E-Paper

ভানমতিয়া

ভানমতিয়ার মাসিশাশুড়ি মালতী আমার গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করত। মধ্যবয়সিনী। স্থূলাঙ্গী। বাতের ব্যথায় কষ্ট পায়। সে-ই এক দিন এনেছিল ওকে।

সোমজা দাস

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৩
ছবি: সৌমেন দাস।

ছবি: সৌমেন দাস।

ভানমতিয়াকে আমি প্রথম দেখি প্রায় পনেরো বছর আগে। বয়স বড়জোর তেরো কি চোদ্দো। টুলটুলে কচি মুখখানা। সেই সময় কর্তার চাকরির সুবাদে আমার ঠিকানা জামশেদপুর। রেলের চাকুরে তিনি। বদলির চাকরি। সদ্য বিয়ের পর জামশেদপুরে বছর তিনেক বসবাসের সময়কাল আমাদের দু’জনের কাছেই ছিল প্রলম্বিত মধুচন্দ্রিমার মতোই মধুর। সেই নিভৃত অবকাশে দু’জন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ চিনে নিচ্ছিলাম একে অপরকে। সব ভাল লাগছিল।

ভানমতিয়ার মাসিশাশুড়ি মালতী আমার গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করত। মধ্যবয়সিনী। স্থূলাঙ্গী। বাতের ব্যথায় কষ্ট পায়। সে-ই এক দিন এনেছিল ওকে। বলেছিল, “ভাবিজি, এখন থেকে ও কাজ করবে এখানে।”

মেয়েটাকে দেখলাম, ঘোমটা টানা একটা পুঁটলি যেন। বলেছিলাম, “একেবারে বাচ্চা তো! ও পারবে?”

মালতী হাঁ-হাঁ করে উঠল।

“পারবে না কাহে? মাইকায় সারা সংসারের কাজ একা করত। সৌতেলি মা-র ঘর। কাম না করলেই গালি-গালোচ। শাদি হয়ে এসে থোড়া-বহোত সুকুন মিলেছে।”

প্রশ্ন করলাম, “নাম কী তোমার?”

সে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গুনগুন করে কী যে বলল, বোঝা গেল না কিছুই। ওর মাসিশাশুড়িকেই ধমক দিতে হল, “আরে উঁচা বোল না বুরবক কঁহিকি!”

“আহা, বোকো না। বাচ্চা মেয়ে।”

মালতী তার দোক্তা-খাওয়া দাঁত বার করে হাসল, “বাচ্চি! আরে গাঁওয়ে ইসি উমরমে বালবাচ্চা ভি হয়ে যায়। ওর নাম ভানমতিয়া।”

নামের শৌখিনতায় চমৎকৃত হলাম। কথা বাড়াইনি আর। ওর বয়সে মাতৃত্ব কাম্য নয়, সে কথা ওদের বোঝানো বৃথা। ওকে বললাম, “ঘরের কাজকর্ম পারবে? আমার হাতে হাতে সাহায্য করতে হবে।”

ভানমতিয়া মাথা নেড়েছিল নিঃশব্দে। সেদিনের পর থেকে আমার গৃহসহায়িকা পদে বহাল হল সে। প্রথম দিনই বলেছিলাম, “অত বড় ঘোমটা চলবে না। হোঁচট খেয়ে পড়ে হাত-পা ভাঙলে বিপদ বাড়বে।”

ভেবেছিলাম আপত্তি করবে। লজ্জা পাবে। কিন্তু দেখা গেল, ও যেন ঘোমটামুক্ত হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মালতীর সামনে যেটুকু জড়তা ছিল, সে চলে যেতেই সে-সব গায়েব। হাসিমুখে ভোজপুরি টানের হিন্দিতে বলল, “আমি সব কাজ জানি মালকিন। কোনও অসুবিধে হবে না।”

বললাম, “মালকিন আবার কী? দিদি বলে ডাকবে।”

ভানমতিয়া খুশি হয়ে মাথা নাড়ল। বাংলা বলতে না পারলেও দিব্যি বোঝে, সম্ভবত জামশেদপুরে প্রচুর বাঙালি থাকার কারণেই। ফলে আমাদের কথোপকথনে ভাষা অন্তরায় হয়নি। ক’দিনের মধ্যেই বোঝা গেল, ভানমতিয়া রীতিমতো গৃহকর্মনিপুণা। আমার কর্তাও বেশ খুশি। আড়ালে বলল, “তোমার শাগরেদটি বেশ জুটেছে। দরকার হলে মাইনে বাড়িয়ে দাও।”

“মাইনের ব্যাপারে কথা তো কাজে ঢোকার আগেই হয়েছে। এর মধ্যেই আবার বাড়াব কেন?”

“এদের জানো না তুমি। অন্যখানে বেশি টাকা পেলেই পালাবে। তোমার ওই ভানমতিয়ার মাসিশাশুড়ি, যে কিনা বাতের ব্যথার নাম করে কাজ ছাড়ল, আমাদেরই এক অফিসারের বাড়িতে কাজ করছে। তাই আগেভাগে সাবধান করে দিলাম।”

শুনে রাগ হয়েছিল বটে, তবে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি তখন। মালতীর বিকল্প হিসেবে ভানমতিয়া মন্দ তো নয়ই, বরং কাজেকর্মে একটু বেশিই চৌকস। তা ছাড়া কেন যেন মনে হয়েছিল, ভানমতিয়া অমন নয়। আমার উনি সকাল-সকাল কাজে বেরিয়ে গেলে সারাটা দিন একাই থাকতে হত। ভানমতিয়া এলে গল্প করে কিছুটা সময় কাটত আমার। ওর কাছেই শুনেছিলাম ওর জীবনের গল্প।

জামশেদপুরের কাছে বোড়াম গ্রামে ওর বাপের বাড়ি। জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা মারা যায়। বাবা বছর ঘোরার আগেই দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। সৎমার সংসারে আদরযত্ন জোটেনি। তার উপরে বাবাটা ছিল মাতাল। বাপের বাড়ির কথা বলার সময় ভানমতিয়াকে অন্যমনস্ক দেখাত। বলত, “সৌতেলি মায়েরই বা দোষ কী দিদি? সেও তো গরিব ঘরের মেয়ে। ভাগ্যের ফেরে মাতাল দাঁতাল বর জুটেছে। তাও দোজবরে বুড়ো। ঘরে সতিনের ঝি। মনে সুখ থাকলে গতরের খাটনিতে কষ্ট নেই। কিন্তু সেটা তো পায়নি বেচারি। তাই হয়তো আমাকে কষ্ট দিয়েই জ্বালা জুড়োত।”

একটা তেরো-চোদ্দো বছর বয়সি মেয়ের মুখে অমন গভীর জীবনদর্শনের কথা শুনব আশা করিনি। সেদিন প্রথম বার মনে হয়েছিল, ভানমতিয়া অশিক্ষিত হলেও নির্বোধ নয়। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “এত কম বয়সে বিয়ে কেন করলে, ভানমতিয়া?”

ও অবাক হয়েছিল।

“কম বয়স কোথায়? আমার বাপের মতি ঠিক থাকলে আরও কম বয়সে বিয়ে হত। কিন্তু মাতাল মানুষ। দু’বেলা রুটি জোগানোর টাকা নেই। তো মেয়ের বিয়ে দেবে কোথা থেকে? বিনে পয়সায় তো বিয়ে হয় না!”

“তা হলে হল কী ভাবে বিয়েটা?”

ভানমতিয়ার নরম মুখে লজ্জার ভাব ফুটে উঠল। বলল, “আমার বাবা এঁর কাছে টাকা ধার করেছিল। তো সেই টাকা শুধতে পারল না। বদলে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল।”

ভানমতিয়ার বর মনু যাদবকে দেখেছি। আধবুড়ো লোকটা। চোখ দুটো দিনের বেলাতেও লাল। বোঝা যায়, নেশাভাঙ করে। প্রথম যে দিন দেখেছিলাম, ওর সঙ্গে ভানমতিয়াকে মনে মনে পাশাপাশি বসিয়ে মনটা বিমুখ হয়ে উঠেছিল। বললাম, “টাকা শোধ করতে না পেরে বিয়ে দিয়ে দিল? তুমি কি গরু-ছাগল নাকি?”

ভানমতিয়ার মুখে ছায়া পড়ল। বলল, “মেয়েমানুষের দাম কী দিদি? গরু-ছাগলের চেয়েও কম।”

শুনে বিরক্ত বোধ করেছিলাম। সে রাতে আমার স্বামী সব শুনে বললেন, “তোমার খারাপ লাগাটা যেমন ঠিক, ওর কথাটাও ভুল নয়।”

রাগ হল। বললাম, “তার মানে তুমিও এটাকে সমর্থন করছ?”

“আমার সমর্থন করা বা না করায় কী এসে যায়? এখানে গ্রামগুলোয় ঘুরে দেখলে দেখতে পেতে, তোমার ভানুমতিয়ার চেয়েও ছোট বয়সের মেয়েরা এক-দুই বাচ্চার মা হয়ে বসে আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভাবের তাড়নায় মেয়েদের বেচে দেয় এরা। ভানমতিয়া তো তবু ঘর-বর পেয়েছে। অনেকের সেটুকু সৌভাগ্যও হয় না। পাচার হয়ে যায় অন্য রাজ্যে।”

অবাক হয়েছিলাম। কষ্ট পেয়েছিলাম আরও বেশি। তিনি সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “এত অভাব এখানে, কী করবে মানুষ? খেতে দিতে পারে না। ভাবে শ্বশুরবাড়ি গেলে গতরে খেটে খাবে। প্রতি বছর কত মেয়ে বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়, কল্পনাও করতে পারবে না।”

সে কথা পরে ভানমতিয়ার মুখেও শুনেছিলাম। নিজেই বলেছিল, “আমার নসিবের দোষ দিদি। সুনা কোঁখ। বাচ্চাকাচ্চা হবে না কোনও দিন। তবে আমার মরদ মানুষ ভাল।”

“কী রকম ভাল, শুনি?”

“গায়ে হাত তোলে না তো!”

দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সত্যি, স্বামী হয়ে স্ত্রীর গায়ে হাত না তোলা মহত্বের পরকাষ্ঠা বইকি! ভানমতিয়া বলে চলেছে, “আমার মরদ বলে, বাচ্চা না-ই বা হল, আমরা মোহনকে বড় করব ছেলের মতো করে।”

মোহনের কথা আগে শুনেছিলাম। মনুর ছোট ভাই, ভানমতিয়ার দেওর। বয়সে ভানমতিয়ার চেয়ে বছর দেড়-দুইয়ের ছোট হবে। মনু স্টেশনে কুলির কাজ করে। ছোট দেওরটি ভানমতিয়ার সঙ্গে বাড়িতে থাকে। মোহনের কথা বলতে গিয়ে ভানমতিয়ার মুখে আলো জ্বলে ওঠে। বলে, “পড়ালেখায় খুব মাথা মোহনের। ইশকুলে যায়। ওর ভাইয়া বলেছে, ওকে বড় অফসর বানাবে। মোহন বড় মানুষ হলে আমাদের আর কষ্ট থাকবে না।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার হিসেবি মন। মোহন বড় হয়ে সত্যিই যদি অফিসার হয়ে বসে, সেদিন গরিব দাদা-বৌদির ঘরের আঁধার ঘোঁচাবে, সে ভরসা হয় না। তবু ওর আশাটুকু ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে না। চুপ থাকি।

এভাবেই কেটে গেল বছর তিনেক। ভানমতিয়া আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে উঠেছিল। তার পর এক দিন হঠাৎই কাজে এল না ও। তার পর আরও এক দিন কাটল, দু’দিন কাটল, মেয়ের দেখা নেই। তখন আমিও সন্তানসম্ভবা। ওকে ছাড়া একা সব কিছু সামলানো আমার পক্ষে মুশকিল। তাই আমাদের ড্রাইভারকে পাঠালাম খোঁজ নিতে। যা শুনলাম, তাতে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। ভানমতিয়ার স্বামী মনু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় লাইন পেরোতে গিয়ে রেলে কাটা পড়েছে।

খবরটা পেয়েই ছুটে গেছিলাম ভানমতিয়াদের বাড়িতে। আমার ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল এক কিশোর। চোখেমুখে শোকের চিহ্ন। এলোমেলো চুল, ঠোঁটের উপর মৃদু গোঁফের রেখা। বুঝলাম, এই মোহন। ভানমতিয়া বাড়িতেই ছিল। ওর অবস্থা শোচনীয়। বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে। পাড়াপড়শিরা সামলে রেখেছে ওকে। আমাকে দেখে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, “আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল দিদি! এখন আমাদের কী হবে?”

ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা আমার ছিল না। কিছু ক্ষণ বসে থেকে ফিরে এসেছিলাম বাড়িতে। এই ঘটনার ক’দিন পর আমার শরীর হঠাৎই খারাপ হতে শুরু করল। স্থানীয় ডাক্তার বললেন, এই সময়ে এ রকম হওয়া স্বাভাবিক। হবু মায়ের পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন। এমন অবস্থায় আমার স্বামী আর ঝুঁকি নিলেন না। আমায় কলকাতার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানেই আমার ছেলে জন্মায়।

কয়েক মাস পরে তাঁরও বদলির অর্ডার এল। ভাগ্যক্রমে এ বারের পোস্টিং কলকাতার কাছেই। জামশেদপুর-বাসের পর্ব সেখানেই শেষ হল আমাদের। তার পরেও মাঝেমধ্যে ভানমতিয়ার কথা মনে পড়ত। কিন্তু খবর নেওয়ার উপায় ছিল না। ধীরে ধীরে স্মৃতির উপর সময়ের পলি পড়তে থাকে। আমিও জড়িয়ে পড়লাম নিজের জীবনে।

ভানমতিয়ার গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হল না। ভানমতিয়ার সঙ্গে আমার আবারও দেখা হয়েছিল। গত বছর এক আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে যেতে হয়েছিল কোলাঘাটে। পরদিন কনে-বিদায়ের পর বিয়েবাড়ির হট্টগোল থেকে খানিক স্বস্তি পেতে বেরিয়েছিলাম জায়গাটা ঘুরে দেখব বলে। হুগলি নদীর পাড় ধরে হাঁটছি। দেখি, একটা বাচ্চা মেয়ে সাইকেলের টায়ারের ভিতরে গাছের ডাল ঢুকিয়ে গড়িয়ে নিয়ে ছুটছে। পিছনে পিছনে হাতে অনেকগুলো পুঁতির মালা নিয়ে হেঁটে আসছে এক মহিলা। আমাকে দেখে গতি বাড়াল। সামনে এগিয়ে এসে বলল, “একটা মালা নিন না। নিজে পরবেন। লোকজনকে দেবেন। বেশি নিলে দাম কম করে দেব।”

বলতে বলতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। তাকিয়ে দেখি, ভানমতিয়া। কপালে টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। আমি বলে উঠলাম, “তুমি এখানে?”

ভানমতিয়া হাসল। বলল, “এখানেই থাকি এখন দিদি।”

বাচ্চা মেয়েটা দেখি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে।

“এ কে?” জিজ্ঞেস করলাম।

ভানমতিয়ার মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “আমার মেয়ে।”

“আবার বিয়ে করেছ? বাঃ! বর বুঝি এখানকার লোক?”

মাথা নাড়ল ভানমতিয়া। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ওর মুখখানা লালচে দেখাচ্ছে। শ্যামলা মুখে লজ্জার আভাটুকু ভারী ভাল লাগল। আগের চেয়ে একটু ভারী হয়েছে শরীর। কৈশোরের ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি এখন ঢলঢলে যুবতী। বলল, “আপনি তাকে চেনেন দিদি।”

“কে?” একটু ‌অবাক হই।

দ্বিধা করল ভানমতিয়া, সম্ভবত স্বামীর নাম উচ্চারণের প্রাথমিক জড়তা। তার পর বলল, “মোহন।”

ধাক্কা লাগল। ভানমতিয়ার মুখেই শুনেছিলাম, মনু মোহনকে নিজের সন্তানের মতো করে বড় করতে চেয়েছিল। সম্পর্কের জটিল সমীকরণ আমার শহুরে সংস্কারের প্রাচীরে জোর আঘাত করল। থমকে গেলাম ক্ষণমুহূর্তের জন্য।

ভানমতিয়া বোকা মেয়ে নয়। সে বোধ হয় বুঝল আমার দ্বিধাটুকু। বলল, “কী করতাম দিদি? গাঁ-ঘরে সোমত্ত বিধবার জোয়ান দেওরের সঙ্গে থাকা কেউ মেনে নেয়? আমরা দু’জন কী ভাবলাম, সেটার পরোয়া কেউ করে না। বদনাম ছড়ায়। আমার তো বাপের বাড়ির জোরও নেই। কোথায় যেতাম?”

“শুধু সেটুকুই? আর কিছু নয়?” কে জানে কেন জিজ্ঞেস করে ফেললাম। মনুর মৃত্যুসংবাদে অসুস্থ ভানমতিয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়ানো কিশোরটির মুখের রেখায় আঁকা উৎকণ্ঠা ও আকুলতা আমি ভুলিনি।

ভানমতিয়া চোখ নামিয়ে নিল। ওর ঠোঁট কাঁপছে। ঘি আর আগুনের প্রাচীন প্রবাদ মনে পড়ে গেল। বললাম, “খুব খুশি হলাম ভানমতিয়া। যা করেছ, বেশ করেছ। কিন্তু তুমি যে বলেছিলে কখনও মা হতে পারবে না?”

ভানমতিয়ার মুখখানা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, “আমি তো তা-ই জানতাম দিদি। মেয়ে যখন পেটে এল, বিশ্বাস করতে পারিনি। বুঝলাম, দোষ আমার ছিল না কোনও দিনই।”

বাচ্চাটা অবাক চোখে আমাকে দেখছে। হাবেভাবে চঞ্চলতা। ওর গাল টিপে আদর করলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, “নাম কী তোমার?”

“লাডলি যাদব,” উত্তর দিল সে।

গঙ্গার ও-পারে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ফেরার আগে আঙুল থেকে আংটি খুলে পরিয়ে দিলাম ভানমতিয়াকে।

“না না দিদি। এ কী…”

“কিছু না ভানমতিয়া। তোমার বিয়ের উপহার।”

ভানমতিয়ার চোখে জল। বাঁ হাতের চেটো দিয়ে সেটুকু মুছে নিয়ে বলল, “লাডলি ইশকুলে যায়। খুব মাথা। ওকে অফসর বানাব দিদি। পারব না?”

গোধূলির নরম আলো এসে পড়েছে ওর দুই চোখের তারায়। সেদিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, “পারলে তুমিই পারবে। ভানুমতীরা যে ভেলকি জানে।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy