একটা গলি। শহরে যেগুলোকে লেন বলে, তেমন নয়। উপায়ও নেই তেমনটা হওয়ার। গায়ে-গায়ে বাড়ি কোথায় এখানে! আসলে একটা শাখা-রাস্তা। সোজা রাস্তা থেকে হঠাৎ বাঁক নিয়েছে অন্য গন্তব্যে। যেমন করে নদীর শরীর থেকে একটা ধারা এক দিন চলতে শুরু করে ভিন্ গতিপথে।
এক সময়ে মেঠো পথ ছিল। চাষবাস করতে যাওয়া লোকজনের পায়ে পায়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল রাস্তা। গ্রাম খানিকটা জমজমাট হতে সেটাই স্থায়ী হয়েছে। শাখা-রাস্তাটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে, ঠিক সেখানেই দু’পাশে দুটো বাড়ি। রাস্তার পাশে পাশে ছড়ানো তার চৌহদ্দি। বাড়ির শেষের পর একটা পুকুর। পুকুরের পর থেকে একটা পোড়োবাড়ির পাঁচিল। পাঁচিলের উল্টো দিকে আর একটা পুকুর। রাস্তা আড়ে-বহরে বাড়তে পারেনি। শুরুর দুই বাড়ি, পুকুর, পাঁচিল মিলিয়ে দৃষ্টিপথ আটকে যায় বলে রাস্তাটা গলির চেহারা নিয়েছে।
গলির পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুজিত। পোড়ো বাড়িটার হাতার মধ্যে থাকা বৃদ্ধ আমগাছের একটা ডাল ঝুঁকে রয়েছে পাঁচিলের উপর থেকে। আমগাছের ডাল আর রাস্তার উল্টো দিকে ঝোপজঙ্গুলে জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। এমন জায়গায় দাঁড়ানোর সুবিধে রয়েছে একটা। দূর থেকে চট করে চেনা যাবে না আম্রশাখাতলে দণ্ডায়মানকে। এই পথে লোকের যাতায়াত কম। তবুও চেনা লোককে গলির মুখে দেখতে পেলে ঝটপট পালিয়ে যাওয়া যাবে। উত্তেজনা, ভয়। বইয়ের ব্যাগ কাঁধে টিউশন থেকে ফিরবে তার প্রিয়া। হবু প্রিয়া। গ্রহণ-বর্জনের সুতোয় ঝুলছে শব্দটা। সুজিতের পকেটে গ্রিটিংস কার্ড। দুটো রাজহাঁস ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে। গ্রহণ করিলে প্রিয়া। বর্জনে অধরা মাধুরী।
ঝুঁকিটা নিতেই হয়েছে সুজিতকে। কাল সন্ধ্যায় খবর এসেছে, নকুলও আজ গ্রিটিংস কার্ড দিতে পথে নামবে। তাই বেলাবেলি সুজিত ঝুঁকির পথে। বিধি তার অনুকূল। জানুয়ারির প্রথম দিনের শীতেও বেশ বসন্তের কোকিল-ডাকাডাকি শুরু হয়েছিল সুজিতের মনে। কার্ড যথাহস্তে গিয়েছে। আবার কেউ দেখেও ফেলেনি।
দ্বিতীয় আত্মবিশ্বাসটি ভেঙেছিল দুপুরে। পাঁচিঠাকুমা বাড়িতে এসে মায়ের সামনেই জিজ্ঞাসা করে বসেছিল, “মেয়েটা আজ পড়তে যায়নি বুঝি? তুই খাতা দিলি?” ঠাকুমা পোড়োবাড়ির সামনে বর্মা শাক তুলছিল। ভাঙা পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে সুজিতের অভিসার পর্বের দর্শক হওয়া নেহাত ঘটনাচক্র।
নিস্তরঙ্গ গ্রামখানা। সময় এখানে জলায় এক ঠ্যাং তোলা বকের মৎস্যবাঞ্ছার মতো কাটে। বড়রা চাষ করে, বাসে করে লেদের কারখানায় কাজে যায়। অফিসবাবুরাও ছোটে। মেয়েরা স্কুলে, নয়তো গৃহস্থালিতে। ছোটরা শিয়ালকাঁটা গাছের হলুদ ফুলের পাপড়ি দিয়ে বাঁশি বাজায়। রাংচিতা গাছের পাতা, ডাঁটা দিয়ে খেলামদড়ির লুচি-মাংস রাঁধে। একে অপরের চুলে আকড়কাঁটার ফল লাগিয়ে দিয়ে আমোদ পায়। শিমুল ফল ফেটে তুলো উড়লে পিছন-পিছন ছোটে। নয়তো মাঠে বল পেটায়। থোড়-বড়ি-খাড়ার এই পৌনঃপুনিক জীবনে ভালবাসাবাসির খবরগুলো গরমকালের দখিনা বাতাসের মতো। প্রাণ তর করে দেয়। নতুন খবর না আসা পর্যন্ত পুনঃপ্রচারে খামতি থাকে না।
ভালবাসা কি শুধু মানুষী? ছায়াসুনিবিড় নীড়ে কত যে তার রূপ!
প্রাণের চারা
সেদিনের মতো ঝরে পড়েছে ‘নিশির শিশির’-এর শেষবিন্দুটি। পড়েছে কোনও ঘাসের আগায়। কিংবা শিউলিশাখে। গাঁয়ের মানুষ বলে, কাক-ডাকা ভোর। তখনও শীতের আমেজে আড়ষ্ট গোটা পাড়া। পুকুরপাড়ের রাস্তাটায় এমন সময়ে চোখ রাখলে একটা চলমান চেহারা নজরে পড়ে। নবদাদু। খালি পায়ে হেঁটে চলেছে মাঠের দিকে। চাদরটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। বীজতলা দেখতে চলেছে দাদু। তার বড়সড় জমির এক ধারে তৈরি হয়েছে কাদামাটির প্রসূতিগৃহ। ডাবায় ধানের বীজ ভেজানো, বীজতলায় ছড়ানো, পাখপাখালি যাতে বীজধান খেয়ে না ফেলে সে জন্য ছাই চাপা দেওয়া— সবই নিজে হাতে করেছে দাদু। ওই ভোরে। তার পরেও শান্তি নেই। রোজ ভোরে চলে আসে মাঠে। আলের ঘাসে পড়া শিশির দু’পায়ে মাখতে মাখতে ঘুরে ঘুরে দেখে বীজতলা। উঁকি কি মারল কচি-কচি মুখগুলো? শীতটা জবর পড়েছে বলে কি কলা ফুটতে দেরি হচ্ছে?
ছেলে বারণ করে। ঠাকুমা রাগ দেখায়। বয়স হয়েছে, ঠান্ডা লেগে যাবে। অন্য চাষিরাও কথা শোনায়। রোজ আসার তো দরকার নেই। এত সক্কালে এলেও কি আলাদা কিছু দেখতে পাবে নবদা! কোনও কথায় কান দেয় না নবদাদু। সে রোজ ভোরে এসে অপেক্ষা করে, আজ হয়তো কালো ছাইয়ের বাধা সরিয়ে সবুজের আভা দেখা যাবে। চারা একটু বড় হলে কচিগুলোর মাথায় শিশির।
নবদাদু জমিতে নেমে হাত বুলোয় ধানের চারাগুলোর উপর। মুক্তো ঝরে ঝরে পড়ে। সকালের শিশির ঘাঁটতে খুব ভাল লাগে।
সব খেলার সেরা
নবদাদুর কাছাকাছি সময়ে আর এক জন মাঠে যায়। সে দুর্লভ চন্দ্র। গ্রামের সকলের জেঠু। তার আবাদ চাষের মাঠে নয়, অন্য মাঠে। গ্রামের ছেলেদের ফুটবল শেখায় জেঠু। অন্য গ্রামের ছেলেরাও আসে। জেঠু ভোর-ভোর উঠে পড়ে। রাতে ভেজানো ছোলার জল ফেলে দেয়। তার পর একটা পাত্রে নেয় কিছুটা আখের গুড়। ট্র্যাকসুট, জার্সি গলিয়ে খেলার বুট পরে হাতে একটা বল নিয়ে মাঠের দিকে হাঁটা দেয় জেঠু। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা একই ছবি। ভোরবেলা বাঁধের রাস্তা ধরে একটা রোগাটে, ছোটখাটো গড়নের লোককে হেঁটে যেতে দেখা যায় মাঠের দিকে। ভোরের নির্জন বাঁধের ইট-পাতা রাস্তায় খেলার বুটের শব্দ ওঠে খটাখট করে।
সকালের ফুটবল অনুশীলন করানো শেষ হলে জেঠু অফিস যায়। ফিরে কোনও দিন বসে যায় সেলাই-ছেঁড়া ফুটবল মেরামত করতে। সেলাই করা, কোনও দিন গোলের জাল পরখ করা। নয়তো খেলার নানা বাংলা, ইংরেজি পত্রিকাগুলো পড়ে দেখা। কলকাতায় অফিস। রাজধানীর বড় বড় বাড়িগুলোর পাঁচিলের গায়ে গজিয়ে ওঠা বইয়ের দোকানগুলোয় ঢুঁ মেরে ফুটবল সংক্রান্ত বইপত্র খোঁজে। কখনও চলে যায় কলেজ স্ট্রিটেও। নতুন বই, পত্রিকার খোঁজে। ফুটবলে বিশ্বের কোথায় কী ধরনের প্রশিক্ষণ চলছে, নতুন কোনও নিয়ম এল নাকি, কেউ নতুন পদ্ধতিতে খেলাচ্ছেন? এ সবের খোঁজ করতে কেতাবই ভরসা। টিভিতে তখন খেলা কোথায়! বেতনের একটা অংশ চলে যায় খেলায়। দরিদ্র পরিবারের ছেলে হলে বুট কিনে দেয়।
জেঠু শুধু মাঠের পাঠ দেয় না। দেয় জীবনের পাঠ, শৃঙ্খলার শিক্ষা। কেউ বিড়ি খেলে রেগে যায়। খেলোয়াড়েরা কেন নেশা করবে? নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন থেকে পাড়ায় পাড়ায় পাঞ্চিং বলের প্রতিযোগিতা বেশ জনপ্রিয়। জেঠুর হাতে তৈরি খেলোয়াড়েরা কেউ কেউ সেই প্রতিযোগিতায় নামে। কেউ টাকা নিয়েও খেলে। বারণ করে জেঠু। বোঝায়, ক্ষণিকের লোভ খেলোয়াড়ের জীবনে সর্বনাশের কারণ। বলে, খেলোয়াড়কে জীবনে সংযমী হতে হয়।
এত কিছুর পরেও প্রতি বছর জেঠুর হাতে মোটামুটি তৈরি কেউ না কেউ অন্য ক্লাবে যোগ দেয়। কিছু দিন মুষড়ে পড়ে অকৃতদার জেঠু। বলে, “আমাদের তো গরিব ক্লাব। কিছু দিতে পারি না।” কেউ আড়ালে বলে, নিয়মের কড়াকড়ি কেউ কেউ মেনে নিতে পারে না।
সব ব্যথাই এক দিন অভ্যাসে পরিণত হয়। ভোর-ভোর উঠে বাঁধের রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই দেখা যায়, এক হাতে বল আর অন্য হাতে ভেজানো ছোলা, আখের গুড়ের ঝোলা নিয়ে হেঁটে চলেছে ছোটখাটো একটা মানুষ।
কোলে রেডিয়ো
এখন কোলের পিসি হয়েছে, মানে ল্যাপটপ আর কী! এক সময়ে ছিল কোলের রেডিয়ো। তখন গ্রামাঞ্চলে রেডিয়ো একটা ব্যাপার ছিল। সব বাড়িতে থাকত না। কারণ নিয়মিত ব্যবধানে ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে ফের নতুন কিনতে হত। বাঁধাধরা খরচের ধাক্কা। বেশির ভাগ লোকের চাষের, দিনমজুরির কাজ। পেরে উঠত না অনেকেই। কিন্তু যাদের বাড়িতে থাকত, তাদের বেশ একটা ভাবসাব দেখা যেত।
টিভির পাট তখন গ্রামে নেই। বিনোদন রেডিয়োতেই। তাই পাশের বাড়ি থেকে অনুরোধ আসত, “ওই বৌ, ‘মহিলামহল’ শুরু হলে একটু জোরে দিস।” ভরদুপুরে পাড়া কাঁপিয়ে ভয় দেখাত ‘শনিবারের বারবেলা’। রাতে ন’টা-সাড়ে ন’টার মধ্যে গ্রাম নিঝুম। কোনও রেডিয়োওলা বাড়ির ছেলেটা রাত দশটা পর্যন্ত চুপিচুপি জেগে থাকে। ‘ছায়াগীত’ শুনবে বলে।
একটা-দুটো বাড়িতে হত রেডিয়োর আশ্চর্য অধিষ্ঠান। সে বাড়িতে জীবনযাপনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল বকেয়া। খোলা জায়গায় প্রাতঃকৃত্য সারতে বাধ্য হত বাড়ির মেয়েরা। কিন্তু ঘরে রেডিয়ো বাজত। কখনও বাড়ির মালিকের অবিমৃশ্যকারিতায়, কখনও অপত্যস্নেহের কাছে হার মেনে। রেডিয়ো পেয়ে ছেলের তো হাতে চাঁদ পাওয়ার আনন্দ। সে কোলে করে রেডিয়ো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। গলে-আসা ব্যাটারি রোদে দিয়ে শুকোয়। তার পর এক দিন হাজির হয় দর্জি-বৌয়ের কাছে। মাপ নিতে হবে রেডিয়োর। তৈরি করে দিতে হবে তার জামাকাপড়।
এসেও গেল এক দিন রেডিয়োর জামা। সে জামায় নবগুলোর কাছে গোল করে কাটা। মাথায় টুপিও হল। মানে হাতলও ঢাকল চকরাবকরা ছিটে। ছেলে-মেয়ে কোলে নেওয়ার মতো বুকের কাছে রেডিয়ো ধরে পাড়ায় ঘোরা শুরু করল ছেলে। চাষের খবর, মাঠের খবর, বিবিধ ভারতী, সাঁওতালি অনুষ্ঠান, মহিলামহল— বিরামহীন শ্রুতিসফর। সে ছেলের নামই হয়ে গেল ‘কোলে রেডিয়ো’। যেন সেটাই রেডিয়ো কোম্পানির নাম। ছেলে মাঝে মাঝে রেডিয়োকে বসাত পাড়ার ক্লাবের চাতালে। কচিকাঁচারা ঘিরে ধরত রেডিয়ো। অতি উৎসাহী কারও কারও ইচ্ছে করত, রেডিয়োর নব একটু ঘুরিয়ে দেখার।
সে হাত বাড়ালেই সঙ্গে সঙ্গে অতি সতর্ক ছেলে চোখ পাকিয়ে ভারী গলায় বলে উঠত, “নাহ্, খারাপ হয়ে যাবে। খুব দামি।”
আশ্রমবাড়ি
লোকে বলে। আসলে গৃহস্থবাড়ি। বাড়ি ঘিরে প্রচুর গাছপালা। ফলের, ফুলের, শাকপাতার, ভেষজের। কোনও সীমানা পাঁচিল নেই বাড়ি ঘিরে। গাছেরাই প্রাকৃতিক পাঁচিল গড়ে দিয়েছে। এ সব বাড়ির গিন্নির হাতের কাজ। তার শখ। গাছ লাগাতে ভালবাসে সে। বাড়িটা বেশ খানিকটা ছড়ানো জায়গায়। খান ছয়েক লোকের পরিবার। গরু আছে গোয়ালে। অনেক কাজ সারা দিনের গৃহস্থালির। ভোর-ভোর উঠতে হয় বাড়ির গিন্নিকে। বাসি ঘর, উঠোন ঝাঁটপাট দেওয়া হয়ে যায় অন্যরা ওঠার আগেই। ছেলেমেয়েরা উঠলে চা করে দিয়ে গাছের পরিচর্যা শুরু হয়। নতুন চারা তৈরি করা, অল্প বড় হওয়াগুলোকে জল দেওয়া, গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করা। লতানো ফুলগাছগুলো বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়লে সেগুলোকে ভিতরের দিকে টেনে আনা। শুকনো ডাল ভাঙা। অনেক কাজ। তার পর রান্নাবান্না। ছেলেমেয়ে মাকে সাহায্য করতে চায়। গিন্নি রাজি হয় না। বলে, “তোমাদের পড়াশোনার কাজ। সেটাই করো। আমি এখনও গায়েগতরে খাটতে পারছি। যে দিন পারব না সাহায্য কোরো।”
ছায়াময় বাড়িটাকে অনেকে অন্য চোখে দেখে। প্রশংসা করে বাড়ির গিন্নির। কেউ আড়ালে বলে, “হবে না কেন? বাঙাল যে! গাছ লাগানো ওদের স্বভাব।” আড়ালে বলা লোকেরাই আবার অন্ধকার থাকতে উঠে আশ্রমবাড়ির ফুল চুরি করে। দেখতে পায় বাড়ির গিন্নি। পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে গাছপালার বেড়ার এ-পার থেকে শান্তস্বরে বলে ওঠে, “অপরাজিতার চারা করেছি দিদি। নেবে গো দুটো? বেলায় এক বার এসো না। টগর গাছের একটা ডালও ভেঙে দেব। নিয়ে গিয়ে বসাবে। এত অন্ধকারে উঠে ফুল তোলা ঠিক নয়। ও পাড়ার এক জন সাপের কামড়ে মারা গিয়েছে, শুনেছ?”
ফুল-তোলাদিদি কিছুই নিতে চায় না। শুনতেও চায় না। সে তড়বড়িয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। ফুলগাছ বসালেই হল! জল দিতে হবে না? পাহারা দিতে হবে না! বেলার দিকে আশ্রমবাড়ির গিন্নির মেয়ে পড়ে ফেরার সময়ে তাকে ধরে ফুল-তোলা দিদি। মুখঝামটা দিয়ে বলে, “তোর মায়ের খুব ট্যাকস ট্যাকস কথা। তোদের তো অত ফুল! দুটো নিলে কি শেষ হয়ে যাবে?”
পাড়াতুতো জেঠিমার কথা শুনে মুখ কালো করে বাড়ি ফেরে মেয়ে। কী হয়েছে, জানতে চায় মা। মেয়ে বললে হাসে। হাতের কাজ শেষ হলে গিয়ে দাঁড়ায় বকফুল গাছটার কাছে।
এ গাছ ছিল তার বাপের বাড়িতে। ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ছেড়ে আসা বাপের ভিটেতেও। শিকড়-ছেঁড়া বাবা এ দেশে এসেছিল কিশোরকালে। একটু বড় হতে গাছটা লাগিয়েছিল নতুন বসতেও। ফেলে আসা নিজভূমের স্মৃতিতে। দিন গুজরানের লড়াইয়ের কালে বকফুল গাছটা কত যে উপকার করেছে! ফুল, বরবটির মতো লম্বা ফল আনাজের কাজ দিয়েছে। প্রচুর ফুল হত। হাটে বিক্রিও করত বাবা। মেয়েকে সে-সব কথা বলতে বলতে স্বগতোক্তির মতো বলত, “গাছ খুব বন্ধুলোক।”
আর একটা গাছ লাগিয়েছিল বাবা। সবেদা। শ্বশুরবাড়ি ঘটি এলাকায়। অনেক খুঁজেও পায়নি গাছ দুটো। শেষে বাবাকে বলা। মেয়ের জন্য চারা করে রেখেছিল বাবা। এক জামাইষষ্ঠীতে জামাই শ্বশুরবাড়িতে ফিরেছিল বকফুল আর সবেদা চারা হাতে করে। মনখারাপ হলে বকফুল গাছটার নীচে এসে দাঁড়ায় আশ্রমবাড়ির গিন্নি। এমনিই। আনমনে গাছের গায়ের শুকনো ছাল তুলে দেয়। হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপ করে। গাছ বন্ধুলোক। শুধু দেওয়ার মন। প্রত্যাশা নেই কিছুই।
ঘুড়ির টানে
“শিবুকাকা, ঘুড়ি কি এসেছে?”
স্কুল ফেরত কচিমুখটা ঢুঁ মেরে যায় পাড়ার মুদি দোকানে। বাবার থেকে চার আনা জোগাড় হয়েছে। একটা ঘুড়ি কিনবে। বাবা বলেছে পাব্বনের সময়ে এক টাকা দেবে। চারটে ঘুড়ি কিনতে পারে তা দিয়ে। দেড় তেল ঘুড়িও পাওয়া যায়। কিন্তু হাওয়া ধরলে বড় টান তার। লাটাইয়ের গোড়া থেকে সুতো উপড়ে নিয়ে চলে যায় অনেক সময়ে। সে চারটে ঘুড়িই কিনবে। শিবুকাকা বলে, “শনিবার এসে যাবে।”
শীত পড়লেই চেনা ছবি ছিল। বাজারটা উঠত পৌষপার্বণের সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে। দোকানে দোকানে ঝুলতে শুরু করত নানা রকম ঘুড়ি। চাবড়া, চাঁদিয়াল, লালিয়াল। একটা ঘুড়ির নাম ছিল পাছা। কেন এমন নাম কে জানে! চিত্রতারকার ছবি দেওয়া ঘুড়িও পাওয়া যেত। কোনওটায় জিতেন্দ্র-শ্রীদেবী। কোনওটায় ব্রেক ডান্সের ভঙ্গিতে মিঠুন। এ সব ঘুড়ি কিনত একটু বড়রা। বাচ্চাদের পছন্দ চাঁদিয়াল, লালিয়াল, চাবড়া। ঘুড়ি এসে গেলেই সুতো বাছাই, লাটাই কেনার চাপ। বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যান। তার পর মাঞ্জা দেওয়ার জোগাড়যন্ত্র। হ্যারিকেনের ভাঙা কাচ জোগাড় করে রাখতে হত। বাড়ি থেকে পেলে তো ভালই। না হলে পাড়ার কাকিমা-জেঠিমার কাছে চাওয়া। জোগাড় করতে হত হামানদিস্তাও। ওতেই গুঁড়োনো হবে হ্যারিকেনের কাচ। ধান কেটে নেওয়ার পরে ফাঁকা মাঠে বা কোনও খামারে হবে তিনটে ইটের উনুন। নাড়া কেটে আগেই শুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাবুদানা জ্বাল দিয়ে তাতে গুঁড়োনো কাচ মিশিয়ে তৈরি মাঞ্জা। দুটো কাঠি পুঁতে এক প্রান্তে গিঁট মেরে সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া শুরু। হাতের কায়দায় মাঞ্জা লাগাতে লাগাতে কাঠি দুটো ঘিরে পাক দিতে দিতে চলা। শুকিয়ে গেলেই সুতো তৈরি। কেউ কেউ এত ঝক্কি করত না। তাদের ঘুড়ি ওড়ানোর থেকে লোটায় বেশি ঝোঁক ছিল। হাতে বাঁশের লগি, গাছের লম্বাটে ডাল। সে সবের আগায় কাঁটা বা কোনও ছোট গাছের ঝোপ বাঁধা। যাতে কেটে যাওয়া ঘুড়ির সুতো সহজেই জড়িয়ে নেওয়া যায়। এ বার শুধু ‘দুয়ো হই কেটটে গেল’ আওয়াজ শোনার অপেক্ষা। এক ঝাঁক লগালগির নাড়া মাঠ, কাদা পেরিয়ে ছুট… ছুট আর ছুট।
ওড়ানোর থেকে লোটা প্রিয় ছিল হাবুর। কোনও ঘুড়ি কেটে গেলে সে আর স্থির থাকতে পারত না। কেটে যাওয়া ঘুড়ি বহু উপর দিয়ে ধাইছে। সকলে হাল ছেড়ে দিয়েছে। হাবু কিন্তু ছুটছে পিছনে। ঘুড়ির পিছনে ছুটতে ছুটতে নাড়ার ধারালো খোঁচা খেয়ে পা কাটত। গোড়ালি হত মাঠের মতোই ফুটিফাটা। ঠিক সময়ে চান-খাওয়াও হত না। শীতে চান করতে ইচ্ছেও করত না। হাবু মাঝে মাঝে মারও খেত লোটার দলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে। কেটে যাওয়া ঘুড়ি নাগালে নেমে এলে একটা কৌশলী আওয়াজ ছিল, “হয়ে গেছে, হয়ে গেছে।” মানে সুতো তার লগার মাথায় জড়িয়েছে। কাটা ঘুড়ির অধিকারী সে। হয়ে গেছে, হয়ে গেছে— হাঁকটা কখনও হত মিথ্যে। হাঁক শুনলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা রণে ভঙ্গ দিত। এই রকমই এক মিথ্যে হাঁক মেরে বিপদে পড়েছিল হাবু। প্রতিদ্বন্দ্বীরা হাঁক শুনে থেমেছিল। তার পর সত্যটা আবিষ্কার করেই শুরু পেটানি।
এক বার সন্ধের মুখে একটা ঘুড়ি পড়ল পুকুরে। লোটার দল পাড় পর্যন্ত ধাওয়া করে এসেছিল। লগার নাগালের বাইরে পড়ায় থেমে যায় তারা। হাবু থামেনি। হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়েছিল জলে। শীতের পোশাক পরেই। তার পর পাড়ে দাঁড়িয়ে ঠকঠকিয়ে কাঁপা। জলে পড়া ঘুড়িকে আবার উড়নসই করতে বহু কসরত করতে হবে।
কিন্তু লোটাতে যে জয়ের একটা আনন্দ রয়েছে!
ভোলার ময়না
ভোলা যখন হাঁটে, লোকে তাকিয়ে থাকে। গ্রামের সেরা সুন্দর সে নয়। সেরা খেলোয়াড়ও নয়। ভোলা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তার দিকে লোকে তাকায় ময়নার জন্য। ভোলার পোষা বৈশাখী শালিক পাখি। কালবৈশাখীর ঝড়ে বাসা থেকে পড়ে গিয়েছিল। ভোলা কুড়িয়ে এনে ছাতু খাইয়ে খাইয়ে বড় করেছে। এখন সে ভোলার সঙ্গে সর্বত্রগামী। কখনও কাঁধে চড়ে। কখনও মাথায়। মাথার উপর উড়তে উড়তেও।
মাঝে মাঝে দেখা যায়, রাস্তার ধারের ঝোপঝাড়গুলোয় একটা বাচ্চা ছেলে কিছু খুঁজছে। পাড়ার লোকে দূর থেকে বলে দেয়, ওটা ভোলা। কাছে গেলে দেখা যাবে, হাতে একটা ঝাঁটাকাঠি। তাতে গঙ্গাফড়িং, উচ্চিংড়ে গাঁথা। ময়না এখন বড় হয়েছে। তাই আর ছাতু খাওয়ায় না। পোকামাকড় ধরে ভোলা। ময়না নিজে কিছু শিকার ধরে না। খালি দাওয়ায় মুড়ি বা খাঁচার বাটিতে ভাত দিলে খুঁটে খেতে পারে। পড়াশোনায় খুব একটা ভাল নয় ভোলা। তবুও রোজ ইস্কুল যায় সে। ওর ময়নার জন্যই বন্ধুদের কাছে একটু-আধটু অন্য দৃষ্টি লাভ হয়। ইস্কুলেও চলে এসেছিল দু’-এক বার। ইস্কুল আসার সময়ে ময়নাকে খাঁচাবন্দি করে দেয় ভোলা।
এক দিন দেখা গেল, ইস্কুলের দ্বিতীয় পিরিয়ডে হড়হড় করে বমি করছে ভোলা। শিক্ষক মহাশয়ই ভার নিলেন সেবার। তিনি বড়ই স্নেহপ্রবণ। ছোটদের ভালবাসেন। জল দিলেন মাথায়, চোখে-মুখে। তার পর একটা বেঞ্চ খালি করে শুইয়ে দিলেন ছাত্রটিকে। অন্য ছাত্রকে দিয়ে বালতি আর ঝাঁটা আনিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন শ্রেণিকক্ষ। হাত ধুতে যাওয়ার সময়ে মিলল গোপন তথ্য। ভোলা নাকি খৈনি খেয়েছে। সেই ছাত্রটিকে কিছু বললেন না তিনি। ফিরে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভোলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাঁ রে, খৈনি খেয়েছিস কেন? ও ভাল জিনিস নয় তো!”
ভোলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, কাল সন্ধেয় ময়নাকে বিড়ালে ধরে নিয়ে চলে গিয়েছে। সারা রাত কেঁদেছে সে। আজ ইস্কুলে আসতে চাইছিল না। মা জোর করে পাঠিয়েছে। আসতে আসতেও কাঁদছিল। তখন নাকি উঁচু ক্লাসের একটা ছেলে ওকে বুঝিয়েছে, খৈনি খেলে কান্না কমে যায়।
শুনে চুপ করে যান শিক্ষক মহাশয়। প্রিয়বিরহের কষ্টে অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। লোককে দেখাতে ইচ্ছে করে তার কষ্ট। তিনি তখন কলেজে। সাবালক। তাঁরও সে ইচ্ছে করেছিল। ভোলা তো নেহাতই নাবালক। শিক্ষক মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ভোলাকে বলেন, “আর কখনও খাবি না। শরীর খারাপ হয়।”
আবার পড়ানো শুরু করতে করতে শিক্ষক মহাশয় ঠিক করে নেন, ভোলার চুনিলালের খোঁজ করতে হবে।
বকুল-বাঁশি
বকুলগাছ কাব্যিক। কবিবরের পছন্দের। সে খবর রাখে না গাঁয়ের লোক। বকুলগাছ কেউ যত্ন করে নিজের জায়গায় লাগিয়েছে, এমনটা দেখা যায় না গ্রামে। সে আপনা থেকেই হয়। কোনও পাখি-বাহিত হয়ে। অযত্নে বেড়ে উঠে আবার পাখিদের কাজে লাগে। হনুমানেও খায় বকুলফল। গাঁয়ে বকুলগাছ একটাই। সেটা বাঁশগাছ, ঝোপজঙ্গলে ঘেরা একটা জায়গায়। গাছের পাশ দিয়ে একটা নালা বয়ে গিয়েছে। বর্ষাকালে জল ছোটে। অন্য সময়ে শুকনো। পুষ্পবতীর ঝরা ফুলে ভরে যায় নালা। পাশ দিয়ে গেলে মিষ্টি গন্ধ নাকে আসে। অলির গুঞ্জন শোনা যায়। সে শব্দ-গন্ধের সমঝদার দু’-এক জনই।
তবে কিছু বাচ্চার কাছে বকুলের গুরুত্ব রয়েছে। গুরুত্বটা ফলের। নিয়মিত তারা বকুলতলায় যায় ফলের টানে। পাকা ফল কুড়োয়। কেউ কেউ চেখে দেখে। বেশির ভাগই শাঁস ছাড়িয়ে দানা বার করে। দানা শুকিয়ে হয় খেলা। গুলি খেলার মতো সুবিধে হয় না মাটিতে। শান বাঁধানো জায়গা হলে বেশি ভাল। তাই সদরের সিঁড়ি বা বাঁধানো পুকুরঘাটে বসে যায় বকুল খেলার আসর। নিয়ম, গুলি খেলার মতোই। ইটের টুকরো বা লেখাপড়ার চক পেনসিল দিয়ে একটা ঘর কেটে নেওয়া। চতুর্ভুজের মতো। তবে পিছনের দিকের ভুজটা টানতে হয় না। সেটা ওই সিঁড়ি বা ঘাটের দেওয়াল। এর বাইরে মার পড়লেই বারটিপ। একটা বড়সড় বকুলদানা দিয়ে মারতে হবে ঘরের ভিতরে থাকা দানের বকুলকে।
বকুল খেলার ছেলেপুলে কিন্তু কম। বড্ড ঝামেলা। গুলি কিনলেই কাজ শেষ। বকুলদানা খেলার উপযোগী করতে অনেক ঝামেলা। কুড়োও রে, ছাড়াও রে, শুকোও রে। তবুও বকুল খেলাই প্রিয় বাপনের। সে গুলি খেলায় তেমন সুবিধে করতে পারে না। কিন্তু বকুলে অসাধারণ অভিজ্ঞ। হাফপ্যান্টের দু’পকেট ভর্তি বকুল জিতে ফেরে। প্রায় দিনই। জয়ী হলে বকুলদানার বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঘরে ফেরে। দানার একটা দিক ঘষে ক্ষয় করে নিতে হয়। ভিতর থেকে বীজটা বার করে নিলেই সুন্দর বাঁশি। হেরে গেলে নিয়মিত প্ররোচনা দেয় জেতা বন্ধুকে। “খেলতে আয়, খেলবি না? ওবেলা পুকুরঘাটে চলে আসবি কিন্তু!” বাপনের ঘরে বোতলে বোতলে বকুলদানা। মা মাঝে মাঝে রেগে যায়, “পড়াশোনা নেই রে তোর!” এক বার ফেলেও দিয়েছিল এক বোতল।
সারা বেলা বকুলতলায় ছিল বাপন। যত ক্ষণ না খালি বোতল ভরেছে বকুলদানায়। তার পর খুশি মনে বকুল-বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঘরে ফিরেছে।
সিনেমা সাঁটানো
সিনেমা-পাগল ছিল সমীর। এলাকার তিনটে হলের পোস্টার মারত তিন জায়গায়। প্রতি শুক্রবার। জায়গাগুলো বেশ দূরে দূরে। সমীর শুক্রবার সকালে হেঁটে হেঁটে হাটতলার বন্ধ দোকানের ঝাঁপে, বাপ্পাদের বাড়ির গায়ে আর বুনিদের গোয়ালের দেওয়াল দেখে আসত। বাড়ির মেয়েরা কেউ সিনেমা দেখতে ইচ্ছুক হলে পাকড়াও করত সমীরকেই। “কোন হলে বাংলা বই দিয়েছে রে?” সমীর কখনও বলত, “সগৌরবে দ্বিতীয় সপ্তাহ।” কখনও, “সব হিন্দি গো বৌদি।”
তার পর এক দিন গ্রামে গ্রামে ঢুকল কারেন্ট। দেশে মুক্ত অর্থনীতি। একে একে কেব্ল টিভি। আরও পরে হাতে হাতে মোবাইল। কোলে রেডিয়োর মতো তাদের বাবাও অনেক জরুরি কিছু বাদ দিয়ে কিনে দিয়েছে বাৎসল্যের কাছে হার মেনে। শিয়ালকাঁটার ফুলের পাপড়িতে বাঁশি বাজানো ছেলের দল হারিয়ে গেল। কমে গেল জেঠুর মাঠে ছেলেপুলেও। ঘুড়ি এখন এতই সহজলভ্য, লোটার ঝামেলায় যায় না কেউ। মাঞ্জার ঝক্কিও নেই। রেডিমেড চিনা মাঞ্জা। বন্ধ হয়ে গেল সিনেমাহলগুলোও।
শুধু রয়ে গেল জলার ধারের প্রাচীন বটগাছটা। কত পরিবর্তনই তো সে দেখল। প্রিয়াকে গ্রিটিংস কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সুজিতের মতো ভীরু প্রেমিক। সরস্বতী পুজোর দিনে হলুদ শাড়ির পিছু নেওয়া শান্তিনিকেতনি পাঞ্জাবি। এখন আর ‘চন্দনের বনে দেখা’ করার জন্য ‘ভ্রুপল্লবের ডাকের’ অপেক্ষা কেউ করে না। পাশাপাশি হাঁটে, সাইকেল চালায়। সর্ষেখেতের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত প্রসারিত করে ডিডিএলজে-র শাহরুখ হয়। মোবাইলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়েই কৈফিয়ত চায়, ‘কী কথা তাহার সাথে?’ বা ‘যুবকের সাথে তুমি যেও নাকো আর’।
বদল দেখতে দেখতে গাঁয়ের দুই গায়ককে কি মনে পড়ে প্রাচীন বটের? এক জন কিশোরকণ্ঠী। অন্য জন মহম্মদ রফি। গরমের দুপুরে গাছের মোটা ডালে শুয়ে শুয়ে তারা পর পর গেয়ে যেত দুই কিংবদন্তি গায়কের গান। কাজ করতে করতে শুনত মাঠের চাষিরা। কেউ কেউ গাছের ছায়ায় জিরেন নিতে এসে পছন্দের গানের অনুরোধের আসর বসাত।
এক দিন হঠাৎ রফিকণ্ঠী মারা গেল। সে দিন ছিল ফাল্গুন মাস। কিশোরকণ্ঠী সেই গাছের শাখায় শুয়ে রফি ধরল পর পর। ‘ক্যায়া হুয়া তেরা ওয়াদা’… ‘তেরি গলিয়োঁ মে না রাখেঙ্গে কদম আজ কে বাদ’... বসন্তের দিনে বিষাদের সুর রেণু রেণু হয়ে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ছিল সে দিন। থমকে থমকে যাচ্ছিল চাষিদের হাত।
এক সময়ে সবাই জড়ো হল গাছের তলায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)