E-Paper

কবির কবিতাকেই নৃত্যরূপ দেন আমেরিকান নৃত্যশিল্পী

তিনি রুথ সেন্ট ডেনিস। রবীন্দ্র-কবিতা নিয়ে মুগ্ধতা ছিল তাঁর। এক বার কবির একটি কবিতায় নৃত্যরূপ দিয়ে তাঁর সামনে পরিবেশন করলেন। কবির ভাবনায় খুলে গেল নতুন দিগন্ত। স্বরচিত নাটকগুলি পরিবর্তন করলেন নৃত্যনাট্যে। শান্তিনিকেতন পেল তার নির্দিষ্ট নৃত্যশৈলী।

অতনুকুমার বসু

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৬
সাহচর্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রুথ সেন্ট ডেনিস।

সাহচর্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রুথ সেন্ট ডেনিস।

রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনা সম্পর্কিত আলোচনায় প্রবেশের আগে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, তিনি ছিলেন প্রধানত এক জন কবি। তাই তাঁর নৃত্যশৈলী ও রূপায়ণ এক জন কবির দৃষ্টিপথ ধরেই দেখা। কবি তাঁর কবিতায় শব্দ-ছন্দ-বিন্যাস প্রভৃতির মধ্য দিয়ে বিমূর্ত অবয়ব তৈরি করেন। যে অবয়বে ধরা থাকে কবির ভাবনা, দর্শন, জীবনবোধের পরিচয়। কবি যখন তাঁর কবিতা বা গানকে নৃত্যের অবয়বে প্রত্যক্ষ করছেন, বা নৃত্যের মাধ্যমে রূপায়ণে সচেষ্ট হচ্ছেন, তিনি তখন তাঁর কাব্যদেহে সামগ্রিক ভাবনার প্রতিফলনকেই ভঙ্গিমা, অভিনয় এবং ভাবের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরতে চাইছেন। কবিতা আর নৃত্য— সৃষ্টির এই দুই আনন্দরূপকে একে অপরের মধ্যে দিয়ে অনুবাদের প্রচেষ্টা। কবিমন এই আনন্দের রূপান্তরটুকু কতটা সফল ভাবে হচ্ছে এটাই বার বার প্রত্যক্ষ করতে চায়।

রবীন্দ্রনৃত্য বিষয়ক আলোচনায় যুক্তিসঙ্গত কারণেই মণিপুরি নৃত্য, জাভা ও বালির নৃত্যধারা এবং জার্মান নৃত্যপ্রসঙ্গ পৃথক পৃথক উপস্থাপনার দাবি রাখে। মণিপুরি নৃত্যের সঙ্গে কবির পরিচয় মণিপুর থেকে শান্তিনিকেতনে নৃত্যের শিক্ষকদের আগমনের বেশ আগে। ১৮৯৯ সালে ত্রিপুরায় বসন্তোৎসবে কবি প্রথম মণিপুরি নৃত্য পরিবেশন দেখেন। কিন্তু তখনও শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের দ্বার উন্মোচন হয়নি। এর প্রায় দু’দশকের ব্যবধানে ১৯১৯ সালের নভেম্বরে কবি সিলেটে গিয়ে নিকটবর্তী মছিমপুর নামক মণিপুরি গ্রামে পুনরায় মণিপুরি নৃত্য দেখে অভিভূত হন ও তখনই শান্তিনিকেতনে এই নাচ শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই সূত্র ধরেই কবির বিশেষ বন্ধু, ত্রিপুরার রাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য ১৯২০ সালে বুদ্ধিমন্ত্র সিংহ ও সঙ্গে এক জন মৃদঙ্গবাদককে মণিপুরি নৃত্যের প্রশিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে পাঠান। সেই থেকেই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে মণিপুরি নৃত্যের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের শুরু। পরে ১৯২৫ সালে নবকুমার সিংহের শান্তিনিকেতনে পদার্পণ থেকে মণিপুরি নৃত্যের জনপ্রিয়তা, প্রসার এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সূত্রপাত। এর সঙ্গে সঙ্গে ১৯২৭ সালে কবির জাভা ও বালি ভ্রমণ বা মূলত পুত্রবধূর প্রেরণায় জার্মানির ইয়স নৃত্যের প্রভাব (১৯৩০) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এ ছাড়াও নানা প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে, এমনকি বিশ্বের নানা প্রান্তে কবির যে নিরন্তর ভ্রমণ, এবং এই ভ্রমণসূত্রে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মেলামেশা এবং পরিচয়ের সুযোগ, তাকেও কোনও ভাবে উপেক্ষা করা যায় না। সৌরাষ্ট্রের গরবা ও ডান্ডি, সিংহলের ক্যান্ডি, বোম্বাই-শিলং-বাগদাদে রণনৃত্য, কেরলের সমবেত লোকনৃত্য, কথাকলি, গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী, গ্রামবাংলার বাউল নৃত্য ইত্যাদি অজস্র টুকরো অভিজ্ঞতা তাঁকে বিভিন্ন ভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। ইংল্যান্ডে কিশোরবয়সে (১৮৭৮) বিদেশি নৃত্য, জাপানি নৃত্য (১৯১৬) বা মস্কোয় ব্যালে নৃত্যও (১৯৩০) কবি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

শান্তিনিকেতনে ১৯০৮-এর পর থেকে প্রায় প্রত্যেক শারদোৎসবেই নিতান্তই অপটু ছন্দে মনের আনন্দে গানের তালে হাত-পা মেলানোটাই নাচের হাতেখড়ি বলা যায়। তবে সেই সময় নৃত্যশিক্ষা বলে সেই অর্থে কিছু ছিল না। অমিতা সেন বলেছেন, “শারদোৎসবেই আমরা নৃত্যের অ আ ক খ-র স্তর ছাড়িয়ে উঠেছিলাম।” আবার ১৯১৭ সালে ‘ডাকঘর’ নাটকে কবি ঠাকুরদা ও রাজকবিরাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সীতা দেবী এই অভিনয় প্রসঙ্গেই জানাচ্ছেন, “নাটকে গান কোথাও নাই, তবু একবার বাউল সাজিয়া ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে’ গাহিয়া নৃত্য করিতে করিতে রবীন্দ্রনাথ মাধবদত্তের ঘরের পাশ দিয়া চলিয়া গেলেন।” ১৯২৩ সালে ‘বসন্ত’ নাটকের শেষ গানে কবি, এলমহার্স্ট-সহ আরও কয়েক জন নেচেছিলেন। এই ভাবেই কখনও ‘ঋণশোধ’, কখনও ‘রাজা’, ‘অচলায়তন’, ‘ফাল্গুনী’ বা ‘বসন্ত’ নাটক প্রভৃতির মধ্য দিয়ে নৃত্যের বিভিন্ন ছোটখাটো প্রয়োগ চলছিলই। কিন্তু তখনও প্রথাগত কোনও নৃত্যধারণা দানা বাঁধেনি। তখনকার স্মৃতিচারণে ইন্দিরা দেবী বলেছেন, “তখনকার কালে আমাদের অভিনয়ে এত নাচের চল ছিল না। নৃত্যনাট্য দূরে থাকুক, অতি সামান্য ভাবেও কোনো বিশেষ প্রচলিত নৃত্যধারা শিক্ষা দেবার কোনোরকম কল্পনাই কারো মাথায় আসে নি।” তা হলে রবীন্দ্রনাথের মনে এই নৃত্যভাবনার সূত্রপাত কোথা থেকে এল? রবীন্দ্রনৃত্য মানে যে বিভিন্ন নৃত্যধারার উপযুক্ত, সুষম এবং নান্দনিক সংমিশ্রণ, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু কবির মনে নিজের গান বা কবিতার নৃত্যায়নের পরিকল্পনা কোথা থেকে উন্মেষ হল?

এই প্রসঙ্গেই আমেরিকান নৃত্যপটীয়সী রুথ সেন্ট ডেনিসের অবতারণা। তিনি এবং তাঁর স্বামী টেডি শোন, দু’জনেই ছিলেন আমেরিকার খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী। ১৯২৫ সালের অগস্টে যাত্রা শুরু করে ডেনিশান ডান্স কোম্পানি জাপান, চিন, হংকং, সিঙ্গাপুর, তৎকালীন রেঙ্গুন হয়ে পরের বছর ৭ জানুয়ারি কলকাতায় পৌঁছয়। ভারতে পা রাখার আগে জাপান, চিন এবং বর্মায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁরা নৃত্য প্রদর্শন করেছিলেন।

তবে ভারতে পদার্পণের অনেক আগেই ডেনিসের ভারতীয় নৃত্য, পৌরাণিক কাহিনি ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর প্রাচ্যের নৃত্যধারা সম্পর্কে আগ্রহ ও উৎসাহের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ‘রাধা’ নৃত্য প্রদর্শন। মূলত ব্যালে ও অন্যান্য পাশ্চাত্য নৃত্যচর্চার মধ্যে থেকেও মিশর, গ্রিস এবং ভারতীয় নৃত্য সম্পর্কে তিনি প্রথম থেকেই বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। প্রাচীন ও প্রাচ্য-নৃত্য সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ থেকেই তিনি ‘রাধা’, ‘কোবরা’ ইত্যাদি বিভিন্ন পৌরাণিক বা লৌকিক কাহিনি বা জীবনাশ্রিত বিষয়কে নৃত্যে উপস্থাপিত করতে সচেষ্ট হন। রাধা ও কৃষ্ণের উচ্ছল প্রেমের সম্পর্কের পাশাপাশি জীবনের আলো-আঁধার মিশ্রিত বিরহ বা মনোকষ্টের বিষয়েও তিনি অবহিত ছিলেন। তাই পারস্পরিক সম্পর্কের উপস্থাপনায় দেহজ ভঙ্গিমার ভিতর দিয়ে চরিত্রের ‘মুড’কে তুলে ধরার প্রতি তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। হাডসন থিয়েটারে একটি শো-এ পরিবেশিত হয়েছিল ‘রাধা’ এবং পরেরটিতে ‘কোবরা’। নিউ ইয়র্কের সেই মঞ্চটি রূপান্তরিত হয়েছিল এদেশের দেহাতি হাট বা বাজারের আদলে। দর্শকদের মনে হয়েছিল, রঙিন পোশাকে সজ্জিত এক সাপিনী হাতে বিন নিয়ে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে, আঙুলে রঙচঙে আংটি, গলায় সাপ ঝুলিয়ে হাত দু’টিকে একত্র করে আঙুলগুলিকে সাপের ফণার ভঙ্গিতে সর্পিল এক দেহভঙ্গিমা উপস্থাপিত করছেন। নৃত্য রূপায়ণের এই খুঁটিনাটি, বিষয়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ পোশাক এবং অন্য অনুষঙ্গ, কৌশল, সব মিলিয়ে প্রাচ্য তথা ভারতীয় পৌরাণিক ও লোকনৃত্য সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা প্রকাশ করে।

১৯২৬ সালের ৭ জানুয়ারি রেঙ্গুন থেকে জাহাজে ডেনিশান কোম্পানি নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে কলকাতা বন্দরে পা রাখে। তাঁরা প্রায় চার মাসের দীর্ঘ ভারত সফরে (৭ জানুয়ারি-৯ মে) কলকাতা, বোম্বাই, করাচি, কোয়েটা, লাহোর, কানপুর, লখনউ, দিল্লি, জব্বলপুর, এলাহাবাদ, সেকেন্দ্রাবাদ, মাদ্রাজ প্রভৃতি শহরে সুনামের সঙ্গে প্রায় একশোটি নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশন করেন। ভারত তথা কলকাতায় তাঁদের প্রথম নৃত্য প্রদর্শন ছিল এখানে পৌঁছনোর ঠিক পরের দিন। ডেনিস রাধা ও তাঁর ক্রীড়াসঙ্গী বালকদের ভাবনা নিয়ে প্রথম উপস্থাপনাটি করেন একেবারে ভারতীয় ঐতিহ্য ও ঘরানা মাথায় রেখে। সুনিপুণ ভাবে শাড়ি পরে এবং নৃত্যের ভাব ও ভাবনা অনুযায়ী শাড়ির আঁচল ইত্যাদি ব্যবহার করে মেজাজ তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা সবার নজর কেড়েছিল। তাঁর সেই প্রথম উপস্থাপনায় আমেরিকান কাউন্সেল জেনারেল-সহ অনেক গণ্যমান্য সরকারি আধিকারিকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। বোম্বাইতে ডেনিস বিশেষ ভাবে পরিচিত হয়েছিলেন সরোজিনী নায়ডুর সঙ্গে। হায়দরাবাদে তাঁদের কনসার্টে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং নিজ়াম।

তবে কলকাতায় কবির সঙ্গে দেখা হওয়ার অনেক আগেই তাঁর কবিতার সঙ্গে ডেনিসের পরিচয় হয়েছিল। স্বামী টেডির সঙ্গে প্রেমপর্বে মনের আদানপ্রদানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উঠে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রেমের প্রাথমিক ধাপে মনের উপর যখন মোহ ও মায়ার এক মিষ্টি আবরণ থাকে, সেই উপলব্ধির স্তর, অনুভবের স্বাদ তিনি কবির লেখায় খুঁজে পেয়েছিলেন।

পরস্পরের প্রথম সাক্ষাৎ কলকাতায়, যেখানে কবি ডেনিসের নৃত্য সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে কোনও বাক্যালাপ হয়েছিল কি না, এই বিষয়ে কোনও তথ্যপ্রমাণ মেলে না। তবে কলকাতায় ডেনিসের সঙ্গে কবির যোগাযোগের একটা তাৎপর্যপূর্ণ সূত্রের কথা বারিদবরণ ঘোষ উল্লেখ করেছেন, “...রুথ ডেনিস কলকাতায় একটি রবীন্দ্র চিত্র-প্রদর্শনী দেখে প্রেরণা পেয়েছিলেন।” প্রবীরকুমার দেবনাথ প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। কিন্তু পৌষমেলার পর রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে কলকাতার টাউন হলে সাত দিন ব্যাপী উৎসবে (২৫ ডিসেম্বর, ১৯৩১) কবির ভারতে তথা কলকাতায় প্রথম চিত্রশিল্প প্রদর্শিত হয়। ইতিপূর্বে কবির চিত্রপ্রদর্শনীর উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তবে এর পরের যোগসূত্রটি বিশেষ আকর্ষণীয়। বিষয়টি ১৯৩০ সালে কবির শেষ আমেরিকা সফর-কেন্দ্রিক। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সঙ্গে ডেনিস ইতিপূর্বেই বিশেষ পরিচিত ছিলেন। কিন্তু কবির সফরকালীন তাঁর মনে নতুন এক পরিকল্পনার উন্মেষ ঘটে। তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাব নৃত্যে রূপান্তরের মাধ্যমে উপস্থিত করে কবিকে সচক্ষে দেখানোর ব্যাপারে আগ্রহী হন। রুথ ডেনিস কবিকে সংবর্ধিত করার উদ্দেশ্যে দু’টি অভিনব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। প্রথম সংবর্ধনাজ্ঞাপক অনুষ্ঠানে কবির চিত্রপ্রদর্শনীর পাশাপাশি কবির কবিতা পাঠ হয় এবং ডেনিস কবির একটি কবিতা অবলম্বনে নৃত্য পরিবেশনা করেন। আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়— “রুথ সেন্ট ডেনিস হ্যাজ় দি অনার টু ইনভাইট ইউ টু অ্যান ইনফরমাল রিসেপশন অন ফ্রাইডে ইভনিং। ডিসেম্বর দি ফিফথ, অ্যাট দি ফিফটি-সিক্সথ স্ট্রিট গ্যালারিস, টু মিট ইন্ডিয়া’স গ্রেট পোয়েট, ফিলসফার অ্যান্ড পেন্টার রবীন্দ্রনাথ টেগোর। দ্য পোয়েট, অ্যাট দিস এগজ়িবিশন অব হিজ় পেন্টিংস উইল রিড সিলেকশনস ফ্রম হিজ় পোয়েমস। রুথ সেন্ট ডেনিস উইল গিভ হার ওন ইন্টারপ্রিটেশন অব ‘আ টেগোর পোয়েম’।” তাঁর কবিতার নৃত্যে রূপায়ণের ভাবনা ও উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে কবির কাছে ছিল এক অনন্য ও অভিনব বিষয়। কলকাতায় ডেনিসের নৃত্যশৈলী দেখার প্রায় তিন বছর পর, সুদূর আমেরিকায় নিজের কবিতার অবলম্বনে ডেনিসের নৃত্য পরিবেশনা প্রত্যক্ষ করা ছিল এক অভূতপূর্ব সংযোগ।

তার পরই যেন শুরু হল প্লাবন। নতুন দ্বীপ আবিষ্কারের নেশা যেন আবার পেয়ে বসল কবিকে। পুরনো লেখাগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নৃত্যনাট্যে রূপ দিতে শুরু করলেন। তেতাল্লিশ বছর পর (১৮৯২) ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটক থেকে হল ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য (১৯৩৫)। ‘চণ্ডালিকা’ও তাই। ‘পরিশোধ’ কবিতা রূপ নিল ‘শ্যামা’য়। নাচের প্রয়োজনেই ‘তাসের দেশ’-এ অন্তর্ভুক্ত হল আটটি নতুন গান। নাচের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝোঁক থেকেই শেষ পর্যন্ত ‘শাপমোচন’-এ গানের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াল ঊনত্রিশ। শান্তিনিকেতন ভাসল নৃত্যের ঢেউয়ে।

কবি চেয়েছিলেন, ডেনিস শান্তিনিকেতনে থেকে এই সমস্ত পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিন। কিন্তু সেই আশা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ডেনিসের বিকল্প হিসেবে কবি হাতের কাছে পেলেন আর এক অসাধারণ নৃত্যপটীয়সী গুজরাতি কৃষ্ণা হাতি সিং ওরফে শ্রীমতী ঠাকুরকে। কলাভবনের প্রথম ছাত্রী। পরবর্তী সময়ে (১৯৩৭) যিনি সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হিসেবে ঠাকুরপরিবারে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৩৩-এর ‘বর্ষামঙ্গল’ অনুষ্ঠানে শান্তিনিকেতন প্রত্যক্ষ করল কবির কবিতার অসামান্য ভাবনৃত্য রূপায়ণ। রচিত হল নতুন এক অধ্যায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy