মনে মনে হিসাব করলেন করবী, বাইশ বছর পরে আবার এলেন বুড়োবাবার থানে। সে বার এমনিই এসেছিলেন, দর্শন করতে, প্রণাম করতে। তাও ঠিক বুড়োবাবার থানে আসবেন বলে আসেননি, এসেছিলেন দূরসম্পর্কের এক মাসির বাড়িতে। তাঁর মেয়ে সুরভির বয়স তখন ঠিক পাঁচ বছর।
মাসি বলেছিলেন, “এই সবে জন্মদিন গেল, যা মেয়েকে নিয়ে দু’জনে বুড়োবাবার থানে মাথা ঠেকিয়ে আয়। খুব জাগ্রত দেবতা। বিপদে-আপদে উনিই আমাদের একমাত্র ভরসা।”
তার পর আবার এই। হাতে ঘোড়ার ছলন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। উনি, ওঁর স্বামী সমর আর মেয়ে সুরভি। মানত পূর্ণ হলে বুড়োবাবাকে ঘোড়ার ছলন দিতে হয়। বুড়োবাবার থানে নানা আকারের কত যে ছলন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে!
একটু দূরে করবীর জামাই অঞ্জন ছোট্ট গুড্ডুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে বন্ধু দেবজিৎ। বুড়োবাবার থানে আসার কথা শুনে সেও সঙ্গী হয়েছে। ওর অবশ্য পুজোটুজো দেওয়ার কোনও পাট নেই, অঞ্জনের সঙ্গে গল্প করছে, আর থেকে থেকে ক্যামেরায় চোখে রাখছে।
করবী পুরনো কথা ভাবছেন। সেদিন কেন কে জানে, বুড়োবাবার কথাই মনে এসেছিল। কিছু দিন আগে ঘুরে গেছিলেন বলেই কি? কাজটা করে ফেলেছিলেন ঝোঁকের মাথায়, তার পর আকুল হয়ে বুড়োবাবাকে ডেকেছিলেন, “সব দিক বজায় রেখো বাবা। তোমার তো অজানা কিছুই নয়, রক্ষা কোরো।”
তার পর থেকে দেখতে দেখতে কত বছর কেটে গেল। করবীর মনের শঙ্কা যেন গিয়েও যাচ্ছিল না। দেখতে দেখতে সুরভি বড় হয়ে গেল, বিয়ে হয়ে গেল, এমনকি সুরভি-অঞ্জনের ছেলে গুড্ডুও প্রায় বছর তিনেক কাটিয়ে ফেলল এই গ্রহে। মাস ছয়েক আগে যখন অঞ্জনের অমন মারাত্মক দুর্ঘটনাটা ঘটল, তখনই করবীর মন কু গেয়ে উঠল, ‘বুড়োবাবার থানে তো এখনও ছলন দেওয়া হয়নি, তার জন্যেই অমঙ্গল হচ্ছে না তো!’
অঞ্জন সুস্থ হতেই আর দেরি করেননি, চলে এসেছেন। দূরসম্পর্কের সেই মাসি আর নেই, মাসির বাড়িও সম্ভবত আর নেই, মাসির ছেলেমেয়েরা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। করবী পুজো দিতে এসেছেন, পুজো দিয়েই চলে যাবেন। আসার আগে জানলেন, সমর আর সুরভিরও মানত আছে। স্বাভাবিক, অঞ্জনের যা অবস্থা হয়েছিল তখন, কোন ঠাকুর-দেবতাকে আর বাদ রেখেছিলেন ওঁরা!
“এসো মা, পুরুতমশাইকে দাও সব,” সুরভি বলল।
করবী এক লহমায় বর্তমানে ফিরলেন। এ বার ওঁদের পালা।
“যা মানত করেছিলাম বাবা, যথাসাধ্য দিয়ে গেলাম,” প্রণাম করতে করতে বললেন করবী। আরও হয়তো কিছু বলতেন, সুরভি মৃদুস্বরে ডাকল, “মা...”
বুড়োবাবার থানে রোজ ভালই ভক্তসমাগম হয়। করবীদের পিছনে অনেকে দাঁড়িয়ে।
“প্রসাদ দে সবাইকে,” করবী মেয়েকে বললেন।
“ছলন ব্যাপারটা কী জানিস?” জামাইয়ের বন্ধু দেবজিৎ প্রসাদ খেতে খেতে জামাই অঞ্জনকে বলল, “লোকজন মানত করে বলে, ‘মানত পূর্ণ হলে ঘোড়া দেব।’ তাই বলে কি আর সত্যিকারের ঘোড়া দেয়? মাটির ঘোড়া দেয়। তাই ছলনের ঘোড়া বা ঘোড়ার ছলন। আমার ঠাকুমা কী বলতেন জানিস, বলতেন, ‘এই গোটা সংসারখানাই হল ছল! সংসারের ছলন-বলনের আর শেষ নেই। আমরা বুঝি, তাও সেই ছলনেই মজি!’”
করবী বিরক্ত হলেন। ঠাকুর-দেবতাকে নিয়ে এসব কী কথাবার্তা! এই ছেলেটাকে একদম পছন্দ করেন না করবী, কিন্তু জামাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে কিছু বলতেও পারেন না। কী যে বলে, তার কোনও মাথামুন্ডু নেই! যা হোক কিছু বলে খালি নিজের পাণ্ডিত্য ফলানো।
“তোরা দেখ কী খাবি-টাবি। আমি আর তোর বাবা ওদিকে যাচ্ছি,” করবী বললেন। আজ ওঁর মন বশে নেই, স্মৃতির অলিগলিতে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ওই দৃষ্টি এখনও ভুলতে পারেননি করবী। শয্যাশায়ী শাশুড়ির সেবাযত্নের কোনও দিন এতটুকু ত্রুটি করেননি, কখনও কোনও অমর্যাদাও করেননি। কিন্তু সে সময়টাই ছিল বড় কঠিন। এক বাল্যবন্ধু, নাম জিতেন, তার অসুখের চিকিৎসার ব্যয়ভার অনেকটাই সমর বহন করছিলেন। ফলে সংসারে বড় অনটন চলছিল। করবী পারেননি নিজেকে সামলাতে, রুগ্ণা শাশুড়ির গলা থেকে সোনার মটরমালাটা খুলে নিয়েছিলেন। তখন উনি বাক্শক্তি হারিয়েছেন, অদ্ভুত অসহায় দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে ছিলেন।
তার পরেই একরাশ গ্লানি গ্রাস করেছিল করবীকে, সঙ্গে ভয়ও। হারটা যে আবার পরিয়ে দেবেন সে উপায় নেই, তখন বড় ননদ বসে রয়েছেন। বুড়োবাবাকে স্মরণ করেছিলেন, ‘অভাবের তাড়নায় করে ফেলেছি বাবা। অপরাধ হয়েছে, হাজার বার স্বীকার করছি। এখন তুমিই রক্ষা করো। কেউ যেন জানতে না পারে বাবা, চোর বদনাম যেন না হয় আমার।’
সমরের ভাইবোনরা তখন প্রায়ই কেউ না কেউ আসছেন, যাচ্ছেন। কাজেই এ নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি, একে অপরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে বিদ্ধ করেছেন। করবী সমরকেও মুখ ফুটে জানাতে পারেননি সে কথা।
“অনেক বছর হয়ে গেল। পুজোও দিলাম, এ বার কথাটা তোমাকে বলা উচিত,” সমর হঠাৎ বললেন।
করবী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সমরের দিকে তাকালেন।
“মা গলায় একটা মটরমালা পরে থাকতেন না? মার মৃত্যুর দু’দিন আগে আমি সেটা বিক্রি করে দিয়েছিলাম,” অতি কষ্টে কথা ক’টা বললেন সমর, “হারটা তখন মায়ের গলায় ছিল না। আমাদের ঘরের লকারে রাখা ছিল। তখন আমার প্রবল জুয়ার নেশা হয়েছিল। এখন ভাবতেও লজ্জা করে। বন্ধু জিতেনকে সাহায্য করা-টরা সব মিথ্যে কথা। অনেক কষ্টে নেশা ছাড়িয়েছি। বাবার কাছে মানত করেছিলাম। নিজের উপর বিশ্বাস ছিল না, খালি মনে হত, আবার ও-পথে যাব না তো! বাবা সত্যিই জাগ্রত, আমায় সুমতি দিয়েছিলেন। আজ তাই আমিওপুজো দিলাম।”
ভেবেছিলেন, রাতের অন্ধকারে ফের এক দিন শাশুড়ির গলার হার শাশুড়িকেই ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ঘরের আলমারির লকারে হারটা নেই দেখে ভয় চেপে বসেছিল করবীর মনে। কারও চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়, চোর অপবাদের ভয়। অপরাধবোধের থেকেও ভয়টাই ক্রমে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হার উধাও হয়ে যাওয়ার রহস্য আজ পরিষ্কার হল।
“তুমি! তুমি নিয়েছিলে!” স্খলিতকণ্ঠে বললেন করবী, “কী যে হয়েছিল সেদিন! হারটা আমিই মায়ের গলা থেকে...” কথা শেষ করতে পারলেন না করবী, চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
“দিম্মা দিম্মা...” গুড্ডু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।
করবী চমকে উঠলেন। মেয়ে, জামাইয়ের উপর রাগও হল। নিজেরা গল্পে মশগুল, ছেলেটা ছুটে চলে এল! কোনও খেয়াল নেই! যদি অন্য কোথাও চলে যেত!
গুড্ডু বায়না ধরল, “দিম্মা, আমি ছলন নেব, আমাকে ছলন কিনে দাও। চলো চলো, ওই দিকে অনেক ছলন আছে...” গুড্ডু করবীর হাত ধরে টানতে লাগল।
“আমি জানি, দেখেছিলাম যে...” খুব আস্তে আস্তে বললেন সমর, যদিও গুড্ডুর কলকলানিতে সে কথা করবীর কানে পৌঁছল কি না সন্দেহ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)