×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৪ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

বালির মাঠ থেকে সিটি সেন্টার

শিবাজীপ্রতিম বসু
২৯ নভেম্বর ২০২০ ০০:০১
বিপণিসম্ভার: সিটি সেন্টার ১। আজকের সল্ট লেকের অন্যতম আকর্ষণ।

বিপণিসম্ভার: সিটি সেন্টার ১। আজকের সল্ট লেকের অন্যতম আকর্ষণ।

বালুর মাঠ নহি জায়েঙ্গে।’ মাথা নেড়ে সাফ জানিয়ে দিল হাতে-টানা রিকশার চালক। আসলে বালির মাঠ, বিহারি উচ্চারণে হয়ে গিয়েছে ‘বালুর মাঠ’। অতএব, ঘনায়মান অন্ধকারে দুরুদুরু বক্ষে প্রায় এক কিলোমিটার ‘হণ্টন’ ছাড়া গতি নেই!

১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির শেষ কি মার্চের শুরু। কলকাতার পথঘাটে তখন বারুদের গন্ধ, অলিতে-গলিতে ‘চেনা ছুরি/ চেনা লাশ’! ফাগুনের সেই শিরশিরে হাওয়ার প্রথম সন্ধ্যায়, ৪৬ নম্বর বাস একটি বালক ও তার মা’কে উত্তর কলকাতার মানিকতলা থেকে উল্টোডাঙার ভিআইপি ব্রিজের মুখে নামিয়ে লেক টাউনের দিকে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। চার দিকে আক্ষরিক অর্থেই জনমনিষ্যি নেই!

তখন ওই ব্রিজের মুখে দাঁড়িয়ে ডান দিকে সরাসরি উল্টোডাঙা স্টেশন দেখা যেত, ব্রিজের মাথায় উঠলে টালা ট্যাঙ্ক দেখা যেত, একটু কোনাকুনি তাকালে হাওড়া ব্রিজ। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস তৈরি হতে তখনও বছরদশেক দেরি। ভবিষ্যতের ‘বিধান শিশু উদ্যান’ তখন এক ছন্নছাড়া জলাশয়, যার চার পাশ পাতাকাঠ, মানে প্লাইউড আর রান্নার গুল শুকোনোর জায়গা। উল্টোডাঙা থেকে কাঁকুড়গাছি অবধি বাঁ-হাতে ‘বস্তি রিহাউজ়িং স্কিম’-এর (বিআরএস) দুটি আবাস, ডান হাতে শিক্ষিত-মধ্যবিত্তদের মানিকতলা হাউজ়িং এস্টেট (যেখানে একদা সুশীতল রায়চৌধুরীর মতো র‌্যাডিকাল কমিউনিস্ট নেতা থাকতেন) আর তার থেকে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে বাগমারি কবরস্থান— ব্যস! এরই কাছাকাছি, কেষ্টপুর খাল আর ভিআইপি রোড-কে বাঁ পাশে রেখে, আঁকাবাঁকা পিচ-পথ, সরু ফিতের মতো সাবেক দত্তাবাদ রোড-এর টালির বাড়ির সারির সঙ্কীর্ণ রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে যেত রিকশাওয়ালা-কথিত, প্রায় জনবর্জিত ‘বালুর মাঠ’-এ, যার পোশাকি নাম (মার্কিন আদলে) ‘সল্ট লেক সিটি’, পরে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের নামে ‘বিধাননগর’, আরও পরে যা পুব কলকাতার অন্যতম কাঙ্ক্ষিত আবাসিক উপনগরী— এই বছর (২০২০) যেখানে প্রথম জন-বসবাসের পঞ্চাশ বছর পার হয়ে যাবে।

Advertisement

উপনগরী হিসেবে বিধাননগরের পত্তন কিন্তু অন্যান্য জায়গার মতো জঙ্গল সাফ করে হয়নি, বা বলা ভাল, কাদামাটির জমিতে নয়, তা তৈরি হয়েছে এমন এক পরিসরে, যাকে প্রচলিত অর্থে জমি বলা যাবে না। কলকাতার নিকটবর্তী কিন্তু স্থলপথে অতি দুর্গম, পূর্ব প্রান্তীয় এই অঞ্চলটি কেষ্টপুর খাল সংলগ্ন সেই বিপুল জলরাশির অংশ ছিল, যাদের সাধারণত ভেড়ি বলা হয়। কেষ্টপুর খালের পাশাপাশি পুব-দক্ষিণে, কিছুটা ছাড়া ছাড়া ভাবে প্রসারিত হতে হতে মাতলা নদী ঘেঁষে শেষমেশ সুন্দরবনে পৌঁছেছে। এক সময় এই সব অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের উপহ্রদ বা ‘লেগুন’ ছিল, পরে সেই সংযুক্তি বন্ধ হয়ে গেলেও, জলের স্বাদ ছিল লবণাক্ত। পরে, কলকাতার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা ভেড়িগুলো যখন বিশালাকৃতির লোহার পাইপে করে গঙ্গা থেকে বেশির ভাগ মিহি সাদা বালিযুক্ত মাটি এনে বুজিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তার ‘লবণাম্বু’ স্মৃতি ধরে রাখতে, আর কিছুটা বোধহয় সমনামী মার্কিন নগরীকে মনে রেখে, ‘সল্ট লেক সিটি’ নামকরণ হয়।

যদিও এই পুরনো ভেড়ি বোজানো ধূ-ধূ বালির প্রান্তরকে এমন বিচিত্র নামে ডাকায় এখানকার হবু বাসিন্দাদের কম আওয়াজ শুনতে হয়নি। খাস কলকাতার সর্বপ্রাচীন বিদ্যায়তনটির এক প্রবীণ শিক্ষক তো তাঁর এক বালক-ছাত্র ওখানে বসবাস করতে যাবে শুনে হেসে লুটিয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘লেক’ও নেই, আর ‘সিটি’ও নয়— হদ্দ গ্রাম! মাঝখান থেকে ফাঁকতালে সাহেব হওয়ার চেষ্টা! আর বালি দিয়ে বোজানো জায়গার স্থিতিস্থাপকতা নিয়েও অনেক ফ্রি উপদেশ ভেসে আসত— ওরে, ওখানে যাসনে, বাড়ি বসে যাবে, ইত্যাদি। সল্ট লেকে বসবাসের শুরুতে লোকে নিজেদের কলকাতাবাসী ভাবত না। মানিকতলা বা কলেজ স্ট্রিট গেলে বলত, ‘কলকাতা’য় যাচ্ছি!

এই বালির মাঠেই বসবাসের পথিকৃৎ হয়ে যে মানুষটি আরও অনেকের মনে বসবাসের সাহস সঞ্চার করেছিলেন, তিনি প্রয়াত জিতেন চক্রবর্তী, রাজ্য সরকারের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। ১৯৭০ সালের ৯ মার্চ, এবি ব্লকের ১২৯ নং প্লটে, তাঁর নবনির্মিত আবাস ‘মূলঘর’-এ— যা তাঁর গ্রামেরও নাম— গৃহপ্রবেশ হয়। সে বছরই তাঁর এবং আর কিছু নবাগত/হবু বাসিন্দার উদ্যোগে তাঁর বাড়ি সংলগ্ন মাঠে, এখন যেখানে এবি-এসি পার্ক, বিধাননগরের প্রথম দুর্গাপুজো হয়। এই পুজোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠল— বিশ্বে সর্বত্র বাঙালিরা যেমনটা করে থাকে— সল্ট লেকের বাসিন্দাদের প্রথম সংগঠন ‘লবণহ্রদ নাগরিক সমিতি’। তখন সব ব্লক মিলিয়ে মাত্র ২৫-৩০টি পরিবারের বাস! সবার বাড়িতে বিদ্যুৎও আসেনি। বাস বা কোনও গণপরিবহণ নেই। ব্যাঙ্ক নেই, বাজার-দোকান, ডাক্তারখানা, পোস্ট-অফিস কিচ্ছু নেই! এই নেই-রাজ্যের নতুন উপনিবেশের প্রাথমিক গঠনপর্বে তাই ‘নাগরিক সমিতি’র অবদান অপরিসীম।

প্রতিকূলতা অচেনা মানুষদেরও কাছে টানে, আর প্রাচুর্য চেনা-পরিচিতদেরও দূরে ঠেলে দেয়— এই উপলব্ধি বিধাননগরের সে কাল ও এ কাল বিচার করলেই আর এক বার পাকাপোক্ত হবে। প্রতিকূলতা থেকে উত্তরণের জন্য নতুন পত্তনের বাসিন্দারা নিজেরাই নানা সমিতি, ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন। যে হেতু প্রথম বছরদুয়েক পোস্ট অফিস ছিল না, তাই পাতিপুকুরের পিওন এসে এবি ব্লকের একটি ক্লাবে চিঠিপত্র দিয়ে গেলে প্রবল উৎসাহী গুটিকয়েক কিশোর সাইকেল করে এক নম্বর সেক্টরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত। কিছু নাট্যামোদী মানুষ শখের ‘ড্রামাটিক ক্লাব’ বানিয়ে সন্ধেবেলায় নানা বাড়ির বৈঠকখানায় কিঞ্চিৎ চা-জলযোগ সহ তারস্বরে রিহার্সাল দিয়ে ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘সাজাহান’ বা ‘নন্দকুমারের ফাঁসি’ মঞ্চস্থ করতেন। দর্শক, বৃহৎ-পরিবার-সম স্থানীয় জনসমাজ, যাঁদের অধিকাংশই নাটক দেখার চেয়ে ‘ওই যে অমুকবাবু’, বা ‘তমুকদিদি’-দের আবিষ্কারে বেশি মনোযোগী থাকতেন। বা, কার খাপ থেকে ঠিক সময়ে তলোয়ার বেরোয়নি, কে ডায়ালগ ভুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, কিংবা স্পিরিট গাম দিয়ে আঁটা কার গোঁফ খুলে গেছিল, ইত্যাকার আমোদ-আলোচনায় মাসখানেক মেতে থাকতেন।

বসবাস শুরুর প্রথম বছরের মধ্যেই একটি আন্তর্জাতিক ঘটনার ঢেউ এই প্রায় নিশ্চল জনবসতির গায়ে লাগল। একাত্তরের মাঝামাঝি সময় থেকে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে মানুষ সে দেশের সামরিক বাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে নানা জায়গায় সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসতে শুরু করলেন। এঁদের একটা বড় অংশ

যশোর রোড দিয়ে বনগাঁ হয়ে কলকাতার দিকে হাঁটতে শুরু করেন। বনগাঁ থেকে দমদম অবধি গোটা যশোর রোড এক দীর্ঘ অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরের চেহারা নেয়, যা দেখে প্রখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ তাঁর অতি মর্মস্পর্শী ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ লিখেছিলেন।

এই শরণার্থীদের একটা বড় অংশকে কিছুটা সরকারি উদ্যোগে এনে রাখা হয়েছিল, অনেকের অধুনা পাঁচ নম্বর সেক্টরে ঠাই হয়েছিল আর বাকিরা নিজ উদ্যোগে সল্টলেকের মাঠঘাট, অসমাপ্ত বাড়িঘর, কোথাও বা বসবাসের বাড়িসংলগ্ন বাগান ভরিয়ে তুলতে লাগলেন।

বেশির ভাগ সময়েই পাতাকাঠের তৈরি নৌকোর খোলের মতো সারি সারি মাথা গোঁজার জায়গায় প্রায় বছরখানেক ছিলেন ওঁরা। সবচেয়ে অসুবিধে ছিল পানীয় জল আর শৌচ ব্যবস্থার। তাতে ডোন্ট পরোয়া অনেকে স্ব-উদ্যোগে দূরে দূরে মাটি খুঁড়ে ‘ব্যবস্থা’ তৈরি করেছিলেন। এবি ব্লকের একটি প্লটে বাড়ির জন্য কয়েক ফুট গভীর খোঁড়া-ভিত, অচিরেই উদ্বাস্তুদের বিষ্ঠা-পুরীষ-এ ভরাট হয়ে গেছিল! এর বেশ কিছু দিন পর সব থিতোলে বাড়িটি তৈরি হয়। অনেকে থাকতেন গঙ্গামাটি আনার কংক্রিটের বড় বড় পাইপের ভেতর। এখন যেখানে বিএ-সিএ মাঠ, সেখানে ছিল পেল্লাই পাইপ তৈরির পরিত্যক্ত কারখানা। সেই পাইপের ভিতরেও শরণার্থীরা ছিলেন, লোকমুখে জায়গাটার নাম ‘পাইপ কলোনি’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একাত্তরের অগস্ট মাসে, প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির ছোট ভাই, সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি যখন প্রায়-সাংবাদিকের মতো কলকাতায় শরণার্থী শিবির দেখতে এসেছিলেন, এবং পরে পাকিস্তান বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে বলে পরোক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তখন তিনি সল্টলেকের ‘পাইপ কলোনি’তেও গিয়েছিলেন। সেই সময়েই কিংবদন্তি হয়ে ওঠা কেনেডি পরিবারের ‘ছোট ছেলে’-কে দেখতে সে দিন কী ভিড়!

বাহাত্তরের ডিসেম্বরে শ্রীমতী ইন্দিরা গাঁধী সল্টলেকে এলেন, জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে। তখনও কলকাতায় আলকাতরায় লেখা মাও জে দং-এর বাণী— ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’ জ্বলজ্বল করছে, কোথাও সম্ভবত নকশালদের হেয় করার জন্য এমন পোস্টারও নাকি দেখা গেছে: ‘ছিলাম নকশাল, হলাম নব/ চাকরি না পেলে আবার হব’। (‘নব’ হল, কংগ্রেস ভেঙে তৈরি ইন্দিরার নেতৃত্বাধীন ‘নব কংগ্রেস’)। এরই পাশে, বাংলাদেশের যুদ্ধবিজয়ের পর তখন তুঙ্গে থাকা ভাবমূর্তির ইন্দিরা গাঁধীর স্টেনসিল-এ আঁকা মুখও দেওয়ালে দেওয়ালে ছেয়ে থাকত, তলায় লেখা, ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’। সেই সময়ে ভূভারতে সবচেয়ে শক্তিশালী দলটির কয়েক দিনের বার্ষিক অধিবেশন ও তাতে যোগ দিতে আসা ইন্দিরা গাঁধীর দু’-তিন দিন সল্টলেক বাসের খবর, রাতারাতি বালির মাঠ-কে কলকাতা তথা বাংলার মনোযোগ ও মানচিত্রে স্থান করে দিল।

অধিবেশন বসার আগেই প্রস্তুতিপর্ব দেখতে বিকেল দিকে ভিড় জমত এখনকার সেন্ট্রাল পার্কের আশপাশে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল শ্রীমতী গাঁধীর বাস উপলক্ষে নির্মীয়মাণ অভূতপূর্ব বাড়িটি। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হলেও আকার ও মাথায় বসানো খড়ের চাল নিয়ে সে যেন বাংলার পল্লিনিবাসের এক শৈল্পিক প্রতিরূপ! পরে, বামফ্রন্টের আমলে এই বাড়িটিই ছিল জ্যোতি বসুর শেষ পর্বের আবাস। মাঝে মাঝে ইন্দিরা আবাসে ভিআইপিদের যাতায়াত করতে দেখা যেত। তখন সম্মিলিত ভিড়, ‘ওই যে মানুদা’ (তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়), ‘ওই তো নেলি সেনগুপ্ত’ (‘দেশপ্রিয়’ যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর স্ত্রী), কিংবা ‘কাশীকান্ত মৈত্র’ প্রমুখের নাম উচ্চারণ করে তাদের রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় জ্ঞাপন করত।

এর পর শম্বুকগতিতে চলা গৃহনির্মাণ স্রোতে কিছুটা গতি এল। প্রথম ব্যাঙ্ক, ডাকঘর, কিছু বাজারও চালু হল। পুরনো ‘নাগরিক সমিতি’-র বদলে ‘বিধাননগর ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান’ নাগরিক সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে বেশি সরব ও সক্রিয় হল। এরই মধ্যে ১৯৭৩-এ প্রথম সরকারি বাস চলল, ’৭৫-এ আরও একটি। বাস চালু হওয়ার পর, স্কুল-কলেজের ছোকরারা বাস ডিপোর কাছে হেঁটে গিয়ে আগে থেকে সিট বাগিয়ে বসত, আর নিজেদের স্টপে এলে পাড়ার গুরুজন দেখলে, ‘কাকু বসুন’, বা ‘মাসিমা বসুন’ বলে উঠে দাঁড়াত, আর এমন সহবত দেখে গলে গিয়ে, পাড়াতুতো কাকা-মাসিমারা ‘টিকিট কাটিস না কিন্তু’ বলে কিঞ্চিৎ অভিভাবকত্ব ফলাতেন।

সাতাত্তরে যখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এল, তত দিনে এক নম্বর সেক্টর স্বতন্ত্র জনপদের চেহারা পেয়েছে, যা কলকাতার কাছে থেকেও কলকাতার চেয়ে আলাদা। এই নিজস্বতার প্রতীক হয়ে বিধাননগর-কেন্দ্রিক কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি পাক্ষিক খবরের কাগজও বেশ জনপ্রিয় হল, যার মধ্যে ‘লবণ হ্রদ সংবাদ’ আজও টিকে আছে। কিছু দিন পর, ‘এ-ই’ ব্লকের বাজারে প্রাক্তন ক্রিকেটার পঙ্কজ রায়ের একটি ‘বিলিতি সুরা’র (রসিকদের মতে, ‘সুধা’) বিপণি চালু হওয়ায় নিরুপায় আসবপায়ীদের সল্টলেকের বাইরে সান্ধ্য অভিযানের প্রয়োজন অনেকটা মিটল। যদিও প্রায় অনেকে, বিশেষত, পাড়ার গুরুজনেরা চেনা হওয়ায়, অপেক্ষাকৃত তরুণদের খানিক দূর থেকে ‘ম্যান মার্কিং’ করে, ঝটিতি আরব্ধ বোতল বাজারের ব্যাগে বা ঝোলায় পুরে সমুখপানে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দ্রুত বিলীয়মান হয়ে যাওয়ার টেকনিক প্র্যাকটিস করতে হত! এরই মধ্যে উল্টোডাঙার দিক থেকে চিংড়িহাটা-ধাপা হয়ে বাঁধের মতো ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস দখিন পানে চলে গেছে। সেন্ট্রাল পার্ক-করুণাময়ীর কাছাকাছি সরকারি অফিসপাড়াও গড়ে উঠেছে। তবু, পুরনো-নতুনের সন্ধিক্ষণ পেরিয়েও যা অনেক দিন রয়ে গেল, তা হল, সন্ধেবেলার প্রাণ জুড়নো হাওয়া আর শরৎকালে এক মানুষের চেয়েও উঁচু কাশ বনের ঢেউ, যেন মানিকবাবুর ‘পথের পাঁচালী’র অপু-দুর্গার রেলগাড়ি দেখার সেই বিখ্যাত সিন-টি কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে!

বামফ্রন্টের শাসনকালেই আধুনিক আবাস-নগরী হিসেবে বিধাননগরের রূপ খুলল। এর মধ্যে, বিশেষত, তিন নম্বরে এমন সব নিজস্ব বাড়ি তৈরি হল, যাদের বাড়ি না বলে ছোটখাটো প্রাসাদ বলা চলে। এর মধ্যে অনেকগুলিই আইনের ফাঁক-ফোকর গলে (দুর্জনে কহে, প্রচুর পারিতোষিক বিলিয়ে), সরকারের দেওয়া অ-হস্তান্তরযোগ্য ৯৯৯ বছরের লিজ-এর ‘হাত বদলে’ পাওয়া। এই ‘নবাগত’রা অনেকেই পুরনো কৌম জীবনের কথা কিছুই জানে না, তা সম্ভবও নয়। পুরনো বাসিন্দাদের চোখে এরা ‘আপস্টার্ট’, আর নবাগতদের চোখে পুরনোরা ব্লক সংগঠন নিয়ে বড় বেশি ঘ্যানঘেনে।



ক্রীড়াঙ্গন: ইডেন গার্ডেনস-এর প্রতিদ্বন্দ্বী যুব ভারতী।

প্রথম দু’দশক বিধাননগরের আবাসিকদের রাজনৈতিক পরিচিতির গুরুত্ব বড় একটা ছিল না। নব্বইয়ের গোড়া থেকে এই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। বিধাননগর প্রথমে পুরসভার প্রস্তুতির জন্য ‘নোটিফায়েড এরিয়া’ হয়, নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে পুরোদস্তুর নির্বাচিত পুরসভা। ফলে, ব্লকে ব্লকে পুরনো অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের বদলে ভুঁইফোড় রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বামফ্রন্টের আমলে কলকাতার ঢঙে তিন নম্বর সেক্টরের একটি বড় ব্লকের পুজো ‘অমুকদার পুজো’ বলে অভিহিত হতে শুরু করে। এই ভাবে, স্বতন্ত্র উপনগরী হিসেবে বিধাননগরের পুরনো কৌম জীবন ক্রমশ ইতিহাসের অন্তর্গত হতে শুরু করে— যে-ইতিহাস এখনও লেখা হয়নি।

নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে আর একটি বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এই উপনগরীর পুরনো সত্তাকে প্রায় পাল্টে ফেলল। এক নম্বর সেক্টরের ডি-সি ব্লক, যা বসতি স্থাপনের তিন দশক অবধি খালি পড়ে ছিল, যেখানে এক সময় স্থানীয় তরুণ যুগলদের বৈকালিক ‘নিরাপদ কুঞ্জবন’ ছিল, সেখানে চলল বিপুল নির্মাণের কাজ— যার ফলে কিছু দিন পর ‘সিটি সেন্টার’ নামের ‘শপিং মল’-টি আত্মপ্রকাশ করল। প্রখ্যাত স্থপতি চার্লস কোরিয়া-র সৃষ্টি এই নতুন পরিসর, তার আলোকোজ্জ্বল বিপণি ও দিশি-বিদেশি চমকপ্রদ পণ্য, সুখাদ্য ও পানীয়ের বিপুল সম্ভার, মাল্টিপ্লেক্স ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির জন্য বহুমাত্রিক মুক্ত পরিসর— বিধাননগরের পুরনো একান্ত অভ্যন্তরটিকে আত্মসাৎ করে তাকে সংকর বানিয়ে ফেলল। এর আগে অফিসপাড়ার নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এই উপনগরীতে বাইরের কেউ আসত না, দোকান-বাজার বা ছোটখাটো রেস্তরাঁয় স্থানীয় মানুষ ছাড়া অন্য কারও আসার প্রশ্নই ছিল না, সেখানে এই নতুন বাণিজ্যিক ইন্দ্রপুরী গোটা কলকাতাকে বিধাননগরের কেন্দ্রে এনে ফেলল। সিটি সেন্টার-কে ঘিরে এবং তার পর গত দেড় দশক ধরে উপচে পড়া আরও বহু বিশ্বমানের বিপণি— তথ্যপ্রযুক্তির পাঁচ নম্বর সেক্টর হয়ে রাজারহাট-নিউ টাউনের প্রশস্ত রাস্তা ধরে সিটি সেন্টার-টু অবধি একই ধরনের হোটেল, মল, ভোগ্যপণ্য ও বিনোদনের সম্ভারের সঙ্গে মিলে— এই সামগ্রিক অঞ্চলটিকে কলকাতার ‘মোস্ট হ্যাপেনিং’ পরিসরে বদলে দিয়েছে।

পঞ্চাশ বছর আগে যে-রিকশাওয়ালা ‘বালুর মাঠ’-এ যাবে না বলে সওয়ারি তুলতে অস্বীকার করেছিল, তার তৃতীয় প্রজন্মের উবার ট্যাক্সির চালক

এখন রাত বারোটার সময়ও বিধাননগরের রাস্তা দিয়ে সাঁ সাঁ করে পাঁচ নম্বর আর নিউটাউনের বিস্তৃত আলোকধৌত সরণি দিয়ে দমদম বিমানবন্দরের টার্মিনাল ‘টি-টু’তে পৌঁছে যাচ্ছে। এই ভাবে সে দিনের সেই নেই-রাজ্য এখন দুনিয়ার সব-পেয়েছি শহরগুলোর সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে... স্থাপত্য-বিষয়ক তাত্ত্বিক রেম কোলহাস আর ব্রুস মাউ-এর কথা মানলে, যে দুনিয়া আসলে বিশ্বজনীন নগরমালার এক বহুস্তরী নেটওয়ার্ক। এই নাছোড় বিশ্ব-নগর ব্যবস্থাকে পঞ্চাশ বছরের পুরনো বালির মাঠ-ও তার নিজস্ব কিছু দিতে চায়। ম্যানহাটনের রাস্তায় নানা বর্ণের বিশ্বনাগরিকদের তার হৃদয় থেকে নেওয়া কয়েক গোছা কাশফুল বিলি করতে চায়!

Advertisement