Advertisement
E-Paper

ফানপ্রস্থ

বৃদ্ধাশ্রম মানেই যেন ব্যাকগ্রাউন্ডে করুণ বেহালা। কিন্তু নিজের ইচ্ছেয়, নিজের সিদ্ধান্তে, নিজের আনন্দের খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমে এসে দাপিয়ে বাঁচছেন, এমন বৃদ্ধবৃদ্ধাও আছেন।২০১০-এ গিয়েছিলাম নেপাল, ২০১১-তে রাজস্থান, মিশর গেলাম ২০১২-এ, আর ২০১৩-তে ঘুরে এলাম গুজরাত’-- কর গুনে গুনে হিসেব দিয়ে যাচ্ছিলেন বীরেন হাজরা। ভদ্রলোকের চেহারা রোগা-পাতলা, মাথার চুল ডাই করা, সামনের দিকে শুধু এক চিলতে টাক। দেখলে তো পঞ্চাশ-পঞ্চান্নর বেশি মনে হয় না, তবু অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে বয়সটা জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন, ‘সাতষট্টি’। বীরেনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল যেখানে, সেখানে তাঁর মতো কোনও ছটফটে প্রাণবন্ত বৃদ্ধকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় আসেনি। জায়গাটা দিল্লি রোডের ধারে একটা বৃদ্ধাশ্রম। তারই একটি ঘরে বীরেনবাবুর এখনকার ঠিকানা।

সীমান্ত গুহঠাকুরতা

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০১৪ ০০:০৫
ছবি: সুমন চৌধুরী

ছবি: সুমন চৌধুরী

২০১০-এ গিয়েছিলাম নেপাল, ২০১১-তে রাজস্থান, মিশর গেলাম ২০১২-এ, আর ২০১৩-তে ঘুরে এলাম গুজরাত’-- কর গুনে গুনে হিসেব দিয়ে যাচ্ছিলেন বীরেন হাজরা। ভদ্রলোকের চেহারা রোগা-পাতলা, মাথার চুল ডাই করা, সামনের দিকে শুধু এক চিলতে টাক। দেখলে তো পঞ্চাশ-পঞ্চান্নর বেশি মনে হয় না, তবু অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে বয়সটা জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন, ‘সাতষট্টি’। বীরেনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল যেখানে, সেখানে তাঁর মতো কোনও ছটফটে প্রাণবন্ত বৃদ্ধকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় আসেনি। জায়গাটা দিল্লি রোডের ধারে একটা বৃদ্ধাশ্রম। তারই একটি ঘরে বীরেনবাবুর এখনকার ঠিকানা। ‘এখনকার’ বলাই ভাল, কারণ বীরেনবাবুর ভাষায়, ‘আমি পরিযায়ী স্বভাবের মানুষ। এক জায়গায় আমার বেশি দিন মন টেকে না। ২০১০ সালে এখানে, এই বৃদ্ধাবাসে এসেছি। চার বছর হয়ে গেল। কোনও দিন হয়তো দুম করে পালাব অন্য কোথাও।’

অবাক হতে হল। বৃদ্ধাশ্রম বলতে তো জানা ছিল সন্তান দ্বারা পরিত্যক্ত এক দল বুড়ো-বুড়ির জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটানোর মতো আস্তানা। সেখানে বীরেন হাজরার মতো লোক কী করছেন? জানা গেল, মানুষটি অকৃতদার, ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আজীবন সরকারি উচ্চপদে কাজ করে রোজগার করেছেন অঢেল। তাঁরা সাত ভাই দুই বোন। বর্ধমানে তাঁদের বিরাট পরিবার এখনও ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সে সব ছেড়ে তিনি শুধুমাত্র নিশ্চিন্তে আর স্বাধীন ভাবে বাঁচার জন্য বেছে নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমের জীবন।

চার বেলা সময় মতো খাবারদাবার তাঁর ঘরে এসে যায়, জামাকাপড়-কাচাকুচিও ফরমায়েশ মতো করে দেওয়া হয়। অতএব বীরেনবাবুও নিশ্চিন্তে তাঁর সমাজসেবা আর ভ্রমণ চালিয়ে যান। সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স, পথশিশুদের একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত আছেন। আর সুযোগ পেলেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে আশ্রমের এই এক চিলতে ঘরে তালা ঝুলিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। ‘আরে বাবা, টাকা খরচ করব বলেই সারা জীবন প্রাণপাত করে রোজগার করেছি’, বললেন সাতষট্টি বছরের টগবগে তরুণ, ‘ইচ্ছে আছে এ বছর ব্যাংককটা ঘুরে আসব।’

ভারতী তালুকদার ছিলেন কলকাতার একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। আর সেই স্কুলেরই শিক্ষিকা ছিলেন অণিমা ঘোষ। ভারতী স্বামীকে হারিয়েছেন বছর দুয়েক আগে, অণিমা বিয়ে করেননি। কর্মজীবনের বন্ধুত্বের টানে দুজনেই এখন থাকছেন হুগলি জেলার একটা বৃদ্ধাবাসে। পাশাপাশি ঘরে।

প্রতিটি বৃদ্ধাবাসেই এখন সাজানো গোছানো এক বা একাধিক গেস্ট হাউস থাকে। আবাসিকদের আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ ইচ্ছা করলেই সেখানে নির্ধারিত ফি দিয়ে রাত্রিবাস করতে পারে। তাঁদের জন্য স্পেশাল মিল-এরও বন্দোবস্ত করা যায়। ভারতীর মেয়ে কলকাতায় থাকে। অবরে-সবরে আসে মায়ের কাছে। বৃদ্ধাবাসের গেস্ট-হাউসে দু’এক রাত থেকেও যায়। আদর-যত্নের অভাব হয় না। ‘আমি কেন মেয়ের বাড়িতে অতিথির মতো থাকতে যাব?’ ভারতী বলছিলেন হাসতে হাসতে, ‘বরং মেয়েই আমার কাছে এসে থাকুক অতিথির মতো।’

এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়েন টইটই করতে। মেয়েই টিকিট কেটে দেয় প্লেনের কিংবা ট্রেনের, হোটেলও বুকিং করে দেয়। গত ফেব্রুয়ারিতে সাত দিনের টুরে গোটা ত্রিপুরা চক্কর মেরে এসেছেন। এখন দুজন মিলে পরিকল্পনা করছেন, আগামী উইক-এন্ডে একটা গাড়ি ভাড়া করে কোথাও একটা ‘শর্ট ট্রিপ মেরে আসা যায় কি না।’

‘আসলে সমস্যাটা আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির’, বলছিলেন উনসত্তর বছরের মানসী বন্দ্যোপাধ্যায়। মানসীর স্বামীর ছিল বদলির চাকরি। এক ছেলে এবং এক মেয়েরও তাই। তাঁদের সঙ্গে থাকার সূত্রে ভারতের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। একটা সময় এই ধারাবাহিক ঠিকানা বদল আর ভাল লাগছিল না। ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘ওই কালো কালো সুটকেসগুলো দেখলেই বিরক্ত লাগছিল।’ মানসী তাই এখন পূর্ব কলকাতার একটা বৃদ্ধাবাসের স্থায়ী বাসিন্দা। নিজের ঘরের লাগোয়া এক চিলতে ঘেরা বারান্দায় রাখা ইন্ডাকশন কুকারে বানানো কফির ধূমায়িত পেয়ালা হাতে গল্প করছিলেন তিনি।

‘আমাদের রাজ্যে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বুড়োবুড়িদের অত্যন্ত করুণার চোখে দেখা হয়। সরকারি অফিসে কোনও কাজ নিয়ে গেলে শুনতে হয়, আপনি একা কেন এসেছেন, আপনার ছেলে-মেয়ে কোথায়। যেন তাঁরা বয়স্ক হয়েছেন মানেই যাবতীয় কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। সেই মানসিকতারই প্রকাশ ঘটে বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে চিন্তাভাবনায়। বৃদ্ধাশ্রম মানেই যেন এক চিলতে চৌকিতে শুয়ে অবহেলা আর অনাদরে শুয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা। অথচ আদপেই ব্যাপারটা তেমন নয়। আমরা এখানে মরতে আসিনি, নতুন ভাবে বাঁচতে এসেছি।’

‘কোথাও একটা থামতে জানতে হয়।’ সটান বলে বসলেন কর্মসূত্রে প্রবাসী বাঙালি সমীর চট্টোপাধ্যায়। সমীরবাবু ছিলেন ইলাহাবাদের বড় ব্যবসাদার। একাধিক গার্লস হোস্টেল, ট্রাভেল এজেন্সি, ছাপাখানা নিয়ে তাঁর ব্যবসা ছড়ানো ছিল সারা ইলাহাবাদ জুড়ে। মাস গেলে শুধু কর্মচারীদের মাইনে দিতেই খরচ হত হাজার পঞ্চাশেক টাকা। আটখানা ঘরের দোতলা বড় বাড়ি, দুটো গাড়ি, এক রাশ চাকরবাকর নিয়ে সেই অবিমিশ্র সুখের সংসার তিনি মাত্র ছ’মাসের সিদ্ধান্তে ছেড়ে চলে এসেছেন শহরতলির একটা ওল্ড এজ হোমে। সঙ্গে স্ত্রী রীনা চট্টোপাধ্যায়। রীনার বয়স মাত্র ৫৩। হঠাৎ এমন কী ভয়ংকর বৈরাগ্য জাগল তাঁদের যে, এত বৈভব এত সুখ আর ভাল লাগল না? এক কথায় বিক্রি করে দিলেন ঘরবাড়ি, সম্পর্ক চুকিয়ে এলেন দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পুরনো শহরের সঙ্গে?

‘কারণটা আমিও ঠিক জানি না’, বললেন সমীরবাবু, ‘তবে এটুকু বলতে পারি আমার ব্যবসা ওই সময়টায় একেবারে ‘পিক’-এ ছিল। সেই সময় হঠাৎই এক দিন মনে হল, সারা জীবন তো রুটি ছিঁড়লাম, এ বার আমি কবিতা লিখব, বাগান করব আর স্ত্রীর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাব।’

ইন্টারনেটে খোঁজ পেয়েছিলেন শহরতলির এই বৃদ্ধাবাসের। সস্ত্রীক এক দিন এসে দেখে গিয়েছিলেন। ব্যবস্থাপনা দেখে মুগ্ধ সমীরবাবু সেই দিনই বুকিং করে ফিরে যান। ব্যবসাপত্র গুটিয়ে, বাড়িঘর বিক্রি করে, অধীনস্থ কর্মচারীদের রুজিরুটির পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে দিয়ে চিরকালের মত চলে আসেন ছ’মাস পর। একমাত্র মেয়ে, যার বিয়ে হয়েছে ইলাহাবাদেই, শুনে রীতিমত আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘তোমরা বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে?’

‘মেয়ে জানত না বৃদ্ধাশ্রমের কনসেপ্টটাই এখন বদলে গেছে। এখন জানে। নিজের চোখে এসে দেখে গেছে আমাদের। শি ইজ স্যাটিসফায়েড ইনাফ। কেউ হয়তো বিশ্বাস করবে না, ভাববে নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বলছি, কিন্তু আমরা সত্যিই সুখে আছি এখানে। দারুণ ভাল আছি।’ পশ্চিমা হিন্দি মেশানো বাংলায় বললেন রীনা।

‘আমরা ব্যবসাটাই করি, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আবাসিকদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার বিনিময়ে আমরা তাঁদের যাবতীয় পরিষেবাও দিয়ে থাকি’, বলছিলেন এমনই একটা আধুনিক বৃদ্ধাবাসের ম্যানেজার শ্যামল অধিকারী, ‘আসলে বাঙালি সেবা জিনিসটাকে খুব ভালবাসে, আর ব্যবসা জিনিসটা খুব অন্তর থেকে ঘৃণা করে। তাই টাকার বিনিময়ে কেউ যদি সেবা করে, তাকে তারা কিছুতেই ভাল চোখে দেখতে পারে না। আমরা কিন্তু সেই কাজটাই করি এবং অত্যন্ত যত্ন নিয়েই। সরকারি বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত ডেস্টিটিউট হোমগুলোর সঙ্গে এটাই আধুনিক বৃদ্ধাবাসগুলোর মৌলিক পার্থক্য।’

শ্যামলবাবুর কাছ থেকেই জানা গেল, এই জাতীয় ওল্ড-এজ হোমগুলোতে আবাসিকদের জন্য এক দল কর্মচারী সব সময় মজুত থাকে। সময়মত ওষুধ-পথ্যের ব্যবস্থা তো থাকেই, পাশাপাশি সপ্তাহে এক দিন করে মেডিকাল চেক-আপ হয় প্রতিটি আবাসিকের, বড়সড় কোনও অপারেশন হলে তাঁরাই দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে করান, এমনকী কোনও আবাসিকের মৃত্যু হলে তাঁর আত্মীয়স্বজনের অনুমতিসাপেক্ষে যথাবিধি সৎকারও নিজেরাই করেন তাঁরা।

সমীরবাবুর অফিস-ঘরে টেবিলের কাচের নীচে একটা ছোট ক্যালেন্ডার রাখা। তাতে বিভিন্ন তারিখের চারপাশে গোল দাগ। জানা গেল, ওগুলো বিভিন্ন আবাসিকের জন্মদিন। প্রত্যেকের জন্মদিনে পার্টির ব্যবস্থা করা হয় হোমের তরফে। তবে আবাসিকদের খাওয়াদাওয়ার দিকে কড়া নজর রাখা হয়। ‘বুঝতেই পারছেন, বুড়ো মানুষদের লোভ একটু বেশি হয়, আর ব্লাড-সুগার কোলেস্টেরল ইত্যাদি তো কমবেশি সবারই আছে’ হাসতে হাসতে বললেন শ্যামলবাবু, ‘তাই একটু-আধটু শাসনে তো সবাইকে রাখতেই হয়।’

এ কথা ঠিক যে টিভি, গিজার, ইন্টারনেট কানেকশন ইত্যাদি অত্যাধুনিক ব্যবস্থাসহ এইসব বৃদ্ধাবাসগুলোতে থাকার জন্য একটা ন্যূনতম আর্থিক সামর্থ্য জরুরি। জীবনের সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ (অথবা সরকারি কর্মচারী হলে রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট থেকে পাওয়া টাকার বেশ খানিকটা) ঢালতে না পারলে ওখানে প্রবেশাধিকার মেলে না।

কিন্তু আসল প্রশ্নটা আর্থিক সামর্থ্যের নয়, মানসিকতার। টাকার জোর অনেকেরই থাকে, কিন্তু সময় থাকতে আত্মসম্মানের সঙ্গে রাজ্যপাট ছেড়ে আসার মত মানসিক জোর সবার থাকে না। সকলেই চায় ছেলেমেয়ের সংসারে কর্তৃত্ব করতে, নাতি-নাতনি পরিবৃত হয়ে, ছেলে-বউমার আদরে-সোহাগে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে। সে চাওয়ায় কোনও দোষ নেই, কিন্তু একটা নির্ভরশীলতার নিবিড় গল্প আছে। আজকাল অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই সেই নির্ভরশীলতা বা শেষ জীবনের ওই পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকার চিরন্তন ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নিজের মতো বাঁচতে চাইছেন।

চাইছেন শ্যাওলা ধরা মধ্যবিত্ত বার্ধক্য-যাপনের, ভালবাসার নামে আত্মজদের অনর্থক করুণা আর শাসনের জাল ছিঁড়ে একটু অন্য রকম ভাবে বাদবাকি জীবনটা কাটাতে। তাঁদের সেই চাহিদাকে পূরণ করতে পারছে বলেই ওল্ড এজ হোমগুলো উপচে পড়ছে ইদানীং। যাবতীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসহ নিশ্চিন্তে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায় সেখানে, পাওয়া যায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং সমবয়সি সমমনস্ক মানুষদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগও।

তবে কি প্রাচীন ভারতবর্ষের বানপ্রস্থের এ এক নতুনতর চেহারা? কলকাতা ও তার আশেপাশের এলাকার বৃদ্ধাবাসগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে এ কথাই বারবার মনে হচ্ছিল। হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ মনুসংহিতায় চতুরাশ্রমের তৃতীয় আশ্রম ‘বানপ্রস্থ’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গৃহস্থ পক্বকেশ শিথিলচর্ম্ম হইলে ও পৌত্রের মুখাবলোকন করিলে, স্ত্রীকে লইয়া বা পুত্রহস্তে স্ত্রীকে সমর্পণ করিয়া বানপ্রস্থ লইবেন এবং বন্য ফলমূলাদি ভক্ষণ করিয়া ঈশ্বরারাধনা করিবেন।’ এটা কি কেবলই একটা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক এষণা, না কি নীরবে ও শান্তিপূর্ণ ভাবে সামাজিক ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা সদুদ্দেশ্যও ছিল এর পিছনে?

‘ব্যাপারটা খানিকটা তো সে রকমই বটে’, বললেন পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, ‘চতুরাশ্রমের একটা নির্দিষ্ট ধর্ম হিসেবে শাস্ত্রকারেরা যখন বানপ্রস্থের বিধান দিচ্ছেন, তখন তার পিছনে একটা সামাজিক কারণ তো অবশ্যই ছিল। তার থেকেও বড় ব্যাপার, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এড়ানোর জন্য বদলে যাওয়া পৃথিবীকে নতুন প্রজন্মের হাতে সমর্পণ করে বনবাসী হবার ওই বিধান দেওয়া হয়েছিল। আজকের ভাষায় বলতে গেলে, শাশুড়ি-বউয়ের যাতে ঝগড়া না হয়, তার জন্যই ওই বানপ্রস্থের বিধান।’

কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা তখন সদ্য রাজা হয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর প্রমুখ কুরুবৃদ্ধেরা সেই সময় বানপ্রস্থের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁদের অনুগামী হলেন কুন্তীও। কুন্তীর ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। তিনি তখন রাজমাতা। নিজপুত্রদের অসীম বৈভব, প্রশ্নাতীত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব— সব ছেড়ে তাঁর সেই বনবাসের সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিল সবাই। পাণ্ডবরা তাঁকে আটকে রাখার কম চেষ্টা করেনি, কিন্তু কুন্তী তাঁর সংকল্প ত্যাগ করলেন না। তিনি বললেন, ‘স্বামীর রাজত্বকালে আমি বহু সুখ ভোগ করেছি, এখন পুত্রের বিজিত রাজ্য ভোগ করতে চাই না।’

আর এ কালের শান্তিলতা মজুমদারও ছেলের বিয়ে দেবার মাত্র সাত দিনের মাথায় কাউকে না জানিয়ে চলে এসেছিলেন একটা বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি জানতেন, পুত্র-পুত্রবধূ তাঁকে ছাড়তে চাইবে না, তাই একেবারে নীরবে নিজের সিদ্ধান্ত রূপায়িত করেছিলেন। আজীবন গৃহবধূ ছিলেন, রোজগার করেননি, কিন্তু বাপের বাড়ির তরফে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়েছিলেন তিনি। সঞ্চিত সেই টাকার একটা অংশ ব্যয় করেই একটা ঘর নিয়েছেন তিনি বৃদ্ধাবাসে।

সেই ঘরে পরম মমতায় গোপালের সিংহাসন পেতেছেন, রাতদিন পুজো-আচ্চা নিয়ে থাকেন। অনেক খুঁজেপেতে এই বৃদ্ধাবাসের ঠিকানা জোগাড় করে ছেলে-ছেলের বউ এসেছিল তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু তাঁদের যাবতীয় অনুনয়-বিনয় ব্যর্থ হয়ে যায়। শান্তিলতা ফেরেননি।

‘ফিরব বলে তো এখানে আসিনি। সংসারের ওপর কর্তৃত্ব করা আর ঈশ্বরসেবা দুটো একসঙ্গে হয় না। আমি আমার গোপালের সেবা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই। আমার এ জন্য কোনও আক্ষেপ আপশোস কিছুই নেই।’ পাটভাঙা সাদা শাড়ি পরে পুজোয় বসার আগে বললেন সদ্যস্নাতা শান্তিলতা।

তবে এ ধারায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাহিনিটি সম্ভবত নিতাই জানার। চুঁচুড়ার বাসিন্দা নিতাইবাবু ছিলেন সরকারি কর্মচারী। অবসর নেওয়ার বছরখানেক আগে তাঁর স্ত্রী মারা গেলেন। সেই ইস্তক চুঁচুড়ার বাড়িতে ছেলের কাছেই ছিলেন তিনি। ছেলে বিবাহিত, বড় ব্যবসাদার। চার বছর আগে বিয়ে হয়েছিল তার। বিপত্নীক নিতাইবাবুর বড় একা লাগত তখন। সাধ ছিল নাতি-নাতনির সঙ্গে আদর-সোহাগ-খুনসুটি করে বাদবাকি জীবনটা কাটাবেন। এক দিন পুত্রবধূর কাছে সেই ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করতেই সটান জবাব পেলেন, ‘আমরা এখন বাচ্চাকাচ্চা নেবার কথা ভাবছি না। আমরা আমাদের লাইফটা এনজয় করতে চাই।’

পুত্রবধূর এই কথায় কেমন একটা ধাক্কা খেলেন নিতাইবাবু। ভাবনাচিন্তা করতে মাত্র দু’দিন সময় নিয়েছিলেন, তার পরই খবরের কাগজে ‘পাত্রী চাই’ কলামে একটা বিজ্ঞাপন দিলেন। তাতে লিখলেন, ‘ষাট বছর বয়সি বিপত্নীক বৃদ্ধের জীবনসঙ্গিনী প্রয়োজন। অবিবাহিতা, বিধবা চলিবে।’ সেই বিজ্ঞাপনের সূত্রেই যোগাযোগ ঘটল বছর চুয়ান্নর সবিতার সঙ্গে। সবিতা ছিলেন অবিবাহিতা। পেশায় হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তার। নিজের ভাইপো-ভাইঝিদের মানুষ করতে গিয়ে উদয়াস্ত খেটে প্রাকটিস করেছেন সারা জীবন, বিয়ের কথা ভাবার সময় পাননি।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার মাত্র ছ’দিন আগে নিতাইবাবু বিয়ে করলেন আবার। তার পর চুঁচুড়ার সেই দোতলা বড় বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সস্ত্রীক একটা বৃদ্ধাবাসে এসে উঠলেন। আজ চোদ্দো বছর তাঁরা আছেন সেখানে। দিব্য আছেন। বৃদ্ধাবাসের বিছানায় বসে মুড়ি-তেলেভাজা খেতে খেতে নিতাইবাবু নিজের জীবনের কাহিনি শোনাচ্ছিলেন, পাশে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন শক্তপোক্ত চেহারার ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা সবিতা জানা। তাঁর প্র্যাকটিস বন্ধ হয়ে গেছে অনেক দিন। তবে বিছানার পাশের টেবিলে এখনও সাজানো অজস্র ছোট-বড় হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধের শিশি। এই হোমের আবাসিকরা অনেকেই ছোটখাটো অসুখ-বিসুখে তাঁর কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে যায়।

‘দ্বিতীয় বার বিয়ে করার পর যে ক’দিন বাড়িতে ছিলাম, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রচুর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, টিটকিরি হজম করতে হয়েছিল। ছেলে-মেয়েরা মুখে কিছু না বললেও বেশ বুঝতে পারছিলাম ব্যাপারটাকে ওরা ভাল ভাবে নেয়নি।’ বলছিলেন নিতাইবাবু, ‘আরে বাবা, তোরা তোদের লাইফটা এনজয় করতে পারিস, আর আমি করলেই দোষ?’

নিতাইবাবুর সঙ্গে কথা বলে ফিরছিলাম একটা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে। তখন গোধূলিবেলা। দেখলাম, পশ্চিম দিগন্তকে সোনার রঙে রাঙিয়ে ধানখেতের ও পারে নেমে এসেছে একটা নিখুঁত বৃত্তাকার রক্তিম সূর্য। মনে হল, সূর্যাস্ত তো অনেক দেখা আছে, কিন্তু তাকে এমন রাজকীয়, এমন আত্মপ্রত্যয়ী আগে কখনও মনে হয়নি তো!

(চেনা-পরিচিত মানুষেরা অনর্থক সহানুভূতি দেখাবে, টেলিফোন করে বিব্রত করবে, তাই এই রচনায় উল্লিখিত কয়েক জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার নাম তাঁদেরই বিশেষ অনুরোধে বদলে দেওয়া হল।)

nachhorbanda@gmail.com

simanta guha thakurta
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy