১৯২০ সালের ৩১ অক্টোবর। রাত তখন দুটো। হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসেন ফ্রেডরিক গ্রান্ট ব্যান্টিং। চারপাশ নিস্তব্ধ, ঘর অন্ধকার, কিন্তু তাঁর মনে যেন হঠাৎ আলো জ্বলে উঠেছে। ব্যান্টিং তখন কানাডার এক তরুণ চিকিৎসক— অপরিচিত, আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগা; ছোট একটি চিকিৎসাকেন্দ্র চালিয়ে কোনও মতে দিন কাটাচ্ছেন। সেই রাতেই তাঁর মাথায় জন্ম নেয় এক ভাবনা, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
তিনি দ্রুত একটি নোটবুক খুলে লিখে ফেলেন— অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসের এমন একটি নিঃসরণ রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। যদি সেই নিঃসরণ আলাদা করে নিষ্কাশন করা যায়, তবে ডায়াবেটিস আর মৃত্যুদণ্ড হয়ে থাকবে না। তখন ডায়াবেটিস মানেই ছিল অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাওয়া, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে। চিকিৎসাবিজ্ঞান সেখানে অসহায়।
বেশির ভাগ গবেষকেরই ধারণা ছিল, প্যানক্রিয়াস অত্যন্ত জটিল— তার রহস্য ভেদ করা অসম্ভব। কিন্তু ব্যান্টিং ‘অসম্ভব’ শব্দটি মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।
আসলে ব্যান্টিং ছিলেন বিপ্লবী চরিত্রের। মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষে তিনি ফেল করেছিলেন। গবেষণাগারে কাজ করার মতো প্রশিক্ষণ তাঁর ছিল না। ছিল না কোনও প্রভাবশালীর সঙ্গে পরিচয়। ছিল শুধু একরোখা জেদ— যা গড়ে উঠেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে। যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এক বার নিজে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আহত সৈনিকদের চিকিৎসা করেছিলেন। অসহায় ভাবে বসে থাকা তাঁর স্বভাবে ছিল না।
ডায়াবেটিস রোগীদের ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলোয় নির্মম ভাষায় লেখা ছিল— ডায়াবেটিসের কোনও কার্যকর চিকিৎসা নেই।
১৯২১ সালে তিনি তাঁর ধারণা নিয়ে যান টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে জে আর ম্যাকলিওডের কাছে। ম্যাকলিওড পুরোপুরি আশ্বস্ত না হলেও সীমিত সুযোগ দেন— একটি ছোট ল্যাব, কয়েকটি পরীক্ষামূলক কুকুর এবং সহকারী হিসেবে এক জন মেডিক্যাল ছাত্র, যাঁর নাম চার্লস বেস্ট।
এর পর শুরু হয় এক কঠিন লড়াই। একের পর এক ব্যর্থতা, সংক্রমণ, হতাশা— সবই ছিল নিত্যসঙ্গী। অনেক রাত কেটেছে ল্যাবের মেঝেতে। তবুও ব্যান্টিং ও বেস্ট থামেননি। একের পর এক পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। কুকুর অসুস্থ হয়েছে, সংক্রমণ হয়েছে, হতাশা জমেছে। তবুও তাঁরা থামেননি।
এক দিন সব কিছু বদলে গেল। একটি কুকুরকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডায়াবেটিক করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী তার দ্রুত দুর্বল হয়ে মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু যখন ব্যান্টিং প্যানক্রিয়াস থেকে তৈরি করা একটি নির্যাস সেই কুকুরের শরীরে প্রবেশ করালেন, তখন আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। কুকুরটির রক্তে শর্করার মাত্রা কমে এল। তার শক্তি ফিরতে শুরু করল। সে বেঁচে রইল।
ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ডায়াবেটিস পরাজিত হল।
কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই বিজ্ঞান জগতের চিরচেনা সমস্যা সামনে এল— কৃতিত্ব বণ্টনের বিতর্ক। ইতিহাস বলে, বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে প্রকৃত আবিষ্কারকের নাম আংশিক বা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। ব্যান্টিংয়ের গল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। ম্যাকলিওড আবার সক্রিয় ভাবে যুক্ত হন, ইনসুলিন বিশুদ্ধ করার দায়িত্ব নেন বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ। কৃতিত্ব, সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। ব্যান্টিং অনুভব করেন, তাঁর মূল অবদান ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
তবুও সময় অপেক্ষা করেনি।
১৯২২ সালের জানুয়ারিতে টরন্টো জেনারেল হাসপাতালে চোদ্দো বছরের লিয়োনার্ড থম্পসনের শরীরে ইনসুলিন প্রয়োগ করা হলে সে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে। তার রক্তে শর্করা স্বাভাবিক হতে শুরু করে, ক্ষুধা ফিরে আসে, শরীরে শক্তি ফিরে পায় সে। হাসপাতালে একের পর এক শিশু জীবন ফিরে পেতে থাকে। চিকিৎসকেরা বিস্ময়ে দেখছিলেন— এটি কেবল গবেষণাগারের সাফল্য নয়, বাস্তব জীবনের বিপ্লব।
১৯২৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় ব্যান্টিং ও ম্যাকলিওডকে। এই সিদ্ধান্তও বিতর্ক এড়াতে পারেনি। চার্লস বেস্টের নাম বাদ পড়ায় ব্যান্টিং নিজের পুরস্কারের অর্থ বেস্টের সঙ্গে ভাগ করে নেন। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়— বিজ্ঞান শুধু আবিষ্কারের গল্প নয়, এটি স্বীকৃতি ও ন্যায়ের লড়াইও।
এর পর ব্যান্টিং নেন তাঁর সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত। ইনসুলিন থেকে তিনি কোনও লাভ করতে চাননি। তিনি এক ডলারের বিনিময়ে ইনসুলিনের পেটেন্ট টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে তুলে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল পরিষ্কার: এই আবিষ্কার মানবজাতির, কোনও ব্যক্তিবিশেষের নয়। ওষুধ প্রস্তুতকারকদের অনুমতি দেওয়া হল কেবল উৎপাদনের জন্য, মালিকানার জন্য নয়। এর ফলেই অল্প সময়ের মধ্যে ইনসুলিন সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়।
১৯৪১ সালে এক গবেষণা মিশনে যাওয়ার পথে তাঁর বিমান নিউফাউন্ডল্যান্ডে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর জীবন শেষ হয়। কিন্তু তাঁর কাজের গল্প সেখানে শেষ হয়নি। পরবর্তী আট দশকে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। ইনসুলিন আরও নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হয়ে ওঠে। আজ গবেষকেরা ‘স্মার্ট ইনসুলিন’ তৈরি করছেন, যা শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রা বুঝে নিজে থেকেই কাজ করে। জিন থেরাপির মাধ্যমে শরীরকে আবার ইনসুলিন উৎপাদনে সক্ষম করার চেষ্টা চলছে।
নন-ইনভেসিভ প্যাচ ও সেন্সরের সাহায্যে এখন সূচ ছাড়াই রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম গ্লুকোজ় সেন্সর ও ইনসুলিন পাম্পকে একত্রে যুক্ত করে প্রায় স্বয়ংক্রিয় ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করছে। এমন ওষুধও তৈরি হয়েছে, যা শরীরের স্বাভাবিক হরমোন প্রক্রিয়া অনুকরণ করে কাজ করে— ফলে চিকিৎসা আরও সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠছে।
এই দীর্ঘ অগ্রগতির ভিত্তিপ্রস্তর ছিল সেই এক নিদ্রাহীন রাত এবং এক চিকিৎসকের একগুঁয়ে বিশ্বাস।
ফ্রেডরিক ব্যান্টিং হয়তো একা নন, যাঁর কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ভাবেই সেই মানুষ, যাঁর আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক, প্রায় স্বয়ংক্রিয় ডায়াবেটিস চিকিৎসা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন পথ তৈরি হয়েছে। আর বিজ্ঞানের ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত সেটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য— মানুষের জীবনকে সুস্থ, দীর্ঘ এবং সহজ করে তোলা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)