Advertisement
E-Paper

গাঁধীর খোঁজে ১৮ বছর

পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরোর তখন মাথায় হাত। জওহরলাল নেহরুর অনুরোধও মানেননি অভিনেতা অ্যালেক গিনেস। তিনি মনে করেন, গাঁধীর ভূমিকায় কোনও ভারতীয়ের থাকা উচিত। নারাজ মার্লন ব্র্যান্ডো, অ্যান্থনি হপকিন্স, ডাস্টিন হফম্যান-এর মতো অভিনেতাও। কিন্তু হাল ছাড়েননি লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে তিনি চিঠিতে জানিয়েছেন ছবির কথা। সেই ছবি— ‘গাঁধী’— তৈরি হয়েছিল আরও কুড়ি বছর পর, ১৯৮২ সালে। অস্কার জিতেছিল আটটা। সে দিন রিচার্ড ও মতিলালের সেই কথোপকথন, আর পরের কুড়ি বছরের সুদীর্ঘ যাত্রার অনুপুঙ্খ বিবরণ এখন রাখা আছে সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে, ‘অ্যাটেনবরো পেপার্স’-এ।

শ্রাবণী বসু

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৯ ০০:০৫
দর্শনীয়: ‘গাঁধী’ (১৯৮২) ছবির একটি দৃশ্যে বেন কিংসলে।

দর্শনীয়: ‘গাঁধী’ (১৯৮২) ছবির একটি দৃশ্যে বেন কিংসলে।

আটটা বেজে গিয়েছে, কিন্তু রিচার্ড অ্যাটেনবরো তখনও বিছানায় সে দিন। ১৯৬২-র এক সকাল। আগের রাতে অনেক ধকল গিয়েছে, আগাথা ক্রিস্টির ‘মাউসট্র্যাপ’-এর মঞ্চাভিনয় ছিল ওয়েস্ট এন্ড-এ, স্ত্রী শিলা সিমসও ছিলেন সঙ্গে। ঘরের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। ও পারের পুরুষকণ্ঠটি নিজের পরিচয় দিলেন: লন্ডনে থাকা এক ভারতীয় সরকারি কর্মী। নাম মতিলাল কোঠারি। রিচার্ড তখনও ক্লান্ত, তাঁকে বললেন ঘণ্টাখানেক পরে ফোন করতে। ও পারের মানুষটি বললেন, বরং লাঞ্চে দেখা করে কথা বললে কেমন হয়? তা-ই ঠিক হল। মধ্যাহ্নভোজে দেখা হলে মতিলাল রিচার্ডকে খুব যেন গোপন কথা বলছেন এমন ভাবে বললেন, মহাত্মা গাঁধীকে নিয়ে ছবি বানানোর জন্য রিচার্ডই উপযুক্ত লোক। লুই ফিশার-এর লেখা গাঁধীর বিখ্যাত জীবনী অবলম্বনে বানানো যেতে পারে সেই ছবি।

সেই ছবি— ‘গাঁধী’— তৈরি হয়েছিল আরও কুড়ি বছর পর, ১৯৮২ সালে। অস্কার জিতেছিল আটটা। সে দিন রিচার্ড ও মতিলালের সেই কথোপকথন, আর পরের কুড়ি বছরের সুদীর্ঘ যাত্রার অনুপুঙ্খ বিবরণ এখন রাখা আছে সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে, ‘অ্যাটেনবরো পেপার্স’-এ। ব্রাইটনের আর্কাইভে রাখা এই সব কাগজপত্র দেখলে পরিষ্কার হয় সিনেমা তৈরির আগে বিস্তর চড়াই-উতরাই আর হোঁচট-ঠোক্করের ছবিটা। ২০১৪ সালে অ্যাটেনবরোর মৃত্যুর পর তাঁর সংগ্রহে থাকা সব কাগজপত্র খুব নিষ্ঠা ও মনোযোগের সঙ্গে ক্যাটালগ করা হয়। ২৬২ ফুট দীর্ঘ বইয়ের তাকে রাখা সেই সমস্ত নথিপত্র সম্প্রতি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল কাগজপত্রের মধ্যে ৭০টা বাক্স ভরা আছে ‘গাঁধী’ ছবি তৈরির নানান গল্পে আর উপকরণে।

মতিলাল কোঠারি যখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, রিচার্ড অ্যাটেনবরো তখন প্রধানত এক জন অভিনেতা। জীবনে কোনও দিন কোনও ছবি পরিচালনা করেননি, সে রকম উচ্চাশাও ছিল না। উপরন্তু, তিনি কোনও দিন ভারতে আসেননি, মহাত্মা গাঁধী সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানতেন না। শুধু গাঁধীর মৃত্যু আর জনমানসে তার প্রতিক্রিয়াটুকু জানা ছিল তাঁর। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি দিল্লির প্রার্থনাসভায় আততায়ীর তিনটে বুলেট বিদ্ধ করে গাঁধীকে। রিচার্ড তখন বছর চব্বিশের এক তরতাজা তরুণ। মঞ্চে অভিনয় করেন, গ্রাহাম গ্রিনের উপন্যাস থেকে হওয়া ছবি ‘ব্রাইটন রক’-এর প্রধান ও ভয়ঙ্কর চরিত্র ‘পিঙ্কি’-র রোলে অভিনয় করেছেন। ১৯৬২ সালে যখন মতিলাল এসে তাঁকে ছবি বানানোর প্রস্তাব দেন, রিচার্ড অবশ্য তত দিনে চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও হাত দিয়েছেন। যদিও ছবি পরিচালনার কাজটা ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁর ব্যবসার পার্টনার ব্রায়ান ফোর্বসকে।

দর্শনীয়: ‘গাঁধী’ (১৯৮২) ছবির সেটে পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরো ও অভিনেতা বেন কিংসলে।

আঠার মতো সেঁটে রইলেন মতিলাল। রিচার্ডকে পড়তে দিলেন ফিশারের লেখা বইটা। রিচার্ড তো বই পড়ে মুগ্ধ! রিচার্ডের মা ছিলেন সাফ্রাজেট আন্দোলনের কর্মী, বাবা শিক্ষাজগতের মানুষ। সাফ্রাজেটেরই এক সভায় তাঁদের দুজনের দেখা, পরে প্রেম। রিচার্ডের ভাই ডেভিড পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে অক্লান্ত কর্মী। লুই ফিশারের বই পড়ে রিচার্ড বুঝলেন, গাঁধীর প্রিয় অনেক নীতিতে তাঁরও ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

ঠিক তার আগের বছরই, ১৯৬১-তে রিচার্ডের মা মারা যান এক গাড়ি-দুর্ঘটনায়। পরে রিচার্ড আক্ষেপ করেছিলেন ‘গাঁধী’ ছবিটা তাঁর মা— যিনি জীবনভর সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে সওয়াল করে গিয়েছেন— দেখে যেতে পারেননি বলে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষের শুরু মহাত্মা গাঁধী ছাড়া আর কারও পক্ষে করা সম্ভব ছিল না, এমনই ভাবনা ছিল রিচার্ডের।

‘গাঁধী’ ছবিটা রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ছবির প্রতি তাঁর নিষ্ঠার কথা চলচ্চিত্র মহলে লোকের মুখে মুখে ফিরত। বছরের পর বছর বহু মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তাঁর প্রিয় ‘গাঁধী প্রোজেক্ট’ নিয়ে। সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন চিত্রনাট্য-লেখক জন ব্রাইলি-র সঙ্গে। ব্রাইলি প্রথমে সন্দিহান ছিলেন। কেবল কোমরটুকুতে কাপড় জড়ানো একটা বুড়ো লোক মাটিতে পাতা আসনে বসে আছে, মুখে শান্তি আর অহিংস প্রতিরোধের কথা, একে নিয়ে তৈরি ছবি পয়সা দিয়ে দেখবে কে? পরে কিন্তু ফিরে এসেছিলেন প্রোজেক্টে, তাঁর লেখা চিত্রনাট্যও অস্কার পেয়েছিল।

‘গাঁধী প্রোজেক্ট’-এর ওই যে ৭০টা বাক্স, সেগুলো তো দুর্দান্ত সব গল্পের খনি। তার মধ্যেও সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হল ছবির নামভূমিকায়, অর্থাৎ গাঁধী চরিত্রে অভিনেতা খোঁজার কাহিনি।

১৯৬৩ সালে রিচার্ড অ্যাটেনবরো অভিনেতাকে অ্যালেক গিনেসকে অনুরোধ করেন গাঁধী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান। সে বছর মার্চে গিনেসের এজেন্ট রিচার্ডকে জানান, ‘‘আজ সকালেই অ্যালেকের কাছ থেকে লম্বা একটা চিঠি পেলাম। যা আশঙ্কা করেছিলাম, তা-ই; ও ‘না’ বলেছে।’’ ‘না’ বলার কারণও ছিল। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পরিচালক ডেভিড লিন অ্যালেক গিনেসকে গাঁধী চরিত্রে অভিনয় করতে বলেছিলেন। পরে সেই ছবি আর হয়নি। গিনেস বলেছিলেন, দ্বিতীয় বার ওই একই চরিত্রে অভিনয় করার সামর্থ্য তাঁর নেই। ১৯৬৩-র অক্টোবরে গিনেস লিখেছিলেন রিচার্ডকে: ‘‘আমি বুড়ো বুড়ো তস্য বুড়ো।’’ রিচার্ড বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, ছবিতে বুড়ো বয়সের গাঁধীকেই দেখা যাবে, বয়সটা তাই কোনও বাধা নয়। তবু গিনেস রাজি হলেন না। এও বলেছিলেন, ‘‘এই নিয়ে বোধহয় চার বা পাঁচ বার আমাকে গাঁধী চরিত্রে অভিনয় করতে বলা হল!’’ তারও আগে, এপ্রিলে এক চিঠিতে এক বার রিচার্ডকে লিখেছিলেন, গাঁধী চরিত্রে কোনও হিন্দুর অভিনয় করা উচিত! মাসকয়েক পরে আবারও লিখেছিলেন, ‘‘আমি এখনও মনে করি তোমার এক জন ভারতীয় অভিনেতা দরকার— কোনও ইংরেজ যে হতে পারে না তা নয়— বা অনামী কেউ!’’

গিনেস তখন সদ্য ডেভিড লিন-এর ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ ছবিতে প্রিন্স ফয়সালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। নানান বেশে একাধিক চরিত্রে অভিনয়ে তাঁর জুড়ি ছিল না, ‘কাইন্ড হার্টস অ্যান্ড করোনেটস’ ছবিতে তিনি ন’টা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। গিনেস জানতেন, মেক-আপ নিয়ে হয়তো গাঁধী হওয়া যাবে সহজেই, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ কারও গাঁধীর চরিত্রে অভিনয় করাটা তাঁর কাছে বেমানান লেগেছিল। ‘গাঁধী’ ছবি তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে, ১৯৮৪ সালে ডেভিড লিন-এরই ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ ছবিতে অবশ্য প্রফেসর গডবোলে হয়েছিলেন অ্যালেক গিনেস।

সহাস্য: ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে রিচার্ড অ্যাটেনবরো। ১৯৮৩। ছবিতে আছে ইন্দিরার স্বাক্ষরও।

রিচার্ড বুঝতে পেরেছিলেন, ‘গাঁধী’ ছবি বানাতে গেলে তাঁর ভারত সরকারের সাহায্য চাই। তিনি চিঠি লিখলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে, জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে যাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রিচার্ড অ্যাটেনবরো ও ভারত সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করেছিলেন মাউন্টব্যাটেনই। ১৯৬২ সালে রিচার্ড মাউন্টব্যাটেনকে লিখেছিলেন, ‘ভারতীয় কোনও অভিনেতাকে (গাঁধী চরিত্রে) পেলে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভাল হয়। তা না হলে আমরা স্বাভাবিক ভাবেই চাইব দুর্দান্ত কোনও ব্রিটিশ অভিনেতাকে; স্যর অ্যালেক গিনেস এই ছবি নিয়ে এরই মধ্যে খুব আগ্রহ দেখিয়েছেন।’

কিন্তু তা হল না। ১৯৬৪-র ফেব্রুয়ারিতে গিনেস জানিয়ে দিলেন, ‘গাঁধী’ করছেন না তিনি। রিচার্ড খুব হতাশ হলেন। ভেবেছিলেন গিনেসকে বুঝিয়ে রাজি করাবেন, হল না। গিনেসকে লিখলেন, তাঁর মতো অভিনেতার ‘না’ বলে দেওয়াটা শুধু তাঁর পক্ষেই নয়, পণ্ডিত নেহরু ও ইন্দিরা গাঁধীর পক্ষেও হতাশার, রিচার্ডের ভারত সফরে তাঁরা দুজনেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে অ্যালেক গিনেসই গাঁধীর চরিত্রে অভিনয় করুন। গিনেসকে দিয়ে গাঁধী করানোর কথা প্রথম বলেছিলেন অবশ্য মতিলাল কোঠারি। ’৬৩-র এপ্রিলে মতিলাল নিজে গিনেসকে চিঠি লিখেছিলেন, সেই চিঠির কপি পাঠিয়েছিলেন রিচার্ড অ্যাটেনবরোকেও। মতিলাল লিখেছিলেন, গাঁধী আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ‘আন্তর্জাতিক সহিংস ঘটনা’ রুখতে পথে নামতেন। মতিলাল স্পষ্ট করে বলেননি কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা, সম্ভবত তিনি ভিয়েতনামে বিপুল সংখ্যায় মার্কিন সেনা নামার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। ইরাকেও একটা সেনা অভ্যুত্থান হয়েছিল। মতিলাল বলতে চেয়েছিলেন, পৃথিবীর মানুষ অন্তত একটা ছবিতে দেখলেও হয়তো বুঝতে পারবে, গাঁধী সারা জীবন কোন জিনিসগুলোর জন্য লড়েছেন। আরও লিখেছিলেন, অ্যালেক গিনেসকে দেখে তাঁর গাঁধীর কথা মনে হয়। শুধু চেহারার সাদৃশ্যটাই সব নয়, মতিলালের মতে, অ্যালেক গিনেসের মতো অভিনেতাই পারবেন ‘গাঁধীর মতো এক জন মানুষের সৌজন্যবোধ, করুণা, সাহস, প্রজ্ঞা, রসবোধ, মানবিকতা আর সর্বোপরি বিনয় ফুটিয়ে তুলতে।’

সন্দেহ নেই, গিনেস অভিনয় করলে আন্তর্জাতিক দর্শক লুফে নিতেন ‘গাঁধী’কে, ছবিটার দরও বাড়ত। মতিলাল এবং নেহরু-ইন্দিরার কাছে গায়ের রঙের চাইতে এই ব্যাপারটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেনের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া নিয়ে যে ছবি, সেখানে এক জন ব্রিটিশ অভিনেতা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলে হইহই পড়ে যাবে, এমনই ভাবনা ছিল তাঁদের।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি ভারতে ছড়িয়ে পড়ল ‘গাঁধী’ ছবি তৈরির কথা। রিচার্ড কাঁড়ি কাঁড়ি চিঠি পেতে থাকলেন অভিনেতাদের কাছ থেকে। ছবি-সহ চিঠি পাঠালেন আশায় বুক বাঁধা বহু ভারতীয়ও। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সেই সব হলদে খাম আর এয়ার মেলে পাঠানো চিঠি পড়লে মজা লাগে বেশ। পত্রলেখকদের মধ্যে ছিলেন স্বর্ণকার, আলোকচিত্রী, এমনকি এক চক্ষু-বিশেষজ্ঞও। আর এক জন চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তিনি চার বার কারাবন্দি হয়েছিলেন, গাঁধীর সঙ্গেই! আরও এক জনের বক্তব্য, তিনি পনেরো বছর ধরে নেহরুর ভাবভঙ্গি মকসো করছেন। কেউ কেউ একেবারে লিস্টি করে লিখে পাঠিয়েছিলেন গাঁধীর সঙ্গে তাঁদের কোথায় কোথায় মিল, যেমন: ‘১) মহাত্মার মতোই আমারও চশমা পরা স্বভাব; ২) মহাত্মাজি নিরামিষাশী ছিলেন, আমিও তাই।’ এক জন তাঁর দাদুর ছবি পাঠিয়েছিলেন, গাঁধী চরিত্রে মানাবে বলে!

১৯৮৩ সালের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে সেরা ছবি, সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেতার অস্কার হাতে রিচার্ড অ্যাটেনবরো ও বেন কিংসলে

রিচার্ডের সেক্রেটারির কাজ ছিল প্রত্যেকটা চিঠির উত্তর দেওয়া। শ্রদ্ধেয় অমুকবাবু, মহাত্মা গাঁধীকে নিয়ে তৈরি ছবিটির প্রতি আপনার আগ্রহের জন্য এবং আপনার দাদুর ছবিটি পাঠানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ওঁদের দুজনের চেহারায় সত্যিই খুব মিল। আমরা অবশ্য ছবিতে গাঁধীকে আঠারো বছর বয়স থেকে দেখাব, তাই আমাদের চাই এক জন তরুণ অভিনেতা।

রিচার্ড অ্যাটেনবরো যখন এই সব চিঠিপত্র আর অনুরোধের বন্যায় ভাসছেন, সেই সময়েই কৃষ্ণ ভানজি নামে এক জন ম্যাঞ্চেস্টারে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। তাঁর বাবা গুজরাতি মুসলমান, মা ব্রিটিশ-ইহুদি। কৃষ্ণের ধারণা হয়েছিল, তাঁর অভিনয় ও অডিশন ঠিকঠাক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এই ভারতীয় নামটা যেন একটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তিনি তাই নিজের নামটা পাল্টে রাখলেন— বেন কিংসলে। আর কী আশ্চর্য, নাম পাল্টানোর পরেই রয়্যাল শেক্সপিয়ারিয়ান কোম্পানি থেকে ডাকও পেলেন! ১৯৬৭ সালে যোগও দিলেন সেখানে। রিচার্ডের ‘গাঁধী প্রোজেক্ট’ নিয়ে অবশ্য বেন কিছু জানতেন না।

বছরের পর বছর কাটল, ভারতে সরকারও পাল্টাল। রিচার্ড অ্যাটেনবরো তখনও ‘গাঁধী’ ছবি নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে নেহরুর মৃত্যু হয়েছে, ইন্দিরা গাঁধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করলেন, তার ফলও ভুগতে হল। ক্ষমতার পালাবদলে প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই। রিচার্ডের সঙ্গে মতিলালের সেই কথোপকথনের পর পেরিয়ে গিয়েছে সতেরোটা বছর। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখনও সক্রিয়, যদি ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলে ছবি তৈরি সম্ভব হয়। ঠিক হয়েছিল, তাঁর চরিত্রটা করবেন অভিনেতা পিটার হার্লো। ১৯৭৯ সালের ২৬ জুন মোরারজি দেশাইকে মাউন্টব্যাটেন লিখছেন: ‘এই চিঠি পাঠাচ্ছি স্যর রিচার্ড অ্যাটেনবরোর হাতে, যিনি মহাত্মা গাঁধীর জীবনভিত্তিক একটি অতি উচ্চ মানের চলচ্চিত্র তৈরির ব্যাপারে আলোচনা করতে দিল্লি যাচ্ছেন। আপনার সঙ্গেও তিনি দেখা করবেন। আমি এ বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রিন্স অব ওয়েলসকে নিয়ে ভারতে আসতে চাই।...’ কিন্তু সেই আসা আর হয়ে ওঠেনি। দু’মাস পর আয়ারল্যান্ডে বোমায় নিহত হন লর্ড মাউন্টব্যাটেন।

অভিনেতা সমস্যার সুরাহা হয়নি তখনও। ১৯৮০-র অক্টোবরে রিচার্ডের অভিনেতা-বন্ধু ডার্ক বোগার্ড তাঁকে লিখলেন, (গাঁধী চরিত্রে) অভিনেতা পাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যিনিই (নির্বাচিত) হোন, তাঁর সামনে একটা মস্ত কঠিন কাজ, আর ছবিটা কোন উচ্চতায় পৌঁছবে বা কোথায় মুখ থুবড়ে পড়বে, তা নির্ভর করবে এই একটা মানুষের উপরেই। এ তো নিছক চরিত্রমাত্র নয়, এ যে ‘ভারত’-এরই প্রতিমূর্তি!

গাঁধীর সন্ধানে রিচার্ড অ্যাটেনবরো হলিউড আর ব্রিটেনের প্রথম সারির অভিনেতাদের কাছে গিয়েছিলেন। অ্যালবার্ট ফিনি করতে রাজি হননি। মার্লন ব্রান্ডো সদ্য ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাও’ করে উঠেছেন তখন, তাঁকেও বলা হয়েছিল। অফার করা হয়েছিল ডাস্টিন হফম্যান, আল পাচিনোকেও! এমনকি পিটার সেলার্সও বাদ যাননি! অ্যান্টনি হপকিন্স-এর স্ক্রিন টেস্টও হয়েছিল। সত্তরের দশকে রিচার্ড অ্যাটেনবরো বুঝতে পারেন, অভিনেতার তারকা-খ্যাতি ‘গাঁধী’ চরিত্রটাকে ঢেকে দিতে পারে। তখনও তাঁর মনে কোনও ভারতীয় অভিনেতাকে দিয়ে অভিনয় করানোর ইচ্ছে প্রবল, আর এত বছর পরেও ছবিটা বানানোর আকাঙ্ক্ষা তেমনই তীব্র।

জন ব্রাইলি শেষমেশ রাজি হয়েছিলেন চিত্রনাট্য লিখতে, যদিও পরিচালকের সঙ্গে তাঁর মতান্তর চলছিলই। রিচার্ড স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন যে তিনি কোনও ‘আর্ট ফিল্ম’ বানাতে চান না। ব্রাইলিকে বলেছিলেন, ‘‘বিশ্বজোড়া সাফল্য চাই আমার ছবির, একটুও কম হলে চলবে না।’’ ১৯৮০ সালে ব্রাইলি রিচার্ডকে বলেন জন হার্টকে দিয়ে স্ক্রিন টেস্ট করাতে। তা-ই হল, কিন্তু স্ক্রিন টেস্টের ছবি দেখে হার্ট বললেন, তাঁকে এই চরিত্রে মোটেই মানাচ্ছে না, ভয়ঙ্কর বেখাপ্পা লাগছে। সব দেখেশুনে রিচার্ড ব্রাইলিকে লিখলেন, ‘এতদিনকার অভিজ্ঞতা থেকে ভালমতো বুঝছি, ভারতীয়ের চরিত্রে এক জন ককেসীয়কে ভাবা একেবারে গোড়ায় গলদ হবে।’

এই সময়েই রিচার্ডের ছেলে মাইকেল তরুণ ভারতীয় অভিনেতা কৃষ্ণ ভানজি ওরফে বেন কিংসলে-র কথা রিচার্ডকে বলেন। রয়্যাল শেক্সপিয়ারিয়ান কোম্পানির ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নাটকে রিচার্ড বেন-এর অভিনয় দেখেছিলেন, বুঝতেও পারেননি যে বেন আসলে ভারতীয়। বেনকে দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন রিচার্ড, এই তো পেয়ে গেছি আমার ভারতীয় অভিনেতাকে! আবার চিন্তাও হল খুব, প্রযোজকরা যদি না করে দেন শুনে! রিচার্ড তাঁর প্রযোজকদের উপরে বিশেষ এক শর্ত আরোপ করলেন— তাঁরা পরিচালককে কখনও বলবেন না, ছবির নামভূমিকায় বিরাট খ্যাতিমান বা জনপ্রিয় কাউকে নাও। চিন্তিত মনেই মাইকেলকে সঙ্গে নিয়ে বেন-এর পরবর্তী মঞ্চাভিনয় দেখতে গেলেন— বের্টোল্ট ব্রেশট-এর নাটক।

২৫ জুলাই ১৯৮০। বেন কিংসলে-কে স্ক্রিন টেস্টে ডাকা হল শেপার্টন স্টুডিয়োয়। সঙ্গে ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ, নেহরুর চরিত্রে অডিশন দিতে এসেছিলেন। নাসিরুদ্দিন নির্বাচিত হননি, ছবিতে নেহরুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রোশন শেঠ। স্ক্রিন টেস্ট-এর ‘রাশ’ দেখার সময় রিচার্ড খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। এত বছর ধরে তিনি এমন এক অভিনেতা খুঁজছেন যাঁর চোখদুটো ঝকঝক করবে, যিনি পর্দায় তো বটেই, ইতিহাসেও অনায়াসে সব মানুষের নজর কাড়বেন, যিনি একই সঙ্গে এক জন ইংরেজি-শিক্ষিত আইনজীবী হিসেবে, আবার কটিবস্ত্র পরিহিত মানুষ হিসেবেও রুপোলি পর্দা ঝলসাবেন। বেন কিংসলে সব ক’টাতেই দারুণ উতরোলেন। স্ক্রিন টেস্ট মিটে গেলে রিচার্ড অ্যাটেনবরো ইংরেজদের স্বভাবোচিত গাম্ভীর্যে তাঁকে বললেন, ‘‘তুমিই করো তা হলে!’’ বেন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘আমি এই ছবির দাসানুদাস হয়ে থাকব।’’

দীর্ঘ আঠারো বছরের যাত্রা এ ভাবেই শেষ হল অবশেষে। তত দিনে ইন্দিরা গাঁধী আবারও ভারতের শাসনক্ষমতায়। ‘অ্যাটেনবরো পেপার্স’-এর মধ্যে ১৯৮৩ সালের একটা ছবি আছে। সাদা শাড়ি পরা ইন্দিরা গাঁধী রিচার্ড অ্যাটেনবরোর হাত ধরে আছেন, দুজনেই সহাস্য। ছবিটার গায়ে লেখা: ‘শুভেচ্ছা-সহ, ইন্দিরা গাঁধী’।

মতিলাল কোঠারির সঙ্গে দেখা হওয়ার কুড়ি বছর পর ‘গাঁধী’ মুক্তি পেল। এর মধ্যে রিচার্ড অ্যাটেনবরো তিনটে ছবি বানিয়ে ফেলেছেন। তিন ঘণ্টা দশ মিনিটের ছবি ‘গাঁধী’কে মহাকাব্যিক বললে অত্যুক্তি হয় না। শয়ে শয়ে চরিত্র আছে এই ছবিতে। সিনেমায় জনতার চরিত্রে যে ‘এক্সট্রা’রা অভিনয় করেন, এই ছবির ক্ষেত্রে তাঁদের সংখ্যা ছিল চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বাধিক। আর সবচেয়ে বড় কথা যেটা, মঞ্চে অভিনয় করা, প্রায়-অপরিচিত এক অভিনেতা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ছবিটাকে। আটটা অস্কারের মধ্যে ছিল শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য, শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার। গাঁধীর জীবনকাহিনিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিল এই ছবি।

আর রিচার্ড অ্যাটেনবরোর কাছে হয়ে উঠেছিল জীবনেরই প্রতিশব্দ!

Gandhi Ben Kingsley Movie Richard Attenborough
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy