সুকুমারবাবু সাহিত্যিক। সুকুমার মজুমদার। তাঁকে সুসাহিত্যিকই বলা চলে।কারণ প্রতি বছর তাঁর নতুন বই প্রকাশিত হয়। তাঁর নিজস্ব একটা পাঠকগোষ্ঠী আছে। তারা তাঁর বই কেনে। ফলে বছর বছর বেশ ভাল রকম রয়্যালটি পান। এ দিক থেকে কোনও ক্ষোভ নেই তাঁর। কিন্তু একটা জায়গায় সাহিত্যদেবী বড় কৃপণতা করেছেন তাঁর প্রতি। প্রায় তিরিশ বছর সাহিত্যসেবার পরও কোনও পুরস্কার পাননি। অথচ কাল-কা-যোগী কত ভুঁইফোঁড় লেখক মোটে পাঁচ-সাত বছর লিখেই একাধিক পুরস্কার কব্জা করে নিয়েছেন। এই তো বিরূপাক্ষ সমাজপতি, খুব বেশি হলে পাঁচ বছর লিখছেন, তিনিও তিনটে পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছেন এর মধ্যেই। পুরস্কার পেলে বইয়ের ব্লার্বে ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনীর সঙ্গে সেগুলোর উল্লেখ থাকে। তাতে ব্লার্বের চেকনাই যেন আরও বেড়ে যায়। মনে হয়, হ্যাঁ জাত লেখক বটে।
সেদিন বিরূপাক্ষর একটা বই উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। অতি সাধারণ লেখা। ভাষার বাঁধুনি নেই। কিন্তু ব্লার্বে তিন-তিনটে পুরস্কারের উল্লেখ। কামিনীদেবী স্মৃতি পুরস্কার, মোহিনীমোহন স্মারক সম্মান আর কানাইচরণ নন্দী পুরস্কার। এই সব কামিনী-মোহিনী-কানাই-বলাই কে, সেটা তাঁর জানা নেই। কিন্তু এঁদের নামে পুরস্কার তো দেওয়া হয়!
তার পর তরুণ কবি অশোক দাস, যিনি ‘আকাশ’ ছদ্মনামে লেখেন, যাঁর লেখার মাথামুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না, তিনি বই লিখেছেন তিনটে, কিন্তু পুরস্কার পেয়েছেন সাতটা। এ যেন বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত ইয়ে! বেশ কয়েক বার তাঁর কবিতা পড়ার চেষ্টা করছেন সুকুমারবাবু, কিছুতেই কায়দা করতে পারেননি। মনে হয়েছে, পাগলা ষাঁড়ের তাড়া খেতে খেতে কেউ যদি কিছু লেখে, একমাত্র তখনই এমন অলপ্পেয়ে শব্দগুচ্ছ কলম দিয়ে নির্গত হতে পারে।
প্রকাশকের কাছে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, এঁদের কারও বই খুব একটা বিক্রি হয় না। তবু পুরস্কারের পর পুরস্কার পেয়ে যান।
মাঝে মাঝে সাহিত্যসভায় ডাক পড়ে সুকুমারবাবুর। সেখানে আরও কবি-সাহিত্যিক উপস্থিত থাকেন। সবারই নাম ঘোষণার সময় তাঁদের প্রাপ্ত পুরস্কারগুলির উল্লেখ করা হয়। যেমন, “এ বার আপনাদের সামনে বক্তৃতা দেবেন অমুক অমুকঅমুক পুরস্কার জয়ী সাহিত্যিক শ্রীঅচঞ্চল মুখোপাধ্যায়।”
সুকুমারবাবু লক্ষ করেছেন, পুরস্কারের নামগুলো ঘোষণার সময় লেখকের মুখে যেন অন্য রকম জ্যোতি ফুটে ওঠে। আর সুকুমারবাবুর নামের উল্লেখের সময় কেবল বলা হয় ‘বিশিষ্ট সাহিত্যিক’। তখন নিজেকে কেমন ‘হংসমধ্যে বক’ বলে মনে হয়।
এর মধ্যে হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল। আকাশের ঘন কালো মেঘ চিরে যেন এক চিলতে রোদ্দুর। সোমক দুয়ারী বলে একটি ছেলে সুকুমারবাবুর কাছে মাঝে মাঝেই আসে। বয়স তিরিশের এ দিক-ও দিক। পাশের পাড়াতেই বাড়ি। এসে সুকুমারবাবুর সঙ্গে সাহিত্য আলোচনা করে। খুব প্রশংসা করে সুকুমারবাবুর লেখার। সুকুমারবাবুর একনিষ্ঠ ভক্ত যাকে বলে। এক দিন তার সঙ্গে কথায় কথায় সুকুমারবাবু মনোবেদনা ব্যক্ত করে ফেললেন তার কাছে।
সোমক বলে, “আমিও এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছি। আমার মনে হয়েছে, আপনার কিছু বই অবশ্যই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এ ব্যাপারে আপনার প্রতি এক প্রকার অবিচার করা হচ্ছে।”
সুকুমারবাবু বললেন, “কিন্তু কী আর বলি বলো! আমার দুর্ভাগ্য।”
কিছু ক্ষণ পর সোমক বলল, “একটা উপায় আছে, একেবারে শিয়োর শট।”
সুকুমারবাবু বললেন, “তুমি কি টাকাপয়সা দিয়ে পুরস্কার পাওয়ার কথা বলছ? শুনেছি বইবাজারে এমন সব চক্র কাজ করে। আমি কিন্তু ও সবে নেই।”
সোমক বলল, “না না, ও সব ব্যাপার নয়।”
“তা হলে তুমি যে বললে একেবারে নিশ্চিত উপায় আছে?”
মাথাটা একটু চুলকে নিয়ে সোমক বলল, “মানে বলছিলাম কী, আমার ঠাকুরদাদা, শ্রীপঞ্চানন দুয়ারী, এখন বিরানব্বই রানিং।”
সুকুমারবাবু ব্যাপারটা ধরতে পারলেন না, বললেন, “তাতে কী!”
“দাদুও কিন্তু সাহিত্য খুব পছন্দ করে। আপনার সব বই দাদুর পড়া। দাদুও আপনার বিরাট ভক্ত।”
সুকুমারবাবু মুখে বললেন, “বাহ্, বেশ। জেনে খুব ভাল লাগল। ওঁকে আমার প্রণাম জানিয়ো।” সেই সঙ্গে মনে মনে ভাবতে লাগলেন, সোমক দাদুর সাতকাহন শোনাচ্ছে কেন, দাদুর সঙ্গে পুরস্কারের কী সম্পর্ক!
সোমক বোধহয় বুঝতে পারল সুকুমারবাবুর মনের কথা। সে একটু খোলসা করল, বলল, “দাদু তো ধরুন, আজ আছেন কাল নেই।”
সুকুমারবাবু বললেন, “কেন, ওঁর শরীর কি খুব খারাপ? একেবারে শয্যাশায়ী? খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করতে পারছেন তো!”
সোমক বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, খাওয়াদাওয়া করছেন। লাঠি ধরে একটু আধটু হাঁটাচলাও করতে পারেন। কিন্তু গ্রাউন্ড রিয়েলিটিকে তো মানতে হবে, সে যত নিষ্ঠুরই হোক না কেন! দাদুর শরীর দ্রুত ভাঙছে। এক দিন তো সবাইকেই চলে যেতে হয়।”
সুকুমারবাবু বললেন, “সে তো বটেই। তুমি আমি সবাই এক দিন চলে যাব। আমাদের নশ্বর দেহ বিলীন হয়ে যাবে পঞ্চভূতে। এর থেকে কারও নিস্তার নেই। এই বার্তাটাই আমি আমার ‘এই আছি এই নেই’ উপন্যাসে দিতে চেয়েছি।”
সোমক বলে ওঠে, “এই তো, ঠিক এই কথাটাই বলতে চাইছিলাম আমি। সবাই এক দিন বিলীন হয়ে যাব আমরা। তার মধ্যে দাদু হয়তো একটু তাড়াতাড়িই বিলীন হবেন। কারণ নাইন্টি টু রানিং।”
“হ্যাঁ, সে তো হতেই পারে,” বললেন সুকুমারবাবু।
সোমক একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, “রাইট! আমি ঠিক এই পয়েন্টটাই বলতে চাইছি। দাদুর বিলীন হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। একটা মানুষ কত আর টানবে বলুন। আর তার পরেই…”
সুকুমারবাবু একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, “তার পরেই কী!”
“আপনার পুরস্কার না পাওয়ার দুঃখ মিটে যাবে।”
সুকুমারবাবু বললেন, “ঠিক বুঝতে পারছি না বাপু তোমার কথা!”
সোমক বলল, “খুব সিম্পল! দাদুর নামে একটা পুরস্কার ঘোষণা করে দেব, আর তার প্রথম প্রাপক হবেন আপনি। অবশ্য প্রথম দ্বিতীয় বলে কিছু নেই, আপনাকে দেওয়ার পরই তুলে দেব পুরস্কারটা।”
সুকুমারবাবু বললেন, “যাহ্, কী যা তা বলছ!”
সোমক বলল, “কেন নয়, স্যর! দাদু বিলীন হয়ে যাওয়ার পর, তাঁর নামে একটা পুরস্কার তো চালু করতেই পারি। বিশেষ করে দাদু যখন সাহিত্যরসিক। অন্য দিক থেকে তিনি আবার আপনার লেখার বিশেষ ভক্ত। তা হলেই তো দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে গেল। এতে কারও কোনও আপত্তি করার কিছু নেই। আপনি এ সব নিয়ে একদম ভাববেন না।”
কিন্তু ‘ভাববেন না’ বললেই তো আর হয় না। সুকুমারবাবু ভাবতে বসলেন। এ তো এক জনের মৃত্যুর প্রহর গোনা। এ কি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা নয়! নীচতাও বটে। ব্যাপারটায় যেন মন সায় দিচ্ছে না।
সোমক যেন সুকুমারবাবুর মনের কথা পড়ে নিল। বলল, “আচ্ছা স্যর, ব্যাপারটা একটু অন্য দিক দিয়ে ভাবার চেষ্টা করুন। আজ কথায় কথায় কথাটা বলে ফেললাম তাই। কিন্তু যদি না বলতাম, তা হলে তো কোনও সমস্যাই ছিল না। আপনি তো পুরস্কারটা নিতেন!”
এই যুক্তিটা মনে ধরল সুকুমারবাবুর। মনে হল, সত্যিই তো এই দিকটা ভাবা হয়নি তাঁর।
মুখে বললেন, “সে যখন হবে, তখন দেখা যাবে। এই পৃথিবীতে কার কত দিন সেটাই বা কে বলতে পারে। তোমার দাদুর আগে আমিই হয়তো চলে গেলাম।”
সোমক বলল, “বালাই ষাট, বালাই ষাট! সে কখনও হয়! আপনাকে আরও অনেক লিখতে হবে এখনও। পাঠক হিসেবে আপনার কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা।”
*****
এর পর সোমক মাঝে মাঝেই আসে সুকুমারবাবুর কাছে। সাহিত্য বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়। কোন সাহিত্যিকের লেখা থেকে যাবে, কোন সাহিত্যিকের লেখা ঠোঙা হয়ে যাবে, নতুন কোন কোন সাহিত্যিক উঠে আসছেন, তাঁদের মধ্যে কার কার টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি— এ সব আলোচনা যেমন হয়, তেমনই সাহিত্যক্ষেত্রে লবিবাজি, স্বজনপোষণ, আত্মপ্রচার এ সবও উঠে আসে মাঝে মাঝে। এক দিন এমন সব আলোচনাই হচ্ছিল, হঠাৎ সুকুমারবাবু জিজ্ঞেস করে বসলেন, “তোমার দাদু এখন কেমন আছেন?”
প্রশ্নটা করে নিজেই কেমন সঙ্কুচিত হয়ে পড়লেন, ছি ছি, এমন প্রশ্ন করাটা কি উচিত হল তাঁর! সোমক কিছু মনে করতে পারে।
কিন্তু সোমক কিছু মনে করেছে বলে মনে হল হল না। সে খুব স্বাভাবিক গলাতেই বলে উঠল, “আর বলবেন না, দাদুকে নিয়ে ক’দিন যা কাণ্ড গেল!”
সুকুমারবাবু বলে উঠলেন, “সে কী! কেন, কী হয়েছিল?”
“আর বলবেন না,” সোমক বলল, “ঠান্ডা লেগে, সর্দি হয়ে সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার। বুকে সর্দি বসে গিয়েছিল। তার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট।”
সুকুমারবাবু বললেন, “তার পর? তার পর?”
“তার পর আর কী! ডাক্তার ডাকা হল। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘মনে হচ্ছে নিউমোনিয়া। এই বয়সে নিউমোনিয়া খুব খারাপ। আমি ওষুধ দিলাম। দেখা যাক, কতটা কী হয়!’ তো, দাদু ক’দিন খুব নেতিয়ে ছিলেন। আমরাও খুব দোলাচলে ছিলাম। যাই হোক, বিপদ কাটিয়ে দাদু এখন চাঙ্গা।”
এত ক্ষণ চেপে রাখা শ্বাসটা ছেড়ে ফেললেন সুকুমারবাবু। বললেন, “যাক বাবা, মঙ্গলময় ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। খুব সাবধানে রেখোকিন্তু দাদুকে।”
‘মঙ্গলময় ঈশ্বর’— কথাটা নিজেরই কানে লাগল সুকুমারবাবুর। কারণ তিনি নাস্তিক। এবং বিভিন্ন সময়ে জোরগলায় বলেও থাকেন কথাটা।
এর পর এক দিন সোমক জানাল, দাদু মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন বাথরুমে। কপালে চোট পেয়েছেন। ফুলে গেছে। নার্সিংহোমে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, বাহাত্তর ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
উফ্! সেই বাহাত্তর ঘণ্টা যে কী ভাবে কেটেছে, সেটা ভাবলে আজও গা ছমছম করে ওঠে সুকুমারবাবুর। এক বার মনে হচ্ছে, আর ফিরবেন না সোমকের দাদু। এ যাত্রাই শেষ যাত্রা। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ঝুলিতে ঢুকবে প্রথম সাহিত্য পুরস্কার। কে যেন এক বার বলেছিল, প্রথম পুরস্কারের গাঁটটা খুলে গেলে পর পর পুরস্কার ঢুকতেই থাকে ইলিশ মাছের ঝাঁকের মতো। তাঁরও লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ থাকবে একটার পর একটা পুরস্কারের নাম। কিন্তু পরমুহূর্তেই ভিতর থেকে কে যেন ধমকে ওঠে, ‘ছি ছি, এ সব কেমন চিন্তা তোমার! তুমি এক জন সাহিত্যিক হয়ে এমন কুচিন্তা করছ! একটা মানুষের জীবনের থেকে তোমার পুরস্কার পাওয়াটা বড় হল? তোমার সঙ্গে এক জন কসাইয়ের কী তফাত তা হলে!’
তখন মনে মনে খুবই লজ্জিত হয়ে পড়েন সুকুমারবাবু। নাস্তিকতা ভুলে বলে ওঠেন, “হে মঙ্গলময় ঈশ্বর, সোমকের দাদুকে তাড়াতাড়ি ভাল করে দাও।”
যা-ই হোক, সে যাত্রায় নার্সিংহোম থেকে সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরেছিলেন সোমকের দাদু।
তার পর থেকে সোমক এলে কথার মাঝে দাদুর প্রসঙ্গ ওঠে। আর ভিতর থেকে কেমন কুঁকড়ে ওঠেন সুকুমারবাবু। ভদ্রতার খাতিরে শরীর-স্বাস্থ্য কেমন আছে জিজ্ঞেস করতেই হয়। আর তখনই মনের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে।
নিছক কি ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেস করা, না কি গূঢ় অবচেতনে লুকিয়ে থাকে পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রত্যাশা! সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে বড় দ্বিধায় থাকেন তিনি।
এক দিন সোমক সংবাদ দিল, “দাদুর কথাবার্তা কেমন যেন এলিয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।”
শুনে কিছু ক্ষণ চুপ করে থাকলেন সুকুমারবাবু। তার পর বললেন, “ভাল দেখে একটা ডাক্তার দেখাও।”
সোমক বলল, “সে দেখানো হচ্ছে। ডাক্তারবাবু দেখে ওষুধপত্রও দিয়েছেন। কিন্তু খুব বেশি ভরসা দিতে পারছেন না।”
আবারও নাস্তিকতা ভুলে সুকুমারবাবু বলে উঠলেন, “মঙ্গলময় ঈশ্বরকে ডাকো, তিনি সব কিছু ঠিক করে দেবেন।”
সেদিন আরও কিছু ক্ষণ গল্পগাছা করে সোমক চলে গিয়েছিল।
তার পর আর সোমকের পাত্তা নেই। বহু দিন হয়ে গেল সোমক আর আসে না। মাঝে মাঝে ফোন করত, তাও আর করে না। সুকুমারবাবু ভাবলেন, একটা ফোন করবেন। ছেলেটা অনেক দিন আসে না, একটা ফোন তো করা যেতেই পারে। এতে সঙ্কোচের কিছু নেই।
ফোনটা সবে হাতে নিয়েছেন, অমনি ঝড়ের বেগে সোমকের আবির্ভাব। বেশ উত্তেজিত। বলল, “স্যর, একটা কাণ্ড ঘটে গেছে।”
সুকুমারবাবু বুঝলেন, দাদু চলে গেছেন। মুখটা বিষণ্ণ করে বললেন, “কবে হল?”
“এই তো স্যর, কাল।”
সুকুমারবাবু গলায় একটু করুণ ভাব এনে বললেন, “আহা রে, আমার এক জন পাঠক চলে গেলেন। ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”
সোমক বলল, “না না স্যর, কেউ কোথাও চলে যাননি। এবং মনে হচ্ছে এখনই সেরকম কোনও সম্ভাবনাও নেই। বরং পুরস্কার পেয়ে দাদু আরও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।”
সুকুমারবাবু প্রথমে ভাবলেন ঠিক শুনলেন কি! বললেন, “তোমার দাদু পুরস্কার পাচ্ছেন! কিসের পুরস্কার?”
“সাহিত্য পুরস্কার স্যর, ব্রজগোপাল সাহিত্য পুরস্কার।”
সুকুমারবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, “তোমার দাদুও তা হলে সাহিত্যিক ছিলেন, তুমি বলোনি তো কোনও দিন!”
সোমক বলল, “না স্যর, ঠিক আপনাদের মতো সাহিত্যিক নন। উনি একটা খাতায় খেয়ালখুশি মতো লিখতেন। অনেকটা স্মৃতিকথার মতো আর কী। আমার বাবার এক বন্ধু, শ্রীকান্তকাকা, তাঁর প্রেস আছে একটা। দাদু এক দিন সেই খাতা থেকে কিছুটা শুনিয়েছিলেন শ্রীকান্তকাকাকে। শুনে তো শ্রীকান্তকাকা প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, ‘প্রথাগত গল্প-উপন্যাস না হলেও এর মধ্যে প্রভূত সাহিত্যগুণ আছে। আমি ছাপব। এখনও ভাল পাঠক আছে, বিক্রি ভালই হবে।’ তার পর সেই খাতা নিয়ে গিয়ে ছেপেছিলেন শ্রীকান্তকাকা। ‘ব্রজগোপাল স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার’ কমিটির মেম্বারদের কী ভাবে যেন নজরে পড়ে বইটা, তাঁরা এটিকে পুরস্কৃত করবে বলে সিদ্ধান্ত নেন। দাদুকে আজই খবর দিয়েছেন।”
সোমকের দিকে কিছু ক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন সুকুমারবাবু। তার পর বললেন, “বাহ্, বেশ ভাল খবর, ভালই তো।”
সোমক বলল, “আরও একটা খবর আছে স্যর আপনার জন্য।”
“কী খবর, কী খবর!”
“পুরস্কার কমিটি দাদুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোন সাহিত্যিকের হাত থেকে আপনি পুরস্কার নিতে চান?’ তাতে দাদু আপনার কথা বলেছেন। তাঁরা আজ-কালের মধ্যেই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আপনি প্লিজ় রাজি হয়ে যাবেন স্যর।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন হাসলেন সুকুমারবাবু, বললেন, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, নিজে পুরস্কার না পাই, দিতে তো পারব। ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)