আজ থেকে প্রায় ২ কোটি বছর আগের কথা। সে সময়ে মহাসমুদ্রে ঘুরে বেড়াত বিশাল চেহারার হাঙরেরা। নিজেদের সময়ের সেরা জলজ শিকারি। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই মেগালোডনদের চেহারা নিয়ে এ বার নতুন তথ্য উঠে এল গবেষণায়। এদের খাদ্যাভ্যাস এবং আয়ু নিয়েও উঠে এল বিশদ তথ্য।
এদের যে বিশাল চেহারা ছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে কোনও সংশয় ছিল না। তবে কতটা বিশাল, তা নিয়ে বিভিন্ন মত ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণা এ বার তা নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরল। এখন জানা গেল, ‘ওটোডাস মেগালোডন’ লম্বায় ৮০ ফুট (প্রায় দু’টি বাসের সমান দৈর্ঘ্য) পর্যন্ত বড় হতে পারত। মেগালোডনের জীবাশ্মের কিছু অংশ বিশ্লেষণ করে এমনটাই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ‘প্যালিওন্টোলজিয়া ইলেকট্রনিকা’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
এখন যে গ্রেট হোয়াইট শার্ক সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়, সেগুলি গড়ে ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। মেগালোডনের চেহারা ছিল এদেরও তিন-চার গুণ। ২ কোটি ৩০ লক্ষ বছর ধরে সমুদ্র রাজত্ব করেছে এই দানবাকার হাঙরেরা। এদের আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে। আজ থেকে প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগে পর্যন্তও এদের অস্তিত্ব ছিল।
তবে এদের জীবাশ্ম খুব বেশি পাওয়া যায় না। হাঙরদের ক্ষেত্রে গবেষণায় এটি একটি অন্যতম অন্তরায় বলা যেতে পারে। এদের শরীর মূলত তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি। ফলে খুব বেশি জীবাশ্ম পড়ে থাকে না। মেগালোডনজের ক্ষেত্রে মূলত কিছু দাঁত এবং কশেরুকা পাওয়া যায়। যে জীবাশ্মটি নিয়ে গবেষণা হয়েছে, সেটির প্রথম সন্ধান মিলেছিল ডেনমার্কে। ১৯৭৮ সালে। কাদামাটির স্তূপ থেকে মেগালোডনের প্রায় ২০টি কশেরুকা আবিষ্কার করেন জীবাশ্মবিদেরা। সবগুলি একটিই মেগালোডনেরই কশেরুকা। তার মধ্যে একটি ছিল প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার চওড়া। যা মেগালোডনের এ যাবৎকালে সন্ধান পাওয়া জীবাশ্মগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় কশেরুকা।
তখন থেকে সেটি রাখা ছিল ডেনমার্কের ন্যাচরাল হিস্ট্রি মিউজ়িয়ামে। কিন্তু তা নিয়ে বিশদে গবেষণা শুরু হওয়ার আগেই হারিয়ে যায় জীবাশ্মটি। ১৯৮৯ সালে জাদুঘরের জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্যত্র সরানোর সময়ে হারিয়ে যায় জীবাশ্মটি। তিন দশক পরে ২০১৭ সালে জাদুঘরের কিউরেটর বেন্ট এরিক ক্রেমা লিন্ডো জাদুঘরেই একটি বাক্সের মধ্যে সেটি আবার খুঁজে পান। তবে জীবাশ্মের কিছু অংশ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জীবাশ্মটি খুঁজে পাওয়ার পরে তা নিয়ে আবার নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। তাতে এদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনকাল সম্পর্কে আরও বিশদ তথ্য উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন:
জীবাশ্মটি যখন পুনরায় খুঁজে পাওয়া যায়, তখন সেটি আর আগের অবস্থায় ছিল না। ওই সময়ে দু’টি কশেরুকা আংশিক ভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এ ছাড়া ১৮৫টি ছোট ছোট টুকরো পাওয়া যায় কশেরুকার। মূল নমুনার ঠিক কতটা অংশ সেখানে পড়ে ছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে এর থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। যে কশেরুকাগুলির উপর গবেষণা হয়েছে, তার মধ্যে একটির ব্যাসার্ধ ছিল প্রায় ১১.৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ ব্যাস ২৩ সেন্টিমিটার। যা থেকে কম্পিউটার মডেলের ভিত্তিতে এর দৈর্ঘ নির্ধারণ করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের অনুমান, এটি ৮০ ফুট পর্যন্ত বড় হতে পারত। তবে এর লেজ এবং পাখনা কত ব়ড় হত, তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও ধারণা পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:
নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশাল চেহারার হাঙরেরা অন্য হাঙরদেরও খেয়ে ফেলত। অন্য প্রজাতির হাঙরের কিছু আঁশ পাওয়া গিয়েছে জীবাশ্মের সঙ্গে। গবেষকদলের প্রধান তথা শিকাগোর ডিপল ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিদ কেনশু শিমাদা বলেন, “এটার সঙ্গে বাস্কিং হাঙরের অসংখ্য আঁশ পাওয়া গিয়েছে। এটা দেখে তো আমি অবাক হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, এদের পাকস্থলীর মধ্যে বাস্কিং হাঙরদের দেহাংশ ছিল।” গবেষকদের মতে এত দিন যা মনে করা হত, মেগালোডনদের খাদ্যতালিকা ছিল তার চেয়েও অনেকটা বিস্তৃত।
মেগালোডনেরা কত বছর বাঁচত, সে বিষয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা, মৃত্যুর সময়ে ওই হাঙরটির বয়স ছিল অন্তত ৬৪ বছর। তবে কম্পিউটার মডেলের ভিত্তিতে গবেষকদের অনুমান, অনুকূল পরিবেশে ৯৬ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারত মেগালোডনেরা।