Advertisement
E-Paper

চাঁদের জন্ম এখনও রহস্যেই মোড়া! পৃথিবীকে ধাক্কা মারা সেই পাথরখণ্ড কোথা থেকে এসেছিল? কী ভাবে সংঘর্ষ

দ্বিতীয় বার এই চাঁদে মহাকাশচারী পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এত দূর এগিয়েও বিজ্ঞানীদের বার বার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়। কারণ, চাঁদের জন্মের ইতিহাস এখনও রহস্যে ঘেরা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৫৪
পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। ছবি: সংগৃহীত।

পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। তাই তাকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে এ যাবৎ যত চর্চা হয়েছে, তার প্রাথমিক উৎসে থেকেছে চাঁদ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় বার এই চাঁদে মহাকাশচারী পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। আর্টেমিস অভিযানের দু’টি ধাপও সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এত দূর এগিয়েও বিজ্ঞানীদের বার বার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়। কারণ, চাঁদের জন্মের ইতিহাস এখনও রহস্যে ঘেরা। পৃথিবীর হাতের কাছে অবস্থিত এই মহাজাগতিক বস্তুটি কবে কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, সে সম্পর্কে এখনও ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষানিরীক্ষা, গবেষণা চলছে।

১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে মোট ছ’বার চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল নাসা। ১২ জন মার্কিন নাগরিক চাঁদের মাটি ছুঁয়ে এসেছেন, সেখানে হেঁটেচলে বেড়িয়ে এসেছেন। নাসার এই অ্যাপোলো অভিযানের সময় চাঁদ থেকে সংগৃহীত পাথরের নমুনা উপগ্রহ সংক্রান্ত গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। সেগুলি বিশ্লেষণ করে চাঁদের জন্মলগ্নের কিছুটা হদিস মেলে। চাঁদের সঙ্গে পৃথিবীর শিলার উপাদান অনেকটা মিলে যাওয়ায় প্রথম দিকে কেউ কেউ মনে করতেন, পৃথিবী থেকেই চাঁদের উৎপত্তি। তাঁদের ধারণা ছিল, পৃথিবী থেকে কোনও অংশ ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে গ্রহের চারপাশে ঘুরতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই ধারণা ভেঙে গিয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, লক্ষ লক্ষ বছর আগে প্রকাণ্ড এক পাথরখণ্ডের সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে চাঁদ তৈরি হয়েছিল!

সংঘর্ষকারী সেই পাথরখণ্ডের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন থেইয়া। আনুমানিক ৪৫১ কোটি বছর আগে বাইরে থেকে এসে পৃথিবীতে সজোরে আঘাত করেছিল এই পাথরখণ্ড। তবে এর উৎস, আকার, গতি কিংবা সংঘর্ষের ধরন নিয়ে এখনও একাধিক মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম গ্রহ বুধের সমান আকারের পাথরখণ্ড ছিল থেইয়া। তা পৃথিবীকে ধাক্কা মারার ফলে একটি অংশ ছিটকে বেরিয়ে যায় এবং চাঁদের জন্ম হয়। তবে অনেকে এই মত মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, থেইয়ার আকার আরও বড় ছিল। বর্তমান পৃথিবীর আকারের প্রায় অর্ধেক ছিল ওই পাথরখণ্ড। সেই কারণেই সংঘর্ষের তীব্রতা ও প্রভাব ছিল এত বেশি। এই দ্বিতীয় তত্ত্বের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে পৃথিবীর আগ্নেয় ব্যাসল্ট শিলার সঙ্গে চাঁদের শিলার সাদৃশ্যের কথা অনেকে উল্লেখ করেন। অ্যাপোলো অভিযানে সংগৃহীত চন্দ্রশিলার সঙ্গে পৃথিবীতে প্রাপ্ত এই ধরনের শিলার প্রচুর রাসায়নিক সাদৃশ্য রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষকারী বস্তু বুধের আকারের হলে তা সম্ভব ছিল না। থেইয়ার আকার তাই আরও বড় হওয়াই স্বাভাবিক।

নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টারডামের ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের চন্দ্র ও গ্রহবিজ্ঞানী উইম ভান ওয়েস্ট্রেনেন এবং তাঁর সঙ্গীরা চাঁদের জন্মলগ্ন নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে, প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া চাঁদ প্রথম দিকে জ্বলন্ত ম্যাগমার একটি গোলকমাত্র ছিল। তার তাপমাত্রা ছিল হাজার হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। সমগ্র চাঁদই প্রাথমিক অবস্থায় গলিত ম্যাগমা ছিল বলে ওয়েস্ট্রেনেনদের দাবি। ধীরে ধীরে তা ঠান্ডা হয়ে শিলায় পরিণত হয়েছে। তার পর তাতে তৈরি হয়েছে খনিজ পদার্থ। পৃথিবীতে আনা চন্দ্রশিলার নমুনা থেকে এই সমস্ত খনিজের হদিস পাওয়া যায়। ওয়েস্ট্রেনেনের কথায়, ‘‘আমরা মনে করি, সমগ্র চাঁদ আসলে গলিত ছিল। একেবারে কেন্দ্র পর্যন্ত ১৭০০ কিলোমিটার জুড়ে ছিল ম্যাগমা। এই প্রকাণ্ড ম্যাগমার মহাসাগর কঠিন শিলায় পরিণত হতে কত সময় লাগল, কোন পর্যায়ে তাতে খনিজ তৈরি হল, আমরা তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক গবেষণা করেছি।’’

সৌরজগতে পৃথিবী সৃষ্টির আদিলগ্নেই চাঁদের উৎপত্তি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবীর গঠন তখন প্রায় সম্পূর্ণ। সেই সময় বুধের আকারের ছোট মহাজাগতিক বস্তু এসে পৃথিবীকে ধাক্কা মারে। প্রবল গতিতে, নির্দিষ্ট একটি কোণ করে সেই সংঘর্ষ হয়েছিল। আর একটি ধারণা বলে, সংঘর্ষের সময় আদৌ পৃথিবীর গঠন সম্পূর্ণ হয়নি। তখনও পৃথিবীর অর্ধেক তৈরি হওয়া বাকি। ওয়েস্ট্রেনেনরা এই দ্বিতীয় তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাঁদের মতে, এই সময় এমন এক পাথরখণ্ড পৃথিবীকে ধাক্কা মেরেছিল, যেটি বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেক আকারের সমান। তাতেই পৃথিবী পূর্ণাঙ্গ আকার পেয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হয়েছে চাঁদ। সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন অপেক্ষাকৃত হালকা, কম ঘনত্ববিশিষ্ট সিলিকেট পদার্থ (সিলিকন এবং অক্সিজেনের যৌগ, যা দিয়ে ভূত্বক গঠিত) দিয়ে চাঁদ তৈরি হয়েছিল। তুলনামূলক বেশি ঘনত্বযুক্ত সিলিকেট পৃথিবীর বাকি অংশ গঠন করে।

চাঁদের গঠনের এই অংশেও রয়েছে রহস্য। যদি ওয়েস্ট্রেনেনের তত্ত্ব সঠিক হয়, তবে চাঁদের ভূত্বক বেশির ভাগটাই থেইয়া থেকে উৎপন্ন সিলিকেটে নির্মিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু থেইয়ার পরিবর্তে পৃথিবীর সঙ্গে তার সাদৃশ্য বেশি। ওয়েস্ট্রেনেন জানান, এই অঙ্ক মেলাতে হলে থেইয়াকে তির্যক ভাবে ঝটিতি আঘাত হানতে হবে পৃথিবীর উপর। এমন ভাবে সেই সংঘর্ষ হবে, যাতে থেইয়ার অর্ধেক অংশ পৃথিবীর সংস্পর্শেই না-আসে এবং এক দিকের সামান্য অংশ পৃথিবীকে ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। চাঁদ তৈরির সময় আসলে সেটাই ঘটেছিল, দাবি ওয়েস্ট্রেনেনদের। তাঁরা জানিয়েছেন, থেইয়ার অর্ধেক অংশ পৃথিবীকে ধাক্কা মেরেছিল এবং বাকি অর্ধেক অংশ বেরিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে শুরু করেছিল। সেখান থেকেই চাঁদ তৈরি হয়।

চাঁদের শিলার সঙ্গে পৃথিবীর চেয়ে সংঘর্ষকারী পাথরখণ্ডের উপাদানের সাদৃশ্য বেশি কেন, তা নিয়ে জল্পনা জারি আছে বিজ্ঞানীমহলে। থেইয়া কোথা থেকে এসেছিল, তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে পৃথিবীর শিলার মিল রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন কেউ কেউ। একাংশের মতে, সৌরজগতেরই অন্য কোনও অংশ থেকে থেইয়ার উৎপত্তি হয়েছিল, যা রাসায়নিক ভাবে চাঁদ এবং পৃথিবীকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে।

Earth Moon Space Science
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy