সরস্বতী পুজোর দিনে খুদে ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি— বাঙালির কাছে এই দৃশ্য অতি পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরস্কার’, ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’, বিহারীলাল চক্রবর্তীর ‘সারদামঙ্গল’ থেকে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’— সর্বত্র সরস্বতীর বন্দনা রয়েছে। এই দেবীকেই নদীরূপে, মাতৃরূপে বর্ণনা করে তাঁর কাছে ‘দুঃখের জ্বলন’ জুড়োনোর কথা বলেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (‘মেঘনাদবধ কাব্য’)। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যে তিনি জ্যোতির্ময়ীও। নদী, মা বা জ্যোতি, যা-ই হোন না কেন, সরস্বতীকে নিয়ে সবার এমন ব্যাকুলতার প্রধান কারণ, তাঁর প্রসাদ পেলে জ্ঞানের মুক্তি বা প্রসার ঘটে। বিষয়টি পরিষ্কার হয় বেদ, বৌদ্ধ এবং জৈন, তিন ধর্মের শাস্ত্র-সূত্রেও।
সরস্বতীর নেপথ্যে রয়েছে ‘সরস্’ শব্দটি। ব্যুৎপত্তিগত ভাবে ‘সরস্’-এর সঙ্গে ‘বতুপ্’ প্রত্যয় এবং স্ত্রীলিঙ্গে ‘ঈপ্’ প্রত্যয় যুক্ত করে, সরস্বতী। সরস্ শব্দের অর্থ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে পণ্ডিতদের মধ্যে। এক দলের মতে, এর অর্থ জ্যোতি বা দীপ্তি। আবার অনেকে বলছেন, বহমান স্রোত, নদী বা জল বোঝাতেই এটি ব্যবহৃত। দু’টি মতের কারণই সংক্ষেপে বলা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত, মত যা-ই হোক, দু’টি বিষয়ের সঙ্গেই জ্ঞান ও তার প্রসারতার সম্পর্ক।
স্বামী নির্ম্মলানন্দ জ্যোতি অর্থের দিকেই মত দিয়ে মনে করেছেন, আলোকময়ী হওয়ার জন্যই দেবী সর্বশুক্লা। একই মত উমেশচন্দ্র বটব্যাল, শঙ্করনাথ ভট্টাচার্যদেরও। তাঁদের মত অনুসরণ করে তাই বলা যায়, সরস্বতীর সাধনা আদতে জ্যোতির সাধনা। কিন্তু কোন জ্যোতি? এই জ্যোতিকে আদতে যজ্ঞের অগ্নি হিসাবে বর্ণনা করছে ‘ঋগ্বেদ’। প্রসঙ্গত, ‘ঋগ্বেদ’-এ সরস্বতীর সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছেন ইড়া বা ইলা ও ভারতী দেবীও (‘আপ্রী সূক্ত’)। সম্পত্তিবান হতে এই তিন দেবীকেই এক সঙ্গে যজ্ঞে আহ্বান করার অজস্র ঋক্ রয়েছে। একই কথা আছে যজুর্বেদেও। এখানে এই তিন দেবীর স্বামী হিসেবে ইন্দ্রকে স্থান দেওয়া হয়েছে— ‘দেবীস্তিস্রস্তিস্রো দেবী পতিমিন্দ্রমবর্ধয়ন্’। যদিও অনেকের মতে, এখানে পতি শব্দের অর্থ পালক (মহীধর-ভাষ্য)। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে, ইড়া বর্ষা, ভারতী শরৎ এবং সরস্বতী শীত ঋতুর যজ্ঞ-স্বরূপা দেবী। তিন দেবীকে আবার তিন সরস্বতী হিসাবে দেখছে অথর্ববেদ— ‘ত্রিসঃ সরস্বতীরদুঃ’। ভাষ্যকার আচার্য সায়নও এই তিন দেবীকেই আদিত্য বা অগ্নি হিসাবে দেখছেন। ঋগ্বেদে সরস্বতীকে আহ্বান করে যজ্ঞের সমস্ত দ্রব্যকে গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা জানানো হচ্ছে। পরিবর্তে চাওয়া হচ্ছে অন্ন, ধন। পাশাপাশি, সুন্দরগমনা হিসাবে বর্ণনা করে প্রজ্ঞা-রূপ জ্ঞানপ্রাপ্তির জন্যও দেবী সরস্বতীর প্রার্থনা রয়েছে।
প্রার্থনার সঙ্গে বাক্ অর্থাৎ কথারও যোগ আছে। যদিও ‘ঋগ্বেদ’-এ আক্ষরিক ভাবে বিদ্যার সঙ্গে সরস্বতীর যোগসূত্র সে ভাবে দেখা যায় না। এই যোগসূত্রের সন্ধান মেলে অথর্ববেদ ও ব্রাহ্মণে। ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে বলা হচ্ছে— ‘বাক্ বৈ সরস্বতী’ বা ‘বাক্ হি সরস্বতী’। বস্তুত, বাগ্দেবী এবং সরস্বতীর ভিন্নতা-অভিন্নতা সংক্রান্ত তত্ত্বে আমরা যাচ্ছি না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, সরস্বতী বাক্-এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বেদে অগ্নি, ইন্দ্র এবং সূর্যের জন্য যে যজ্ঞাগ্নি জ্বালানো হয়, তার শব্দ বা মন্ত্রই হল যথাক্রমে ইলা, ভারতী, সরস্বতী। এই অর্থেই তাঁরা বাক্রূপ। সূর্যের সঙ্গে এই তিন দেবী তথা সরস্বতীর নিবিড় যোগাযোগটি বোঝা যায় কিছু বিশেষণ থেকে। ঘটনা হল, সূর্যের সাত অশ্ব। সরস্বতী-বর্ণনাতেও বার বার এসেছে ‘সপ্তাবয়বা’ শব্দটি। সরস্বতী তাঁর দীপ্তির দ্বারা স্বর্গ, মর্ত এবং অন্তরিক্ষকে পূর্ণ করেন। আলোর সাগরে তিনি কী ভাবে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যান, তার ব্যাখ্যাও আছে ঋগ্বেদে— ‘মহো অর্ণঃ সরস্বতী প্র চেতয়তি কেতুনা।/ ধিয়া বিশ্বা বি রাজতি।’ অর্থাৎ, আলোর মাধ্যমেই তিনি অন্ধকার, অজ্ঞানতাকে দূর করছেন। ‘দেবীভাগবত’-এও সরস্বতী জ্যোতিরূপা। এখানেই দেখা গিয়েছে, যাজ্ঞবল্ক্যের স্তবে প্রীত হয়ে দেবী জ্যোতিরূপেই আবির্ভূত হয়ে বর দান করছেন।
বস্তুত আলো যেমন বহমান-প্রসারিত, জল বা নদীর গুণও তা-ই। বেদের সরস্বতীকে জল হিসাবেই দেখছেন অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতো পণ্ডিতেরা— “‘সরস্’ শব্দের আদিম অর্থ যে ‘জল’ ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না, তাহা বেদের গোড়ার দিকের মন্ত্র হইতে বেশ বোধা যায়।” আচার্য সায়নের ব্যাখ্যায় এক জায়গায় পাওয়া যায়, সরস্বতী হলেন সর বা ‘জলসমন্বিত অন্তরিক্ষ দেবতা’। যাস্ক তাঁর নিরুক্তে বলছেন, সরস্বতী শব্দের অর্থ, যেখানে জল রয়েছে। ফলে সরস্বতীর নদী-রূপটি নিয়েও চর্চা হওয়া জরুরি। সপ্তসিন্ধু বলতে বোঝায় সাত সিন্ধু আর্যভূমিকে। ঋগ্বেদে বার বার নদী-স্তুতি রয়েছে। সেখানে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শতদ্রু প্রভৃতির বন্দনা আছে— ‘ইমং মে গঙ্গে যমুনে সরস্বতি শুতুদ্রি স্তোমং সচতা পরুঞ্চ্যা...’ প্রভৃতি। ঋগ্বেদে সরস্বতী ও সিন্ধু, এই দুই নদীরই মূল উল্লেখ। এর মধ্যে আবার প্রধান হলেন সরস্বতী। তাই বলা হচ্ছে— ‘(হে বশিষ্ঠ) তুমি নদীগণের মধ্যে বলবতী সরস্বতীর উদ্দেশে বৃহৎ স্তোত্র গান করো।’
সরস্বতী নদীরূপে বৈদিক যুগে, পুরাণ, ব্রাহ্মণেও বন্দিত হয়েছেন। সরস্বতীর তীরে যে যজ্ঞ, তা-ই পরিচিত সারস্বত যজ্ঞ হিসাবে। এমনকি, সরস্বতীর জলে পিতৃতর্পণের বিধানও রয়েছে ‘মহাভারত’-এর বনপর্বে— ‘সরস্বতীং সমাসাদ্য তর্পয়েৎ পিতৃদেবতাঃ’। শল্যপর্বে বলদেব সরস্বতীর তীরে বাস করার মতো সুখ নেই বলছেন। কিন্তু এই দেবী নিছক নদী হলেই কি তিনি প্রশস্তি দিতে পারেন? সেটা নয় বলেই, দেবীর কাছে আমাদের প্রার্থনা— ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবিতমে সরস্বতী/ অপ্রশস্তা ইব স্মসি প্রশস্তিম্ অম্ব নস্ কৃধি।’ (ঋগ্বেদ, ২.৪১.১৬) অর্থাৎ আমরা বলছি, হে সরস্বতী, আপনার মতো মা, নদী, দেবী আর কেউ নন। দেবী, আমরা বড়ই অপ্রশস্ত হয়ে আছি। আমাদের প্রশস্তি দিন। এই প্রশস্তি নিশ্চিত ভাবেই জ্ঞানের বিস্তারের।
সুতরাং, এটা বলাই যায়, সরস্বতী নদী বা আলো, যে রূপেই বন্দিত হন না কেন, তাঁর কাছে আমাদের প্রসারিত হওয়া, গতিশীল হওয়ার প্রার্থনা রয়েছে। ঘটনাচক্রে, নদীরূপা সরস্বতীর প্রবাহ মহাভারতের যুগের আগেই হারিয়ে গিয়েছে। তাই মহাভারতে সরস্বতীর প্রবাহ দেখতে না-পাওয়ার কথাও রয়েছে। যদিও সেখানে তিনটি নদী-খাতের কথা বলা হয়েছে। আর সরস্বতীর বিলোপ-স্থান হিসাবে বিশেষজ্ঞেরা রাজস্থানের বিনশন জায়গাটিকে উল্লেখ করেন। মহাভারতে অবশ্য সরস্বতীর সাগরসঙ্গমের কথা বলা হচ্ছে— ‘ততো গত্বা সরস্বত্যাঃ সাগরস্য চ সঙ্গমম্’। (বনপর্ব, ৮২।৬০) ঋগ্বেদের মন্ত্রেও সমুদ্রে সরস্বতীর লীন হওয়ার কথা রয়েছে (৭।৯৫।২)। সরস্বতীর বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশপাশে হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে।
প্রশ্ন হল, সরস্বতী নামে প্রচলিত অনেকগুলির নদীর মধ্যে কোনটি আসলে বৈদিক সরস্বতী? অনেকের মতে ব্রিটিশ আমলের পঞ্জাব পার্বত্যরাজ্য (বর্তমানে হিমাচল প্রদেশের অন্তর্গত) সিরমুরের পর্বত থেকে বেরিয়ে সরস্বতী আম্বালা, কুরুক্ষেত্র প্রভৃতি জায়গা, রাজস্থানের নানা অংশ পেরিয়ে প্রয়াগে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। অনেকের মতে সরস্বতীর উৎপত্তিস্থল মধ্য এশিয়াও হতে পারে!
প্রসঙ্গত, বেদে সরস্বতীর মূর্তিকল্পনা নেই। কিন্তু তাঁর শুভ্রবর্ণের আভাস আছে। অনেক পণ্ডিতদের মতে, তর্কসাপেক্ষ ভাবেই খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ভারহুত স্তূপের রেলিংয়ে খোদাই করা বীণাবাদনরত মূর্তিটিই এখনও পর্যন্ত সরস্বতীর প্রাচীনতম প্রাপ্ত-রূপ। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, সরস্বতীর মূর্তিকল্পনা, ন্যূনতম খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতেই পূর্ণ রূপে হয়ে গিয়েছে। এই রূপের প্রভাব বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে থাকা যে অসম্ভব নয়, তা-ও নানা সূত্রে বোঝা যায়। রূপকল্পনায় কিছু প্রভেদ থাকলেও, মোটামুটি ভাবে দেবীর যা গুণ, অর্থাৎ জ্ঞান বা বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী, সেটিই বৌদ্ধ ও জৈন সরস্বতীর বর্ণনাতেও এসেছে।
বোধিসত্ত্বের অর্থ হল যাঁর বুদ্ধত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে, অর্থাৎ পরম জ্ঞানের অধিকারী যিনি। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম প্রধান বোধিসত্ত্ব হলেন মঞ্জুশ্রী বা মঞ্জুনাথ বা মঞ্জুঘোষ। ইনি হলেন জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞার দেবতা। এঁকে বাগীশ্বরীও বলা হয়। সরস্বতী (এবং লক্ষ্মী) তাঁর শক্তি। সরস্বতীও বাগীশ্বরী। সাধারণ ভাবে, এঁর চারটি হাতে রয়েছে দণ্ড, বই, মালা, কমণ্ডলু। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটি রূপ নেপালের নেওয়ারি বৌদ্ধ। সেখানে মঞ্জুশ্রীর মন্দিরে সরস্বতী পূজিতা হন। তিব্বতে সাধারণ ভাবে বজ্র-সরস্বতীই বেশি দেখা যায়। এখানে দেবীর পরিচিত ‘যঙ্-চন্-ম’ বা ‘বঙ্-গি-ল্হ-ম’ নামে। এর অর্থ যথাক্রমে মধুর কণ্ঠের দেবী ও বাগ্দেবী।
আবার, বৌদ্ধ মহাযান সাধনায় সরস্বতীর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে জাঙ্গুলী তারা (যেখান থেকে পরে মনসার উৎপত্তি বলে মনে করেন অনেকে) এবং বজ্রতারার। বজ্রতারা শুভ্রবর্ণ। শ্বেতপদ্মে চন্দ্রের আসনে তাঁর অধিষ্ঠান। ডান হাতে বরদামুদ্রা। বাঁ হাতে তাঁর পদ্ম। জাঙ্গুলী দেবী সরস্বতীর মতোই সর্বশুক্লা, বীণাপাণি, হংসবাহনা। দেবীর অন্য দুই হাতের অভয়মুদ্রা ও অন্য হাতে সাপ। প্রসঙ্গত, আশুতোষ ভট্টাচার্যও মনে করেছেন, “জাঙ্গুলী দেবীর স্তবোক্ত সমস্ত গুণই অধুনা বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলিয়া পূজিতা সরস্বতী দেবীর উপরই প্রযোজ্য।” বস্তুত, এই দেবীর ছায়া কিন্তু জাপানেও রয়েছে। জাপানে যে সাত জন সৌভাগ্যদেবতা, তাঁদের অন্যতম হলেন, ‘বেন-জই-তেন’। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এই দেবীর মন্দিরও নদী, সমুদ্র বা জলাশয়ের পারে হয়। এ ছাড়া, সীতাতারা নামে আরও এক দেবীর কথা জানা যায়, যিনিও জ্ঞানদাত্রী।
বৌদ্ধ-দর্শন, পুজো পদ্ধতি সংক্রান্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘সাধনমালা’য় সরস্বতী নামেই কয়েকটি ধ্যান পাওয়া যায়: মহাসরস্বতী, বজ্রবীণা সরস্বতী, বজ্রসারদা, বজ্র-সরস্বতী বা আর্য বজ্র সরস্বতী। মহাসরস্বতী প্রজ্ঞা, মেধা, স্মৃতি, মতি নামে চার দেবী দ্বারা বেষ্টিত। বজ্রবীণা সরস্বতী মোটামুটি ভাবে মহাসরস্বতীর মতোই। তাঁর দুই হাতে বীণা। শ্বেতবর্ণা বজ্রসারদার হাতে রয়েছে ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’ বই। এই চারের মধ্যে আর্য বজ্র সরস্বতীর রূপটি বিশেষ ভাবে বলা যেতে পারে। এঁর ছয় হাত। তাঁর দক্ষিণ দিকের মুখ নীল, বাঁ দিকের শ্বেত বর্ণ।
এই বৌদ্ধ সরস্বতীর প্রভাবের ছায়া বাংলা সাহিত্যেও রয়েছে। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘মহাসরস্বতী’ কবিতায় দেবীর বন্দনা করেছেন এই ভাবে— ‘বিশ্ব-মহাপদ্ম-লীনা! চিত্তময়ী! অয়ি জ্যোতিষ্মতী!/ মহীয়সী মহাসরস্বতী!/... অন্ধকারে তুমি ঊষা-প্রভা’।
অন্ধকারে তিনি আলোর দীপ্তি বলেই বোধহয় জৈন তীর্থঙ্করেরাও এই দেবীকে বার বার শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বস্তুত, জৈন-শাস্ত্রে রোহিণী, প্রজ্ঞপ্তী, কালী, মহাকালী, গৌরী, গান্ধারী, মানবী, পুরুষদত্তা প্রভৃতি ষোলো জন বিদ্যার দেবী রয়েছেন। জৈন ধর্মে ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী হল শ্রুত। এঁরই অধিষ্ঠাত্রী হলেন শ্রুতদেবী। শ্রুতসুন্দর ব্রত, শ্রুতজ্ঞান ব্রত, শ্রুতপূজা প্রভৃতির থেকেও এই ধর্মে সারস্বত বন্দনার বিশেষ গুরুত্বের কথা বোঝা যায়। এ ছাড়াও, কর্নাটকের শ্রবণবেলগোলায় অষ্টধাতুর শ্রুতস্কন্ধযন্ত্র রয়েছে। এই সূত্রে লখনউ জাদুঘরে থাকা সরস্বতীর একটি ভগ্নমূর্তির উদাহরণও দিয়েছেন পণ্ডিতেরা। এটি সরস্বতীর অতি প্রাচীন মূর্তিগুলির একটি, যা ১৩২ খ্রিস্টাব্দে তৈরি বলে অনুমিত। মূর্তিটির হাতে রয়েছে বই। বিভিন্ন জৈন মন্দিরে থাকা সরস্বতীর দুই, চার, ছয়, আট, ষোলো হাত দেখা যায়। জৈন সরস্বতীর বাহন হিসাবেও মূলত হংসকেই দেখা যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা ময়ূর। জ্ঞানের সঙ্গেই যে জৈন সরস্বতীর মূল সম্পর্ক, তা বোঝা যায় জৈন ধর্মাবলম্বীদের আচার থেকেও। জৈনরা কার্তিক মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে উৎসব করেন, যা জ্ঞানপঞ্চমী বা সারস্বত উৎসব।
সুতরাং, এটা বলাই যায়, রূপ বা তত্ত্ব যা-ই হোক না কেন, সর্বত্রই এই দেবীর অধিষ্ঠান জ্ঞানেই। সেই জ্ঞান, যা আমাদের অহংকে নাশ করে মুক্তি, বিস্তারের পথ দেখায়। এই বিস্তারের সন্ধানেই কি মধ্যযুগের সাধক-কবি শুকুর মাহ্মুদের ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’-এও বলা হচ্ছে— ‘নম মাতা সরস্বতী বিখ্যাত সংসারে।’— এমন বন্দনাও তো জ্ঞানকে নির্মোহ করে তোলারই কথা!
তথ্যসূত্র: ‘ঋগ্বেদ’, ‘সরস্বতী’: অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, ‘দেবদেবী ও তাঁদের বাহন’: স্বামী নির্ম্মলানন্দ, ‘হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’: হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য,‘পূজা-পার্বণ’: যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, ‘সাধনমালা’ (বিনয়তোষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত, গায়কোয়াড়স ওরিয়েন্টাল সিরিজ়) প্রভৃতি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)