E-Paper

ঘুম

আমি টিঙ্কু। আমি যেখানে জব করি, ‘আপনা মার্কেট’-এর মতো জায়গায় ডিউটির সময়ে তো ওরাই দেয় ইউনিফর্মের মতো একটা পোশাক। স্মার্ট। বাড়ি ফেরার সময়ে ছেড়ে রেখে আসতে হয়। ওরা লন্ড্রি করায় বটে, কিন্তু নোংরা নষ্ট করলে টাকা কেটে নেবে।

যশোধরা রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:১৪

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

দু’দিন না পরে কোনও জামা কাচতে দিতাম না আমি। তবু আজ এক বার মাত্র পরা জামাটাই ধুতে দিতে হল। কাপড়টাও কড়া,সিন্থেটিক মেশানো। আর দিন তো বদলাচ্ছে। গরম পড়ছে। এখন দিনের দিন বদলাবে আবহাওয়া। শীতের কাপড় সব কাল মা কেচে দিল। আলমারিতে তুলে দেবে। মা উলের জামাও সব হাতে করে কাচে। ভারী-ভারী কাপড় মেলে দেয়। কাল দেখলাম সুচ-সুতো নিয়ে বসেছে ছেঁড়া-ফাটা সেলাই করতে। মা কত কষ্ট করে। তেলের একটা প্যাকেট খুলে তেল বোতলে ঢেলে শান্তি নেই, প্যাকেটখানা কড়ার উপর উপুড় করে রাখে, চোঁয়ানো তেলেই একটা তরকারি নামিয়ে দেয়! জেঠুর গল্প শুনেছি, টাকা বাঁচাবে বলে বাড়িতে গামছা পরে থাকত, যাতে জামাকাপড় নষ্ট না হয়। হাড়কিপটে! হি হি! আমাদের অবশ্য কিপটেমি নয়। শূন্য ঢনঢন কলসি। ভাঁড়ে মা ভবানী। আমি অত পারি না। তাও, এক জামা দু’দিন থেকে তিন দিনই পরতাম। এখন থেকে আবার রোজ কাচো মেলো।

আমি টিঙ্কু। আমি যেখানে জব করি, ‘আপনা মার্কেট’-এর মতো জায়গায় ডিউটির সময়ে তো ওরাই দেয় ইউনিফর্মের মতো একটা পোশাক। স্মার্ট। বাড়ি ফেরার সময়ে ছেড়ে রেখে আসতে হয়। ওরা লন্ড্রি করায় বটে, কিন্তু নোংরা নষ্ট করলে টাকা কেটে নেবে। ওটা শর্ট কুর্তা, গাঢ় নীল মোটা কাপড়। নীচে সেম কালারের প্যান্ট। ওবেলা ফেরার সময়ে ফের নিজের কুর্তি। অনেকটা রাস্তা বাসে, ট্রেনে, তার পর টোটোতে। অন্য দিন ঘাম-জামাটা বারান্দায় হাওয়ায় দোলে। ভূত যেন।

গরম আসছে। ঘরে আনাজ নেই। আজ সজনে ফুলের বড়া করেছিল মা। ঘি-ভাত দিয়ে খেলাম। মাকে বললাম, “মা, এ বার তেতোর ডাল করবে।”

মা বলল, “ঘি ফুরিয়েছে। আনিস।”

আমার কাজের জায়গা থেকে ফেরার সময় মেয়ে-সিকিয়োরিটি সব মেয়েদের পুরো চেক করে। কিছু নিয়ে আসছি কিনা লুকিয়ে। কোমরের নাড়াবাঁধার জায়গায়, গায়ে থাবড়ে থাবড়ে দেখে। সেদিন মেয়ে-সিকিয়োরিটি ছিল না। পুরুষ-সিকিয়োরিটি খুব লজ্জা পাচ্ছিল। গায়ে হাত দেবে কী ভাবে! টেনে কুর্তিটা পেটের সঙ্গে সাঁটিয়ে দেখালাম, লেগিং-এর কোমরে কিছু লুকিয়ে আনিনি। ইজ্জত নেই নাকি! কাজের জায়গা থেকে চুরি করব, এতটা হা-ভাতে আজও হইনি। পাড়ার দোকানেই তো ধারে কেনা হয় আমাদের রোজ যা লাগে।

‘আপনা মার্কেট’। সুপারমার্কেট। কাচের দরজা। খুব জোরে এসি চালানো। ভিতরে এমন ফ্রেশনার দেয়, গন্ধের টানে মানুষ পাগল হয়ে বাইরে থেকে ঢুকে পড়ে। গ্রীষ্মে এসি-র হু হু হাওয়ার পরশ আসবে স্লাইডিং দরজা ডাইনে-বাঁয়ে খুলে গেলেই। বাইরে থেকে শীতলতার সাড়া পেলেই, মানুষ ঠান্ডা বাতাসের টানেই ঢুকবে দোকানে। বিক্রি হবে ঘোল-ছাঁচ-আইসক্রিম।

রোজকার দরকারের রুটি, চাল, দুধ, ডিম... দোকানের অনেকটা ভিতর দিকে সেই সেকশন। সুপারমার্কেটের এটাই নিয়ম। পেরিয়ে আসতে হয় ঝলমলে পোশাক, স্বাস্থ্যের উপাদান, প্রসাধন। ফ্লোর ম্যানেজার তপনের কাছে গিয়ে নিখুঁত লিপস্টিকে বাঁধানো হাসি হেসে বলি, “কী গো, আমাকে পোশাকের দিকটায় ডিউটি দাও না গো।”

কে না জানে, সুপারমার্কেটে অপ্রয়োজনীয় জিনিসই লোভে পড়ে বেশি কেনে লোকে। শ্যাম্পু-কোম্পানির মেয়েদের পোশাকের রং আলাদা। গোলাপি-বেগুনি। ওরা এক লিটার শ্যাম্পুতে কন্ডিশনার ফ্রি, দু’লিটারে ফুফা লুফা, চিরুনি ফ্রি, এমন সব অফার নিয়ে এক পায়ে খাড়া। কেউ হয়তো চাল-ডাল কিনতে যাচ্ছে, মাঝরাস্তায় তাকে পাকড়াও করে মস্ত একটা শ্যাম্পুর শিশি গছিয়ে দেবে।

আমি আর সুরভি হাসাহাসি করি, তপনদা আমাদের উপর ছড়ি ঘোরায়। নিজের যেন কত্ত ব্যাঙ্ক ব্যালান্স। বেট ধরেছি সুরভি আর প্রতিমার সঙ্গে, তপন আমাদের মধ্যে কার জন্য বেশি ক্রাশ খায়!

আজকাল যে খবরের কাগজের ঠোঙায় মুদির জিনিস আসে, সেই ঠোঙাটাই পাশ বরাবর খুলে খুব মন দিয়ে পড়ে মা। কাগজ রাখতে পারি না, বই-টই এক-দু’খানাই আছে বাড়িতে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আর কত পড়বে পুরনো বই। বাবা নেই বলে কাগজ নেই, অথচ মা পড়ত। দুপুরে। আমার সংসার এখন টায়ে-টায়ে চলে, মাইনের টাকার অর্ধেক খরচা টোটো-ট্রেন-বাসে। কাল ঠোঙা খুলে মা বলল, “দ্যাখ দ্যাখ টিঙ্কু, এই ছবিটা দ্যাখ।”

ছবিটায় একটা মাঝবয়সি শাড়ি-পরা বৌ, পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। মুখে খুব শান্তি। যেন স্বপ্ন দেখছে। দেখলাম, ছবিটা দেখতে দেখতে মায়ের মুখে নরম আভা। কত দিন এমন শান্তিতে ঘুমোতে পারেনি মা!

আমারও তো মনে পড়ে না কোনও দিন মাকে শুয়ে থাকতে দেখেছি। আমি যত ক্ষণ জেগে থাকি, দেখি, মা কাজ করে চলেছে। এই বসে কুটনো কুটে রান্না চাপাল, আবার উঠে কাপড় মেলছে। এটা নামাচ্ছে, ওটা তুলছে সারা দিন। শুয়ে থাকা মা-কে আর কবেই বা দেখলাম আমি। আমি ঘুমোনোর সময়ে দেখি, মা রান্নাঘর তকতকে করে মুছে রাখছে। মায়েরও তো বয়স হচ্ছে, পা কনকন করে না?

আমার পা-দুটোই আজকাল টাটায়। পিঠ দপদপ করে। পুরো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ তো! তপনদা কথা রেখেছে। জামাকাপড়ের সেকশনে আমাকে দিয়েছে। কয়েক মাস আগে তো টানা গ্রসারিতে ছিলাম। চাল-ডাল, মশলা। কী একঘেয়ে! এখন গেঞ্জি, টপ, কুর্তি। আয়না আছে বড় বড়। থামের সঙ্গে। সবাই গায়ে জামা ফেলে দেখবে বলে। আজ, খেয়াল নেই কখন, আয়নায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম বোধ হয় খানিক। পিঠ একটু আরাম পেল।

আবার সরে এসেছি। দাঁড়িয়ে পালাজ়ো দেখাচ্ছি কাস্টোমারকে। হঠাৎ চেঁচামেচি। আরে, কী হয়েছে! তপন দৌড়ে এল, “অ্যাই অ্যাই, কোন মেয়েটা রে, আয়নায় ঠেস দিচ্ছিল?”

সিসিটিভিতে দেখেছে বড় ম্যানেজার। তপনকে তলব অমনি। উপরের একটা ঘরে সিসিটিভির সব ক’টা স্ক্রিন। ওই ছবিতে মুখ ভাল দেখা যায় না। আমরা গেলাম তিন জন। আমি, সুরভি আর প্রতিমা। আমরাই এদিকে ছিলাম। বড় ম্যানেজার সিসিটিভির স্ক্রিনে ব্যাকে গিয়ে গিয়ে থামিয়ে থামিয়ে দেখছিল। আমার গলার কাছে হৃৎপিণ্ড। ধাঁ করে মনে পড়েছে, ঠেস দিয়েছিলাম একবারটি। পিঠ খুব টনটনাচ্ছিল তখন।

ওই তো আমার ছবি! সবাই এক রকম যদিও আমরা। ওটা অন্য কেউ হতেই পারত। নীল টপ নীল প্যান্ট। এমনিতে বোঝা কঠিন। তাও, প্রতিমাই ফটাস করে বলে দিল, “ওই তো, ওটা তো টিঙ্কু!”

“ও ঠেস দিয়েছিল আয়নায়?”

“নিজের চোখে দেখিনি। তবে এটা তো টিঙ্কুই।”

প্রতিমা, তোর সঙ্গে কাট্টি। তোর সঙ্গে রুটি-আলুচোখা, ব্রেড পকোড়া ভাগ করে রোজ খাই। কে তোকে হুট করে ধরিয়ে দিতে বলেছিল আমায়? নিজে শাস্তির ভয়ে এমন করলি?

অবশ্য ও না বললেই বা কী হত। আমাকে ঠিক ধরে ফেলতই ওরা। ক’টাই বা মেয়ে ওই ফ্লোরে!

ধরা পড়ে গেলাম। যা-তা গালি দিল তপন, গলার শির ফুলিয়ে। যেন অত না চেঁচালে ওর চাকরিও আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই যাবে। ওর দায়িত্ব আমাদের ম্যানেজ করার।

বলেই চলল, “টিঙ্কুটার কী সাহস! আয়নাটা ভেঙে যেত যদি! মামাবাড়ির আবদার পেয়েছ? তোমাকে বেচলেও উঠত ওই আয়নার দাম! যাও স্প্রে আর ডাস্টার নিয়ে পরিষ্কার করো! গায়ের ছোপছাপ লাগিয়েছ! যত্ত সব হা-ভাতের বাচ্চা!”

এই তপনের খুব কাছে গিয়ে লিপস্টিক বাঁধানো মুখ ওর দিকে তুলে ধরলে ওর চোখ তিরতির করে কাঁপত। আমি স্পষ্ট দেখেছি। ওর ইউনিফর্ম থেকে আসত হালকা সুবাস। ও তো ট্রায়ালের মেন’স পারফিউম, বডি স্প্রে ওদিকের মেয়েগুলোকে পটিয়ে গায়ে মাখে। আমি বলে দিই যদি?

আমার কান্না পাচ্ছে। পা দুমড়ে পড়ে যাব? বেরোতে যাচ্ছি, উপরের ওই ম্যানেজারটা কেটে কেটে বলল, “ফির সে অ্যায়সা করোগি তো নোকরি চলা যায়গা। ডিউটি টাইম ইজ় ডিউটি টাইম। নো কম্প্রোমাইজ়।”

প্রতিমা, সুরভি সরে গেল নীরবে৷ সবাই আমার পাশ থেকে সরে গেল। ওদের তো বন্ধু ভাবতাম। দশ মিনিট টিফিন ব্রেকে বাইরে গিয়ে এক গেলাস শিকঞ্জি ভাগ করে খেতাম। আসলে এখানে কেউ কারও বন্ধু নয়।

বাড়ি এসে মাকে কিছু বলিনি। শুধু বিছানার পাশে রাখা ছেঁড়া ঠোঙার কাগজটা টেনে আমি শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকি। কী নিশ্চিন্ত ঘুম! রাতে সারা গায়ে ব্যথা করে, সরু একটা খাটে আমি আর মা তো গা কুঁকড়ে শুই ভাগাভাগি করে।

আমি যখন ঘুমোই, তখন এ রকম দেখায়? আরাম, শান্তির ঘুম কেমন দেখতে হয়? এক দিন আমিও ঘুমোব। অনেক টাকা জমিয়ে মাকে নিয়ে যাব ছবির মতো একটা জায়গায়। ঘরে বেয়ারা খাবার দিয়ে যাবে। চা পর্যন্ত নিজে করে খেতে হবে না। আমরা শুধু সাদা ধবধবে বিরাট বিছানায় ঘুমোব। তোয়ালের হাঁস ভেসে থাকা বিছানা।

অমুকদা তমুকদা কিচ্ছু না। আমি শুধু এক বেলা ঘুমের জন্য ক্রাশ খাচ্ছি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Literature Bengali Short Story Short story Bengali Story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy