E-Paper

বই পড়ার জন্য আত্মীয়ার আঁচল থেকে চাবি চুরি

কবি, গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, বাগ্মী-সহ আরও যে সব রূপে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করা যায়, পাঠক রবীন্দ্রনাথ তার অন‍্যতম।

পীতম সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৭
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফাইল চিত্র।

কীর্তিটি করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ছিলেন আগ্রাসী পাঠক। হাতের কাছে যা পেতেন, পড়ে ফেলতেন। যেখানে যেতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন প্রায় একটা ছোটখাটো লাইব্রেরি। সাহিত‍্য ছাড়াও ভালবাসতেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞানের মতো দুরূহ বিষয়ের বইও।

সময়টা ১৩০২ বঙ্গাব্দ। অগ্রহায়ণ মাসের ১৬ তারিখ, পূর্ণিমা। সেই দিনেই ‘পূর্ণিমা’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কবিতা রচনা করেন— “পড়িতেছিলাম গ্রন্থ বসিয়া একেলা,/ সঙ্গীহীন প্রবাসের শূন‍্য সন্ধ‍্যাবেলা/ করিবারে পরিপূর্ণ। পণ্ডিতের লেখা/ সমালোচনার তত্ত্ব; পড়ে’ হয় শেখা/ সৌন্দর্য‍্য কাহারে বলে— আছে কি কি বীজ/ কবিত্ব কলায়; — শেলি, গেটে, কোলরীজ/ কার কোন্ শ্রেণী। পড়ি পড়ি বহুক্ষণ/ তাপিয়া উঠিল শির, শ্রান্ত হল মন,/ মনে হল সব মিথ‍্যা, কবিত্ব কল্পনা/ সৌন্দর্য‍্য সুরুচি রস সকলি জল্পনা/ লিপি-বণিকের; — অন্ধ গ্রন্থকীটগণ/ বহু বর্ষ ধরি’ শুধু করিছে রচন/ শব্দমরীচিকা-জাল, আকাশের পরে/ অকর্ম্ম আলস‍্যাবেশে দুলিবার তরে/ দীর্ঘ রাত্রি দিন। অবশেষে শ্রান্তি মানি’,/ তন্দ্রাতুর চোখে, বন্ধ করি’ গ্রন্থখানি/ ঘড়িতে দেখিনু চাহি দ্বিপ্রহর রাতি;/ চমকি’ আসন ছাড়ি’ নিবাইনু বাতি।”

কবিতাটির এমন প্রথমাংশ পড়তে গিয়ে পাঠক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও তিনি ‘ক্ষণিকা’ কাব‍্যগ্রন্থের ‘কবি’ কবিতাটিতে হেঁয়ালি করে লিখেছিলেন, “কাব‍্য প’ড়ে যেমন ভাব/ কবি তেমন নয় গো।”

তা হলে কেন ‘পূর্ণিমা’ কবিতায় পাঠক রবীন্দ্রনাথের ছায়া পাঠকেরা দেখে থাকে, তার ব‍্যাখ‍্যা তিনি নিজেই ঔপন্যাসিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়কে ১৩০২-এর ৬ চৈত্র তারিখে চিঠিতে জানিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, “‘পূর্ণিমা’ কবিতাটা সত‍্য ঘটনামূলক। একদিন বোটে সিয়া বাতি জ্বালাইয়া সন্ধ‍্যাবেলা ডাউডেন সাহেবের সমালোচনা পড়িতে পড়িতে রাত অনেক হইল এবং হৃদয় শুষ্ক হইয়া গেল— অবশেষে দিক্ হইয়া বইটা ধপ্ করিয়া টেবিলের উপর ফেলিয়া দিয়া যেমনি বাতি নিবাইয়া দিলাম অমনি চারিদিকের মুক্ত জানালা দিয়া এক মুহূর্তে অনন্ত আকাশভরা পূর্ণিমা আমার বোট পরিপূর্ণ করিয়া নিঃশব্দ উচ্চহাস‍্য সকৌতুকে হাসিয়া উঠিল।”

বাইরের অমন চরাচরবিস্তৃত চন্দ্রালোকের সৌন্দর্যের মধ‍্যে, বোটে বাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে ডাউডেনের পুঁথি থেকে সৌন্দর্যতত্ত্ব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উদ্ধার করার দুশ্চেষ্টা প্রকৃতির কাছে হাস‍্যকর বলে মনে হয়েছিল কবির। এখানে একটি বই পড়ে কবিতা রচনার উপলক্ষ্য বিধৃত হলেও পাঠক রবীন্দ্রনাথের ছবিটি ফুটে উঠেছে।

কবি, গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, বাগ্মী-সহ আরও যে সব রূপে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করা যায়, পাঠক রবীন্দ্রনাথ তার অন‍্যতম। এক দিকে অধ‍্যয়নে তাঁর বিরাম, বিরতি যেমন থাকত না, পাশাপাশি রচনাতেও তিনি ছিলেন অক্লান্ত, অসীম। বাংলা তো বটেই, ইংরেজি ও বিদেশি ভাষারও নানা ধরনের বই তিনি গোগ্রাসে পড়তেন। সাহিত‍্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, শিল্পকলা বিষয়ক হাতের কাছে যা বই পেতেন, তা-ই পড়ে ফেলতেন। সারা জীবন নানা বিষয়ের নানা বই পড়ে প্রিয়নাথ সেন, প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী, অমিয় চক্রবর্তীদের সঙ্গে চিঠিপত্রে আলোচনা করেছেন।

ছেলেবেলার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, “আমার বাল‍্যকালে বাংলাসাহিত‍্যের কলেবর কৃশ ছিল। বোধ করি তখন পাঠ‍্য অপাঠ‍্য বাংলা বই যে-কটা ছিল সমস্তই আমি শেষ করিয়াছিলাম।” বইপড়ার নেশা তাঁকে এক বার এমন পেয়ে বসেছিল যে দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়ার বাক্সবন্দি করে রাখা দীনবন্ধু মিত্রের ‘জামাই বারিক’ প্রহসনটি পড়ার জন‍্য তাঁর আঁচলে-বাঁধা চাবির গোছা চুরি করে বাক্স খুলে বইটি পড়ে ফেলেন।

ছোট থেকেই তাঁর বই পড়ার অভ্যাস শুরু। ‘জীবনস্মৃতি’তেই এই অভ‍্যাস গড়ার গোড়ার কথা আছে, “চাকরদের মহলে যে সকল বই প্রচলিত ছিল তাহা লইয়া আমার সাহিত‍্যচর্চার সূত্রপাত হয়। তাহার মধ‍্যে চাণক‍্যশ্লোকের বাংলা অনুবাদ ও কৃত্তিবাসের রামায়ণই প্রধান।” বাল‍্যকালে এক বার বর্ষার সময়ে মার্বেল কাগজে মোড়া, ছেঁড়া মলাটওয়ালা, দিদিমার কৃত্তিবাসী মলিন রামায়ণ বইটি নিয়ে তিনি মায়ের ঘরের দরজার কাছে পড়তে বসে গেছিলেন। কখনও কখনও রাত দুটো পর্যন্তও পড়তেন। তাই দেখে বড়দিদি সৌদামিনী দেবী এসে জোর করে বালক রবির থেকে বই কেড়ে নিয়ে বিছানায় শুতে পাঠিয়ে দিতেন। বালক বয়সেই রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব পদাবলি পাঠ করেন। এই পাঠ সম্পর্কে কাদম্বিনী দেবীকে নিজেই ১৯১০ সালের ৪ জুলাই একটি চিঠিতে লিখেছেন, “তার ছন্দ, রস, ভাষা, ভাব সমস্তই আমাকে মুগ্ধ করত। যদিও আমার বয়স অল্প ছিল, তবু অস্পষ্ট অস্ফুট রকমের বৈষ্ণবধর্ম তত্ত্বের মধ‍্যে আমি প্রবেশলাভ করেছিলুম।” এমন বিষয়ে পাঠের কারণ জানাতে কবুল করেছিলেন যে “বিদ‍্যাপতির দুর্বোধ‍্য, বিকৃত মৈথিলী পদগুলি অস্পষ্ট বলিয়াই বেশি করিয়া আমার মনোযোগ টানিত।” এই কালেই পড়ে ফেলেছিলেন গোবিন্দদাস, চণ্ডীদাস প্রমুখের পদাবলি এবং মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব‍্য। ফলস্বরূপ ষোলো বছরে রচনা করেছিলেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’। এর পর তিনি বিলেত যাওয়ার প্রস্তুতিকালে আমদাবাদে মেজদা সত‍্যেন্দ্রনাথের বাড়ির লাইব্রেরিতেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতেন। সেই সময় সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতিও আকৃষ্ট হন। সেই স্মৃতি প্রসঙ্গে লিখেছেন, “সংস্কৃত কাব‍্যের ধ্বনি ও ছন্দের গতি আমাকে কতদিন মধ‍্যাহ্নের অমরুশতকের মৃদঙ্গাঘাত গম্ভীর শ্লোকগুলির মধ‍্যে ঘুরাইয়া ফিরিয়াছে।” তখনই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত‍্যের ইতিহাস সংক্রান্ত রাশি রাশি গ্রন্থ অভিধান সহযোগে পড়তে পড়তে ‘এ‍্যাংলো স‍্যাক্সন’ ও ‘এ‍্যাংলো নর্মান’ সাহিত‍্য সম্বন্ধে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতেন।

বিলেতে বাসকালেও স্কুল-পালানো কিশোর রবি হার্বাট স্পেনসারের ‘ডেটা অব এথিক্স’ ছাড়াও ‘দি ওরিজিন অ‍্যান্ড ফাংশন অব মিউজ়িক’ পড়ে অত্যন্ত উপকৃত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ গীতিনাট‍্য রচনার প্রেরণা পান তাহারই প্রবন্ধ পাঠ করিয়া।” ইন্দিরা দেবীকে লেখা ‘ছিন্নপত্র’-এ দেখা যায়, শেলি, কিটস, ব্রাউনিং, টেনিসন, টলস্টয়, এলিয়ট, গোর্কির লেখা নিয়মিত পাঠ করতেন কবি। রথীন্দ্রনাথ ‘পিতৃস্মৃতি’তে লিখেছেন, “একরাশ বই তাঁর নিত‍্য সহচর। যেখানেই যেতেন একটি ছোটখাটো লাইব্রেরি সঙ্গে যেত। তার মধ‍্যে থাকত গ‍্যেটে, তুর্গেনিভ, বালজাক, মোপাঁসা, ওয়াল্ট, হুইটম‍্যান প্রভৃতি বিদেশী সাহিত‍্য, অমরকোষ ও কয়েকখানা সংস্কৃত বই। সাহিত‍্য ছাড়াও তিনি ভালবাসতেন পড়তে জ‍্যোতির্বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান ইত‍্যাদি দুর্বোধ‍্য বিষয়ের মোটা মোটা বই।” এই প্রসঙ্গে ইন্দিরাকে চিঠিতে জানিয়েছেন, মফস্সলে গেলে অনেকগুলো বই সঙ্গে নিয়ে নেন। কখন কোনটা দরকার পড়ে তা তো আগে থেকে জানা সম্ভব নয়, “তাই সমস্ত সরঞ্জাম হাতে রাখতে হয়।”

অ‍্যাস্ট্রোনমির উপর রবার্ট বলের বই পড়ে তাঁর এত ভাল লেগেছিল যে মীরা দেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “ও বইটা প্রথমে যখন পড়েছিলুম তখন আমার এত ভালো লেগেছিল যে আমার আহার নিদ্রা ছিল না।” ভ্রমণ-সাহিত‍্যও যে ভালবাসতেন তা জানা যায় ইন্দিরাকে লেখা চিঠি থেকে। লিখেছিলেন, “কাল কেবল বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে একখানি ছোটো কবিতা লিখেছি এবং একটা তিব্বত ভ্রমণের বই পড়েছি। এই রকম নির্জন জায়গায় একলা বসে ভ্রমণের বই পড়তে আমার ভারী ভালো লাগে। এ রকম জায়গায় নভেল আমি ছুঁতে পারি নে।”

দর্শনশাস্ত্রের বই পড়তে বিশেষ পছন্দ করতেন না। বন্ধুবর মোহিতচন্দ্র সেনের ‘এলিমেন্টস অব মরাল ফিলসফি’ বইটি পড়ে জানিয়েছেন, “আমি দার্শনিক বই প্রায় পড়ি নাই।” কারণ দর্শালেন, “ভয় হয় পাছে যাহাকে সহজ বলিয়া জানি তাহার কঠিন স্বরূপ দেখিয়া আতঙ্ক জন্মে।” সমস্ত প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে দেখতে গেলেই অনেকটা অংশ ফাঁকা থেকে যায়, এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন।

অগ্রজ লেখকদের লেখা পাঠ করার পাশাপাশি অনুজ সাহিত্যিক ও কবিদের লেখাও পড়তেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের লেখা প্রসঙ্গে নিজের অভিমত অকাতরে প্রকাশ করেছেন। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ সকলের লেখাই পড়তেন। জীবনের প্রান্তে এসে নিশিকান্ত রায়চৌধুরীর লেখা পড়ে চিঠিতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, “তোমার অলকানন্দা পড়লুম, পড়ে বিস্মিত হলুম। ভাষা ও ছন্দের মধ‍্য দিয়ে তুমি যে বাণীশিল্প রচনা করেছ, রসজ্ঞ মাত্রেরই কাছে তা সমাদৃত হবে।”

‘প্রবাসী’র রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় পাঠক রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “তাঁকে সবাই কবি বলেই জানে। তিনি যে কিরূপ পণ্ডিত ও কতরকমের বই পড়েছিলেন তা লোকে জানে না। তাঁর কবিত্ব-খ‍্যাতি না থাকলে পাণ্ডিত‍্য-খ‍্যাতি রটত।” ‘তিনি যে কত বড় পড়ুয়া ছিলেন’, শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যেও সে কথা প্রকাশ পেয়েছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy