পৃথিবী এবং চাঁদ— দেখতে ভিন্ন হলেও কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশে একই পরিবেশে তারা গঠিত হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের একাংশ আবার মনে করেন, পৃথিবী থেকেই জন্ম হয়েছিল চাঁদের। পৃথিবী যখন গঠিত হচ্ছে, তখন তাকে ধাক্কা দিয়েছিল মঙ্গল গ্রহের সমান আকারের কোনও বস্তু। তার অভিঘাতে পৃথিবী থেকে ছিটকে গিয়েছিল তারই অভ্যন্তরীণ পদার্থ। আর তা থেকেই জন্মেছিল চাঁদ। এই ধারণার ভিত্তিতেই বার বার বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্ন এসেছে, চাঁদে কি কখনওই পৃথিবীর মতো অক্সিজেন ছিল না? কখনওই ছিল না প্রাণ? সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, কোটি কোটি বছর আগে চাঁদে হয়তো অক্সিজেন ছিল। তার পরেই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি প্রাণও ছিল। এখন তা খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবীর মতো চাঁদে কোনও প্লেট টেকটনিক নেই। বায়ুমণ্ডল নেই। অক্সিজেন নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, আজকে চাঁদকে দেখলে বোঝা যেতে পারে, কোটি কোটি বছর আগে আমাদের পৃথিবী কেমন ছিল। সেখানকার শিলা পরীক্ষা করলে ইঙ্গিত মেলে, ৪০০ কোটি বছর আগে কী হয়েছিল চাঁদের মাটিতে, কী হয়েছিল পৃথিবীতে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে চাঁদের মাটিতে ক্রমাগত অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল শিলা। সেগুলি পরখ করে তাদের উৎপত্তি, সে সময়ের পরিস্থিতি বুঝতে সুবিধা হয়েছে বিজ্ঞানীদের।
জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির কয়েক জন বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ। তাঁরা চাঁদের বুকে লাভা থেকে তৈরি একটি শিলা বিশ্লেষণ করেছেন। আমেরিকার অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের সময় সেই শিলা চাঁদের মাটি থেকে আনা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা সেই শিলায় ইলমেনাইটের উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন। এই ইলমেনাইট খনিজ তৈরি হয় লৌহ, টাইটেনিয়াম এবং অক্সিজেন থেকে। এই টাইটেনিয়ামের ১৫ শতাংশ আবার বিদ্যুৎ পরিবহণে সক্ষম।
ইলমেনাইটে টাইটেনিয়াম অক্সিজেনের সঙ্গে জোট বাঁধলে চারটি ইলেক্ট্রন ক্ষরণ করে। কিন্তু চাঁদ থেকে তুলে আনা ইলমেনাইটে যে টাইটেনিয়াম মিলেছে, তা তিনটি ইলেক্ট্রন ক্ষরণ করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই রকম অবস্থা হয় যখন টাইটেনিয়াম কম পরিমাণ অক্সিজেনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। এর থেকেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, চাঁদে ৩৮০ কোটি বছর আগে যখন ম্যাগমা থেকে এই শিলা তৈরি হয়েছিল, তখন কম পরিমাণে হলেও অক্সিজেন ছিল। তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল শিলার মধ্যস্থ ইলমেনাইটের টাইটেনিয়াম।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা এখনও পর্যন্ত চাঁদ থেকে তুলে আনা মাত্র একটি ইলমেনাইট পরীক্ষা করেছেন। তবে চাঁদ থেকে তুলে আনা আরও ৫০০টি ইলমেনাইট নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখেছেন। তাঁদের ধারণা হয়েছে, বাকি ইলমেনাইটেও টাইটেনিয়ামের এই অবস্থা লক্ষ করা যেতে পারে। তবে তাঁদের মতে, সে রকম না-হওয়াও কিছু অস্বাভাবিক নয়। কারণ, হয়তো চাঁদের সব জায়গায় একই রকম পরিস্থিতি কোটি কোটি বছর আগে তৈরি হয়নি। সেটা বোঝার জন্যও চাঁদের বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে আনা শিলা পরীক্ষা করা জরুরি বলে মনে করছেন ওই বিজ্ঞানীরা। ৫০ বছর আগে চাঁদ থেকে তুলে আনা শিলার পাশাপাশি আগামী দিনে যা তুলে আনা হবে, তা-ও পরীক্ষা করতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা। দেখেতে চাইছেন, সত্যিই কি চাঁদে অক্সিজেন ছিল? তার পরের ধাপ অবশ্যই পৃথিবীর উপগ্রহে প্রাণের উৎস খোঁজা।