঙ্গ হিসেবে ধরতে পারে, নির্ভুল ভাবে সেই প্রাণীর অবস্থান বুঝে নেয়। অন্ধকারেও লুকিয়ে থাকা ইঁদুর টের পায় সাপ। একটু পর পর চেরা জিভ বেরিয়ে আসছে। বিপদের গন্ধ, শিকারের গন্ধ, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, আলো এবং উত্তাপ— সব খবর নিতে থাকে। নইলে বেঁচে থাকাই মুশকিল। সাপ শুনতে পায় না, তার বহিঃকর্ণ নেই। কিন্তু মাটির কম্পন টের পায়। শিবুর পায়ের শব্দ বুঝতে পেরে সাপ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাইছে।
“শিবুকা, আমি বাড়ি চললাম। এত রোদে আমার পোষাচ্ছে না। ওঠো, আর মাছ তুমি পাবে না। বার্থডে পার্টির জন্য চলো বেলুন সাজাই। নন্দার জন্য কী গিফ্ট কিনলে?”
“অ্যাঁ! কিসের গিফ্ট? কার বার্থডে? তুই যা, আমি আসছি। মনে হচ্ছে চারে বড় কিছু ঘোরাঘুরি করছে। বেশি জোরে কথা বলিস না, ওরা শুনতে পায়। চারে ভিড়বে না।”
“শিবুকা, তোমার বৌ এক দিন পালিয়ে যাবে। দেখো, আমি বলে রাখলাম। আশ্চর্য মানুষ তুমি! আজ নন্দার জন্মদিন, আমাকে নেমন্তন্ন করেছে। এখনও ছায়াবাজি দেখিয়ে জপিয়ে রেখেছ বৌকে।”
“পালাবে? সিরিয়াসলি বলছিস? তুই ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারবি? মাস্টারি করিস, দিব্যি চলে যাবে তোদের। উফ, কেন যে মানুষ সাধ করে পিছনে বাঁশ নেয়। কী, না বংশরক্ষা! আমার তো সেদিকেও ফক্কা। নন্দা মনে হয় তোকে বেশ পছন্দ করে। এত অশান্তি কী ভাল লাগে, বল! আচ্ছা, তুই বিয়ে করছিস না কেন, বল তো ?”
“শিবুকা, আমাদের ছায়াবাজি দেখাতে, মনে আছে তোমার?”
“তোর মনে আছে? আমাদের পড়ার ঘরে তুই, পন্টা, বাবলি, হেবো— সাদা চাদর টাঙিয়ে খরগোশ, কুকুর, হরিণ, প্রজাপতি দেখাতাম! ছায়াবাজি! চল, তুই যখন সঙ্গে এসেছিস, তখনই বুঝেছি আজ খালি হাতে ফিরতে হবে। ব্রাহ্মণ হলেই কি আর দুনিয়ার সব না-মুমকিনকে মুমকিন করতে পারে!”
ক্রমশ
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)