E-Paper

একটানা চিৎকারের ছবি

পিহু হাঁ করে চেয়ে ছিল আমার মুখের দিকে। বুঝেছিলাম, ও স্বাদ, গন্ধ, রং বা উত্তাপ কোনও কিছুই টের পায় না। কোনও দিন পাবে বলেও মনে হয় না।

অলোকপর্ণা

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৮

ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়।

পিহু চেয়েছিল আমি ওর একটা ছবি আঁকি, যেখানে ওর চিৎকার-ঠাসা মুখ চেপে ধরে আছে অনাত্মীয় দুটো হাতের পাতা, আর সাদা কাগজের মধ্যে আটকে আছে ওর কালো-কালো গোঙানি। ওর এতেই আনন্দ। ছবি আঁকার গোটা সময়টা পিহু পোষা কুকুরের মতো আমার পায়ের কাছে বসে থাকবে বলেছিল। ও বলেছিল, আমি চাইলে ও আমার জুতোও চেটে দিতে পারে। ওর এতেই আনন্দ।

আমি ওকে প্রশ্ন করেছিলাম— “অপমানের স্বাদ কেমন?”

পিহু হাঁ করে চেয়ে ছিল আমার মুখের দিকে। বুঝেছিলাম, ও স্বাদ, গন্ধ, রং বা উত্তাপ কোনও কিছুই টের পায় না। কোনও দিন পাবে বলেও মনে হয় না।

আমি ওর গমরঙা চামড়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এমন নিস্তেজ বুঝি জড়বস্তুও নয়। তাদের ঠেললে, পিষলে, আছাড় দিলে তবু ভাঙে, তুবড়ে যায়, দাগ লাগে বা ক্ষত সুস্পষ্ট হয়। পিহু যেন হাড়ে-মজ্জায় অপাপবিদ্ধ একটানা হাসি। শুধু অনুজ্ঞার অপেক্ষায় আছে।

পিহু দেওয়ালে হেলান দিয়ে একমনে বসে থাকলে আমি ওর চোখদুটো দেখতাম। আমি জানতাম, ও চাইছে এমন কাউকে, যে ওর দায়িত্ব নিতে রাজি হবে, আর ওকে আপাদমস্তক ব্যবহার করবে। ওর ওতেই আনন্দ। ও ওর বত্রিশ বছর বয়সি টানা-টানা মায়াবী ছলছলে চোখে আমায় দেখছে, না পরম করুণাময়কে— আমি বুঝতে পারতাম না। ওর কাছে দুই-ই সমান। ওর ঈশ্বরে এবং নিজেতে, কিছুতেই বিশ্বাস নেই। ছোটবেলায় যে দিন থেকে ওর পিতা ওর গায়ে চরম কুৎসিত হাত দুটো রেখেছেন, সে দিন থেকে ও ঈশ্বরবিচ্যুত। ওর আছে কেবল গোটা দুই শয়তান। যারা ওকে নিয়ন্ত্রণ করে আর দাবার গুটির মতো ওকে ঠেলে দেয় এর-ওর কাছে। কিস্তিমাত হয় না, দানের পর দান পিহু কেবল সাবাড় হতে থাকে।

“শেষ কবে তুমি কেঁদেছ পিহু?”

“মনে করতে হবে।”

“মনে করো।”

আমি পিহুর চুল আঁকতে শুরু করি। এলোমেলো বত্রিশ বছরবয়সি ভারতীয় চুল। আঁকতে গিয়ে ওর মাথার পিছনে একটা ক্ষতর সন্ধান পাই।

“এটা কিসের দাগ?”

“মনে নেই।”

“মনে করো।”

ক্ষতটা বেশ বয়স্ক, আমার কল্পনা করতে অসুবিধে হয় না, কেউ বা কারা পিহুর ছোট্ট মাথাটা ঠুকে দিচ্ছে দেওয়ালে, আর ক্ষত জন্মাচ্ছে। আমি ছবি থেকে ক্ষতটাকে দূরে রাখি।

“ব্যথা লেগেছিল খুব?”

“মনে পড়ে না।”

“মনে করো।”

“আবার ব্যথা পেলেই মনেপড়ে যাবে।”

আমি পিহুর কপাল আঁকতে শুরু করি। আর পাঁচটা কপালের মতো চিন্তাশূন্য, শান্ত।

“শেষ কবে কেউ তোমার কপালে চুমু খেয়েছে পিহু?”

“মনে নেই। মনে নেই।”

“মনে করো।”

বুঝলাম, আমি যা-যা জানতে চাই, পিহু তার সবটা ভুলে গেছে। আমার প্রশ্নের কোনও জবাব তার কাছে আমি পাব না। তবু পিহুর কপাল বেয়ে ভুরুতে নামি। তার নীচেই রয়েছে ওর সেই মায়াবী প্রত্যয়ী চোখজোড়া, যা অনুজ্ঞার অপেক্ষায় আছে। কবে থেকে, তা পিহুর আর মনে নেই।

“তুমি কখনও কারও কাছে সাহায্য চাওনি? কেন চাওনি?”

“আমি তো জানতাম এমনই হয় সবার সঙ্গে। স্কুলে, কলেজে বন্ধুদের সবার বাড়িতে এমন দুটো হাত রয়েছে যারা সুযোগ পেলেই মুখ চেপে ধরে, আর সবারচিৎকার আটকে যায় গলায়। তার পর যখন বুঝলাম এমনটা আর কারও সঙ্গে হয় না, তত দিনে আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে চিৎকার গিলে ফেলার। তত দিনে পেটের ভিতর সমস্ত চিৎকার একজোট না হলে আমার খিদে মেটে না। আমি আমার সব চিৎকার গিলে ফেলছি সেই কবে থেকে, আমি আমার সমস্ত ক্ষুধা এভাবে মিটিয়েছি। আর কি নিজেকে আটকানো সম্ভব?”

পিহুর চোখ আঁকতে এ বার আমার ভয় করে। যে চোখে এত চিৎকার এত এত বছর ধরে আটকে আছে, তা আঁকার মতো দক্ষতা, তা আঁকার মতো মন আমার আছে কি না, আমি খুঁজে দেখি। আমিআমাকে হাতড়াই। হাত ফিরে আসে কাগজের উপর।

আমি বরং পিহুর নাক আঁকি। তার পর আমি পিহুর গাল আঁকি পরম মমতায়। চেষ্টা করি পৃথিবীর যাবতীয় কড়ি ও কোমল সেখানে এনে জড়ো করতে। তার পর আমি আঁকি পিহুর ঠোঁট। সেখানে আমি একরত্তি হাসি এঁকে দিই।

পিহুর চিবুকে এসে পৌঁছলে আমার বেদম ইচ্ছে করে পিহুকে আদর করতে। ইচ্ছে হয়, ওর মাথায় হাত রাখি। ইচ্ছে হয়, এঁকে ফেলা ছবিটা ছিঁড়ে ফেলে আবার নতুন করে পিহুকে আঁকতে শুরু করি, যাতে আঁকা শেষ না হয়, যাতে আঁকা শেষ হলে পিহু উঠে চলে যেতে নাপারে অন্য কারও কাছে, যাতে আর কোনও হাত পিহুকে ছুঁতে না পারে কোনও দিন।

আমার প্রবল ইচ্ছে হয় মুহূর্তে সাদা কাগজটা ছিঁড়ে কুটি-কুটিকরে ফেলতে।

কিন্তু শিল্পের প্রতি মোহে আমি কাগজের পিহুকে দেখি আর এক বার। যে কাগজে পিহু শিল্প হয়ে উঠছে, তা ছিঁড়ে ফেলার মতো শক্তি আমি হারিয়েছি অনেক দিন। মাটিতে বসে থাকা পিহুর চেয়ে কাগজের পিহু আমার কাছে মহৎ হয়ে ওঠে।

আমি পিহুর চিৎকার আঁকতে শুরু করি। মোটা মোটা পেনসিলের আঁচড়ে সাদা কাগজের বুক ফুঁড়ে দিয়ে আমি পিহুর চিৎকার আঁকি। এমন তীব্র হয়ে ওঠে সে চিৎকার, যেন মনে হয় সবাই তা শুনে ফেলবে। পায়ের কাছে বসে থাকা রক্তমাংসের পিহু আদুরে গলায় বলে ওঠে— “এ বার ওর মুখ বন্ধ করে দাও।”

পিহুর নরম ঠোঁটের উপর দিয়ে, পিহুর নিরীহ গালের উপর দিয়েদুটো অপরিচিত হাত আঁকতে শুরু করার আগে আমি থমকাই। এক বার ভাবি, অন্তত ছবিতে পিহুর চিৎকারটুকু থাক।

তার পর আমার চোখ পড়ে নিজের দুই হাতের উপর, যার প্রতিটা আঙুল কালো হয়ে আছে ছবির র‌ং লেগে। আমি আমার কালো হাত দিয়ে পিহুর মুখ চেপে ধরি, আর পিহুর চিৎকার নিমেষে ঢাকা পড়ে যায়। ছবি আঁকা শেষ হয়।

ছবিতে দুটো চোখ নেই, তাতে কিছু যায়-আসে না পিহুর, সে উঠে পড়ে আমায় বিদায় জানায়। জানি, আমি আর কোনও দিন তাকে খুঁজে পাব না কোথাও।

চোখহীন আর্ত চিৎকারের ছবি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে থাকে, পিহু ঠিক যেমনটা থাকতে চেয়েছিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Literature Bengali Story Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy