Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

novel: ডানায় ডানায়

রূপক ঘটক
১৪ নভেম্বর ২০২১ ০৯:৪৪
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

মা আশ্চর্য হয়ে বলে, “সে কী,
কী করে?”

বল্লাল বলে, “আরে ভদ্রমহিলা তো ভদ্রলোককে তার পর হাত ধরে তুললেন।”

Advertisement

তমা বলল, “তার পর?”

বল্লাল বলল, “ভদ্রলোকের গাল থেকে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন আঁচল দিয়ে।”

তমা বলল, “তার পর?”

“তাও ভদ্রলোকের নীরব অশ্রুপাত থামে না।”

“তার পর?”

“ভদ্রমহিলা তখন ভদ্রলোককে একটা চুমু খেলেন। এই দীর্ঘ জীবনে এই প্রথম বার তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে চুম্বন করলেন তাঁর স্বামীকে।”

তমা বলল, “ভদ্রলোক তখন মুখ লুকোলেন তাঁর স্ত্রীর বুকে,” বলে সে নিজেই মুখ গুঁজল বল্লালের বুকে।

বল্লাল বলল, “ভদ্রলোক কিছুই বলেন না, শুধু তাঁর চোখ থেকে জল ঝরে।”

তমা বলল, “ভদ্রমহিলা তাঁর কোলে টেনে নিলেন তাঁর স্বামীকে,” বলে তার হাত দিয়ে বল্লালকে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে বসিয়ে দিল নিজের আঙুল।

বল্লাল বলল, “ভদ্রলোক চুপ করে থাকলেন, ভদ্রমহিলা তাঁকে ভরিয়ে দিলেন আদরে আদরে,” বলে তার মুখ ডুবিয়ে দিল তমার শরীরে।

তমা বলল, “এই প্রথম বার তিনি নিজে ডেকে নিলেন তাঁর স্বামীকে।”

বল্লাল বলল, “এই প্রথম তারা মনের আনন্দে মিলে মিশে গেল।”

তমা বল্লালকে গভীরতম আলিঙ্গন করে বলল, “তার পরও তারা উঠল না। ভদ্রমহিলা আবার ধরলেন গান।”

তার পরও তারা, তমা ও বল্লাল একে অপরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকল। ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে কোন অবচেতনের আহ্বানে তাদের এক সঙ্গেই ঘুম ভাঙল। বল্লাল বিমুগ্ধ চোখে দেখতে থাকল অনাবৃত তমাকে। তমা এক বার তার হাত দিয়ে আড়াল করল বল্লালের দু’চোখ, আবার ছেড়ে দিল। তার পর আবার তাকে টেনে নিল শরীর-সরণিতে। ক্ষণিকের জন্য তার মনে পড়ল বিপ্লবের মুখ। তার মনে হল, ব্যগ্রতাই হয়তো স্বাভাবিক। সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল, এখানে আসার পর থেকে একটা মুহূর্তের জন্য বাড়ি, পরিবার, গবেষণা, গরিমা, বিপ্লব, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্টের খাতা, কোনও চিন্তাভাবনাই তার মাথায় আসেনি। সে থেকেছে শুধু বর্তমানে। ভুল হল। সে থেকেছে শুধু বল্লালে। আবার ভুল হল। সে
থেকেছে শুধু দুই বকের মেলে দেওয়া ডানায়। বাকি সব প্রসঙ্গ সে অপ্রাসঙ্গিক করে মোমবাতির মতো নিভিয়ে দিয়েছে।

বন্ধ জানলার কাচে এসে টোকা দেয় সকালের আলো। তখনও সে বল্লালের বুকে মাথা রেখে রয়েছে আধোঘুমে। বল্লালও আচ্ছন্ন ঘুমের সেই নাছোড় অবশিষ্টাংশে।

তমা বলে, “আমি কোথায়?”

বল্লাল তার হাত দিয়ে তমার কোমর জড়িয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন গলায় বলে, “একটা দালানে। সামনে উঠোন। এখান থেকে তোমার কলেজ কাছে। তুমি যোগ দিয়েছ অন্য একটা কলেজে। এখানে খুব কাছেই তোমার নিজের বাড়ি। সকালে তোমার বাবা এসে এক বার করে ঘুরে যান সাইকেল নিয়ে। বিকেলে তোমার মা আসেন রিকশা চড়ে।”

অবিশ্বাস্য কল্পনা চোখে মেখে তমা অস্ফুটে বলে, “বল্লাল!”

বল্লাল তার মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে, “ছোট একটা দালান। বাইরে বাগান। যেখানে অনেক ফুল।” তমা বলে, “পুরনো সেই সাইকেলটা নিয়ে বাবা এসেছেন। আমি বললাম, আজ পুজোর ফুল নেবে তো?”

বল্লাল তার মেঘমন্দ্র স্বরে বলল, “উনি বললেন ‘না’।”

তমা অভিমানভরে বলল, “কেন, ফুল নেবে না কেন?”

বল্লাল বলল, “উনি বলছেন, ‘আমি তো এখন বাড়ি যাব না তমা! আমি তো এখন খেলব!’”

তমা রাগত স্বরে উঠে বসে। বিছানার চাদরটা টেনে তাতেই গা ঢাকা দিয়ে বলে, “ইয়ার্কি হচ্ছে? আমার বাবা খেলবেন?”

বল্লাল মৃদু হেসে বলে, “খেলবেনই তো বলছেন। ওই যে শোনো, উনি বলছেন, ‘আমি এবেলা কোথাও যাচ্ছি না। আমি এখন খেলব আমার পুঁটি দিদির সঙ্গে।’”

আষ্টেপৃষ্ঠে বিছানার চাদর জড়িয়েই গড়িয়ে গড়িয়ে বল্লালের কাছে চলে আসে তমা। তার পর গাঢ় গলায় জিজ্ঞেস করে, “এত কিছুর মধ্যে তুমি কোথায় ইতিহাসবাবু?”

বল্লাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সেটাই তো ভাবছি প্রিয়তমা! এত সুখ আমার সহ্য হবে তো!”

তমা ভুরু কুঁচকে বলে, “এ কী! বাউন্ডুলের মুখে তো এ রকম হতাশার কথা মানায় না!”

বল্লাল বলে, “আমার বাউন্ডুলেপনার পাসওয়ার্ড হারিয়ে গেছে!”

তমা বলল, “কোথায় হারাল ইতিহাসবাবু?”

বল্লাল হেসে বলল, “মুন্সিয়ারিতে!”

ঢুলব দুজনে

পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দিন কেটে গেল অতঃপর। কেটে গেল পরের চব্বিশ ঘণ্টাও সে ভাবেই। দু’জনের এত মিল কি সম্ভব? বল্লালের কোমরে মাথা রেখে গড়িয়ে যাওয়া বেলায় তমার কখনও মনে হয়, কোথাও, কোনও শব্দে, কোনও বর্ণে, কোনও বাক্যে তো দ্বিমত হচ্ছে না তারা? তা হলে এটা কী? এটা কি সুখী দাম্পত্যের এক ঝলক? না কি এটা পলস্তারা? সময়ের কর্কশ ঘষায় এটা উঠে গেলে অনিবার্য ভাবে আসবে কথায় কথায় দ্বিমত, বাদানুবাদ? তারাও কি এক দিন গরিমা স্নেহময়ের মতো দুটো আলাদা পক্ষ হয়ে যাবে? এর উত্তর একমাত্র যার পকেটে তার নাম সময়। কিন্তু তমার উদগ্র ইচ্ছা হয় সেই সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করার।

ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমে ঢুলে পড়ে সে। হঠাৎ চোখ খুলে দেখে বেলা এগারোটার দেহরাদূনের সূর্য তাকে ডাকছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে শ্রীমান ইতিহাসের চোখেও তন্দ্রা। তমার হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই মিনিবাসটার কথা। হাওড়া সেতু পেরিয়ে যাওয়ার সময় হলুদ ট্যাক্সি থেকে চোখে পড়েছিল মিনিবাসের পিছনে লেখা ‘ঢুলব দুজনে’। মনে পড়েই হাসি পায়। আর সমীহ জাগে সেই দার্শনিকের প্রতি, যিনি এই শব্দবন্ধ নির্মাণ করেছিলেন। সে দিন তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। কে ঢুলবে? কে কে ঢুলবে? আজ কে কী কেন কোথায় কী ভাবে— কোনও প্রশ্নই অবশেষ থাকল না তার মধ্যে। জীবন নামের শিক্ষক চোখে হাত বুলিয়ে ওই কথার মানে বলে দিয়ে গেল।

সে এক হাত দিয়ে বল্লালকে ঠেলে বলে, “এই যে ঘুমবাবু, কলেজ যাবে না?”

বলেই মনে পড়ে নিজের গন্তব্যের অভ্যেসে কথাটা বলে ফেলেছে, যা বল্লালের ক্ষেত্রে খাটে না। বল্লাল তার আঙুলগুলো ধরে বলে, “আজ তো রবিবার।”

বলে ফের ঢুলতে শুরু করে, আঙুল ছাড়ে না। তার পর ঘুম জড়ানো গলায় বলে, “একটু সময় করে সেখানে যাবে তমা?”

তমা বলে, “কোথায়?”

বল্লাল বলে, “যেখানে আমাদের গল্পটা থেমে গিয়েছিল।”

তমা বলে, “যেখানে পূর্ণিমার চাঁদ পাঁচ পাহাড়ের চুড়োয় কী ভাবে নেমে আসে তা দেখাবে তুমি আমায়?”

বল্লাল বলে, “সেই গেস্টহাউসটা। সেই পর্দা। সেই টেবিল।”

তমা বলে, “যদি তখন ভিড়ে গমগম করে?”

বল্লাল বলল, “পুরোটা ভাড়া নিয়ে নেব আমরা। যাবে তমা?”

তমা বলল, “সেটাই কি আমাদের সুখুচর, বল্লাল? আমরা কি সেখানে ডানা মেলব?”

বল্লাল বলে, “ডানা মেলে লুকোচুরি খেলব বিকেলের সঙ্গে। রাত কেমন করে দিনের ঘরে চলে আসে তা দেখব মেঘের আড়াল থেকে। এক বার দেখব শেষ বিকেলের লাল আলো, আর এক বার দেখব উপত্যকার গভীর, নীল অন্ধকার...”

বলতে বলতে তারা আবার ঢুলতে শুরু করে। দু’জনেই। ঢোলা তো ঘুম নয়, সে তো সাময়িক। তাই একটু পরেই তন্দ্রা ছুটে যায় তমার। সে
উঠে বসে বলে, “এই যে আহাম্মকবাবু, আজ তো রবিবার নয়!”

বল্লাল ঘুমে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো গলায় বলে, “আমি শুনতে পাচ্ছি না।”

তমা অনুযোগের সুরে বলে, “এই, তোমার ক্লাস আছে তো!”

বল্লাল বলে, “আজ আমার ডে অফ।”

তমা কানের কাছে তার মুখ নিয়ে গিয়ে বলে, “আজ রাতে আমার ফেরার ট্রেন।”

বল্লাল কান চাপা দিয়ে বলে, “আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।”

তমা আরও নিভৃত উচ্চারণে বলে, “তুমি তো চোখ দিয়ে শোনো পাজি ছেলে!”

বল্লাল বলে, “আমার তো চোখও বন্ধ।”

তমা বলে, “তা হলে কান দিয়েই দেখে নিয়ো, আমি চলে যাব। কান তো আর বন্ধ করতে
পারবে না!”

তমাল এ বার দুঃখ দুঃখ উচ্চারণে বলে, “কান দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, কলকাতার দিকে ট্রেন
চলছে না।”

তমা মুখে হাসি টিপে বলে, “তা হলে কোন দিকের ট্রেন চলছে বাবু?”

অনেক গভীর থেকে উঠে আসা গলায় বল্লাল বলে, “পাঁচ শৃঙ্গের দিকে।”

তমা আর কোনও উত্তর দেয় না। তার মাথাটা বল্লালের মাথায় রাখে।

হাতে হাত

কলেজে আজ পরীক্ষা শুরুর দিন। সকাল দশটা থেকে পরীক্ষা। প্রথমেই ইনভিজিলেশনের দায়িত্ব ছিল যাদের, তাদের মধ্যে গরিমা, তমাও ছিল। পাশাপাশি ঘরেই দায়িত্ব ছিল, তবে কাজের চাপে মাথা তোলার সুযোগ ছিল না। পৌনে দশটায় হলে পৌঁছে রোল নম্বর মিলিয়ে বিলি করতে হল ওএমআর শিট। যেমন তেমন বণ্টন করলে চলবে না, প্রশ্ন বিলি করতে হল ডব্লিউয়ের মতো বসার জায়গা মেনে। প্রতি সিটে গিয়ে নম্বর মিলিয়ে সই করতে করতেই কেটে গেল সময়টা। তার পর রোল নম্বর অনুযায়ী আলাদা আলাদা বিভাগের ওএমআর শিট সাজিয়ে রুম নম্বর-সহ লিখে
জমা করে আসতে আসতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। নিজের টেবিলে আসতেই চায়নাদি চা দিয়ে গেল। তাকে দেখে বলল, “বাবা! কত দিন পর দেখলাম তমাদিকে।”

তমা হাসল। এরই মধ্যে ফোন করে দিবাকরদাকে, এই শহরে যে বই ফিরি করে। বল্লালের জন্য, তার নিজের জন্য বইগুলো দিতে বলে। মনে হয়, ওর কি একটা ধন্যবাদ পাওনা হয়? সেটা কী ভাবে দেওয়া যায়! তার পরই গরিমা এল চা নিয়ে আর নিজের টেবিলে না গিয়ে চেয়ার টেনে এনে বসল তমার টেবিলের সামনে।

রাগ, অভিমান আর অনুযোগের সুরে বলল, “কী ব্যাপার বল তো, তুই তো একেবারে কক্ষচ্যুত উপগ্রহ হয়ে গেলি! নিজে তো ফোন করলিই না, আমি করলেও শুনি হয় বেজে যাচ্ছে, নয় বন্ধ। তোর ব্যাপারটা কী?”

“অনেক ব্যাপার, অনেক। কক্ষচ্যুত উপগ্রহ পাক খেতে খেতে অন্য কক্ষপথে ঢুকে পড়লে যা হয় আর কী! বলব তোকে সব। আগে তোর কথা বল। এ দিকে তো তোকে জ্বলন্ত পরিস্থিতিতে ফেলে গিয়েছিলাম। এখন কী অবস্থা বল...”



Tags:

আরও পড়ুন

Advertisement