রক্তের রহস্যময় এক অ্যান্টিজেনের সন্ধান করার চেষ্টা করছিলেন বিজ্ঞানীরা। আর তা করতে গিয়েই জিনগত এক ফারাকের হদিস পেলেন তাঁরা, যা পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।
বিরল এক রক্তের গ্রুপ নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল বিজ্ঞানীদের মনে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে গবেষণা করে তারই সমাধান করলেন রহস্যের। তাঁরা মনে করছেন, এর ফলে রক্তদান নিয়ে জটিলতা আরও কমবে।
ব্রিটেন এবং ইজ়রায়েলের বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে গবেষণা করেছেন। মূলত ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাই কাজ করেছেন। তাঁদের গবেষণা ‘ব্লাড’ নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ওই গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে গবেষণার পরে তাঁরা রক্তের এএনডব্লিউজে গ্রুপের নেপথ্যে জিনগত ভিত্তির সন্ধান পেয়েছেন। তার ফলে সম্পূর্ণ নতুন এক গ্রুপ সিস্টেমের হদিস মিলেছে, যার নাম ‘এমএএল’। এর ফলে যে সব মানুষের রক্তের গ্রুপ বিরল, তাঁদের শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁদের রক্ত দেওয়া হলে শারীরিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিত। এ বার সেই সমস্যাও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বেশির ভাগ মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের রক্তের গ্রুপ কী, তা হলে উত্তর মিলবে এ, বি, এবি, ও এবং এগুলির নেগেটিভ বা পজিটিভ আরএইচ স্টেটাস। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নির্দিষ্ট গ্রুপের বাইরেও এক বিস্তীর্ণ জগৎ রয়েছে। গবেষকেরা এখন পর্যন্ত ৪৭টি ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমের খোঁজ পেয়েছেন, যার অন্তর্গত ৩৬০টি পরিচিত ব্লাড অ্যান্টিজেন। লোহিত রক্তকণিকার কোষের পৃষ্ঠে থাকে এই অ্যান্টিজেন। রক্তদাতা এবং গ্রহীতার অ্যান্টিজেনের সামান্য ফারাক থাকলেও গ্রহীতার শরীরে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
নতুন যে রক্তের গ্রুপের এমএএল সিস্টেমের হদিস মিলেছে, তা আবর্তিত হয়েছে এএনডব্লিউজে অ্যান্টিজেনকে কেন্দ্র করে। এই বিরল মার্কারের সন্ধান বিজ্ঞানীরা প্রথম পেয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। প্রথম যে দুই রোগীর শরীরে ওই অ্যান্টিবডির হদিস মিলেছে, তাঁদের নামেই হয়েছে নামকরণ। ওই দুই রোগীর নাম ছিল অ্যান্টন এবং ডব্লিউজে। তা থেকে হয়েছে এনডব্লিউজে। ৫০ বছর আগে ওই অ্যান্টিজেনের সন্ধান পেলেও তার নেপথ্যে কোন জিন, তা ধরতে পারছিলেন না বিজ্ঞানীরা। অবশেষে তারও হদিস পেলেন বিজ্ঞানীরা।
এক্সোম সিকোয়েন্সিং করে বিজ্ঞানীরা ডিএনএর প্রোটিন-কোডিং অঞ্চলের বিশ্লেষণ করেছেন। তাতেই দেখা গিয়েছে, এএনডব্লিউজে নেগেটিভ যাঁদের রক্তের গ্রুপ, তাঁরা এমএএল জিন বহন করছেন। ওই জিনে রয়েছে ছোট মেমব্রেন প্রোটিন, যার নাম এমএএল। ওই প্রোটিন মেমব্রেনের স্থিতাবস্থা বজায় রাখে। পরিবহণেও সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এএনডব্লিউজে পজ়িটিভ যাঁরা, তাঁদের লোহিত রক্তকণিকায় সম্পূর্ণ এমএএল প্রোটিন থাকে। যাঁদের রক্তের গ্রুপ এএনডব্লিউজে নেগেটিভ, তাঁদের এই প্রোটিন থাকে না।
আরও পড়ুন:
এই বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে বিজ্ঞানীরা লোহিত রক্তকণিকায় এমএএল জিন প্রবেশ করান। সেগুলি এএনডব্লিউজে অ্যান্টিজেন উৎপাদন করতে শুরু করে। তবে জিনের বিয়োজিত সংস্করণ তা করতে ব্যর্থ হয়। এর থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, ওই রক্তের গ্রুপের জন্য এমএএল প্রোটিনই দায়ী। তারা এ-ও বুঝতে পারেন, এএনডব্লিউজে অ্যান্টিজেন তৈরির জন্য এমএএল প্রোটিন যথেষ্ট।
কেন এই গবেষণা জরুরি?
বিজ্ঞানীরা দেখেছন, ৯৯.৯ শতাংশ মানুষেরই রয়েছে এএনডব্লিউজে অ্যান্টিজেন। ১৯৭২ সালে সেই রোগীর শরীরে ওই অ্যান্টিজেন মেলেনি। তার পরেই শুরু হয় গবেষণা। তাতে দেখা যায়, তিনি এএনডব্লিউজে নেগেটিভ। যাঁরা এএনডব্লিউজে নেগেটিভ তাঁদের ক্ষেত্রে রক্তগ্রহণের পরে সমস্যা দেখা দিত। এত দিন যে হেতু ওই রক্তের গোষ্ঠীর জিনগত ভিত্তি অজানা ছিল, তাই গোষ্ঠীর ধারকদের শনাক্ত করার বিষয়টি ছিল জটিল। নতুন এই আবিষ্কারের ফলে রক্তগ্রহীতা এবং দাতাদের চেনা অনেক সহজ হবে।
বিজ্ঞানীরা এ-ও দেখেছেন, এএনডব্লিউজে নেগেটিভ ধারকের অনেকেই জন্মসূত্রে তা প্রাপ্ত হয় না। বরং ক্যানসার বা রক্তের কোনও জটিলতা এমএএল প্রোটিনকে চেপে দেয়। ফলে তারা এএনডব্লিউজে নেগেটিভ ধারক হয়ে পড়েন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে পাঁচ জন এএনডব্লিউজে নেগেটিভ ধারকের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যাঁরা জন্মসূত্রে ওই রক্তের গ্রুপ পেয়েছেন। তাঁরা আরব-ইজ়রায়েলি পরিবারের সদস্য। তবে এই ধারক সারা পৃথিবীতে আরও ছড়িয়ে থাকতে পারেন। এ বার তাঁদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তাঁদের চিকিৎসার সুবিধা হবে।
বিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই ‘এবিও’ রক্ত গ্রুপের সিস্টেম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হত রক্তের গ্রুপ। এ বার ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে আরও নতুন রক্তের গ্রুপের খোঁজ মিলেছে।