Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন

২৯ মে ২০১৬ ০০:০৩

ঘি-মাখন

পিনাকী ভট্টাচার্য

বা টার শব্দটার উৎস গ্রিক ‘bouturon’ (গরুর দুধের চিজ) থেকে। কিন্তু শব্দটা নাকি সিন্থিয়ানদের থেকে ভাড়া করা, তাদের একটা বড় অংশের জীবন কাটত গরু-ভেড়া-ছাগল চরিয়ে। গ্রিস ও তার আশপাশে ভেড়ার দুধই বেশি মেলে। কিন্তু তা থেকে মাখন নয়, চিজ তৈরি হত। চার হাজার বছর আগের এক উপকথায় বলে, সারাহ্‌ মাখন তৈরি করে দেবদূতদের নিবেদন করেছিল। কিন্তু যে ভাবে সেই মাখন তৈরি হয়েছিল— সেই রেসিপির চেয়ে নাকি অনেক বেশি সহজ ছিল প্রথম বার পিরামিড বানিয়ে ফেলা! অন্তত গ্রিক-রোমানদের কাছে তো তাই!

Advertisement

প্রথম শতক আর তার পরেও ইউরোপে মাখন যেত ভারতবর্ষ থেকে। সে সময়ের মাখনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায় না। বারো শতকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় মাখন বানিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু হয়। তাদের মাখন বানানোর কায়দাখানা ছিল অন্য রকম। ওরা মাখন বানিয়ে তাতে খানিকটা রসুন মিশিয়ে ছোট ছোট পিপেতে ভরে সোঁদা জমিতে পুঁতে রাখত। চিহ্ন হিসেবে ওপরে গাছের চারা লাগানো থাকত। মাখন যত পুরনো হত, ততই নাকি স্বাদ খোলতাই হত। মাখনের ব্যবসা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে জার্মানরা তাদের মদ ভর্তি জাহাজ নিয়ে নিয়মিত নরওয়ের বার্গেন বন্দরে নোঙর ফেলত আর সেই মদের বিনিময়ে নিয়ে আসত শুকনো মাছ আর মাখন। ১১৯৭ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাজা দেখলেন, এই করে প্রজারা সব মদ্যপ হয়ে যাচ্ছে। তিনি জার্মানির সঙ্গে বাণিজ্য একেবারে নিষিদ্ধ করে দিলেন।



তার পর চোদ্দো শতক এলে সুইডেন থেকেও মাখন রফতানি শুরু হয়ে যায়। ব্রিটিশরা যখন কলকাতায় আস্তানা বানাল, নিজেদের মাখন নিজেরাই বানিয়ে নিতে শুরু করল। কারণ তাদের মুখে তত দিনে ইউরোপীয় মাখনের স্বাদ জমে গিয়েছে, ভারতে তৈরি মাখন তাদের মুখে রোচে না।

তবে এ দেশে চার হাজার বছর আগেই মাখন বানানো শুরু হয়ে যায়। গরু, ইয়াক আর ঘোড়ার দুধ থেকে। এই মাখন খাওয়া তো হতই, তা ছাড়া অন্ধকার দূর করতে জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগত। আবার সেই সময়ের লোকেরা শীত কালে গায়ে মাখন মেখে শরীর গরম রাখত।

আর্যরা এ দেশে আসামাত্র সবচেয়ে দামি সম্পত্তিগুলোর মধ্যে গোধনকেও গণ্য করত। গরুর দুধ থেকে তৈরি মাখন জ্বাল দিয়ে তৈরি হত ঘি। সে সময়ের সমাজে ঘি-র কদরই আলাদা। পবিত্রতার নিরিখে অন্যান্য খাবারদাবারকে কয়েক যোজন দূরে ফেলে দিয়েছিল ঘি। পঞ্চগব্য থেকে পঞ্চামৃত— সবই ঘি না থাকলে অসম্পূর্ণ। খেতে বসে শুরুতেই ভাতে ক’ফোঁটা ঘি ছড়িয়ে দিলে সেই অন্ন শুদ্ধ হয়ে যায়! ঈশ্বরকে নিবেদন করার পায়েস বা ক্ষীর তৈরি করতে শুরুতেই চালে ঘি মাখতে হবে। দুধ, চিনি পরে মেশানো হবে। নইলে তা পায়েস বা ক্ষীর হিসেবে গণ্যই হবে না, হয়ে যাবে দুধ-ভাত। আমাদের বাংলার ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ আছে, শিবঠাকুর তামসিক প্রকৃতির। তাই তিনি সরষের তেলের রান্না খান। কিন্তু শ্রীবিষ্ণু সাত্ত্বিক প্রকৃতির। তিনি ঘিয়ে রান্না ছাড়া খান না।

ঘি-র এই বিশেষ স্বীকৃতির কারণ? পুরাণ বলে, প্রজাপতি নিজের দু’হাতের তালু ঘষে ঘি তৈরি করেছিলেন, আর তা আগুনে ঢেলেছিলেন মানবজাতির সৃষ্টির জন্যে। আর ঋগ্বেদ বলেছে, ঘি হল বীজের প্রতীক আর আগুন জঠরের। যজ্ঞের সময় ঘি ঢেলে আগুনকে দাউদাউ করে জ্বালালে, সৃষ্টির ধারাকেই অবিরাম ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই তো ঘি এত পবিত্র!

pinakee.bhattacharya@gmail.com

ড্রাইভারদের জন্য ‘মিল্ক অ্যালাওয়েন্স’

চা করির পরীক্ষার গুচ্ছের ধাপ পেরিয়ে যে দিন স্টেট ট্রান্সপোর্টের কোচবিহার অফিসে যোগ দিলাম, একটু ভয় ভয়ই করছিল। অ্যাকাউন্টস অফিসারের চাকরি, পারব তো? প্রথম দিনই আলাপ হল সহকর্মীদের সঙ্গে— বিনয় ঘোষ, ইন্টারনাল অডিটর; শ্যামল সাহা, সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার। বিনয়দা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় উঠেছেন? হোটেলে উঠেছি শুনে ওঁরাই বলেকয়ে অফিসেরই আর এক কর্মচারীর বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।



আলাপ হল পাবলিক রিলেশন্স অফিসার লীলাবতী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মধ্য চল্লিশের স্মার্ট সুন্দরী মহিলা। প্রথম আলাপেই প্রশ্ন, বিয়ে হয়েছে? আমি আর অনিল একই দিনে জয়েন করেছিলাম। দুজনেই মাথা নাড়লাম। উনি বললেন, ‘আপনাদের মতো ইয়ং জেনারেশনের ছেলেরা বিয়ে না করে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায় কেন বুঝতে পারি না। ঠিক আছে, আমি সব ব্যবস্থা করব।’ আমরা তার পর থেকে পি.আর.ও. অফিসের ধারেকাছে ঘেঁষতাম না।

তিনতলা অফিসের পাশেই স্টেট ট্রান্সপোর্টের গ্যারেজ। বিশাল গ্যারেজে শ’খানেক বাস দাঁড়িয়ে থাকত। রাতে একটা-দুটো টিমটিমে বাল্‌বের আলোয় ভুতুড়ে চেহারা নিত জায়গাটা। শর্টকাট হবে বলে প্রায়ই আমরা গ্যারেজের ভেতর দিয়ে যেতাম। এক বার রাতে নির্জন গ্যারেজে লোডশেডিং হয়ে গেল, খুব ভয় করছিল। স্টোর্স অফিসার দাসবাবু পর দিন শুনে খুব বকলেন। গ্যারেজের এক পাশে পর্বতপ্রমাণ জঞ্জাল, সেখানে নাকি গোখরো আর কেউটে সাপের আস্তানা। রাতে তারা হাওয়া খেতে বেরোয় প্রায়ই। এর পর থেকে আর কখনও গ্যারেজের ওই পথে ঢুকিনি। বড় রাস্তা ধরে অনেকটা ঘুরে যেতাম।

ট্রাফিক অফিসার সৌমিত্র রায়ের সঙ্গে আলাপ হল। সুপুরুষ যুবক, অমায়িক ব্যবহার। কিন্তু সহকর্মীরা সাবধান করে দিল, লোকটা সারা রাত মদে চুর হয়ে বাস টার্মিনাসে ডিউটি করে! কিন্তু কেউ তাকে মাতাল হতে দেখেনি। অ্যানুয়াল স্পোর্টসের দিন ওর একটা গুণের পরিচয় পেয়ে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম। শহরের এক পাশে, রাসমেলার বিরাট মাঠে জিপগাড়ির রেস হত। স্পিডে গাড়ি চালানোর রেস না, ধীরগতিতে আর এঁকেবেঁকে চালানোর রেস। মাঠের মাঝখানে অনেকগুলো বাঁশের খুঁটি পোঁতা, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে এঁকেবেঁকে জিপ চালাতে হবে। কোনও খুঁটির গায়ে সামান্য ধাক্কা লাগলেই নম্বর কাটা। স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাঘা বাঘা সব ড্রাইভাররা এই খেলায় যোগ দিতেন। কিন্তু সৌমিত্রদাই প্রতি বছর ফার্স্ট। অবাক হয়ে ভাবতাম, ওকে তো কখনও গাড়িই চালাতে দেখিনি! পরে জেনেছি, ওর যেমন গাড়ির হাত, তেমনই গানেরও গলা। চাঁদনি রাতে অফিসের ছাদে পিকনিক, সৌমিত্রদার উদাত্ত গলায় ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ শুনে সবাই মুগ্ধ!

ছবি: সুমিত্র বসাক

ও দিকে শ্যামলদা একটা প্রমাণ সাইজের বাটি নিয়ে রাঁধুনির পাশে বসে গেছেন। দিল খুশ, মেটে চচ্চড়ি আর স্কচে মজে। আমার মনে একটা প্রশ্ন বহু দিন ধরেই খচখচ করছিল, আজ সুযোগ বুঝে করে ফেললাম। বাস ড্রাইভারদের তো অনেক রকম অ্যালাওয়েন্স দেওয়া হয়, কিন্তু ‘মিল্ক অ্যালাওয়েন্স’টা কী? হেসে বললেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেবের ধারণা, ড্রাইভাররা বড় বড় বাস চালায় বলে ওদের প্রচুর এনার্জির প্রয়োজন। তাই ওদের জন্যে ‘মিল্ক অ্যালাওয়েন্স’-এর ব্যবস্থা করেছেন।’



স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাসে বিনা পয়সায় যাতায়াতের জন্য অফিস থেকে একটা পাস পেয়েছিলাম। লক্ষ করতাম, স্টেট বাসে চড়লেই ড্রাইভার-কন্ডাকটররা মুখটা কেমন ব্যাজার করে রাখে। শ্যামলদাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, অফিসাররা বাসে উঠলে ওদের উপরি আয় কমে যায়। টিকিট-ছাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে বেআইনি পয়সা আদায় করতে পারে না কিনা!

ক’দিন পরেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। ট্রান্সপোর্টের বাসে শিলিগুড়ি যাচ্ছি, পথে এক সাইকেল-আরোহীকে চাপা দিল আমাদের বাস। লোকটা তক্ষুনি মারা গেল। দিনটা ছিল হাটবার। মারমুখী জনতা ঘিরে ফেলল বাসটাকে। ড্রাইভার কন্ডাকটর ‘ওই যে আমাদের অফিসার’ বলে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে চোঁ-চাঁ দৌড়। এ দিকে মারকুটে লোকজন আমাকে বাস থেকে টেনে নামিয়ে বলতে লাগল, ব্যাটাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ধোলাই দে। সে দিনই হয়তো মরে যেতাম। হঠাৎই একটা পুলিশের জিপ এসে পড়ল, আমার পরিচয় পেয়ে ওদের গাড়িতে তুলে পৌঁছে দিল লোকাল থানায়। অনেক রাতে ছাড়া পেলাম। তার পর থেকে আর বিনা পয়সার বাসে উঠতাম না। টিকিট কেটে প্রাইভেট বাসেই যাতায়াত করতাম।

আর এক বার বিপদে পড়েছিলাম পাহাড়ি পথে। শিলিগুড়িতে এক বিকেলে ডিভিশনাল ম্যানেজার ডেকে বললেন, পর দিন সকালে দার্জিলিং গিয়ে, ওখানকার স্টেট ট্রান্সপোর্ট ডিপো-র সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন করে, সে দিনই রাতে ফিরতে হবে। পরিবহন মন্ত্রী রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। আসলে তখন সুবাস ঘিসিঙ্গ দার্জিলিং আর কালিম্পং ডিপোর মালিকানা হস্তান্তরের জোর দাবি তুলেছিলেন। ঘোর বর্ষাকাল, তিন দিন ধরে তুমুল বৃষ্টি। ধস নেমে হিলকার্ট রোড বন্ধ। যানবাহন কিছুই চলছে না। ড্রাইভার বলল, আপনি আমাদের মিনিবাসে মিরিকের রাস্তা ধরে দার্জিলিং চলে যান। গেলাম সে ভাবেই। কাজ শেষ হতে সন্ধে সাতটা। ওই মিনিবাসেই ফিরছি, বাসে শুধু আমি আর ড্রাইভার। বৃষ্টিতে চার দিক গাঢ় সাদা, পাঁচ ফুট দূরেও কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। ড্রাইভার মাঝে মাঝে পকেট থেকে একটা বোতল বের করে চুমুক দিচ্ছে, আর অন্ধকার রাস্তায় পুরো আন্দাজে গাড়ি চালাচ্ছে। এক দিকে পাইন বনে ঢাকা পাহাড়, অন্য দিকে গভীর খাদ। হঠাৎ টায়ার পাংচার। বাসটা গড়াতে গড়াতে খাদের দু’ইঞ্চি দূরে এসে থেমে গেল। কপালে মৃত্যু ছিল না বলেই বোধহয় বেঁচে গেলাম। শুনশান জায়গা, ঘন অন্ধকার। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে চাকাও ঠিক করা যাবে না। সঙ্গে কোনও খাবারও নেই। ড্রাইভার বাসের মেঝেতে সিট-কভার পেতে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ল পাঁচ মিনিটেই। সারা রাত জেগে বসে ছিলাম। পর দিন সকাল দশটায় চাকা সারিয়ে সোজা অফিস।

অরূপ কুমার বসু, শিলিগুড়ি

arup_321.in@rediffmail.com

ফুল ফুটুক না ফুটুক, তিনি আছেন

পজ সাহা

লিখছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ছবি: তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়

সব সময়েই কোনও এক জন কবি ‘সেই সময়ের কবি’ হিসেবে পরিচিত, চিহ্নিত হয়ে যান সাধারণ মানুষের কাছে। আমরা যখন এখানে টেলিভিশন শুরু করি, প্রথম একক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সুভাষদা পড়লেন, ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।/ মালা/ জমে জমে পাহাড় হয়/ ফুল জমতে জমতে পাথর।’ এই কবিতাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের অনুষঙ্গ। একটি নির্ভার প্রেমের কবিতা শুনিয়েছিলেন, ‘মুখখানি যেন ভোরের শেফালি/ নেমে গেল এক্ষুনি।/ দু-অধরে চেপে চাঁদ একফালি/ নেমে গেল এক্ষুনি।’ বলেছিলেন, শুধু ‘সংগ্রামের ডাক আর চড়া গলার দাবি’ নিয়ে প্রগতিশীল কবিতা হয় না। বলেছিলেন, তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে মনে করতেন তাঁর স্কুলের শিক্ষক কবি কালিদাস রায় তাঁকে নিজেই সাহিত্যকৃতির জন্য যে পুরস্কার দিয়েছিলেন, সেটিকেই। সাহিত্যে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল গদ্য দিয়ে। কিন্তু খবরের কাগজে প্রথম নাম বেরোয় ফুটবলে গোল করে! সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের টিমে ভাড়াটে খেলোয়াড় হয়ে ঘুরেছেন অনেক জায়গায়। তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথাও শুনিয়েছিলেন। হেমন্ত তখন গল্প লেখেন আর শাঁখারিপাড়ায় কল্যাণ সংঘ পাঠাগারের সাহিত্য বিভাগের দায়িত্ব সামলান।

সুভাষদা নিজের বাজার করার প্রীতি নিয়ে গল্প করেছিলেন, বলেছিলেন, ‘বাজার হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনের মুকুর।’ তাঁর মা যামিনী দেবীরও নিজের হাতে বাজার করার খুব শখ ছিল। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই যান না কেন, সময় পেলে সেখানকার বাজারে এক বার ঢুঁ মারবেনই। এক দিন সুভাষদার বাড়িতে ঢোকার মুখে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। একটা খালি প্যারাম্বুলেটর নিয়ে বেরোচ্ছেন। বললেন, ‘একটু বোসো, বাজার করে নিয়ে আসি।’ প্যারাম্বুলেটর নিয়ে! বললেন, ‘হ্যাঁ, বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে, এটা তো এমনিই পড়ে থাকে, তাই কাজে লাগাচ্ছি।’ সুভাষদার স্ত্রী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন, ‘সুভাষের বাজার করা জানো না! বাজারে গিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা বের করতে গিয়ে বেরল মস্কো যাওয়ার সে দিনের প্লেনের টিকিট। সেখান থেকে বাজারের ব্যাগ নিয়েই প্লেনে উঠে সোজা মস্কো।’ সুভাষদা হেসে বলতেন, ‘গীতা একটু বাড়িয়ে বলে।’ খুব অন্য রকম দাম্পত্য জীবন ছিল তাঁদের। এক দিন সুভাষদার বাড়ি যেতেই গীতাদি জোরাজুরি করতে লাগলেন, রাতে তাঁদের সঙ্গে খেতে হবে। খাওয়ার টেবিলে দেখি অনেক আয়োজন। একই সঙ্গে চিংড়ি, ইলিশ। গীতাদি বললেন, ‘আমি চিংড়ি পছন্দ করি আর সুভাষ ইলিশ। আজ দুজনের পছন্দমতই রান্না হয়েছে।’ বললাম, আজ কি আপনাদের বিবাহবার্ষিকী? দুজনেই সলাজ হাসি হাসতে লাগলেন।

দূরদর্শনের প্রথম দিকে এক বার আন্দোলন হচ্ছে, ঠিক হয়েছে আমরা অনশনে বসব। সুভাষদাকে গিয়ে জানালাম। শুনে বললেন, ‘আমিও বসব তোমাদের সঙ্গে অনশনে। শুধু আগের দিন জোলাপ খেয়ে পেটটা পরিষ্কার করে নিতে হবে।’ মনে পড়েছিল, জেলে সুভাষদার একটানা সাতচল্লিশ দিন অনশনের অভিজ্ঞতা আছে।

এক বার আমাদের শারদ সাহিত্য অনুষ্ঠানে সুভাষদার অল্প বয়সের বন্ধু সন্তোষকুমার ঘোষ বললেন, এ বারের কয়েকটি শারদ সংখ্যায় সুভাষদার কবিতায় ছন্দের নিজস্ব নিপুণ ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ। পাশে বসে-থাকা সুভাষদা খুব সরল ভাবে বললেন, ‘আমি তো অত ছন্দ-টন্দ বুঝি না, ছন্দ কখনও শিখিওনি। যেমন প্রাণ চায় তেমনি লিখি।’ সন্তোষদা খুনসুটি করে বললেন, ‘সুভাষ, এ-সব বললে হবে! প্রবোধচন্দ্র সেনের মতো ছান্দসিক যে তোমার ‘পদাতিক’ বইয়ের ছন্দ ব্যবহার দেখে বিস্মিত হয়ে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় এত কথা লিখেছেন!’ অপ্রস্তুত সুভাষদার মুখে ছড়িয়ে পড়ল শিশুর মতো সারল্যের হাসি।

আমাদের কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে হলে, সুভাষদার সঙ্গে কখনও টেলিফোনে আলোচনা করতাম না। সোজা চলে যেতাম তাঁর ৫বি শরৎ ব্যানার্জি রোডের বাড়িতে। এক দিন গিয়ে দেখি, সুভাষদা খালি গায়ে মেঝেয় বসে ঘড়ি সারাচ্ছেন। ভীষণ গরম, কিন্তু ঘরে ফ্যান চলছে না। বললেন, ‘এত লোডশেডিং হয়, তাই যখন কারেন্ট থাকে তখনও মাঝে মাঝেই ফ্যান বন্ধ রেখে শরীরটাকে সইয়ে রাখি। একটু বোসো, ঘড়িটা সারিয়ে নিই। তোমাদের কোনও ঘড়ি বা টেবিল-ল্যাম্প খারাপ থাকলে আমাকে দিয়ো, সারিয়ে দেব।’ গীতাদি শুনতে পেয়ে বললেন, ‘কক্ষনও ঘড়ি-টড়ি সুভাষকে দেবে না, আরও খারাপ করে দেবে।’ এক দিন বাড়িতে যেতেই গীতাদি আমাদের সামনে দু’বাটি পায়েস রাখলেন। বললেন, ‘আগে পায়েস খেয়ে নাও, পরে কথা বলবে।’ পায়েস কেন, জিজ্ঞেস করতেই দেখি সুভাষদার মুখে অনাবিল হাসি, বুঝলাম আজ ওঁর জন্মদিন। এই রে, কোনও উপহার তো আনিনি আমরা! সহকর্মী শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত তক্ষুনি সুভাষদাকে নিয়ে একটি ছড়া লিখে উপহার দিলেন। ছড়াটার খুব প্রশংসা করে বললেন, ‘এই যে তোমরা এসেছ, আবার কী সুন্দর ছড়া লিখে দিলে, এর চেয়ে ভাল উপহার আর কী হতে পারে!’ এক বার পুরো একটা ফিল্ম করেছিলাম সুভাষদার ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত’ কবিতাটি নিয়ে। দেখে সুভাষদা খুব খুশি হয়েছিলেন।

ষাটের দশকের শেষের দিকে ইন্সটিটিউট অব অডিয়োভিস্যুয়াল কালচার-এর তরফ থেকে কেবলমাত্র কবিতা আবৃত্তি নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড শুরু করেছি। সুভাষদার বাড়ির দু-একটা বাড়ি পরেই ছিল আমাদের আখড়া। সুভাষদাকে নিয়ে আসতাম সেখানে। প্রথমে যে সমবেত আবৃত্তির অনুষ্ঠান, সেটা শুরু করতাম ওঁর কবিতা দিয়েই। ‘একটি কবিতা লেখা হবে। তার জন্যে/ আগুনের নীল শিখার মতন আকাশ/ রাগে রী-রী করে, সমুদ্রে ডানা ঝাড়ে/ দুরন্ত ঝড়।’

সুভাষদার ৭৫ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়েছিল ভারতীয় ভাষা পরিষদে। আমরা দূরদর্শন থেকে অনুষ্ঠানটি কভার করেছিলাম। আমার উপর দায়িত্ব ছিল মঞ্চে অনুষ্ঠানটি সংযোজনা করার। দেখেছিলাম, অনেক হইচইয়ের মধ্যেও সুভাষদা কেমন উদাসীন নির্জনতার মধ্যে ডুবে।

১৯৮৪ সালে এক লাইভ কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে সুভাষদাকে নিয়ে এসেছি। রিহার্সালের মধ্যে তৎকালীন ডিরেক্টর আমাকে ডেকে জানালেন, নির্বাচনের তারিখ একটু আগেই ঘোষিত হয়েছে। শুনেই সুভাষদা উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আমি ইলেকশনে কংগ্রেসের হয়ে ক্যাম্পেন করছি, আজ আমার এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না।’ কংগ্রেসের হয়ে ক্যাম্পেন! বামপন্থী সুভাষদার! বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ।’

২৩ আষাঢ় ১৪১০, মঙ্গলবার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর স্মরণ-অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর অনেক কবিতা। শেষে ছিল: ‘আগুনের একটি রমণীয় ফুল্‌কি/ আমাকে ফুলের সমস্ত ব্যথা/ ভুলিয়ে দিক।’

আরও পড়ুন

Advertisement