তারা ছিল ডাইনোসরদের ‘রাজা’। ‘টির্যাইনোসরাস-রেক্স’, সংক্ষেপে ‘টি-রেক্স’ (লাটিন ভাষায় ‘রেক্স’ শব্দের অর্থ রাজা)। শুধু নামে নয়, চেহারার দিক থেকেও সমসাময়িক অন্য প্রাণীর কাছে ‘রাজা’ই ছিল এরা। শিকারে পটু। হিংস্র। সেই শিকারিদের নিয়েই এত দিনের প্রচলিত ধারণা ভাঙল নতুন গবেষণায়।
ডাইনোসরদের মধ্যে সম্ভবত এই প্রজাতিটিই সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। আজ থেকে সাড়ে ছ’লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত যত ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত পৃথিবীতে, তাদের মধ্যে অন্যতম হিংস্র প্রজাতি এই ‘টি-রেক্স’। স্টিফেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার দৌলতে আরও বেশি পরিচিতি পেয়েছে এরা। কিন্তু কত দিন বাঁচত এই শিকারি ডাইনোসরেরা? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও বেশি আয়ু ছিল ‘টি-রেক্স’দের।
গত কয়েক দশকে টি-রেক্সদের নিয়ে বিস্তর গবেষণাও হয়েছে। এত দিন মনে করা হত, এরা ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকত। এখন জানা গেল, এই ডাইনোসরদের গড় আয়ু ছিল ৩৫-৪০ বছর। গাছের কাণ্ডের বলয় দেখে যেমন কোনও গাছের বয়স নির্ধারণ করা যায়, এ ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই। টি-রেক্সের পায়ের হাড়েও গাছের মতো বলয় থাকে। তা দেখে ওই ডাইনোসরের বয়স নির্ধারণ করা যায়। এমন বেশ কিছু জীবাশ্মের হাড়ের বলয় বিশ্লেষণ করে দেখেন আমেরিকার ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমির অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড এবং তাঁর দল।
দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই গবেষণায় দেখা যায়, টি-রেক্সরা ৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচত। ওই বয়স পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগে তাদের ওজন ৮ টন পর্যন্ত হত না। সম্প্রতি ‘পিয়ারজে’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এই শিকারি ডাইনোসরদের মৃত্যুর সময় কত বয়স ছিল, তারা কত দ্রুত প্রাপ্তবয়স্ক চেহারা পেয়েছে— তা তাদের পায়ের হাড়ের বলয় দেখে বোঝা যায়। এত দিন মনে করা হত, টি-রেক্সরা প্রায় ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচত। এবং ২৫ বছর বয়সের পরে তাদের চেহারা আর বড় হত না। কিন্তু এত দিন জীবাশ্ম বিশ্লেষণে কিছু বলয় গবেষকদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
অতীতের গবেষণার সেই ফাঁকগুলিই পূরণ করেন উডওয়ার্ড এবং তাঁর দল। অতীতে প্রযুক্তিগত কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু বলয় গবেষকদের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। এত দিন ধরে ‘অদৃশ্য’ থাকা সেই বলয়গুলি খুঁজে বার করতে বিশেষ এক ধরনের আলো ব্যবহার করে গবেষকেরা। টি-রেক্সের ১৭টি জীবাশ্মের মধ্যে এমন কিছু বলয় খুঁজে পান তাঁরা, যা অতীতে দেখা যায়নি।
গবেষণায় শিকারি ডাইনোসরদের আয়ু সম্পর্কে যেমন নতুন তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তেমনই জানা গিয়েছে এদের শারীরিক বিকাশের বিষয়ে নয়া তথ্যও। গবেষকদের দাবি, এই ডাইনোসরদের সম্পূর্ণ শারীরিক বিকাশ হয়েছে তুলনামূলক ধীর গতিতে। জীবনকালের বেশির ভাগ সময়টাই এরা কাটিয়েছে মাঝারি আকারের শরীরে। তার পরে দ্রুত চেহারা বড় হয়ে যেত এদের।
গবেষকদলের প্রধান উডওয়ার্ডের কথায়, এই শিকারি প্রজাতি কেন ডাইনোসরদের ‘রাজা’ হয়ে উঠেছিল, তা বুঝতে সাহায্য করবে এই গবেষণা। তিনি বলেন, “টি-রেক্স কেন নিজেদের সময়ে সেরা মাংসাশী প্রাণী হয়ে উঠেছিল, তা বুঝতে সাহায্য করবে গবেষণাটি। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে চেহারা বড় হত এদের। ফলে গোটা জীবনকাল জুড়ে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীকে শিকার করতে পারত তারা। শেষে এগুলি চেহারায় এতটাই বড় হয়ে উঠত যে অন্য ‘টি-রেক্স’দেরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারত।”
উডওয়ার্ডদের এই গবেষণা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে কয়েক মাস আগের এক গবেষণাকেও। ২০০৬ সালে আমেরিকার মন্টানায় পাওয়া গিয়েছিল একটি জীবাশ্ম। জোড়া ডাইনোসরের জীবাশ্ম। দু’টিই ভিন্ন প্রজাতির। জীবাশ্মবিদেরা এর নাম রেখেছেন ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’। অনুমান করা হত, দু’টি ডাইনোসর লড়াই করতে করতে একই জায়গায় মারা গিয়েছে। সেই থেকেই জীবাশ্মের নামকরণ। যদিও লড়াই করতে করতে মারা যাওয়ার কোনও প্রমাণ্য তথ্য এখনও মেলেনি।
আরও পড়ুন:
ওই ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’-এর মধ্যে একটি জীবাশ্ম ‘ট্রাইসেরাপটস হরাইডাস’-এর। তিন শৃঙ্গবিশিষ্ট তৃণভোজী ডাইনোসর। সেটি নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। বিতর্ক অন্যটিকে নিয়ে। এত দিন মনে করা হত অপরটি একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্সের জীবাশ্ম। মারা যাওয়ার সময়ে যার বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর। গত অক্টোবরে এক গবেষণায় দাবি করা হয়, সেটি আদৌ টি-রেক্সের জীবাশ্মই নয়। সেটি আসলে ন্যানোটাইর্যানাস নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতির ডাইনোসরের জীবাশ্ম।
কিন্তু যে তথ্যের ভিত্তিতে ওই গবেষণা চলেছিল, তখনও মনে করা হয় ‘টি-রেক্স’দের গড় আয়ু হত ৩০ বছর। ফলে গবেষকেরা যে তথ্যের ভিত্তিতে সেটিকে ভিন্ন প্রজাতির বলে দাবি করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সেটির বয়স। তাঁদের দাবি ছিল, সেটি আদৌ কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স নয়। বরং, প্রাপ্তবয়স্কই। এ বার নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ওই বয়সে টি-রেক্সদের সম্পূর্ণ শারীরিক বিকাশই হত না। গত অক্টোবরের ওই গবেষণাকেও নতুন দিশা দিতে পারে উডওয়ার্ডদের এই সাম্প্রতিক গবেষণা।