Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

তাঁর কলম নাড়িয়ে দিয়েছিল বিদেশি শাসনের ভিত

নির্দেশমাত্রই গর্জে উঠল বন্দুক, পড়ে গেলেন রিজ়াল, পড়লেন ঘুরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে।

সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়
০৯ জানুয়ারি ২০২২ ০৬:০২
প্রতিস্পর্ধী: হোসে রিজ়াল। ছবি সৌজন্য: উইকিমিডিয়া কমন্স

প্রতিস্পর্ধী: হোসে রিজ়াল। ছবি সৌজন্য: উইকিমিডিয়া কমন্স

আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল ফিলিপিন্সের চার শতক পুরনো স্পেনীয় শাসকদের মধ্যে। লেখকের নাম হোসে প্রোতাসিয়ো রিজ়াল। লিখেছিলেন মাত্র দু’টি উপন্যাস। প্রতিবাদী চিন্তা প্রকাশ করার শাস্তি হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। গুলিতে ঝাঁঝরা মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য দেওয়া হয়নি কফিনও।

নাম হোসে প্রোতাসিয়ো রিজ়াল। শান্ত মানুষ। জীবনের শেষ দিন আরও ধীর স্থির। নিজের সেলে বসে দেখা করলেন পরিবারের কয়েক জন সদস্যের সঙ্গে। লিখলেন কয়েকটি চিঠি। প্রথম চিঠিটি ভাই ফার্দিনান্দকে। সে জেলে এসে দেখা করতে পারেনি। নিজের সেলে পড়াশোনার জন্য পেট্রোলিয়ামের একটি ল্যাম্প ছিল তাঁর কাছে, সেটার আর তো দরকার নেই। মুখ নিচু করে বসে রয়েছে আদরের বোন ত্রিনিদাদ, চেষ্টা করছে দাদার সামনে ভেঙে না পড়তে। ত্রিনিদাদকে কাছে ডাকলেন হোসে, আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, তার পর সেই পেট্রোলিয়ামের বাতিটি তার হাতে তুলে দিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “সাবধানে নিয়ে যাস। বাতির মধ্যে আরও কিছু আছে।” বাতির ঢাকনার মধ্যে একটা ভাঁজ করা কাগজে লেখা ছিল রিজ়ালের শেষ কবিতা, ‘মি আলতিমো আদিয়োস’ বা ‘শেষ বিদায়’, যার প্রথম লাইন ছিল, ‘বিদায় আমার প্রিয় পিতৃভূমি…’

Advertisement

৩০ ডিসেম্বর, ১৮৯৬। সকাল ছ’টার কিছু ক্ষণ আগে, পায়ে হেঁটে ফোর্ট সান্তিয়াগো থেকে বেরোলেন হোসে রিজ়াল। দু’টি হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, মাথা উঁচু করে হেঁটে যাচ্ছেন বাগুমবায়ান মাঠের দিকে। মুখে স্মিত হাসি। পাশে হেঁটে চলেছেন লেফটেন্যান্ট আন্দ্রাদে, যিনি মামলায় রিজ়ালের হয়ে সওয়াল করেছিলেন। সঙ্গে প্রচুর সৈন্য, দু’জন মিশনারি পাদরি। সার দিয়ে আট জন সৈন্য দাঁড়িয়ে বন্দুক হাতে। এরা সবাই ফিলিপিন্সের নাগরিক। আরও আট জন সৈন্য বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের পেছনে, এরা স্প্যানিশ। এদের দায়িত্ব অভিনব। ফিলিপিন্সের নাগরিক সৈন্যরা যদি নির্দেশমাত্র গুলি না চালায়, তা হলে স্প্যানিশ সৈন্যরা গুলি করবে ফিলিপিনো সৈন্যদের। ফিলিপিনো সৈন্যদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালেন হোসে। সেটাই তখন রীতি। শেষ কথা তিনি বলেছেন, ‘কনসুমেতাম এসত’। সেন্ট জনের সমাচারে আছে, এ কথা বলেছিলেন জিশুখ্রিস্ট, ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায়। মানে— সব শেষ। কালো কাপড় নিয়ে এসেছিল এক জন, রিজ়াল চোখ বাঁধতে দেননি। দুই মিশনারি এগিয়ে এসেছিলেন ক্রস হাতে, রিজ়াল মুখ ঘুরিয়ে থেকেছেন।

নির্দেশমাত্রই গর্জে উঠল বন্দুক, পড়ে গেলেন রিজ়াল, পড়লেন ঘুরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে। স্পেনীয় মহিলারা যাঁরা এই মৃত্যুদণ্ড দেখার জন্য ভিড় করেছিলেন, তাঁরা আকাশের দিকে হাত তুলে নাড়লেন সুগন্ধি রুমাল, পুরুষেরা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে জানালেন বিদায় অভিবাদন। ব্যান্ড বেজে উঠল। শত শত ক্রুদ্ধ পরাধীন ফিলিপিন্সবাসী সে দৃশ্য দেখতে বাধ্য হলেন নীরবে।

শাসকের নিয়ম, বাড়ির লোকদের দেহ দেওয়া হবে না, জানানোও হবে না কোন কবরখানায় সমাধিস্থ হবেন হোসে। বোন নারসিসা বহু কবরস্থান ঘুরে ‘পাকো’ কবরস্থানে একটি সদ্য-খোঁড়া সমাধি দেখতে পেলেন, আন্দাজ করলেন সেটিই তাঁর প্রিয় ভাইয়ের। আন্দাজ মিলে গেল। কেয়ারটেকারকে কিছু টাকা দিলেন নারসিসা, অনুরোধ করলেন উপরে লিখে দিতে ‘আর পি জে’, উল্টো দিক থেকে রিজ়ালের নামের আদ্যাক্ষর। পরে জানা যায়, স্পেনীয় ঔপনিবেশিক প্রভুরা রিজ়ালের জন্য একটি কফিনও বরাদ্দ করেননি।

কে এই হোসে প্রোতাসিয়ো রিজ়াল? কেন তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হল মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে?

না, তিনি বিদ্রোহী দলের নেতা বা কর্মী ছিলেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামেও তিনি অংশ নেননি। ফিলিপিন্সের স্পেনীয় প্রভুদের বিরুদ্ধে মিছিলেও হাঁটেননি। তিনি মাত্র দু’টি উপন্যাস লিখেছিলেন। তাতেই আতঙ্কিত হয়েছিল ফিলিপিন্সে চারশো বছর উপনিবেশ গড়ে বসে থাকা স্পেনীয় প্রভুরা। সেই দু’টি উপন্যাসের নাম— ‘নোলি মে টেঙ্গেরে’ (আমাকে ছোঁবে না) ও ‘এল ফিলিবাসটুরেসমো’ (লোভের শাসন)।

রিজ়ালের পূর্বপুরুষ চিন থেকে এসেছিলেন ফিলিপিন্সে। ১৬৯৭ সালে ফিলিপিন্সে চিনা বংশোদ্ভূত মানুষের বিরুদ্ধে দাঙ্গা শুরু হয়, সেই বিপদ থেকে বাঁচতে তাঁরা ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন। রিজ়ালের জন্ম ১৮৬১ সালে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমবয়সি। ছাত্র হিসেবে অসাধারণ হোসে ছোট থেকেই নজর কাড়েন প্রবন্ধ ও কবিতা লেখায়। স্পেনীয়রা ফিলিপিন্সের যে পক্ষপাতপূর্ণ ইতিহাস রচনা করেছিলেন, যা স্কুলে পড়ানো হত, অল্প বয়সেই সেই ইতিহাসের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখতেন।

ম্যানিলার অদূরে ফোর্ট সান্তিয়াগো ছিল স্পেনীয় প্রভুদের ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র। এ দুর্গ তৈরি হয় ১৫৯৩ সালে। ঘটনাচক্রে ম্যানিলা গিয়ে দেখেছিলাম, ফোর্ট সান্তিয়াগোর এক অংশে এখন রিজ়াল মেমোরিয়াল। সেখানে বালক রিজ়ালের ছবি। বছর সাত-আটের সেই ছেলেটির চোখে যেন বিশ্বের আলো।

স্কুলের পাঠ শেষ করার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জানতে পারলেন, মায়ের চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছে। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, চোখের ডাক্তার হতে হবে, বাঁচাতে হবে মায়ের দৃষ্টিশক্তি। তখন সে দেশে ডাক্তারি পড়ার সুবিধা ছিল না, তাই পাড়ি জমাতে হবে মাদ্রিদে। বাবার ঘোর আপত্তি, তাই বাবাকে না জানিয়েই চড়ে বসলেন মাদ্রিদের জাহাজে। পয়সা তুলেছিল দাদা ও তার বন্ধুরা, চাঁদা তুলে। পরে বাবা সব জানতে পারেন ও হোসের পড়াশোনার খরচের দায়িত্বও নেন।

মায়ের চোখ বাঁচানোর জন্য মাদ্রিদ পাড়ি দিলেন ষোলো বছরের হোসে, এ দিকে চোখের জলে ভাসলেন এক কিশোরী। নাম রিভেরা। বয়স চোদ্দো। এর মধ্যেই পরস্পরকে মন দিয়ে ফেলেছে। নিয়মিত পত্রবিনিময় হত।

মাদ্রিদে ডিগ্রিলাভ ছাড়াও প্যারিস ও হিডেলবার্গে পড়াশোনা করে হিডেলবার্গে যখন চক্ষুবিশারদ হলেন হোসে, তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। এখানেই তিনি বিখ্যাত অধ্যাপক অটো বেকারের সংস্পর্শে আসেন, এখানেই হাতে পান সদ্য আবিষ্কৃত ‘অপথ্যালমোস্কোপ’ যন্ত্র। আর এখানে বসেই শেষ করেন প্রথম উপন্যাস ‘নোলি মে টেঙ্গেরে’। সঙ্গে অজস্র প্রবন্ধ, কবিতা। রিজ়াল ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা। লেখালিখি ও ডাক্তারির পাশাপাশি চলেছে ছবি আঁকা, ভাস্কর্য, উডকাটের কাজ। রিজ়াল নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সে ডায়েরিগুলি থেকে তাঁর জীবনের তথ্য সংগ্রহ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। ডায়েরির কিছুটা লেখা ফিলিপিনোতে, কিছুটা জার্মানে, আবার খানিক বাদে শুরু হয়েছে ফরাসি ভাষা। শোনা যায়, বাইশটি ভাষা আয়ত্ত ছিল তাঁর।

১৮৮৭ সালে ম্যানিলা ফিরলেন হোসে। বাড়িতেই খুললেন ক্লিনিক। প্রথম রোগী রিজ়ালের মা। তিনি তখন প্রায় অন্ধ। হোসে জানতেন রিভেরা ম্যানিলাতে নেই। সে তখন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে গিয়েছে দুশো কিলোমিটার দূরে পাঙ্গাসিনান-এ। যুবক রিজ়াল সবে তোড়জোড় করছে পাঙ্গাসিনান যাওয়ার, এমন সময়ে বাবা তাঁকে ডেকে পাঠালেন। বারণ করলেন রিভেরার কাছে যেতে। রিজ়াল তো অবাক। তাঁর মন অস্থির। গত এক মাস একটাও চিঠি আসেনি রিভেরার। তিনি যাবেন না? তত দিনে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে ‘নোলি মে টেঙ্গেরে’, সরকারের খাতায় লাল কালিতে নাম উঠে গিয়েছে হোসে-র। রিভেরার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের পরিবারও রাজরোষে পড়বে, এই ছিল সিনিয়র রিজ়ালের বক্তব্য। বাবার কথা মানলেন রিজ়াল।

লিখলেন আরও অনেক চিঠি, কিন্তু রিভেরা নীরব। সে নীরবতার কারণ জানা গেল প্রায় এক বছর পরে। এক রেলের ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করে তাঁর ঘরনি হয়ে গিয়েছেন রিভেরা। মারাত্মক ধাক্কা খেলেন রিজ়াল, আর কখনও রিভেরার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়নি।

হোশে রিজ়ালকে ছেড়ে চলে গেলেন লিয়োনর রিভেরা, কিন্তু অমর হয়ে থাকলেন হোসের লেখা ‘নোলি মি টেঙ্গেরে’-র মারিয়া ক্লারা চরিত্রের মধ্যে। আর কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্রিসোসতোমো ইবারা, যে অনেক বছর বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে আসছে আর বার বার রক্তাক্ত হচ্ছে ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিরোধিতায়, সে চরিত্র যে আত্মজৈবনিক তা আর বলে দিতে হয় না। রিজ়াল পরবর্তী কালে লিখেছিলেন, হ্যারিয়েট বিচার স্টো-র বিখ্যাত উপন্যাস ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখার প্রেরণা। ‘আমার দেশও তো আঙ্কল টমের মতই স্পেনীয় চাবুকে রক্তাক্ত হচ্ছে’— বলেছিলেন হোসে।

এমন সময় ‘নোলি মি টেঙ্গেরে’ উপন্যাসকে দেশদ্রোহিতা ও চার্চের বিরোধিতার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। আদালতে আবেদন জানানো হল, হোসেকে দেশান্তরিত করতে। কিন্তু কোর্টের হাতে তেমন কোনও আইন নেই। ফলে ক্ষিপ্ত রিজ়াল-বিরোধীরা রটিয়ে দিল, হোসে জার্মানি ও বিসমার্কের গুপ্তচর। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল, হোসে দেখলেন দেশে থাকা তাঁর পরিবারের পক্ষেও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

১৮৮৮ সালে রিজ়াল পাড়ি দিলেন হংকংয়ে। কিন্তু সেখানেও ছায়ার মতো লেগে রইল স্পেনীয় গুপ্তচর। অগত্যা চলে যেতে হল আমেরিকা, সেখান থেকে ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ মিউজ়িয়ামের গ্রন্থাগারে মন দিলেন পড়াশোনা ও গবেষণায়। সঙ্গে ধারাবাহিক লেখালিখি। ক্রমশ ইউরোপে বসবাসকারী ফিলিপিন্সের মানুষের কাছে রিজ়াল হয়ে দাঁড়ালেন তাঁদের মুখপাত্র। এ দিকে নিষিদ্ধ ‘নোলি মি টেঙ্গেরে’-র কপি তখন চলে গিয়েছে ফিলিপিন্সের ঘরে ঘরে।

১৮৯১-তে ঘেন্ট-এ রিজ়াল প্রকাশ করলেন তাঁর উপন্যাসের সিকুয়েল ‘এল ফিলিবাসটুরেসমো’ (লোভের শাসন)। এ বার আক্রমণের লক্ষ্য শুধু স্পেনীয় প্রভুরা নয়, সেই প্রভুদের ধামাধরা ফিলিপিনোরাও হোসে রিজ়ালের শাণিত কলমের আক্রমণে বিদ্ধ হলেন। শাসক ও শাসক-ঘনিষ্ঠরা দেখলেন, এ তো সরাসরি বিদ্রোহে প্ররোচনা!

১৮৯২-এ নিজের শহর ম্যানিলায় ফিরে এলেন রিজ়াল। তাঁর ইউরোপের বন্ধুরা বার বার বারণ করেছিলেন ফিলিপিন্সে আসতে, তিনি শোনেননি। যা-ই হোক না কেন, আর তিনি পালিয়ে থাকবেন না।

আদালত রিজ়ালকে নির্বাসিত করল ফিলিপিন্সের সুদূরতম দ্বীপ ডাপিটান-এ, যা ম্যানিলা থেকে হাজার মাইলেরও বেশি দূরে। এর মধ্যে রিজ়ালের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সম্পর্ক তৈরি হয়েছে জোসেফাইন ব্র্যাকেন নামে এক মহিলার সঙ্গে। ইচ্ছে থাকলেও ক্যাথলিক মতে বিয়ে করতে পারেননি রিজ়াল, চার্চের ফাদার বিয়ে দিতে অস্বীকার করেছেন। কোনও রকম বিয়ের আগেই চলে যেতে হল ডাপিটান-এ। জোসেফাইন গেলেন সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই থাকতে শুরু করলেন তাঁরা। হোসে সেখানকার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ও ইউরোপের বন্ধুদের সাহায্যে গড়ে তুলেছিলেন একটি স্কুল, পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা, একটি হাসপাতাল, স্থানীয়দের শিখিয়েছিলেন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের কাজ। রিজ়ালের গড়া সেই স্কুলে বিদেশি ভাষা হিসেবে পড়ানো হত ইংরেজি, সে দেশে সেই প্রথম।

রিজ়ালের নির্বাসনের পরেই ম্যানিলাতে স্থাপিত হয় একটি গুপ্ত সংগঠন যার নাম ‘কাটিপুনান’। লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা। রিজ়াল নিজে কিন্তু কখনও সে দাবি তোলেননি। তাঁর সর্বোচ্চ দাবি ছিল স্পেনীয় ও ফিলিপিনোদের সমান অধিকার। ১৮৯৬ সালে ‘কাটিপুনান’ সদস্য সংখ্যা তিরিশ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভ্যালেঞ্জুয়েলা নামে এক বন্ধু ডাপিটান-এ এসে রিজ়ালকে জানালেন, কাটিপুনান বিদ্রোহের জন্য তৈরি। কিন্তু রিজ়াল এতে রাজি নন। তাঁর মত ছিল, যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া এ কাজ করতে গেলে অকারণে প্রাণ যাবে। ‘এল ফিলিবাসটুরেসমো’ উপন্যাসে এক জায়গায় রিজ়াল লিখছেন, ‘শুধু তরোয়ালের ফলায় স্বাধীনতা আসবে না। সে দিন স্বাধীনতা আসবে যে দিন আমরা তার যোগ্য হয়ে উঠব। আর সে দিন পরম শক্তিমান ঈশ্বর নিশ্চয়ই আমাদের হাতে এমন কোনও অস্ত্র দেবেন যাতে চূর্ণ হয়ে যাবে পৌত্তলিকতা, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে অত্যাচারীর শাসন। স্বাধীনতা আসবে নতুন ভোরের মতো।”

কাটিপুনানের বিদ্রোহী কার্যকলাপ ছড়িয়ে পড়ল। উপন্যাস লিখে প্ররোচনার দায়ে গ্রেফতার হলেন হোসে। তারিখটা ৩ অক্টোবর ১৮৯৬। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন গভর্নর ব্লাঙ্কো। রিজ়ালকে কারাবন্দি করে রাখা হল ফোর্ট সান্তিয়াগোতে। যে বিপ্লব এখনই করা উচিত নয় বলে মত ছিল রিজ়ালের, সেই বিপ্লবের মূল সংগঠক হিসেবে তিনি বন্দি হলেন, অপেক্ষায় থাকলেন এমন এক বিচারের, যার রায় আগেই লেখা হয়ে গিয়েছে।

তদন্ত করে চার্জশিট গঠন হল এক দিনে, বিচার চলল মাত্র পাঁচ দিন। রিজ়ালের হয়ে লড়ার অনুমতিই পাননি কোনও আইনজীবী। ঘোষিত হল মৃত্যুদণ্ড। জীবনের শেষ চিঠিতে রিজ়াল লিখছেন, ‘কাল সকাল সাতটায় আমাকে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু আমি কোনও অপরাধ করিনি। আমার কোনও পাপবোধ নেই।’

আর মৃত্যুর দিন ভোর পাঁচটায় লিখলেন আর এক দলিল। জোসেফাইন ব্র্যাকেন-কে লিখিত ভাবে দিলেন স্ত্রীর মর্যাদা। এই তাঁর কলমের শেষ আঁচড়।

জাতীয়তাবাদী নায়ক হোসে রিজ়ালের মৃত্যুর দু’বছর পরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ‘ফিলিপিনো রিপাবলিক’। প্রেসিডেন্ট হন একুইনালডো। গৃহীত হয় এশিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান।

আরও পড়ুন

Advertisement