E-Paper

কাল নকুলবাবু আসবেন

চা-টা আবার তেমন একটা সুবিধের হয়নি। তাতে অবশ্য পরমার কোনও দোষ নেই। আসলে আগে যে দামের চা-পাতা আনা হত, সেটা আর আনা হয় না।

উল্লাস মল্লিক

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:১৭
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

বাইরের রকে বসে চা খাচ্ছিলেন দয়ালবাবু। লিকার চা। আগে দুধ-চা খেতেন। কিন্তু ইদানীং দুধ-চায়ে গ্যাসের সমস্যা হচ্ছিল। আসলে হঠাৎ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই যেন গ্যাস-অম্বলের সমস্যাটা আরও চাগাড় দিয়ে উঠল। দয়ালবাবুর মাঝে মাঝে মনে হয়, ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে কি গ্যাস-অম্বলের কোনও যোগ আছে!

দয়ালবাবুর সঙ্গেই ওই ফ্যাক্টরিতে কাজ করত সুকুমার আর অনাদি। এখনও মাঝে মাঝে ফোন করে। ফ্যাক্টরি খোলার সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তা হয়। এ বার কথা হলে ওরাও গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় ভুগছে কি না, জেনে নিতে হবে।

চা-টা আবার তেমন একটা সুবিধের হয়নি। তাতে অবশ্য পরমার কোনও দোষ নেই। আসলে আগে যে দামের চা-পাতা আনা হত, সেটা আর আনা হয় না। এখন কম দামের চা-পাতা আসে। যেটাকে মরিচদানা চা বলে লোকে।

চা খেতে খেতেই দয়ালবাবু দেখলেন, সামনের রাস্তা ধরে রমেন সামন্ত আসছে। ক্রাচের উপর ভর দিয়ে একটু একটু করে এ দিকেই আসছে। ঊনসত্তর নম্বর রুটে কন্ডাক্টরি করত রমেন। অ্যাক্সিডেন্টে একটা পা গোড়ালির নীচ থেকে বাদ যায়। সেই থেকে ক্রাচ চিরসঙ্গী।

দয়ালবাবুর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল রমেন। দয়ালবাবু দেখলেন, ঘামে ভিজে গেছে জামা। কপাল থেকেও ঘাম গড়াচ্ছে।

রমেন জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছ, দয়ালদা?”

দয়ালবাবু বললেন, “ওই আছি... এক রকম চলে যাচ্ছে।”

রমেন বলল, “একটা কথা ছিল তোমার সঙ্গে।”

দয়ালবাবু বললেন, “বল না।”

রমেন সামান্য গলা নামিয়ে বলল, “তোমাদের বাড়ি কাল নাকি নকুল শিকদার আসছেন?”

দয়ালবাবু বুঝতে পারলেন না, বললেন, “কে নকুল শিকদার?”

রমেন বলল, “নকুল শিকদার আবার ক’জন আছে দেশে! নকুল শিকদার তো এক জনই।”

দয়ালবাবু একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, “নকুল শিকদারের মতো মানুষ কেন আমার বাড়ি আসবেন!”

“কিন্তু সবাই তো তা-ই বলাবলি করছে দয়ালদা।”

“কে, সবাই?”

“আরে দাদা, কে নয় সেটাই বলো। হাটে-বাজারে সবাই তো বলাবলি করছে।”

দয়ালবাবুর বিস্ময় কাটেনি, বললেন, “সবাই বলাবলি করছে!”

“হ্যাঁ দাদা, সবাই বলছে। সবাই তো আর এক সঙ্গে মিথ্যে কথা বলতে পারে না।”

দয়ালবাবু বললেন, “কী জানি, আমার তো কিছু…”

“তুমি হয়তো ভুলে গেছ দাদা। তুমি তো খুব ভুলো মনের মানুষ। আচ্ছা, না হয় বৌদিকে ডেকে এক বার জিজ্ঞেস করো দিকি। বৌদি নিশ্চয়ই জানে।”

দয়ালবাবু বললেন, “তোমার বৌদি জানবে আর আমি জানব না, তা কখনও হয় নাকি!”

রমেন বলল, “কিন্তু মানুষের তো ভুল হয় দাদা। মানুষ কত কী ভুলে যায়। এই তো শিপ্রা, মানে তোমার বৌমা, পর পর দু’দিন তরকারিতে নুন দিতে ভুলে গেল। আলাদা করে কাঁচা নুন মেখে খেতে হল। যতই কাঁচা নুন মাখো, সেই টেস্ট আর হয় না। তা ছাড়া কাঁচা নুন খাওয়া শরীররে পক্ষেও ভাল নয়, প্রেশার চড়ে যায়। কিন্তু কী করা যাবে, আলুনি খাবার আমি আবার মোটেই... যাক্‌গে যাক, তাই বলছি, ভুল তো মানুষের হয়েই যায়। তুমি এক বার বৌদিকে ডাকো না! সামান্য মোটে একটা কথা তো, এখনই ফয়সালা হয়ে যাবে।”

অগত্যা দয়ালবাবু গলা তুলে পরমাকে ডাকলেন। ভিতরবাড়ি থেকে পরমা কী যেন একটা বলল, ভাল বুঝতে পারলেন না দয়ালবাবু। পরমার গলার স্বর দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে আসছে। গলার স্বরের আর দোষ কী! শরীরে এতটুকু পুষ্টি নেই। রোজ আলুসেদ্ধ আর ভাতে-ভাত খেলে পুষ্টি আসবে কোথা থেকে! একটু মাছটা-ডিমটা না পেলে কি শরীর চলে! তবে এ নিয়ে অবশ্য পরমার কোনও অভিযোগ নেই। যাই হোক, দয়ালবাবু নকুল শিকদারের কথা ভাবতে বসলেন।

কথা হচ্ছে, নকুল শিকদার মস্ত মানুষ। অনেক ক্ষমতা তাঁর। দেশের রাজা, মন্ত্রীরা তাঁর কথা শুনে চলে। হেন সমস্যা নেই যার সমাধান নকুলবাবুর অসাধ্য। এই জন্যেই এত মানুষ ভালবাসে তাঁকে। শ্রদ্ধা করে। তাঁর নামে জয়ধ্বনি দেয়।

দয়ালবাবু কখনও সামনাসামনি দেখেননি নকুলবাবুকে। তাঁর দেখা মেলা কি সোজা কথা! অনেক ভাগ্য করলে তবে নকুলবাবুর মতো মানুষকে সামনাসামনি দেখা যায়। তবে ছবি দেখেছেন দয়ালবাবু। লম্বা, দোহারা চেহারা, ফর্সা গায়ের রং, টিকোলো নাক, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, মোটা ফ্রেমের পিছনে উজ্জ্বল দুটো চোখ। দেখলেই মনে হয়, হ্যাঁ, এই মানুষটার উপর ভরসা রাখা যায়।

“বলছি, আমার কথা তো তুমি সবই জানো দয়ালদা।”

দয়ালবাবু রমেনের মুখের দিকে তাকালেন। চোখ দুটো যেন চিকচিক করছে। দেখে দয়ালবাবুর বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

“দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে কী করে যে দিনগুলো কাটছে, কী বলব তোমায়!” বলল রমেন।

দয়ালবাবু বললেন, “জানি, সব খবরই কানে আসে।”

“অ্যাক্সিডেন্টের পর মালিক তো এককালীন সামান্য ক’টা টাকা দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলল। ভাল করে চোখে দেখার আগেই তো সে টাকা শেষ। আসলে আমাদের ইউনিয়ন তেমন জোরদার নয়। ইউনিয়নের মধ্যেই মালিকপক্ষের লোকজন ঢুকে বসে আছে। তারাই এখন সব চালাচ্ছে। ইউনিয়ন তেমন করে চেপে ধরলে আরও কিছু পাওয়া যেত। বিপদে যদি একটা গতিই না হল, তা হলে এত দিন ইউনিয়ন করলাম কী জন্য!”

মনের কষ্টটা চেপে রেখে দয়ালবাবু সায় দিলেন, “তাই তো।”

রমেন বলল, “তা বলছিলাম কী, নকুলবাবুকে একটু আমার কথা বলে দেখো না! তুমি বললেই হয়ে যাবে।”

দয়ালবাবু বললেন, “আচ্ছা সে বলব’খন।”

“বলবে যে, তেঁতুলতলার মোড়ে এক ফালি জমিতে যদি একটা গুমটি ঘরেরও বন্দোবস্ত করে দেন, সিগারেট, বিড়ি, পানমশলা, লজেন্স-টজেন্স নিয়ে বসে যাই। তা হলে অন্তত বৌ-ছেলেমেয়ের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড়…”

দয়ালবাবু কথার মাঝপথেই বলে উঠলেন, “বুঝেছি, বুঝেছি।”

“এই তো দেখো না, বিট্টু ওখানে চায়ের দোকান বসিয়ে দিল। ওর মুরুব্বির জোর আছে, তাই কেউ কিছু বলল না। আমি কাকে ধরব বলো! তবে নকুল শিকদার যদি এক বার ‘হ্যাঁ’ করে দেয়, কারও টুঁ শব্দটি করার ক্ষমতা হবে না। তোমার দুটো পায়ে পড়ি দাদা, একটু বোলো...”

দয়ালবাবু বললেন, “ছি ছি, অমন করে বলছিস কেন! নিশ্চয়ই বলব তোর কথা।”

আশ্বাস পেয়ে ক্রাচ টানতে টানতে চলে গেল রমেন।

দয়ালবাবু দেখলেন, ছটুয়া আসছে এ দিকেই। ছটুয়ার ভাল নাম দীপঙ্কর। কিন্তু এলাকায় ছটুয়া নামেই পরিচিত। ছটুয়ার বয়েস তিরিশের এ দিক-ও দিক। কাজকর্ম তেমন কিছু করে না। পাড়ার কালীপুজো-দুর্গাপুজো-শীতলাপুজো এ সব নিয়ে মেতে থাকে। টাকার অভাবে কোন মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, কোনও গরিবের বাড়ি কেউ মারা গেছে অথচ পয়সার অভাবে মড়া উঠছে না— খবর পেলে কোমরে গামছা বেঁধে দলবল নিয়ে হাজির ছটুয়া।

ছটুয়া এসে দাঁড়াল সামনে। বলল, “কেমন আছ দাদা?”

দয়ালবাবু বললেন, “ওই চলে যাচ্ছে আর কী!”

ছটুয়া বলল, “আগে তবু তোমাকে হাটে-বাজারে দেখতে পেতাম, এখন তো আর খুব একটা দেখি না।”

দয়ালবাবু বললেন, “রোজ তো আর বাজার যাওয়া হয় না, যে দিন যাই সকাল-সকাল চলে যাই। বেলা বাড়লে যা রোদ!”

ছটুয়া বলে, “ঠিক বলেছ দয়ালদা। গরমে একেবারে নকড়া-ছকড়া দশা। মাস-কে-মাস পেরিয়ে গেল একটু বৃষ্টির দেখা নেইকো। সমস্যা সব জায়গায়... ইয়ে, বলছিলাম দাদা, একটা কথা ছিল।”

“কী কথা?” বললেন দয়ালবাবু।

“শুনছি, নাকি কাল নকুলবাবু আসবেন তোমাদের বাড়ি!”

“কে বলল?”

ছটুয়া বলল, “সবাই তো চার দিকে বলাবলি করছে।”

দয়ালবাবু বললেন, “কী জানি! রমেনও তো বলে গেল। আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।”

“সবাই জানে দাদা। বলছিলাম কী, আমার ব্যাপার তো সবই জানো তুমি। লোকের বিপদে-আপদে যতটা পারি করি। কিন্তু আমারও তো বয়স হচ্ছে, এ বার একটা পাকা কাজকর্ম না হলে আর চলছে না। আর সত্যি কথাটা বলেই দিই তোমাকে। আমার জন্য একটা মেয়ে আটকে আছে। সরকারপাড়ার বাসুদেব সরকারের মেয়ের সঙ্গে আমার অনেক দিনের জানাচেনা… মানে বোঝোই তো… তা মেয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে বাড়ি থেকে খুব চাপ দিচ্ছে। তোমাকে সত্যি কথা বলছি দাদা, অন্য কোথাও বিয়ে হলে ও শিয়োর সুইসাইড করবে।”

দয়ালবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “সে কী কথা, সে কী কথা!”

ছটুয়া বলল, “হ্যাঁ দাদা, সেটাই তো ভয়ের কথা।”

দয়ালবাবু বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা হলে তো বলতেই হয়। তোর কথা নিশ্চয়ই বলব নকুলবাবুকে।”

ছটুয়া যেতে না যেতেই দয়ালবাবু দেখলেন, বাসু নন্দী আসছে। একটু অবাক হয়ে গেলেন দয়ালবাবু। ক'দিন আগেই বাসু নন্দীর সঙ্গে ছোটখাটো ঝামেলা হয়েছে তাঁর। তিনি বাজারে যাচ্ছিলেন। রাস্তার একেবারে ধার দিয়েই যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে সাইকেল নিয়ে দয়ালবাবুর গায়ের উপর এসে পড়ল বাসু নন্দী। মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে কোনও প্রকারে সামলে নিলেন দয়ালবাবু। পিঠে আর ডান হাতে বেশ আঘাত লাগল তাঁর। ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন। দোষ পুরোটাই বাসু নন্দীর। কিন্তু দয়ালবাবু সবিস্ময়ে লক্ষ করলেন, বাসু নন্দী তাঁর উপরেই চোটপাট শুরু করল। তিনি নাকি রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছিলেন। দয়ালবাবু বোঝাতে চেষ্টা করলেন, তিনি মোটেই রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটেননি, নিয়মমতো বাঁ দিক দিয়েই হাঁটছিলেন। কিন্তু কে কার কথা শোনে! আরও জোরে চিৎকার করতে শুরু করল বাসু নন্দী। উপায় নেই দেখে দয়ালবাবু চুপচাপ চলে এসেছিলেন সে দিন।

আজ বাসু নন্দী আসছে দেখে বেশ একটু অবাকই হয়ে গেলেন তিনি। কী হল রে বাবা আবার! একটু শঙ্কিতই হয়ে পড়লেন তিনি।

বাসু নন্দী সামনে এসে দাঁড়াল। মুখে একটা বিগলিত হাসি। বলল, “কেমন আছ, দয়ালদা?”

দয়ালবাবু বললেন, “ওই চলে যাচ্ছে আর কী!”

বাসু নন্দী বলল, “তুমি কিন্তু একটু রোগা হয়ে গেছ।”

দয়ালবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, “রোগা হয়েছি? কী জানি!”

“হ্যাঁ গো। বেশ চোখে লাগছে। অবশ্য চার দিকের যা অবস্থা!”

দয়ালবাবু শুধু ঘাড় নাড়েন একটু।

“আজকাল কিন্তু খুব ডেঙ্গি হচ্ছে। মশারি টাঙিয়ে শোও তো?”

মোটা মশারির মধ্যে হাওয়া আসে না বলে রাতে মশারি টাঙান না দয়ালবাবু। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে নীরবে ঘাড় নাড়লেন।

বাসু নন্দী বললেন, “আমার একটা নিবেদন আছে তোমার কাছে।”

দয়ালবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো বলো, অত কিন্তু-কিন্তু করার কী আছে!”

“আজ কবুল করছি যে, দোষটা কিন্তু আমারই ছিল, টাল সামলাতে না পেরে সে দিন সাইকেল নিয়ে আমিই তোমার গায়ে পড়ে গিয়েছিলাম।”

দয়ালবাবু বললেন, “আরে, ছাড়ো তো ও সব কথা, আমার কিছু মনে নেই।”

“সে তুমি ভালমানুষ, তাই।”

এমন কথার উত্তরে কী বলতে হয়, জানেন না দয়ালবাবু। তাই চুপ করে রইলেন।

বাসু নন্দী বললেন, “একটা কথা বলার ছিল তোমাকে। বলছিলাম কী, তোমার বাড়ি নাকি কাল নকুলবাবু আসবেন। তুমি তো দাদা সাঙ্ঘাতিক লোক, নকুলবাবুর মতো মানুষের সঙ্গে এত চেনাজানা… অথচ আমরা কেউ কিছু জানিই না। যাই হোক, বলছিলাম কী, শ্বশুরবাড়িতে আমার মেয়েটার উপর বড্ড অত্যাচার হচ্ছে। জামাই কাজকর্ম কিছু করে না। নেশা করে মেয়ের গায়ে হাত তোলে, আর খালি টাকার জন্য চাপ দেয়। নকুলবাবুকে বলে একটা ব্যবস্থা কিছু করা যায় না? নকুলবাবু মনে করলেই করতে পারেন…

দয়ালবাবু বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বলব। মনে হয় নকুলবাবু ঠিক একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।”

তার পর কত জন যে এল! কারও জমির সীমানা নিয়ে সমস্যা, কোথাও কোনও ভাইকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে দাদা, কারও মায়ের অসুখ কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না; পয়সার অভাবে কারও মেয়ের বিয়ে আটকে আছে, কেউ বাবার ওষুধ কিনতে পারছে না… বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেলে ভাল করে খেতে দেয় না। সবারই একটা দাবি, নকুলবাবুকে একটু বললেই হবে, নকুলবাবুই মুশকিল আসান।

দলালবাবু দেখলেন, তাঁর বাড়ির সামনে রীতিমতো ভিড় জমে গেছে। সবাই তাদের সমস্যার কথা বলতে চাইছে। হইচই হচ্ছে। হইচইয়ের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল দয়ালবাবুর। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন বিছানায়। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে পড়েছে ঘরে।

ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন দয়ালবাবু। ছবিতে দেখা জনদরদি নকুলবাবুর মুখটা মনের মধ্যে ভেসে উঠল তাঁর। পাশে পরমা ঘুমচ্ছে। প্রায় কঙ্কালসার চেহারা। কোটরে ঢোকা চোখ। একটুও পুষ্টি পায় না শরীরটা, তার উপর দুশ্চিন্তা। পরমার গায়ে হাত দিলেন দয়ালবাবু। পরমার ঘুম খুব পাতলা, চোখ মেলে তাকালেন। বললেন, “কী হল, ঘুমোওনি!”

দয়ালবাবু বললেন, “হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছিলাম তো, হঠাৎই ভেঙে গেল। আচ্ছা... তোমাকে একটা কথা বলি, ধরো, কাল যদি হঠাৎ আমাদের বাড়ি নকুলবাবু আসেন তা হলে কী হবে!”

পরমা বললেন, “কে নকুলবাবু?”

“আরে নকুল শিকদার গো! নকুলবাবু বলতে আর কে আছেন!”

পরমা বললেন, “যাহ্‌, নকুলবাবুর মতো অমন বড় মানুষ কেন আসতে যাবেন আমাদের বাড়ি!”

“আচ্ছা ধরো এলেন। আসতেই তো পারেন। তখন!”

পরমা বললেন, “তিনি তো তখন অতিথি। অতিথি এলে যেমন আদর-যত্ন করতে হয়, করব। কাঠের চেয়ারটা একটু ঝেড়ে-মুছে রাখব, ওটায় বসতে দেব। জল আর লেবু দিয়ে চিনির শরবত করে দেব। লেবু তো গাছেই আছে। চা করে দেব তার পর। তুমি রাধু ময়রার দোকান থেকে বরং দুটো সন্দেশ এনে দিয়ো। অতিথিকে একটু মিষ্টিমুখ করালে সংসারের কল্যাণ হয়।”

দয়ালবাবু বললেন, “বলছিলাম কী, রমেন সামন্ত একটা গুমটির কথা বলতে বলেছে, বলব নাকি।”

“তোমার যদি মনে হয়, বোলো।”

তার পর দয়ালবাবু একে একে ছটুয়া, বাসু নন্দী সবার কথা বললেন। পরমার একটাই কথা, “বলবে, নিশ্চয়ই বলবে নকুলবাবুকে। অত বড় মানুষ, নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।”

দয়ালবাবু বললেন, “আর আমাদের জন্যে কী চাইব?”

পরমা বললেন, “ও মা,আমাদের জন্য আবার কী চাইব! উনি তো কাল আমাদের অতিথি! আমরা তাঁকে যেমন পারি, খাতির-যত্ন করব। বাড়িতে অতিথি এলে নিজের জন্য কিছু চাইতে নেই।”

দয়ালবাবু অবাক হয়ে পরমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। হুবহু তার মনের কথাটা বলে দিয়েছে পরমা। কী করে জানল কে জানে!

পরমা বললেন, “নাও, এ বার শুয়ে পড়ো। রাত জাগা ভাল নয়।”

দয়ালবাবু শুয়ে পড়লেন। ঘুমিয়েও পড়লেন একটু পরে। মুখে আলগা হাসি। বাড়িতে অতিথি এলে যেমন হাসি ফুটে ওঠে গৃহকর্তার মুখে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy