E-Paper

তাঁর বিশ্বপথিকবৃত্তির প্রেরণা ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ

যৌবনে দু’দশক রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটেছে। শুধু সাহিত্যসচিব নন, রবীন্দ্রনাথের বিদেশের জানালাও ছিলেন তিনি। ‘দেশ’ পত্রিকায় একদা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত ‘কবির চিঠি কবিকে’ পড়লেই দেখা যাবে তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা-স্নেহ আর মত বিনিময়ের সম্পর্ক। বিদেশের মাটিতে গবেষণা, অধ্যাপনাও করেছেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। আগামী ১০ এপ্রিল তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী।

ঋতম্ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৯

অনিঃশেষ (১৯৭৬) কাব্যের এই উচ্চারণের ভিতর দিয়ে আমার শ্রবণে প্রথম প্রবেশ করেছিলেন তিনি। বয়স তখন সাড়ে তিন কিংবা চার। আর একটু বড় হয়ে ‘আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ঘুরুক দেখুক থাকুক/ কেমন যেন চেনা লাগে ব্যস্ত মধুর চলা’ যেমন বিস্মিত করেছে, তেমনই ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে’, ‘তুমি যেন বলো আর আমি যেন শুনি’, ‘ঝোড়ো হাওয়া আর ঐ পোড়ো দরজাটা/ মেলাবেন তিনি, মেলাবেন’ কিংবা ‘গুরুচরণ কামার, দোকানটা তার মামার’-এর মতো অসংখ্য পঙ্‌ক্তি স্মৃতিজীবিত হয়েছে ক্রমশ। কিন্তু শৈশবে প্রথম শোনা ওই প্রশ্নখচিত মন্ত্রোপম কবিতার নিহিতার্থ আজও খুঁজে চলি। ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’-এর কথা তো রবীন্দ্রগানেই পেয়েছি, তা হলে অসীমের মাটিতে বসে কী করার কথা বলেন রবীন্দ্রেতর এই কবি? তেরো বছর বয়সে উপনয়নের পর যখন শিখে নিলাম গায়ত্রী মন্ত্র, অনুভব করলাম এ আসলে আত্মজিজ্ঞাসার নামান্তর। এই কি তবে অমিয় চক্রবর্তীর ঈশ্বরচেতনা? তবে প্রথাগত দেবতা নয়, বিশ্বচরাচরের সঙ্গে এক বিশ্বপথিকের সংলাপ যেন এ-কবিতা। যে-মন্ত্র বৈদিক সৌরচেতনায় দীক্ষিত কবিকে বলে : “যা যথেষ্ট তার চেয়ে বেশি কী নিয়ে যাবে/ হে পান্থ, / সমস্তের স্তব্ধ মোহনায়॥” হয়তো কিছুটা রাবীন্দ্রিক এই অনুভব, অথবা বলা ভাল ভিন্ন স্বরায়ণে অমিয় খুঁজে চলেন আমাদের উৎসকে। তাই বুক থেকে তাঁতে এনে বসান রোদ্দুরের সুতো; তাঁর ‘চেতন স্যাকরা’ নর্দমার দোকান দেহলিতে বসে বলে, ‘ধ্যান বানাই। এই আমার উত্তর’— আপাত-তুচ্ছ প্রাত্যহিকের মধ্যেই আছে মিরাক্‌ল। তাই লিখতে পারেন, “ধ্যানে নয়, টবে নয়, নয় মালায়, বোতলে গন্ধ-ফোঁটায়/ —ফুলকে পাব বোঁটায়।” (বাস্তবিক)

আগুনকে আলো করা

তা হলে রবীন্দ্রানুসারী তথা রবীন্দ্রপ্রভাবিত— এই অভিধা দিয়ে রবীন্দ্রানুজ কবিদের ঈষৎ করুণার চোখে দেখার অভ্যাস আজও কেন আমাদের মজ্জাগত? রবীন্দ্রযুগে জন্ম হয়েছিল তাঁদের, তাই মনে ও ভাষায় রবীন্দ্র-উত্তরাধিকার ক্রিয়াশীল থাকলেও ভাবনার জগতে যে যথেষ্ট মৌলিকতা ছিল, তা সত্যেন্দ্রনাথ, কুমুদরঞ্জন, কালিদাস, কিরণধন কিংবা যতীন্দ্রমোহনের কবিতার নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই জানেন। প্রান্তিকের স্বর, নিসর্গদর্শন, ঈশ্বরচেতনা, প্রেম কিংবা সমাজভাবনায় ভাবিত ছিলেন তাঁরাও, মগ্ন পাঠক ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের। অথচ সেই বুদ্ধদেব বসুকেই অনুসরণ করে আমরা ‘তিনি ও রবীন্দ্রনাথ একই জগতের অধিবাসী’— এ কথা মেনে নিয়েও অমিয় চক্রবর্তীকে আধুনিক কবি হিসেবে বিচার করি। তিরিশের প্রধান কবিপঞ্চকের তালিকায় জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্রর পাশে তিনিও সাদর অভ্যর্থনা পান। যৌবনের উজ্জ্বল কুড়িটা বছর রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটেছে তাঁর। শুধু কিছু দিনের সাহিত্যসচিব (১৯২৬-৩৩) বা বিদেশসফর-সঙ্গীই নয়, রবীন্দ্রনাথের অসমবয়সি বন্ধু ও বিদেশের জানালাও ছিলেন অমিয়। ‘দেশ’ পত্রিকায় একদা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত ‘কবির চিঠি কবিকে’ পড়লেই দেখা যাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-স্নেহ আর মত বিনিময়ের উদার আকাশ এই চিঠিগুলি। কোথাও ক্ষোভের অবকাশও ছিল, মতান্তরও ঘটেছে তাঁদের, যদিও মনান্তর হয়নি কখনও। আবার স্বেচ্ছায় রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে এসে বিদেশের মাটিতে গবেষণা, অধ্যাপনায় সময় কেটেছে তাঁর। এই বিশ্বপথিকবৃত্তির প্রেরণাও তিনি পেয়েছেন শান্তিনিকেতনে, এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। ১৯২৭-এ ডেনমার্কের মেয়ে হিয়োর্ডিস তথা হৈমন্তীর সঙ্গে তাঁর বিবাহও রবীন্দ্র-উদ্যোগেই। তাঁর প্রথম দুই কাব্য ‘খসড়া’ (১৯৩৮) এবং ‘একমুঠো’ (১৯৩৯) পড়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন এগুলিকে আধুনিক কাব্যের সেরা নিদর্শন হিসেবে মেনে নেন, তেমনই আনন্দ পান ‘অমিয়চন্দ্রের কাব্যে তাঁর স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে’। কী সেই স্বাতন্ত্র্য? রবীন্দ্রনাথের শেষ দশকের কবিতা, যা আসলে ‘আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধানতম প্রস্থানভূমি’ আর সেই উৎস থেকেই যে অমিয় ‘অঞ্জলি ভরে তীর্থসলিল’ সংগ্রহ করেছিলেন— অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের এই মূল্যাঙ্কন একান্ত সত্য। কিন্তু জটিল চিন্তন ও চৈতন্যে সমৃদ্ধ কবির মন বিজ্ঞানদৃষ্টি আর প্রাত্যহিকের যাপন করা আত্মজীবনকে মূর্ত করেছে কবিতায়। দেশ-কালের কালো ছায়াও সেই দর্পণে চাপা থাকেনি। ‘ইতিহাস’ কবিতায় নেবুরঙা শার্ট পরা মানুষের প্রবেশে যে গ্রামীণ কাহিনি শুরু হয়, তার শেষ হয় ‘এই গ্রাম তাহলে উঠে যাবে।’— এই বেদনাদীর্ণ অথচ আপাত নিরাবেগ উচ্চারণে। ছিন্নমূল বেদনা আর গ্রাম পতনেরই শব্দ, কিন্তু মোটেও জীবনানন্দীয় নয় সে উচ্চারণ। ‘যুদ্ধের খবর’, ‘অন্নদাতা’ ‘১৩৫০’-এর মতো একাধিক কবিতায় যুদ্ধ কিংবা দুর্ভিক্ষের ছায়া অস্পষ্ট থাকেনি। তবে সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর প্রাকরণিক বিশিষ্টতা। সচেতন গদ্যরীতিতে, মিলের চমক আর হপ্‌কিন্সের ‘স্প্রাং রিদম’-এর দোলায় তিনি চলমান ছবি আঁকেন। রবীন্দ্রনাথের আস্তিক্যবোধ, মানবতা আর রোম্যান্টিকতাকে সম্প্রসারিত করেছেন তাঁর বিশ্বনাগরিক মন নিয়ে। তাই প্রথম জীবনে লেখা ‘মেঘদূত’ কবিতায় কালিদাস আর রবীন্দ্রনাথকে পেরিয়ে তাঁর যক্ষের বিরহ ছাতাঅলা গলির ভিতরে কিংবা হাওড়ার পুলে বয়ে চলে ‘মনোরথে নয়, বাস্-এ, মোটরে’। অনুভব করেন “এ-জীবন আজো মিল-হারা। / দেখো অদ্ভুৎ/ চলে মর্তে দুই মেঘদূত।” আবার পরিণত বয়সে ‘বিসর্জন’ নাটকের অভিপ্রায়কে রাজনৈতিক তাৎপর্যে মণ্ডিত করে গড়ে তোলেন হেঁয়ালি-নাট্য ‘সর্বনাম’ (১৯৬৬)— অর্থাৎ যারা বিশ্বব্যাপী নামহীন সাধারণ মানুষ। এক দিকে অভিনীত হয়ে গেছে ‘বিসর্জন’ নাটক, পর্দা নেমে গেলে দেখা যায় অভিনেতা, দর্শক, টিকিট-বিক্রেতা, ছাত্রছাত্রীদের বিচিত্র ভূমিকা। নাট্যচরিত্র আর অভিনেতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, দেশের সীমানা ভাঙে। ভুবনডাঙা মেশে ভবানীপুর থেকে লন্ডন কিংবা আমেরিকায়। চলতি বিসর্জন-এ নাটক পার হয়ে সকলে খুঁজে চলে নতুন নাট্যকারকে। ‘চতুর্দিকে দাহ-লাগা রাষ্ট্রের ছাই’-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই সন্ধান, যেখানে মিলে যান শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথের পাঠক আধুনিক কবিও, যিনি দুটো মহাযুদ্ধ পার হয়েও অনির্বাণ হিংসার আগুন-ঝড় আর বারুদ-ধোঁয়াকে জেগে থাকতে দেখেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে ভিয়েতনামের যুদ্ধ (১৯৫৪-৭৫) নাড়া দিয়েছিল সকলকেই। যদিও কবি স্পষ্টত বলেননি সে-কথা। ‘জগৎজোড়া দুঃখের দিনে কিছু কথার ছবি’ আর ‘কল্পনার রঙিন সাক্ষ্য’ নিয়ে লেখেন এই হেঁয়ালি-নাট্য, যা কিছুটা অ্যাবসার্ডও— স্যামুয়েল বেকেটের ‘গোডো’র মতোই আসল নাট্যকারকে পায় না কেউ। পরিণামে দেশকালাতিশায়ী এই সর্বনামের দলের ফিরে আসার আশ্বাস জেগে থাকে : “ওরাই ফিরে আসবে। পুরনো রাস্তায় নয়, নতুন ধর্মে। সর্বনামের দল, এদের বহু নাম, বহু দেশ। কিন্তু চিনতে বাধে না দরাজ মার্কিনে, খাঁটি বাংলায়– ভারতে কোনো যথার্থ স্বদেশে।”

মর-জীবনের মরকতমণি

নব্বইয়ের দশকে মাধ্যমিকের ‘সহায়ক পাঠ’-এ পাঠ্য ছিল অমিয় চক্রবর্তীর ‘গাছ’ কবিতাটি। পঙ্‌ক্তিগুলির ভিতরে রবীন্দ্রনাথের ‘বৃক্ষবন্দনা’ কিংবা সুকান্তের ‘আগামী’, ‘চারাগাছ’-এর চেয়ে এক ভিন্নতর প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম। “মধ্যাহ্নের রিক্তপটে রৌদ্র লেগে/ ঐ দ্যাখো বৃক্ষচ্ছবি আছে জেগে/ ধ্যানের মতন”— আপাত-অমূর্ত এক ছবি বলে মনে হলেও, আসলে বিশুদ্ধ চেতনারই কথা বলে। কোনও রূপকায়িত বিপ্লবীচেতনা কিংবা প্রকৃতিবন্দনা এ নয়, বরং গাছের প্রতীকে কবি আমাদের আত্মলীন, স্থিতধী আর নম্র হতে বলেন এখানে। মূল সুর রবীন্দ্রবলয় থেকে আহৃত সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁর অনুভব ও প্রকাশ আধুনিক। আজকের ইকোক্রিটিসিজ়মের আলোকে এ-কবিতা মানুষ ও বৃক্ষের অন্তনির্হিত সম্পর্ককে চিনিয়ে দিতে পারে। আত্মজীবন-বন্ধনী পার না-করেও কী ভাবে ‘মর-জীবনের মরকতমণি— কী রকম সমবেত অভিজ্ঞান’ হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা, সে-কথা বুঝতে গেলে তাঁর ‘বাসা-বদল’ কবিতাই শুধু নয়, ‘বাড়ি’, ‘যৌগিক’, ‘যাজ্ঞিক উনোন’, ‘কুয়োতলা’, ‘হাসপাতাল’, ‘চায়ের বেলা’, ‘টেলিফোন’— এর মতো অসংখ্য কবিতার কথা মনে পড়ে যেতে পারে। তাঁর বিজ্ঞানচেতনা আর আন্তর্জাতিকতা, তো বহুচর্চিত বিষয়। তবে আধ্যাত্মিক চেতনার কবি হিসেবে তাঁকে দেখেছি ভিন্ন ভাবে। রবীন্দ্রোত্তর বাঙালি কবির ঈশ্বরভাবনা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অমিয় চক্রবর্তী আর অলোকরঞ্জনের কথা সবার আগে মনে এসেছিল। কিন্তু প্রথাগত আধ্যাত্মিকতা তাঁর কবিতায় নেই। ‘এপারে’ কবিতার “দেখলাম দু-চক্ষু ভ’রে হে প্রভু ঈশ্বরমহাশয়, / চৈতন্য প্রসন্ন সূর্য, / খচিত রাত্রির দেয়া গান”— আসলে তাঁর এক কৌতুকী আমেজ নিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন। তাঁর ‘মানুষের ঈশ্বর’ ঠোঁটে সিগারেট, পায়ে নতুন জুতো নিয়ে আধুনিক বিশ্বের বাসিন্দা, দুঃখে-শোকে-ক্ষুধায়-অভাবে আজ তাঁকে আরও বেশি কাছের মানুষ মনে হয়েছে তাঁর। রবীন্দ্রনাথের ‘ধূলামন্দির’ কিংবা ‘মানুষের ধর্ম’ এখানে তাঁর প্রেরণা, তাই লিখতে পারেন “এসো ফেলে রেখে ঠাকুরঘরের ভান,/ পথের ধুলোতে কোরো সন্ধান।” এই মহাবিশ্বে মহাকাশে অমিয় চক্রবর্তী খোঁজেন চৈতন্যের উন্মীলন: ‘চেতনা বিদ্যুৎ নামে’। ‘মেলাবেন, তিনি মেলাবেন’ সেই শুভবোধের জাগরণেরপ্রত্যাশা, যার সঙ্গে ‘পুষ্পদৃষ্টি’র কবির বিজ্ঞানবোধের বিরোধ নেই।

লেখাটাই জবাব

শান্তিনিকেতনের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বিশ্বপথিক হয়ে রবীন্দ্রসাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। অক্সফোর্ডে টমাস হার্ডির ‘দ্য ডাইনাস্টস’ নিয়ে পিএইচ ডি-র কাজ যথানিয়মে সম্পন্ন করলেও মৌলিক কবিতা ও অধ্যাপনার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, আন্তর্জাতিক মন, শিক্ষাচিন্তা, গান্ধী ও আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাশোনা— এমন নানা মাত্রায় রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন তিনি। তাঁর সৃজনশীল অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ বিশ্বখ্যাতি পেতে পারত, যদিও অজানা কোনও কারণে সেই উদ্যোগ বাতিল করেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। দুঃখ পেলেও মেনে নিয়েছিলেন অমিয়। তাঁর একমাত্র বাংলা প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৩)-এর পাতা উল্টালে পাঁচটি পর্যায়ে কাব্যভাবনা, বিশ্বসাহিত্য, সমকালীন সাহিত্য, কবি ও মনীষী, রবীন্দ্রচর্চা আর ভ্রমণকাহিনি রচনায় তাঁর দক্ষতার প্রকাশ মেলে। ‘চলো যাই’ নামে একটি ভ্রমণবৃত্তান্তও লিখেছিলেন কবি। তবে গদ্যশিল্পী অমিয় কিছুটা আলাপচারিতার ঢঙে লিখেছেন তাঁর প্রবন্ধ, যা সমকালীন কবিবন্ধুদের থেকে ভিন্নস্বাদের। বহু-আলোচিত ‘কাব্যে ধারণাশক্তি’তে যেভাবে বর্ষার কাব্য লেখার কথা বলেন, বোঝাতে চান ‘চৈতন্যের বিশেষ ঘন মুহূর্তে কোন ঘটনা বাঁধা পড়বে, কোনটা পড়বে না, তার হিসাব নাই’ কিংবা ‘কাব্যাদর্শ’ বোঝাতে গিয়ে জোর দিয়ে বলেন, “বলা বাহুল্য, কাব্যসৃষ্টির বড়ো একটা ধারা সামাজিক চলন্ত স্রোতের সঙ্গে জড়িত, প্রবাহিত।” আবার ‘কেন লিখি?’র উত্তরে সংক্ষেপে জানিয়ে দেন ‘লেখাটাই জবাব’। তাঁর গদ্যের সূত্র ধরেই আমরা পঞ্জাবি কবি ভাই বীরসিংকে চিনি, যুগসঙ্কটের কবি ইকবালের প্রতি আগ্রহী হই, সাহিত্যগুরু প্রমথ চৌধুরী, আইনস্টাইন, এইচ জি ওয়েলস, ইয়েটস, এলিয়ট, পাস্তেরনাক বা জয়েসের পরিচয় পাই। গান্ধীজির প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি, গান্ধীর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার প্রতি অকপট মূল্যায়ন তাঁর ‘মহাত্মা গান্ধী’। এ ছাড়াও বহু দিগ্‌দর্শী প্রবন্ধ আর আত্মকথন আজও অগ্রন্থিত বা দুষ্প্রাপ্য, যা নতুন করে সঙ্কলিত হওয়ার অপেক্ষায়।

কমলদল নেই

তাঁর কবিতায় ‘রক্তমাংসের সংক্রাম’ আশ্চর্যভাবে কম, তাঁর প্রেমের কবিতা আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে দোলা জাগায়। তাই ‘সৃষ্টিমূলে আছে কাম’ এ কথা জেনেও আধুনিক যুগের ‘লালসার অসংযম’কে তিনি বরণ করেননি। ‘যেমন আদিম চাওয়া চেয়েছিল ঊর্বশীকে পুরুরবা’ (ভোর); ‘মানুষের প্রাণে তবু অনন্ত ফাল্গুনী— / তুমি যেন বলো আর আমি যেন শুনি’ (চিরদিন), ‘কত দীর্ঘ দু-জনার গেল সারাদিন, / আলাদা নিঃশ্বাসে’ (রাত্রি)-র মতো কবিতার পাশেই স্থান করে নেয় দান্তের ‘বিয়াত্রিচে’কে ঘিরে তাঁর মুগ্ধতা ‘তোমারই চোখের দীপে আলো দেখে একা।’ তাঁর কবিতা বলে এক ‘অস্পর্শ আলিঙ্গন’-এর কথা, যার স্থান গভীর অন্তরে। তাই ‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’-এ নির্বাসিত কেরানিকে নিয়ে নবমেঘদূত রচনা করলেন আধুনিক কবি, যেখানে ক্ষুদ্র চাকরের আমিত্ব, আপনজনের ভালবাসা আর বাঁচবার সার্থকতা কেড়ে নিতে পারে না কোনও প্রভু : ‘দূর সংসারে, এলো কাছে, / বাঁচবার সার্থকতা।’ ব্যক্তিগত জীবনের চাকরিকেন্দ্রিক ক্ষোভ (১৯৪০) এখানে থাকলেও, কবিতাটি সর্বজনীন হয়ে গেছে আজ। এখানে এই বঙ্গদেশের প্রতি অনুরাগ আর গৃহপ্রীতি তাঁর আজীবনের সম্বল, শেষজীবনে তাই শান্তিনিকেতনের বাসগৃহ ‘রাস্কা’তেই ফিরে এসেছিলেন। আবার প্রেমের কবিতাগুচ্ছ ‘পুষ্পিত ইমেজ’-এ এক বন্ধুর সৌজন্যে খুঁজে পাই ‘দ্বৈত’-এর মতো মিতকথনের আশ্চর্য কবিতা, পাথর ও জলের সংলাপে ‘কেবল বিচ্ছেদ, অচির মিলন’-এর শীলিত কথকতা, শেষে আকুল প্রেমার্তি ‘কবে/ রৌদ্রে সমুদ্রে দুজনার সত্তা এক হবে’? ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় না থাকলেও এ-কবিতাটি সাহিত্য অকাদেমি প্রকাশিত অনুবাদ-সঙ্কলনে ‘ডুয়েট’ নামে স্থান পেয়েছে। এমন একাধিক কবিতায় অল্প কথার আঁচড়ে গভীর ভাবনা জাগিয়ে তোলার নিপুণ দক্ষতা বৌদ্ধ জ়েন কবিতার ধারাকে স্মরণ করায় (স্মর্তব্য, ‘পালাবদল’ কাব্যে ‘Zen-ধরনে’ নামে তাঁর একটি কবিতাও আছে) তাঁর কবিতার পাঠক হিসেবে আজকের হিংসায় উন্মত্ত বিশ্বে এমনই এক প্রশান্তির অনুভবে আমরাও স্থিত হই ‘মধুকোরকে মুকুল রাশি/ কমলদল নেই’ (দিঘি)–‘নেই’-এর ভিতরে গচ্ছিত ‘আছে’র আস্তিক্যচেতনাই অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬)-কে স্বতন্ত্র করে রেখেছে, সন্দেহ নেই।।

ঋণস্বীকার: অমিয় চক্রবর্তী- কবিতাসংগ্রহ (১,২), দে’জ; অমিয় চক্রবর্তী- সাম্প্রতিক, নাভানা; অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত- গদ্যসমগ্র ১, প্রতিভাস; সুমিতা ভট্টাচার্য- অমিয় চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি; সুমিতা চক্রবর্তী- বিশ্বনাগরিক অমিয় চক্রবর্তী: স্রষ্টা ও সৃষ্টি, দিয়া; কাঞ্চনকুন্তলা মুখোপাধ্যায়- আধুনিক বাংলা কবিতা ও অমিয় চক্রবর্তী, তারাশঙ্কর পরিষদ; দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়- রবীন্দ্রপর কবিতা, দে’জ; তরুণ মুখোপাধ্যায়- কবির্মনীষী অমিয় চক্রবর্তী, সারঙ্গ; কণিকা সাহা- আধুনিক বাংলা কাব্যনাট্য: উদ্ভব ও বিকাশ, সাহিত্যলোক; উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত, কবিতীর্থ: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্য অমিয় চক্রবর্তী; Amiya Chakrvarty- Another Shore, Translated by Carolyn B Brwon and Sarat Kumar Mukhopadhyay, Sahitya Akademi; Sumita Chakrabarti- Amiya Chakravarty, Sahitya Akademi

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore birth anniversary

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy