E-Paper

কাঠপুতুলের খোঁজে বারাণসীর পথে

বেনারসের পুরনো কাঠের পুতুল খোজওয়া-র পুতুল নামে পরিচিত। মোগল আমলের হাতির দাঁতের শিল্পীরাই পরে হয়ে যান পুতুলশিল্পী। স্থানীয় জঙ্গলের কাঠ আর বনজ রং নিয়েই তৈরি হত এই পুতুল। বেনারস শহরের মতোই প্রাচীন এই আশ্চর্য পুতুলনির্মাণ।

পল্লব মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৩৩
শিল্পকর্ম: বেনারসের কাশ্মীরিগঞ্জে নির্মিত খোজওয়া-র কাঠের পুতুল।

শিল্পকর্ম: বেনারসের কাশ্মীরিগঞ্জে নির্মিত খোজওয়া-র কাঠের পুতুল।

ঋগ্বেদ ও স্কন্দপুরাণে বারাণসী তথা কাশীর উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতকার বলছেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ভ্রাতৃহত্যা ও ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্ত হতে পঞ্চপাণ্ডব এসেছিলেন শিব-সন্ধানে এই অবিমুক্তেশ্বর ধামে, যে স্থানে স্বয়ং শিব সদা বিরাজমান। উত্তর ভারতে গঙ্গাতীরের অতি প্রাচীন এই নগরী বরাবরই কাশী নামে পরিচিত। হিন্দু পুরাণমতে, মহাদেব এই বেনারস শহর তৈরি করেছিলেন। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, বারাণসীতে মৃত্যু হলে মোক্ষলাভ হয়। বৌদ্ধধর্মের বিকাশেও বারাণসীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। গৌতম বুদ্ধের সময় বারাণসী ছিল কাশী রাজ্যের রাজধানী। ৫২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বারাণসীর কাছে সারনাথে বুদ্ধ প্রথম বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তন করেন। এই ঘটনা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ‘ধর্মচক্রপ্রবর্তন’ নামে পরিচিত।

৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন এই শহরে এসেছিলেন। তিনি লিখেছেন, গঙ্গার পশ্চিম তীরে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চলে বারাণসী অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং বারাণসীতে এসেছিলেন। তিনি এই শহরকে ‘পোলোনিসি’ নামে উল্লেখ করেন। ১৬৬৫ সালে ফরাসি পর্যটক জঁ বাপ্তিস্ত তাভার্নিয়ের এই শহরের গঙ্গাতীরবর্তী বিন্দুমাধব মন্দিরের স্থাপত্য-সৌন্দর্যের কথা বর্ণনা করেন আর ১৮৯৭ সালে বিশিষ্ট ভারতপ্রেমিক সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন বারাণসী দেখে আপ্লুত হয়ে লিখলেন, “বারাণসী ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন, ঐতিহ্যের চেয়েও প্রাচীন, এমনকি কিংবদন্তির চেয়েও প্রাচীন। সব কিছুকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তার চেয়ে দ্বিগুণ প্রাচীন।”

ইতিহাসবিদরা অনুমান করেন, বরুণা (বারাণসীতে এখনও প্রবহমান) ও অসি নদী (অসি ঘাটের কাছে প্রবাহিত একটি ছোট নদী, যা বর্তমানে প্রায় মজা নালার মতো)— এই দু’টি নদীর নাম থেকেই বারাণসী নাম হয়েছে। যুগে যুগে বারাণসী নানা নামে অভিহিত হয়েছে, ‘কাশী’ (বৌদ্ধযুগের তীর্থযাত্রীরা বারাণসীকে এই নামে অভিহিত করতেন, এখনও করেন), ‘কাশিকা’ (উজ্জ্বল), ‘অবিমুক্ত’ (শিব যে স্থান কখনও ছাড়েন না), ‘আনন্দবন’ ও ‘রুদ্রবাস’ (রুদ্রের নিবাস)।

সেই শিবঠাকুরের আপন দেশের উত্তরপ্রান্তে আদি কেশব ঘাট থেকে দক্ষিণ প্রান্তের অসি ঘাট পর্যন্ত প্রায় পৌনে সতেরো কিলোমিটার টোটো-বাহনে আর পায়ে হেঁটে ফিরেছিলাম কী জানি কিসের অন্বেষণে! না-জানা সেই অন্বেষার মধ্যেই মনের মাঝে ঝিলিক দিচ্ছিল এক সুদূর গাঁয়ের আদুর গায়ের বালকের স্মৃতি। গোধুলিয়া থেকে উত্তরের রাস্তার চক চাহামেমার একটা গলি, নাম তার ঘুঘুরাণী গলি। সেখানে একটা চক-মিলানো দোতলা বাড়ির উঠোনে ফাগুনের একলা দুপুরে আদুর গায়ের একটা ছেলে আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতে একটা ছোট তিনকোনা কাঠের রঙিন পাটাতনের তলায় ঝুলছে রঙিন রেশমি সুতোর গুচ্ছ, আর পাটাতনের উপরে কাঠের তিনটে ছোট ছোট বহুরঙা পাখি দানা খাচ্ছে। সে বাড়ি কবে বেদখল হয়ে গেছে!

এবারের ঠিকানা দক্ষিণের অসি নালার ধারে সঙ্কটমোচন মন্দিরের কাছের হোমস্টে। এক দিন দেবদর্শনে ক্ষান্তি দিয়ে টোটো-বাহনে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমার সেই আদুর গায়ের শৈশব আর বাল্যকালকে ফিরে দেখতে। প্রাচীন দুর্গামন্দির ছাড়িয়ে চেতমনি চৌমুহানী, যেখানে বিশাল গোল বেদির উপর বাবা বিশ্বনাথের বাহন এক বিশালাকায় নন্দীমূর্তি পুবমুখে উদাসনয়নে বসে আছেন, তাঁকে পার করেই উত্তরমুখী টোটো বেশ খানিকটা এগিয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে থেমে গেল।

“কাশ্মীরিগঞ্জ আ গয়া।”

টোটো ছেড়ে পায়ে পায়ে গলি আর তার ডালে ডালে পাতায় পাতায় খুঁজে ফেরা শৈশবের খোজওয়া-র পুতুল, পাখি, গাড়ি, আর কত সব দেবদেবীর ছোট-বড় দারুমূর্তি। কাঠ চেরাইয়ের, উড টার্নারের শব্দ, রাসায়নিক রঙের ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস ভারী, তবে ছেনি-বাটালির ঠুকঠাক আর নেই। তার বদলে এখন মেশিনের ঘর্ঘর। একটু দক্ষিণ-পশ্চিমে পাক খেয়ে মৌরিয়াদের পুতুল ঘর। একটি অল্পবয়সি ছেলে টার্নারে মা লক্ষ্মীর গাছকৌটো বানাচ্ছে। চোখ তুলে তাকাতে কিছু প্রশ্ন করলাম।

সে ইশারায় দেখিয়ে বলল, “মেরা দাদাজি।”

মুখোমুখি হলাম মোটা কাচের চশমা চোখে অশীতিপর দারুশিল্পী ব্রহ্মানন্দ মৌর্যের সঙ্গে, ওঁরা উচ্চারণ করেন মৌরিয়া। কারখানার সামনের চলটা-ওঠা সিমেন্টের দাওয়ায় বসে আছেন তিনি। দুপুরের খাওয়ার পর বিড়ির ধোঁয়ার মৌতাতে চোখ আধবোজা। পরিচয় দিতে নাকের আছে নেমে আসা চশমাটা ঠেলে তুলে ঠাহর করার চেষ্টা। প্রাথমিক আলাপচারিতার পর বলতে শুরু করলেন, “বেনারস মানে শুধু ঘাট, মণিকর্ণিকা ঘাটের অনির্বাণ চিতা, মোক্ষলাভ, উত্তরবাহিনী গঙ্গা, পাথরের জাফরির কাজ, বেনারসি শাড়ি, অম্বুরি তামাকই নয়। বেনারস আরও অনেক কিছুর গল্প জানে...”

কাঠের অস্ত্র।

কাঠের অস্ত্র।

পুরো এলাকা জুড়ে কাঠের স্তূপ, মেশিনের আওয়াজ। এই সব শব্দ, কাঠের মিহি গুঁড়ো ওড়ার মাঝে বাপ-দাদার দোকানের দাওয়ায় চটের উপর বসে খোজওয়া পুতুলের অতীত-বর্তমানের গল্প শোনাচ্ছেন মাস্টার ক্র্যাফটসম্যান ব্রহ্মানন্দ মৌরিয়া।

“আমার পরদাদা (বাবার ঠাকুরদা) বাচ্চালাল মৌরিয়া, খুব অল্প বয়সে চলে আসেন মির্জাপুর থেকে পুতুলের টানে। সেও তো লগভগ দেড়শো দোশো সাল হোগা। পারিবারিক পাথরের জাফরির কাজ তার মন টানেনি, তিনি এখানকার বড় বড় দারুশিল্পীদের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন, তাঁর রক্তে শিল্প, পারিবারিক শিল্প-তালিম তো ছিলই, কাজ শিখলেন কাঠের পুতুল তৈরির ওস্তাদ কারিগরদের থেকে। তার পর এখানেই ঘর বসালেন। আমার দাদা (ঠাকুরদা) মুন্নিলাল মৌরিয়ার জন্ম এখানেই। এই কারখানা আমার বাবা রাজনাথ মৌরিয়ার তৈরি। তার আগে এখানে কোনও কারখানা ছিল না, সব কাজ ঘরে বসেই লোকে করত। এ-সব অঞ্চল তখন জঙ্গল। তখন বেশ কয়েক ঘর প্রাচীন শিল্পী কাঠের পুতুল বানাত।”

একটু থেমে শুরু করলেন পুতুলের কাঠের কথা। “শোনভদ্র, মির্জাপুর, চিত্রকূটের জঙ্গলে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা কোরাইয়া, কূটজ, দুধিয়ার মতো লম্বা আঁশযুক্ত গাছের গভীর জঙ্গল ছিল। বিনামূল্যে বিনা যত্নে সহজলভ্য কোরাইয়া, দুধিয়া, গামারিয়া কাঠ থেকে এই পুতুল তৈরি হত। বনজ লতা, ফুল, পাতা, গাছের ছাল, শিকড় আর নানা রকম গাছের আঠা মিশিয়ে রং বানাত। খোজওয়া বাজার অত্যন্ত প্রাচীন বাজার। একটা কাঁচা রাস্তা ছিল মাঝ বরাবর, আর ওই রাস্তার দু’পাশে খোজওয়া, তিরহাইয়া, কাশ্মীরিগঞ্জ ছাড়াও আরও দু’-একটা গ্রাম ছিল। এখন আমার ছেলে মহেশ আর নাতি কারখানা সামলায়, আর আমি মাঝে মাঝে এসে বসি। অল্পস্বল্প কাজ করি, মূলত রঙের কাজ, সে তেমন কিছু নয়।”

খোজওয়া পুতুলের ইতিহাস কত পুরনো জানতে চাইলে বলেন, “শুধু খোজওয়া পুতুল নয়, ভারতীয় পুতুলের পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস আছে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়োতে তার সন্ধান পাওয়া গেছে। বেনারসের পুরনো কাঠের পুতুল, খোজওয়া পুতুল নামে খ্যাত। আশির দশকে জঙ্গল থেকে সরকার এই কাঠ নেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে পরবর্তী কাল থেকে ইউক্যালিপটাসের কাঠ দিয়ে পুতুল তৈরি হয়, এখনও তা-ই হয়। এখন তো এই কাজে টার্নার, লেদ মেশিন এসে গেছে। আমাদের সময়ে নানা মাপের ছেনি, বাটালি আর কাঠের হাতুড়িই ছিল সম্বল।”

বেনারসের খোজওয়ার এই পুতুল এই শহরের মতোই প্রাচীন। ওঁরা বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। বেনারসের এই কাঠের পুতুলগুলো এক সময় বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছিল, কিন্তু ভারত সরকার ও রাজ্য সরকারের তৎপরতায় এই পুতুলশিল্প আবার বাঁচতে শুরু করে। বিদেশে এই পুতুলের চাহিদামতো শিল্পীরা সেগুলো তৈরি করেন এবং রফতানি করেন। ফলে অর্থনৈতিক দিকটিও আজ দৃঢ় হয়েছে।

খোজওয়ার কাঠের পুতুল ২০১৪ সালে জিআই ট্যাগ পেয়েছে। দেবদেবীর শহর বারাণসীতে এই পুতুলগুলো সাধারণত দেবদেবীদের ঘিরেই তৈরি। খোজওয়া কাশ্মীরিগঞ্জ ও তার আশপাশের কিছু এলাকাতেও এই পুতুল তৈরি হয়। শিল্পীদের কথায়, তাঁদের পূর্বপুরুষ মোগল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় হাতির দাঁতের জিনিস তৈরিতে দক্ষ ছিলেন। কিন্তু পরে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞায় সেই শিল্প উঠে গেলে কাঠের শিল্পের দিকে ঝোঁক বাড়ে।

ব্রহ্মানন্দ মৌরিয়ার থেকে বিদায় নিয়ে সরু গলিতে একটা জিলিপি-পাক খেয়ে পৌঁছে গেলাম পুতুল-শিল্পী রামেশ্বর সিংজির তিনতলা বসতবাড়ি আর পুতুল-কারখানা বালাজি ভবনে। দরজা খোলা। সেখানে কাঠের কাজ হচ্ছে। মাঝবয়সি এক জন ভদ্রলোক তাঁর পুতুলের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। কথায় কথায় জানালেন, দেশের বাইরে এখন এই পুতুলের যা চাহিদা, সেটা যথাসম্ভব সরবরাহ করেও মেটানো যাচ্ছে না। যথেষ্ট কদর বেড়েছে। ল্যাকারের কাজগুলো লেদ মেশিনে করা হয়। কাঠবিড়ালীর লেজের চুল দিয়ে পেন্ট ব্রাশ তৈরি করা হয়। ফেব্রিকের রং ব্যবহার করা হয়, তবে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয়, তাই বাচ্চাদের খেলার পক্ষেও উপযুক্ত। খোজওয়া এলাকায় সত্তর শতাংশ শিল্পী সিঁদুরদানি, আর বাকি শিল্পীরা এই পুতুল তৈরি করেন।

শিল্পী রামেশ্বরজির অধীনে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বর্তমানে প্রায় ৪০ জন কর্মচারী। উনি এও বললেন যে, আজকের বাজারে এই পুতুলশিল্প থেকে তিনি যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে রামেশ্বর সিংজি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ৩০ টাকার পুতুল থেকে এক লাখ টাকা দামের পুতুলও রয়েছে। বাচ্চাদের লাটিম, বাঁশি, চরকি থেকে দশানন রাবণ, বিষ্ণুর দশাবতার, লক্ষ্মী-গণেশ, কাঠের গাড়ি, নানা ধরনের পুতুল আর দশেরা পুতুলের ভিড়ে সন্ধানী চোখ খুঁজছে কাঠের পাটাতনের উপর খুটখাট শব্দে দানা খাওয়া ছোট রঙিন পাখিদের, আর পুতুলের ভিতর পুতুলের সংসার।

কী খুঁজছি, জিজ্ঞেস করায় বলেছিলাম সেই সব কথা। রামেশ্বরজি হেসে বলেছিলেন, ওই পাখির আর চাহিদা নেই বলে বানানো হয় না, তবে নানি-পুতুল আছে বইকি। তাক থেকে হলুদরঙা নয় ইঞ্চি মাপের বিশাল পুতুল পেড়ে এনে বড় পুতুলের ভিতর থেকে পর এক নারী পুরুষ পুতুল বার করে দেখাচ্ছেন তিনি, আর মনে তখন বেজে উঠছে যৌবনে কেঁদুলি মেলায় এক বাউলের থেকে শোনা দেহতত্ত্বের গান— “একটা আম আছে দেহে আর আমের ভেতর আমের চারা আম ফলে তাতে”-র অনুরণন। সবচেয়ে ছোটটির মাপ দেড় সেন্টিমিটার। দশেরা পুতুল বলতে বোঝানো হয় নবরাত্রি বা দশেরা উৎসবের জন্য তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের পুতুল। এই পুতুলগুলো সাধারণত বিভিন্ন স্থানে সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে। দশেরা পুতুল শুধু খেলার সামগ্রী নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। দশেরা পুতুলের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে—

গোলু পুতুল: মাটির বা কাঠের তৈরি বিভিন্ন আকারের পুতুল।

কুমারী পুতুল: সাধারণত দেবীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত পুতুল।

অন্যান্য পুতুল: বিভিন্ন চরিত্র বা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের পুতুল।

চান্নাপট্টনা শিল্প: এই শিল্পে তৈরি পুতুলগুলো সাধারণত কাঠ বা মাটির তৈরি এবং তাতে বিভিন্ন রং ও নকশা করা হয়।

এ ছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের কাঠ, মাটি, কাগজ বা কাপড় ব্যবহার করে পুতুল তৈরি করা হয়।

সেখান থেকে বেরিয়ে সোমনাথ গুপ্তা আর তাঁর দুই ছেলে জিতেন্দ্র আর কাল্লুরামের কাছে গেলাম। সেখানে খাপরার চালে মেঝেয় পাতা বিশাল উনুনের গনগনে আগুনের সামনে বসে খোজওয়া পুতুলের রং-রসায়নের খবর পাওয়া গেল। কী ভাবে গালা, রজন গলিয়ে রঙের গুঁড়ো মিশিয়ে রং বানানো হয়, নিজের চোখে দেখে পৌঁছে গেলাম মহাজন রাজেন্দ্রকুমার সিংয়ের বাড়ি। হিসাব মতো ১৮০০০ টাকা কুইন্টাল দরে মল্লিকপুর, মির্জাপুর থেকে কাঠ এনে কারিগরদের দিয়ে দেন তাঁরা। মজুররা ১০০ টাকা রোজ মজুরিতে কাঠ চেরাই, মাপসই কেটে শিল্পীদের দিলে তাঁরা তখন ফরমায়েশ মতো নানা রকম পুতুল বানিয়ে দেন। পুতুলের কেনা দামের কম-বেশি ৪৩ শতাংশ শিল্পীর, আর বাকিটা মহাজনের। বাঙালিটোলার বিশিষ্ট পুতুল ব্যবসায়ী শ্রীবন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, “এ রকম ১০-১২ জন মহাজন আছেন, যাঁরা কাজ দেওয়ার নামে শোষণ করেন শিল্পীদের। আমাদের দোকানের বয়স প্রায় একশো, আমরা কোনও দিন মহাজনের থেকে মাল নিই না। সরাসরি শিল্পীদের থেকে মাল কিনে বিক্রি করি। খোজওয়া পুতুলের মহাজনি ব্যবসা বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকা, কিন্তু শিল্পীদের দারিদ্র কখনও ঘোচে না তো!”

ফিরে আসতে আসতে মনে হল, পুতুলশিল্পীরা নিজেদের জীবনযাপনে রং লাগানোর কথা না ভেবেই মনের আনন্দে রঙিন করে তোলেন পুতুলগুলি। দৈনন্দিন লাভক্ষতির হিসাবে শিল্পীদের কবেই বা মাপা গেছে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

varanasi benaras Kashi

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy