পূর্বানুবৃত্তি: শিলিগুড়ি নিয়ে শোনা নানা স্মৃতিচারণ মনে ভিড় করে আসে মনোতোষের। তাদের জমিটি আগে ছিল চা-বাগানের ডাক্তার রামপ্রিয় সান্যালের। আঞ্চলিক গুঞ্জন ছিল চা-বাগানের এক নেপালি মহিলা মহামায়া ছেত্রীকে নিয়ে ডাক্তার বাবুর দ্বিতীয় সংসার আছে। গ্রামাফোনে গান শোনার প্রবল নেশা ছিল ডাক্তারবাবুর। তিনি মনোতোষের বাবা প্রিয়তোষকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁর জমিতে একটা ঘর তুলে মন্টুকে নিয়ে থাকতে। সেই মজুমদার কলোনি এখন আর চেনা মুশকিল। তার নাম অবধি পাল্টে গেছে। আস্তে আস্তে জমে উঠছে চুমুকপুর। মনোতোষের স্কুলের ক্লার্ক নৃপেন মণ্ডল তাকে বলেছিল এই বেলা কিছু জমি কিনে রাখতে। নৃপেনের প্রস্তাবেই ওর কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে কো-অপারেটিভে একটি জমি কিনতে রাজি হয়েছে মনোতোষ। নিপুকে নিয়ে সেই জমি দেখতে বেরিয়েছে সে। নৃপেনের এক বন্ধুর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় এই কোঅপারেটিভ থেকে সেই বন্ধু নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। সেই জায়গায় মনোতোষকে অংশ নিতে বলছে নৃপেন।
শিবুকাকাদের বাড়িতে একটা ময়ূর ছিল। একটা লোক অনেক উঁচু আমগাছের ডালে ফাঁসি দিয়েছিল। বাসি মড়ার একটা গন্ধ হয়। দেখি না গলায় দড়ি দিলে কী হয়— ভেবেছিল মনোতোষ। সেই গাছেরউপরে শিবুকাকাদের ময়ূর বসে ছিল। অন্ধকারে কর্কশ স্বরে ময়ূর ডেকে উঠলে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছিল মনোতোষ।
কয়েক মুহূর্তেই যেন তার মাথায় প্রক্ষেপিত হল কিছু ছবি। কোথাও প্রোজেক্টর চালিয়েছে কেউ। পলাশগুড়ি, বকুলডাঙা, নন্দা, একটা পুঁটিমাছ। গ্রামোফোন চালাচ্ছে শিবুকাকা। ‘মেরে তো গিরিধারী গোপাল দুসরা না কোঈ’, শুভলক্ষ্মী। তার আগে দিলীপকুমার রায়ের ‘সাথী, জনম মরণকে সাথী।’ ‘পগ ঘুঙরু বাঁধ মীরা নাচি রে’, যূথিকা রায়।
“পাভো ক্রিস্টাটাস। দি ইন্ডিয়ান ব্লু পি-ফাউল ইজ় অলসো নোন অ্যাজ় কমন পি-ফাউল।”
“কিছু বললেন স্যর?”
“লোগ কহে মীরা হুয়ি বাওরি, সাস কহে কুল নাশি রে।”
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে মনোতোষকে একটা দিয়ে লাইটারও এগিয়ে দিল। সিগারেট ধরিয়ে লাইটার ফিরিয়ে দিলে একটু আড়ালে গেল নৃপেন মণ্ডল। তার নাম যে নৃপেন, এ কথা তার নিজেরই মনে থাকে না। তার পাড়াতেই স্কুল। পাড়ার ছেলেরা পড়ে, তাদের গার্জিয়ান— সবাই ডাকে নিপু অথবা নিপুদা বলে। তার নিজেরও ছোটবেলা থেকে এ নাম শুনে শুনে কানে সেট হয়ে গেছে। ‘নৃপেন’ বলে কেউ হঠাৎ ডাকলে তার বুঝতে একটু সময় লাগে। এদিক-সেদিক তাকায়, কাকে ডাকল! বায়োলজির স্যর মনোতোষ লাহিড়ির একটু খামখেয়ালিপনা আছে। হঠাৎ এই ফরেস্ট দেখে, ময়ূর দেখে মনে হয় কবি-কবি ভাব চেগে উঠেছে। উঠুক, নিপু ইচ্ছে করলে স্যরের সামনেই সিগারেট ধরাতে পারত। পারল না। ঝোঁকটা একটু সামলে নিক, তার পর জমিজমার কথা আলোচনা করা যাবে। নাহ্, এখানে এই খোলা জায়গায় রিং হবে না। পায়ে ভাল করে মাড়িয়ে সিগারেটের আগুন নেবাল নিপু। শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে সব জায়গায়।
“এই যে স্যর, পশ্চিমে ওই উঁচু ঢিপি, পুবে সুপুরি গাছের সারি, উত্তরে দেখুন আশ্রমের ধ্বজা দেখা যাচ্ছে। আর, দক্ষিণে তো অলরেডি ঘরবাড়ি উঠতে শুরু হয়ে গেছে। চিন্তা করে সুযোগ নষ্ট করবেন না স্যর। এ জমি হাতছাড়া হলে পরে আঙুল কামড়াতে হবে। জমির দর অলরেডি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। উত্তরে দেখুন, একদম ক্লিয়ার। এখানে দোতলায় বসে আপনি পরিষ্কার পাহাড় দেখতে পাবেন। আজ মেঘলা, নইলে আজই আপনাকে দেখিয়ে দিতাম।”
নিপুর কথা শুনে মজা পেল মনোতোষ। যেন নিপু তাকে দেখাবে বলেই পাহাড়টা ওখানে বসিয়েছে। পাহাড়টা ওখানে আছে, সেটা কোনও প্রাকৃতিক বিষয় নয়, নিপুরই ক্যারিশমা। সে শিলিগুড়ির ছেলে, তাকে পাহাড় দেখাচ্ছে নৃপেন মণ্ডল। গত মাসেই সে রোহিণী ঘুরে এসেছে।
সে বলে, “চলো, একটু এগিয়ে ঘরবাড়ি দেখে আসি। নিশ্চয় লোকজন আছে।”
“সে যাওয়া যাবে, আমাকে কিন্তু তাড়াতাড়ি ডিসিশনটা জানাবেন। নইলে ওরা অন্য কাউকে কো-অপারেটিভে নিয়ে নেবে। আমি আপনার কথা, প্রায় শিয়োর, এ রকম ভাবে বলে রেখেছি। ভবিষ্যতের প্রতিবেশী, রোজ মুখ দেখাদেখি, আপদে-বিপদে পাশে থাকা— জেনুইন ভদ্রলোক না হলে চলে নাকি। টিচার শুনে ওরাও ভরসা পেয়েছে। টিচারদের কিন্তু এখনও একটা দাম আছে, নাম আছে। অবশ্য, ছোটলোক টিচারও আমি দেখেছি। আমাদের স্কুলেই। বুঝতেই পারছেন। চৌহদ্দিটা ভাল করে বুঝে নিন। পরে কখনও একা এলে যাতে চিনতে পারেন, তেমন কিছু মার্ক দেখে রাখুন।”
“ওই ভদ্রমহিলা কি মারা গেছেন? যাঁর হাজ়ব্যান্ডের এটা নেওয়ার কথা ছিল?”
একটু থমকে গেল নিপু। স্যর এখনও সেই কথা ভেবে যাচ্ছে। অনেকে যে বলে মনোতোষ লাহিড়ি একটু অ্যাবনর্মাল, কথাটা ভুল নয়। দু’-এক জন স্যর মাঝে মাঝে তার অফিসে এসে সার্ভিস-বুক, পিএফ লোন নিয়ে অনেক কিছু জানতে চায়। বসে, গল্প করে। নৃপেন সামান্য করণিক, ওরা পরনিন্দা-পরচর্চা নিশ্চিন্ত মনেই করে। এমনকি হেডস্যারের নোটিসে যে ইংরেজি গ্রামারে ভুল থাকে, সেটা নিয়েও হাসিঠাট্টা করে। হিস্ট্রির সুবীরবাবু এক দিন বলেছিলেন বায়োলজির নতুন ছেলেটার মাথায় গন্ডগোল আছে। নিপু বুঝেছিল মনোতোষ লাহিড়ীর কথা বলছে ওরা। ক’দিন ধরেই সে ভাবছিল ওই স্যরের সঙ্গে এক দিন ইনশিয়োরেন্সের পলিসির ব্যাপারে কথা বলবে। নইলে অন্য চারে মাছ চলে যেতে পারে। তার তো সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে বিমার উপকারিতা নিয়ে লেকচার দিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে। সত্যি, এখনও কত কোটি কোটি জীবন বিমা ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা, নাসা কি চাঁদেরও বিমা করে রেখেছে! হতেই পারে। একেই তো ক্ষয়রোগগ্রস্ত, তার উপর চাঁদে যে পরিমাণ অভিযান শুরু হয়েছে— ক্ষতি তো হতেই পারে।
“জানি না স্যর। না মনে হয়। এই তো টাটায় নিয়ে গেল। শিশিরদা, মানে ভায়রার সঙ্গে এ ব্যাপারে আর কথা হয়নি। আপনি স্যর ওই কথা নিয়েই ভেবে যাচ্ছেন?”
তার ভাবনার কথা করণিক মশাই কতটুকু বুঝবে! হয়তো তার ফ্ল্যাটই ওই দম্পতির পাওয়ার কথা ছিল। উত্তরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভোরের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার কথা ছিল। বারান্দার টবে মরসুমি ফুল ফোটানোর কথা ছিল। হল না। সেখানে হয়তো কোনও দিন মনোতোষ দাঁড়িয়ে ঝকঝকে গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জ দেখবে। দেওয়ালে তার বাবা-মায়ের ছবি ঝোলাবে। ফুল ফোটাবে বারান্দায়। আর, হঠাৎ মনে পড়বে অনিয়ন্ত্রিত কোষ-বিভাজনের কথা। কালপক্ষী মাথার উপরে চংক্রমণ শুরু করে। এক দিন মুখে করে তুলে নিয়ে যায়, লৌকিক হিসাবের খাতায় নাম কাটা যায়। আর যদি সে বলে ফেলে সাপ দেখলে তার ভয় করে না, অপার্থিব সুন্দরের সামনে যেমন মুগ্ধতায় স্থবির হয়ে যায় মানুষ, সেও তাই। একটা পুঁটিমাছের কথা। সে জানে বাসি মড়ার গন্ধ কেমন হয়। এক দিন সাদা ব্লাউজ়ের নীচে কালো ব্রা স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। বিষভর্তি থলি নিয়ে যেন উদ্ধত একজোড়া ফণা। তীব্র সেই দৃশ্যের দিকে তাকাতে পারেনি মনোতোষ লাহিড়ি। নাহ্, এ-সব কথা নৃপেন মণ্ডলকে বলা যায় না। ভাববে, স্যর তারকাটা আছে।
মনোতোষ বলে, “চলো, একটু এগোই। দাঁড়াও, ভারী জ্যাকেটটা পরে নিই। দারুণ গরম, হংকং মার্কেটের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাও বাড়ছে মনে হচ্ছে। নিপু, মনে হচ্ছে এ পথটা পলাশগুড়ির দিকে গেছে? আগে সরু মেঠোপথ ছিল। আমার মনে হচ্ছে আমি আর শিবুকাকা এক বার সাইকেল নিয়ে অনেকটা এসেছিলাম। এত দূরে নয়, কিন্তু এ পথেই। ইয়া মোটা লেজওয়ালা একটা শেয়াল দেখেই আমরা ভয় পেয়ে ফিরে গিয়েছিলাম।”
“ঠিক স্যর। রাস্তার কাজ শুরু হতেই জমির দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ল। আগে দেখুন কতটা পথ ঘুরে আসতে হত। তখন রাস্তাও ছিল এবড়োখেবড়ো, একেবারে ওম পুরীর গাল, এখন দেখুন একেবারে বিদ্যা বালান।”
স্কুটার স্টার্ট দিয়ে ওরা আরও দক্ষিণে এগোল। জঙ্গল-কুড়োনো ভাঙা ডালপালার বোঝা মাথায় নিয়ে এক দল মহিলা রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে। মনোতোষ হর্ন বাজাতেই ওরা পাশে সরে গেল। কিছুটা এগোতেই ঘরবাড়ি দেখতে পেল মনোতোষ। রাস্তার দু’পাশেই মাঝে মাঝে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা জমি। জঙ্গল হালকা হয়ে এসেছে। মাঠ শূন্য, ধান উঠে গেছে। কোথাও কোথাও নীলচে ধোঁয়া উঠছে। যেখানে ঘাসজমি, সেখানে গরু-বাছুর চরে বেড়াচ্ছে। দু’-এক জায়গায় খোঁটায় বাঁধা গরু। একটা সাদা-কালো কুকুর, পিছনে পাঁচটা বাচ্চা— স্কুটারের দিকে তাকিয়ে সন্দেহজনক ভাবে ভৌ-ভৌ করল।
“স্যর, এরা তো জঙ্গল কুড়িয়ে ভাঙা ডালপালা, শুকনো পাতার বোঝা নিয়ে যাচ্ছে। বনবস্তির মানুষ। ওদের তো গ্যাস-ফ্যাস নেই, এসব দিয়েই জ্বালানির কাজ, কড়া শীতে আগুন পোয়ানোর কাজ চলে। এরা আর জঙ্গলের কী এমন ক্ষতি করে বলুন। কোনও ক্ষতি নেই। একটু বিকেলের দিকে, সন্ধের মুখে থাকলে দেখবেন সাইকেলের সঙ্গে, সামনে-পিছনে দামি দামি কাঠের লগ— হাতকরাতে কাটা, নিয়ে যাচ্ছে। অ্যাকচুয়ালি ওরাই জঙ্গল সাফ করে দিচ্ছে। সঙ্গে কাঠ-মাফিয়ারা রয়েছে। রাত হলেই ট্রাকের হেডলাইট নিবিয়ে জঙ্গলে গাড়ি ঢোকায়।”
“জানি নৃপেন। লোভের করাত কেটে নেয় কত পুরনো শাল, সেগুন। হাতির দাঁত, গন্ডারের খড়্গ। বর্ডার দিয়ে রাতারাতি পাচার হয়ে যায়। বাঁকুড়ায় আমার এক বন্ধু আছে, সুজয়, ফরেস্টের রেঞ্জার। ওর কাছে অনেক গল্প শুনেছি। জঙ্গলে পোচার আর কাঠ-মাফিয়াদের কাছে সুজয় মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভয়ডরের বালাই নেই। দু’-এক জন ঘুরিয়ে তাকে সাবধান করেছে। তার অফিসের এক জন নেতা গোছের স্টাফ এক দিন তাকে খুব কায়দা করে বলতে এসেছিল, সুজয় নাকি বাড়াবাড়ি করছে। তার শিডিউলের বাইরে গিয়ে কাজ করার কী দরকার পড়েছে! এর আগে এক জন বেশি বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে বেঘোরে মারা পড়েছিল। ওয়াকিটকিতে খবর আসে তিন নম্বর বিটে দুটো ট্রাক ঢুকেছে। সুজয় সঙ্গে সঙ্গে গার্ড নিয়ে ছুটে যেত।”
“কাঠ-মাফিয়ারা কিন্তু খুব খতরনাক স্যর। চুরিতে বাধা পেলে গুলি-ফুলিও চালিয়ে দেয়। অনেক উপরমহলেও ওদের লাইন থাকে।”
“সুজয়ের কিছুই করতে পারেনি ওরা। বন দফতরের একদম টপ লেভেলে ছিল ওর গডফাদার। প্রাণেশ বর্মণ। সেই খুঁটির জোরেই সুজয় পোচার আর কাঠ-মাফিয়াদের ঢিট করেছিল। ইনফর্মারের কাছে খবর পেয়ে রেড করতে যাওয়ার কত গল্প শুনেছি। শুনলে বোঝা যায় বাস্তবের কাছে সিনেমার গল্পও কিছু না।”
“আমি এক বার মোবাইলে ছবি তোলার চেষ্টা করতেই আমার দিকে তেড়ে এসেছিল। প্রায় মোবাইল কেড়ে নেয় আর কী! আসলে ভয় পেয়েছিল। ভেবেছে ওদের এই কাঠ চুরির খবর আমি বোধহয় ছবি-সহ কাগজে দিয়ে দেব। জঙ্গল ওরাই সাফ করে দিচ্ছে। সাধে কি আর শহরে হাতি চলে আসছে। জঙ্গলে ওদের খাবার কমে আসছে। এই বছর পাঁচেক আগেও দিনের বেলায় এই পথে হাতির ভয়ে কেউ যাতায়াত করত না। জানেন তো, ধান পাকলে চাষিদের রাতের ঘুম উড়ে যায়। ওই যে দেখুন, মাঠে এখনও টং-ঘর রয়েছে। অনেক উঁচুতে একটা কেবিনের মতো, কাঠের। ধান পাহারা দেয়। রাতে হাতির সাড়া পেলে দমাদ্দম টিন বাজায়, পটকা ফাটায়, মশাল নিয়ে সবাই বেরিয়ে পড়ে। হেই সামালো ধান হো...। অনেক পুরনো গান, তাই না?”
“কাস্তেটা দাও শান হো, জান কবুল আর মান কবুল, আর দেব না আর দেব না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো... সলিল চৌধুরী।”
ছোট একটা চায়ের দোকান দেখে স্কুটার থামাল মনোতোষ। এখানেও দোকানের সামনে সারি সারি প্লাস্টিকের বোতলে পেট্রল সাজানো রয়েছে। নানা রকম পানমশলার পাউচ, বিস্কুটের বয়াম, পাশেই একটা উনুনে কেটলিতে জল ফুটছে। কে জানে কবে থেকে ফুটছে! তাদের স্কুটার থামিয়ে নেমে আসতে দেখেই মাথায় টুপি, গায়ে চাদর, লুঙ্গি-পরা দু’জন বেঞ্চ ছেড়ে উঠে এল।
“চুমুকপুরে জমি নিবেন? কয় কাঠা নিবেন? রোট-সাইডে, নাকি ভিত্রে খুঁজিছেন? সগায় তো রোড-সাইডে নিবার চায়। অল্প কিছু আছে। নিলে কহেন, হামাক একটা কল করি দিবেন। লিখেন— বলেন রায়, নাইন ফোর থিরি জিরো... বইসেন এইঠে। এই মন্তা, চাহা খিলা, সাগাই আইচ্চে।”
“না, না, এমনি একটু ঘুরতে বেরিয়েছি। এই বোতলগুলোতে কি পেট্রল নাকি?”
“কী বা কহি। জমি ব্যাচায় সগায় হুন্ডা কিনা ধইচ্চে। সবার পাছত ভট ভট ভট। লরম সিট, কী বা আরাম। তেল ফুরায় গেইলে কায় বা শিলিগুড়ি যায়। দিনকালে পেট্রল খায় গাড়ি, আতির কালে পেট্রল খায় আতাউর, বাবলা, নিরঞ্জন, শামসুর। হয় না চুমুকপুর?”
“এই বলেন, থাম না! কী সব উল্টাপুল্টা কথা কস। উনারা বেরাইতে আইছেন, আর তুই আমাগো দ্যাশের নামে বদনাম করস! অর কথা বাদ দ্যান বাবু। ন্যান, চা খান। যে ঠান্ডা আইজ পরছে! জমিজমার কথা থাকলে আমারেও কইতে পারেন। শিলিগুড়ি, এই দিকে পলাশগুড়ি থিক্যা কত কাস্টমার আসতাছে। দ্যাখবেন নাকি, এই আমার ঘরের পচ্চিমেই দশ কাঠা তিন ছটাক আছে। নাইরহল গাছ আছে তিন খান। আমরা তো অনেক পুরানা বাসিন্দা। ভাবছিলাম ছুটো একখান পুসকন্নি কইরা চারামাছ ছাড়ুম। হইল না। কিছু ফুলের চারা বুনছি। কুনও দালাল-টালাল নাই, আমার আর আপনার মইদ্যে ডাইরেক্ট বিজিনেস। যে কাউরে কইয়েন, মন্তেশ্বর সাহা, দেখায় দিব।”
আন্দাজে মনোতোষ বুঝল সূর্য এখন মধ্যগগনে, দক্ষিণ আকাশে হেলে আছে। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল। দুপুর একটা দশ।
ক্রমশ
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)