সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও কয়েক লক্ষ গুণ উত্তপ্ত হয় তার বায়ুমণ্ডল অর্থাৎ করোনা। কিন্তু কেন? সেই নিয়ে কম গবেষণা হয়নি পৃথিবীতে। এ বার ভারতের এক দল বিজ্ঞানী সেই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করলেন।
সূর্যের বায়ুমণ্ডল বা করোনার তাপমাত্রা কয়েক লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে সূর্যের পিঠ (‘ফোটোস্ফিয়ার’)-এর তাপমাত্রা ৫৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, চৌম্বকীয় তরঙ্গের কারণে তাপমাত্রার এই হেরফের ঘটে। কেউ কেউ মনে করেন, খুব ছোট সৌরশিখা বা সৌরঝলক (‘মাইক্রোফ্লেয়ার’) সূর্যের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা একলাফে অতটা বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও সেই বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
এ বার নৈনিতালের আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অবজার্ভেশনাল সায়েন্সেস (এরিস)-এর এক দল বিজ্ঞানী এই করোনার তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত রয়েছে দিল্লি আইআইটির গবেষকেরা। ওই বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল’-এ।
গবেষকেরা তিন স্তরীয় ম্যাগনেটোহাইড্রোডায়নামিক (এমএইচডি) নিয়ে গবেষণাটি করেছেন। প্লাজ়মা বা তরলের সঙ্গে চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক ক্রিয়া বোঝা হয় এই পদ্ধতিতে। তাঁরা দেখেছেন, কী ভাবে সূর্যের চৌম্বকীয় কাঠামোর মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় তরঙ্গ কী ভাবে করোনার প্লাজ়মা-আচরণকে প্রভাবিত করে। পদার্থবিদ্যার ভাষায় প্লাজ়মা হল বস্তুর চতুর্থ পর্যায়। গ্যাসকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে বা তাকে তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে পাঠিয়ে এই অবস্থা তৈরি করা হয়। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল হয় প্লাজ়মা।
সূর্যের এই করোনা আদতে অসংখ্য চৌম্বকীয় কাঠামোয় পূর্ণ। তার মধ্যে দিয়ে প্রতিনিয়ত আড়াআড়ি ভাবে অগ্রসর হয় এমএইচডি তরঙ্গ। একে অ্যালফভেনিক বা কিং তরঙ্গও বলা হয়ে থাকে। এই তরঙ্গগুলির কারণেই করোনার কাঠামো চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে দুলতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা এত দিন মনে করতেন, এই আড়াআড়ি তরঙ্গগুলি পর্যায়ক্রমে লাল এবং নীল তরঙ্গ ডপলার শিফট তৈরি করে, যা আদতে পর্যবেক্ষককে তার দিকে ধাবমান প্লাজমা দেখতে সাহায্য করে। তবে করোনার স্পেকট্রাল লাইন (উজ্জ্বল রেখা)-এর আকৃতি পরিবর্তনে তাদের ভূমিকা কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিজ্ঞানীদের ওই পর্যবেক্ষণে সৌর বর্ণালীর রেখায় কিছু অসাম্য ধরা পড়েছিল।
আরও পড়ুন:
নতুন গবেষণা এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষক অম্বিকা সাক্সেনা এবং বৈভব পন্থ সূর্যের করোনাল অঞ্চলের মডেল তৈরি করেছিলেন, যার চৌম্বকীয় কাঠামোর বিভিন্ন অংশের ঘনত্বের পার্থক্য ছিল। এই মডেলের নীচ দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে তরঙ্গ প্রবাহ পাঠান ওই দুই বিজ্ঞানী। সেই তরঙ্গগুলি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে কী ভাবে উপরে উঠে আসে, তা লক্ষ্য করেন তাঁরা। করোনাল স্পেক্ট্রাম লাইনে কী ভাবে প্লাজমা ক্ষরণ হয়, তা-ও খতিয়ে দেখেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সুবিন্যস্ত চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে যখন আড়াআড়ি ভাবে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, তখন ঘনত্বের তারতম্যের কারণে প্লাজমা অসম ভাবে চলাচল করে। এর ফলে চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে কিছু কাঠামো এবং ঝঞ্ঝা তৈরি হয়। যেহেতু সূর্যের বায়ুমণ্ডল বা করোনা পাতলা, তাই যিনি পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁর দৃষ্টিরেখা বরাবর একাধিক বিকিরণ আপতিত হয়। সে কারণে পর্যবেক্ষকের চোখে যে বার্তা আসে, তাতে ভারসাম্য থাকে না। করোনার মধ্যে দিয়ে এই তরঙ্গ যত উপর দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ পরিবর্তিত হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করছে, করোনার মধ্যে যে ঝঞ্ঝা তৈরি হয়, তার কারণেই তার তাপমাত্রা বহু লক্ষ গুণ বেড়ে যায়। সূর্যের যে পৃষ্ঠ আমরা দেখতে পাই, তার চেয়ে করোনার তাপমাত্রা থাকে কয়েক লক্ষ গুণ বেশি।