Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৫ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বিলকিস

দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুর স্টেশন থেকে ম্যাজিক ভ্যানে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক গিয়ে বিলকিসদের গ্রাম উত্তরাবাদ। গ্রামের একটা আলাদা পরিচয়ও আছে

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬ মার্চ ২০১৬ ০০:০৯
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুর স্টেশন থেকে ম্যাজিক ভ্যানে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক গিয়ে বিলকিসদের গ্রাম উত্তরাবাদ। গ্রামের একটা আলাদা পরিচয়ও আছে। ঘোড়া রেসের গ্রাম। জানুয়ারি মাসে গ্রামের মাঠে ঘোড়দৌড়ের আসর বসে। সেই গ্রামের এক পাশে মাটির নিকোনো বাড়ি ছিল বিলকিসদের। বাবা-মা আর চার বোনের, অভাবের কিন্তু আনন্দের একটা সংসার। কাকা-জ্যাঠারা অবশ্য খোঁটা দিতেন, আঁটকুড়ের বাড়ি বলে। তাঁদের সকলের ছেলে রয়েছে, একমাত্র বিলকিসদের কোনও দাদা বা ভাই নেই।

গায়ে মাখত না বিলকিসরা। বাবা উদয়াস্ত খেটে রোজগার করতেন। চার বোন স্কুলে যেত। মা সারা দিন পরিশ্রমের পর রাতে লণ্ঠনের আলোয় ঘরের মাটির দেওয়ালে মাটি দিয়েই অপূর্ব নকশা তৈরি করতেন। বিলকিস আর তার দিদি তাতে রঙ বোলাত। ভারী গর্ব হত তাদের। গ্রামে এত সুন্দর নকশা করা মাটির ঘর আর একটিমাত্র আছে। তার পর এক দিন বাবার খুব অসুখ করল। বমির সঙ্গে রক্ত, পায়খানার সঙ্গেও রক্ত। খাদ্যনালীর ক্যান্সার।

গ্রামের কয়েক জনের পরামর্শে সমস্ত জমিজমা বিক্রি করে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা এক এজেন্টের হাতে তুলে দেওয়া হল। সেই এজেন্ট নিয়ে গেল ভেলোরে। অপারেশন হল। বাবার গলার ভিতর পাইপ বসল। ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছে তার হিসেব না দিয়ে এজেন্ট জানিয়ে দিল, আর কোনও টাকা অবশিষ্ট নেই। নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরলেন অসুস্থ বাবা।

Advertisement

বিলকিস তখন ক্লাস সেভেনে। তেরো বছর বয়স। দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে মা, দুটো ছোট বোন। বাবা শয্যাশায়ী। গ্রামেরই কয়েক জন ধান ভর্তি বস্তা দিয়ে যেতেন। মা বড় কড়ায় খড়ের জ্বালে সেই ধান ভাপিয়ে দিতেন। স্কুলে যাওয়ার আগে বিলকিস সেই ধান শুকোতে দিত। দু’দিন শুকোনোর পর মাথায় করে নিয়ে যেত চালকল-এ। সংসার চালাতে দিশেহারা মা শত কাজের মধ্যে চার বছর আর ছ’বছরের দুই মেয়েকে দেখতে পারতেন না। বিলকিসই তখন ওদের মা। পুকুরে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো, গ্রাস পাকিয়ে খাইয়ে দেওয়া, বই গুছিয়ে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া থেকে রাতে ঘুম পাড়ানো—সব তারই দায়িত্ব। ছ’বছরের বোনটার আবার আঙুল চোষার অভ্যাস ছিল। মা বকুনি দিত। বকুনির ভয়ে রাতে ঘুমোনোর আগে এ-দিক সে-দিক লুকিয়ে আঙুল চুষত। হ্যারিকেন নিয়ে তাকে খুঁজে এনে কোলে শুইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াত বিলকিস। তার পর নিজে বই নিয়ে বসত।

মাস ছয়েকের মাথায় বাবা একটু সুস্থ হলেন। মা তখন ঘুগনি, চানা, মুড়কি, নিমকি বানিয়ে দিতেন। স্কুলের সামনে, গ্রামের বাজারে মাথায় করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন বাবা। প্রায়ই বিক্রি ভাল হত না। চারটের সময় স্কুল থেকে ফিরে তখন ঘুগনির হাঁড়ি মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বিক্রি করে আসত বিলকিস। পাড়ার অনেকে অবশ্য তা নিয়েও কথা শোনাতে ছাড়েনি। ‘ধিঙ্গি মেয়ে এই রকম নেচে বেড়াবে? গায়ের রংও তেমন নয়, শরীরে গত্তিও নেই। এখন বিয়ে না হলে সারা জীবন আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে।’ শুনে বিলকিসের অসহ্য লাগত। একমাত্র ভরসা ছিল বাবা। ফ্যাসফেসে গলায় যিনি মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘ওদের কথা গায়ে মাখিসনি। তুই পড় মা।’

পৌনে এক ঘণ্টা হেঁটে স্কুলে যেত বিলকিস। কামাই করত না। স্কুলে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ত। ক্লাস সিক্স থেকে পি.টি ক্লাসে মেয়েদের ব্যায়াম করতে দেওয়া হত না। কারণ, ওড়না টাইট করে বেঁধে সামনে-পিছনে ঝুঁকে, শুয়ে-বসে ব্যায়াম করতে হয়। তাতে মেয়েদের শরীরের নানা অঙ্গ পরিস্ফুট হবে। ছেলেরা আকৃষ্ট হবে। বিলকিসদের মতো অনেকে আবার এত গরিব ছিল যে টাকার অভাবে ব্রা কিনতে পারত না। ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সেটাও একটা সমস্যা। তাও বিলকিস বুঝেছিল, স্কুল হল তার সামনে একমাত্র রাস্তা, যেখান দিয়ে হেঁটে জীবন বদলানো যাবে।

গ্রামটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। লোকের টাকা নেই, শিক্ষা নেই, খাবার নেই। ছোট্ট-ছোট্ট মেয়েগুলোকে সামান্য বিস্কুট-লজেন্স-জামা-ক্লিপের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। তার পর সালিশি সভা বসিয়ে সেই ধর্ষকদের সঙ্গেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। বিলকিসের এক বন্ধুরই তো তা-ই হল। একটা বাচ্চা নিয়ে সে কার্যত ধর্ষকের বাড়ির ঝিয়ে পরিণত হল। গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষই কাজ করতে চায় না। কী পরিশ্রম করে মেয়েগুলো! মাঠে খাটছে, বাড়িতে খাটছে, বাচ্চা মানুষ করছে, তার পরেও পুরুষের মুখঝামটা আর মার খাচ্ছে। দেখে দেখে চোয়াল শক্ত হয় বিলকিসের। বেরোতে হবে এখান থেকে।

তত দিনে অবশ্য কাকারা তাদের ঘরছাড়া করেছে। যেহেতু বাবার ছেলে নেই, তাই তিনি পৈতৃক ভিটে বা জায়গা পাবেন না—এই যুক্তিতে। মায়ের নকশা করা ঘরটা চোখের সামনে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ওরা। অনেকটা দূরে অন্য এক দূরসম্পর্কের জ্যাঠার জমিতে উঠে যেতে হয়েছে। সেখানে ভিজে মাটির বাড়িতে সব সময় ঠান্ডায় কাঁপতে হয়। বাবার শরীর আরও খারাপ হয়।

তবে বাবা ধারদেনা করে বাড়ির পাশে এক চিলতে মুদির দোকান দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে হাটে গিয়ে দোকানের জিনিস কিনে বয়ে আনে বিলকিস। একটানা বেশি ক্ষণ দোকানে বসতে পারেন না অসুস্থ বাবা। তখন বিলকিসই দোকান চালায়। জীবনটা সবে ছন্দে ফিরছিল, এমন সময় হঠাৎ এক দিন মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মা মারা গেলেন। সকালে সেজেগুজে ফুফি-র ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। ফিরলেন অজ্ঞান অবস্থায়। বাবা ছুটলেন কলকাতায় এক পরিচিতের থেকে টাকা জোগাড় করতে। মা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন। আত্মীয়দের হাতেপায়ে ধরেও ডাক্তার ডাকাতে পারেনি বিলকিস। দু’দিন বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মা মারা গেলেন। সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ল ক্লাস এইটের চোদ্দো বছরের বিলকিসের ঘাড়ে।

তখন বিলকিস ভোর চারটেয় ঘুম থেকে ওঠে। বাড়ি নিকোয়। পুকুরে বাসন মেজে, মাটির উনুনে খড় দিয়ে আগুন জ্বালায়। এক হাতে জ্বলন্ত খড় ধরে থাকতে হয় আর অন্য হাতে হাতা নাড়ে। রান্না করে এক ঘণ্টা পড়াশোনা। তার পর দুটো ছোটবোনকে তৈরি করে, তাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে, নিজে পৌনে এক ঘণ্টা হেঁটে স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে আবার রাতের রান্না। তখন উনুনের পাশে পড়ার বই খোলা থাকে। সন্ধ্যা ছ’টায় দুই বোনকে টিউশনে দিয়ে নিজে টিউশন পড়তে যাওয়া। সাড়ে আটটায় বাড়ি ফিরে সবাইকে খাওয়ানো, শোওয়ানো। হ্যারিকেনের নিবু আলোয় খাতাবই খুলে আবার ঘণ্টাখানেক পড়ে, ঘুম।

তবে লড়াইয়ের আরও বাকি ছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই ঘোড়া রেসের মাঠে পানমশলা বিক্রি করতে গিয়ে এক বেলাগাম ঘোড়ার ধাক্কায় গুরুতর জখম হলেন বাবা। কিছু দিন পর রক্তবমি হতে হতে মারা গেলেন। টানা তিন দিন বালতি করে শুধু বাবার রক্ত ফেলেছিল বিলকিস। বাবাকে মাটি দিয়ে আসার চার দিন পর সে দোকান খুলতে চেয়েছিল। কোথা থেকে জিনিস কিনতে হয়, বিক্রি করতে হয়, তার জানা। কিন্তু কাকারা জানিয়ে দিলেন, দোকান যেহেতু পৈতৃক জমিতে, তাই সেই দোকান এখন থেকে তাঁদের। বিলকিস মেয়ে। মেয়েদের আবার পৈতৃক সম্পত্তিতে কীসের অধিকার?

বিলকিস এক দিন বাড়ি বসে ভাবল। তার পর চোখ মুছে বেরলো ধারে কিছু পয়সা জোগাড় করতে। তা দিয়ে ঘুগনি তৈরি করে সে বেচবে। হঠাৎ ছোটবোন এসে ডাকল, ‘দিদি, বড়মা এসেছে। তোকে এক্ষুনি ডাকছে।’ বড়মা মানে সেই দূরসম্পর্কের জ্যাঠাইমা, যাঁর দেওয়া জমিতে বিলকিসরা মাথা গোঁজার ঘর করতে পেরেছিল। তিনি বললেন, ‘এই বয়সে এ ভাবে একা বাঁচতে পারবিনি মা। ছিঁড়ে খাবে সবাই। আমার তিন ছেলে। ছোট ছেলেকে বলিছি তোকে বিয়ে করতে। আজ, এখনই।’

মনটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল বিলকিসের। কান্না থামাতে পারছিল না। যা পরেছিল সেই কাপড়েই বিয়ে হয়ে গেল সেই দিন। তবে পরের ইতিহাস তার মতো আর পাঁচটা মেয়ের থেকে একটু আলাদা। বিধবা শাশুড়ি এবং বরের থেকে সব রকম সাহায্য পেল। শাশুড়ি এন্টালির ওই বাড়িতে থেকে কাজ করেন, আর স্বামী গড়িয়ায় রাজমিস্ত্রি হিসেবে খাটেন। তাঁরা ছাড় দিলেন পড়াশোনার, দিলেন কিছুটা আর্থিক সাহায্য। বিলকিস একাই থাকতে শুরু করল গ্রামের বাড়িতে। ছোট বোন দুটোকে ভর্তি করল গ্রামের মাদ্রাসায়। নিজে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করল। আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে রাখতে লাগল হাঁসুয়া, কুড়ুল, বঁটি।

গত দু’বছর ধরে বিলকিস দু’বিঘা ধার করা জমিতে ধান চাষ করে। একা! দু’হাজার টাকা দিয়ে ট্র্যাক্টর ভাড়া করে জমিতে লাঙল দিইয়ে নেয়। আরও কিছু টাকা দিয়ে শ্যালো-তে জল দেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাদবাকি সব তার নিজের কাজ। বীজধান কিনে সেদ্ধ করে খড়ের গাদায় ঢুকিয়ে অঙ্কুর বার করা। জমিতে কলাগাছ দিয়ে মাড়াই করে সেই বীজ ছড়ানো। গাছ বার হলে সেগুলো ভাল করে ধুয়ে লাঙল দেওয়া জমিতে পোঁতা। সার দেওয়া, ওষুধ দেওয়া, ধান কাটা, ঝাড়াই, ধানকলে নিয়ে যাওয়া— স-অ-অ-ব। স্কুলে বলেকয়ে ওই মরশুমে কিছু দিন করে সে ছুটি নিয়ে নেয় মাঠের কাজ করতে। ফসল হওয়ার পর কিছু চাল বিক্রি করে, জমি-ট্র্যাক্টর ও শ্যালোর জলের ধার শোধ করে, আর বোনেদের মাদ্রাসার খরচ দেয়। বাকি চাল সে বেচে না। বাড়িতে রাখে। সারা বছর আর নিজেদের খাওয়ার চাল কিনতে হয় না।

সামনের বছর মাধ্যমিকে বসতে চলেছে বিলকিস। এন্টালিতে তার শাশুড়ি যে বাড়িতে কাজ করেন, তার ছাদে বসে অনেক দূরে দৃষ্টি হারিয়ে যায় ষোলো বছরের ফিনফিনে, অ্যানিমিয়ায় ভোগা কিশোরীর। সদ্য পাওয়া সাইকেলে স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে টিটকিরি শুনতে হয় তাকে। বিয়েওয়ালা মেয়ে আবার সাইকেল চড়ে স্কুলে যায়! ছি ছি! তবু সে সাইকেলে স্কুলে যাবেই। মাধ্যমিকে ভাল করে পাশ করবেই। বোনদের মানুষ করবেই। চাকরি করবেই। টাকা জমিয়ে জমি কিনবে, আর বাবার নামে একটা মুদির দোকান খুলবে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement