বড়দিনে সান্তা ক্লজ, এক্স-মাস ট্রি ধরা দিল ‘নারিয়েল পানি’-র থালায়

নিজস্ব প্রতিবেদন
বড়দিনে সান্তা ক্লজ, এক্স-মাস ট্রি ধরা দিল ‘নারিয়েল পানি’-র থালায়

এ স্বাদের ভাগ হবে কি হবে না সে জবাব পরে। তবে এ লেখার মেজাজের ভাগ দিতে পারা বেশ মুশকিলের। তবে খোশমেজাজ মোটেও ছিল না। একে কলকাতা শহরে বড়দিনের আবহাওয়া হাওয়ায় দানা বাঁধতে শুরু করেছে। পার্ক স্ট্রিট, সুইনহো স্ট্রিট, বো ব্যারাকের রাস্তাঘাটে উড়ে বেড়াচ্ছে ক্রিম আর মাখনের দলা পাকানো গন্ধ। শুনলাম টার্কি ফেস্টিভ্যাল চলছে কলকাতার নানা রেস্তরাঁয়। ভবানীপুরের এক নতুন চিনে খাবারের ঠেক আবার বড়দিন উপলক্ষে কোয়েলের মাংস বেড়ে দিচ্ছেন অতিথির পাতে। এমন দিনক্ষণে সরষে আর নারকেলের নিরামিষ দক্ষিণ ভারতীয় ক্যুইজিনে ঢুঁ! ধুস! কোনও মানে হয়?

আলিপুরের এনক্লেভ মল-এর লিফ্‌ট দিয়ে ওঠার সময়ও সেই মনকেমনে ভাটা পড়েনি। তবে দরজা ঠেলে ঢুকতেই ম্যানেজারের একগাল হাসি, সৌজন্য বিনিময় কিছুটা স্বস্তি দিল বটে, তবে চমকে দিল রেস্তরাঁর পরিবেশ। টানা রিক্সার আদলে তৈরি বসার জায়গা আর সিলিং থেকে নামানো আলো এই রেস্তরাঁর সাজে যোগ করেছে দারুণ জমক। যদি খুব একটা চিত্ররসিক না-ও হন, তবু দেওয়াল জোড়া ছৌ মুখোশের পেন্টিংয়ের দিক থেকে চোখ সরাতে কয়েক মিনিট লাগবে বইকি! কিন্তু এ তো গেল পরিবেশ। বড়দিনের কেক-পেস্ট্রি-মাংসের আমিষ ময়দানে দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের দোকান কেবল পরিবেশ দিয়েই তার কব্জির জোর দেখাবে না কি? ধন্দ তখনও কাটেনি।

ওহো, রেস্তরাঁর নামটাই তো বলা হয়নি! ‘নারিয়েল পানি’। নামেই মালুম, এ ঠেক খাঁটি দক্ষিণ ভারতীয়। খবর ছিল, বড়দিনের কথা মাথায় রেখে ক্রিসমাস স্পেশাল ‘সান্তা ইডলি’ ও ‘এক্স-মাস দোসা’ যোগ হয়েছে মেনুকার্ডে। তবে কি দক্ষিণ ভারতের খাবারের মুখে জোর করে পরিয়ে দেওয়া হবে সান্তার পোশাক? সেই রহস্য ভেদ করতেই যাওয়া।

নারিয়েল ইডলি।

আরও পড়ুন: বড়দিন সামনেই, বাড়িতেই বানিয়ে ফেলুন পছন্দের পানীয়

আর এই যাওয়ার কারণ বোধ হয় টের পেয়েছিলেন ‘নারিয়েল পানি’-র মালিক রাশি কেডিয়া। তাই বোধ হয় একের পর এক ইডলি-দোসায় মন ভরানোর পাঠ শেখাচ্ছিলেন। যেন সবুরে মেওয়া ফলানোর অভিজ্ঞতায় শান দিচ্ছেন! তাঁরই নির্দেশে পাতে হাজির হল নারিয়েল ইডলি। একটা নারকেলের মালার মধ্যে থাকা ইডলির গায়ে সরষে দানা আর নারকেল কোড়া ছড়ানো। ভুল ভাঙল কামড় দেওয়ার পর। এই ইডলির ভিতরেও চাল-ডালের সঙ্গে বেশ ভাব-ভালবাসা করে নিয়েছে নারকেল কোড়া ও মিহি করে কুচোনো সব্জি। সঙ্গের সম্বর, নারকেলের চাটনি ও পেঁয়াজ-রসুনের আচারের মানও বলে এ দোকান আর পাঁচটা সাধারণ দক্ষিণ ভারতীয় দোকানের মতো নয়।

ইডলির প্রায় পনেরো-কুড়ি রকমের বিকল্প পাবেন এখানে। তবে যদি ইডলির চেয়ে দোসা বেশি ভালবাসেন, তা হলেও এ জায়গা আপনারই। চিরচেনা দোসার মেক ওভার দেখলে চমকে যেতে পারেন, যদি পাতে আসে ‘বাব্‌ল দোসা’। চেহারায় একেবারেই আলাদা যে চেনা দোসার চেয়ে। বাষ্পের মতো ফুলে ফুলে শরীরের ভিতরে সব্জি ও মাখন, চিজের দিব্য মেলামেশা।

তবে দোসা-ইডলি-উত্তপম-দইবড়ার বাইরেও যে দক্ষিণী খানার এক বৃহৎ পরিসর আছে, তা বুঝতে খোদ কলকাতা শহরের এই দোকানই যথেষ্ট, তা মালুম হয় ‘নারিয়েল পানি’-র ভিতরে ঢুকলেই। পানিয়ারাম থেকে টিক্কা অন দ্য রকস, শটগান মুরগান— এ সব বিচিত্র নামে ভরা মেনু কার্ড!

শটগান মুরগান।

আরও পড়ুন: সহজ এই উপায়ে বড়দিনে বাড়িতেই বানান চকোলেট কেক​

তবে বুঝিয়ে বললে এ সব খাবারের রসায়ন বুঝতে সমস্যা হয় না। দক্ষিণ ভারতীয় খাবারকে ছোটবেলা থেকে ভালবাসতেন বলেই বোধ হয় দক্ষিণী হেঁশেলের খুঁটিনাটি সব হাজির করেছেন নিজের রেস্তরাঁয়। চালবাটা আর মাখন দিয়ে বানানো ছোট ছোট টিক্কায় কোনও এক অপূর্ব মন্ত্রবলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন বাঙালির জিভের তাড়ে যায় এমন মশলার মিলমিশ। আর উপরে তাওয়ায় সেঁকে নেওয়া পেঁয়াজের টুকরো গেঁথে সাজিয়ে দিলেন থালায়। টিক্কা অন দ্য রক্‌স সেখানে সত্যিই শো স্টপার!

তবে ওখানে গেলে শটগান মুরগান না চেখে আসবেন না যেন! নাইট্রোজেনের ধোঁয়ার মায়াবী উপস্থিতি এই পদ-কে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। প্রমাণ আকারের ইডলি (যা চার জন ভাগ করে খেলে প্রত্যেকেই এক টুকরো করে পাবে)-র শরীরে দক্ষিণী চাটনি, সরষে ও নারকেল কোড়া রাখা। এ তো গেল বাইরের স্বাদ, ভিতরে মাখন, চিজ, বেকিং সোডা ও স্পঞ্জের মতো নরম চাল-ডালের কেরামতি।

সময় কিছুটা এগোতেই পাতে এল ‘সান্তা ইডলি’। হুবহু সান্তাক্লজের মতো সাজ তার। মুখ আর টুপি বানানো হয়েছে টম্যাটো সস দিয়ে। দাড়িটি নির্ভেজাল নারকেল কোড়ার। চোখের জন্য কয়েকটা সরষে দানাই যথেষ্ট। একই নতুনত্ব‘এক্স-মাস দোসা’-য়। গোটা দোসাটাই আদ্যন্ত একটি ক্রিসমাস ট্রি-র মতো দেখতে। তাতে ঝাঁকড়া ভাব এনেছে বাব‌্ল দোসার ইউনিক স্টাইল— যার কপিরাইট গোটা কলকাতায় একমাত্র রাশি কেডিয়ার! দক্ষিণী কেতায় এই দোকানের পিজ্জাও জিভে জল আনবে!

তবে খাওয়া শেষে যদি জলেবি ক্যাবিয়ার্স না খেয়েই উঠে পড়েন, সে ভুলের দায় আপনার। ছোট ছোট বেসনের দানাকে ভেজে তার গায়ে ঠান্ডা, মিষ্টি আচার মাখিয়ে নাইট্রোজেনের ঠান্ডা ধোঁয়া সমেত যত্ন করে চামচ করে খাইয়ে দেবেন ওয়েটার। হ্যাঁ, এই পদ অর্ডার করলে নিজস্ব স্টাইলে খাইয়ে দেন ওয়েটাররা। তাঁদের ব্যাখ্যা, এই পদ খাওয়ার যে কায়দা তা অনেক শহরবাসীই জানেন না। তবে আপনি যদি ওস্তাদ খাইয়ে হন তবে নিজের হাতেও খেতে পারেন।

তাই বড়দিনের মেজাজকে আরও এক ধাপ এগোতে আজই ঢুঁ মারুন নারিয়েল পানিতে। আলিপুর রোডের এনক্লেভ মল-এর তৃতীয় তলের এই রেস্তরাঁ খোলা থাকে বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। দু’জনের খেতে খরচ পড়বে কর-সহ ৫০০ টাকা। পকেটসই দামে এ বারের বড়দিনে ‘সান্তা ইডলি’ ও ‘এক্স-মাস দোসা’-য় কামড় বসাতে আর দেরি কেন?

ও হ্যাঁ, মনের ধন্দ তত ক্ষণে আমার কেটে গিয়েছে সে কথা এখনও বলে দিতে হবে বুঝি!