Advertisement
E-Paper

একটুও পচেনি! ৫ লক্ষ বছরের প্রাচীন নকশি-কাঠ আবিষ্কার আফ্রিকায়, তৈরি আধুনিক মানুষ জন্মানোর বহু আগেই

প্রাচীন যুগের অধিকাংশ নিদর্শনই পাথরের তৈরি। মাটি খুঁড়ে পাওয়া পুরনো পাথর, মানুষের হাড়-দাঁতের নমুনা বিশ্লেষণ করে লক্ষ লক্ষ বছর আগের জীবনযাত্রার হদিস পান বিজ্ঞানীরা। এ বার মিলল কাঠ!

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯
প্রাচীন যুগে ব্যবহৃত কাঠ আবিষ্কার আফ্রিকায়।

প্রাচীন যুগে ব্যবহৃত কাঠ আবিষ্কার আফ্রিকায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আফ্রিকায় প্রায় পাঁচ লক্ষ বছরের পুরনো একটি কাঠের কাঠামো আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা। এমন একটি কাঠামো, যা তৈরি হয়েছে আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স) জন্মানোরও অনেক আগে। ফলে এই কাঠামো যে আদৌ আধুনিক মানুষ তৈরি করেনি, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। নতুন আবিষ্কার বদলে দিতে চলেছে এত দিনের ধারণা। আধুনিক মানুষের পূর্বসূরিরাও কাঠের কাজ জানত, এত দিন তা জানা ছিল না।

প্রাচীন যুগের অধিকাংশ নিদর্শনই পাথরের তৈরি। মাটি খুঁড়ে পাওয়া পুরনো পাথর কিংবা মানুষের হাড়-দাঁতের নমুনা বিশ্লেষণ করেই লক্ষ লক্ষ বছর আগে আদি মানবের জীবনযাত্রার হদিস পান বিজ্ঞানীরা। পাথর, দাঁত কিংবা হাড় সহজে ধ্বংস হয় না। বছরের পর বছর তা একই ভাবে থেকে যায়। ফলে প্রাচীন কালের এই ধরনের নমুনাগুলি খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু কাঠ? পচনশীল কাঠ সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। বছরের পর বছর ধরে কাঠের কোনও কাঠামো অবিকৃত থেকে যাওয়ার ঘটনা সচরাচর চোখে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে। আর সেই কারণেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বেশি।

মধ্য আফ্রিকার জ়াম্বিয়া দেশের জনপ্রিয় জলপ্রপাত কালাম্বো ফল্‌স। এই জলপ্রপাত সংলগ্ন পাহাড়ের পাথর খুঁড়ে একটি কাঠের নকশা খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৬০-এর দশকে এখানে প্রথম বার খননকার্য চালানো হয়েছিল। তখনই বেশ কিছু কাঠ উদ্ধার হয়। কিন্তু তা কত পুরনো, তখন নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। সম্প্রতি আবার ওই এলাকা থেকে কাঠ পাওয়া গিয়েছে। ব্রিটেনের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাবেরিস্টুইথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল বিজ্ঞানী পাথর কেটে কাঠগুলি বার করে এনেছেন। নিখুঁত গবেষণায় নিশ্চিত করেছেন সেগুলির প্রাচীনত্ব। তাঁদের গবেষণা বলছে, কাঠগুলি ৪ লক্ষ ৭৬ হাজার বছরের পুরনো। আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবীতে এসেছে তারও অন্তত দু’লক্ষ বছর পরে!

জ়াম্বিয়া থেকে পাওয়া কাঠগুলি ভাল করে খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ল্যারি বারহ্যাম সেগুলির মধ্যে থেকে একটি শঙ্কু, একটি লাঠি এবং একটি গাছের গুঁড়ি চিহ্নিত করেন। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, গাছের গুঁড়িটিকে কোনও যন্ত্রের মাধ্যমে কাটা হয়েছিল এবং লাঠিটি ব্যবহৃত হত মাটি খোঁড়ার কাজে। এ ছাড়াও গাছের নির্দিষ্ট খাঁজযুক্ত একটি শাখা ওই নমুনার মধ্যে থেকে চিহ্নিত করা গিয়েছে। সাড়ে চার লক্ষ বছর আগে এই ধরনের কাঠের কাজ যে সম্ভব, এত দিন বিজ্ঞানীরা তা ভাবতেও পারেননি। মনে করা হচ্ছে, কালাম্বো ফল্‌সে বিশেষ কোনও জলাবদ্ধ পরিস্থিতিতে কাঠগুলি এত দিন সংরক্ষিত থেকে গিয়েছে। এতটুকু পচন ধরেনি তাতে। বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে কাঠগুলির বয়স নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রাচীন নিদর্শনের অভাব থাকায় আদি মানবের কাঠের ব্যবহার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। বিজ্ঞানীরা কেবল কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করেন— আগুন জ্বালানোর কাজে কাঠ ব্যবহার করা হত, মাটি খোঁড়ার কাজে কাঠ ব্যবহার করা হত এবং বর্শার মতো হাতিয়ার হিসাবেও কখনও কখনও কাঠ ব্যবহার করত আদিম মানুষ। এর বাইরে কাঠ দিয়ে আর কী কী কাজ সেই সময় করা হত, তার হদিস মেলেনি। কালাম্বো জলপ্রপাতের আবিষ্কার সেই ইতিহাসের পাতায় নতুন সংযোজন হতে পারে।

গবেষণা বলছে, আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের পূর্বসূরি হোমিনিনের পৃথক একটি প্রজাতি দুই বা তার বেশি গাছের গুঁড়ি জোড়া লাগাতে শিখেছিল। সম্ভবত এই প্রজাতির নাম হোমো হাইডেলবার্গেনসিস। এদের ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা সম্পর্কে এত দিন আমরা যা জানতাম, নতুন আবিষ্কার তা বদলে দিচ্ছে। অধ্যাপক বারহ্যামের কথায়, ‘‘আমাদের পূর্বসূরিদের সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যাচ্ছে। প্রস্তর যুগ ভুলে যান। দেখুন আদিম মানুষ কী সব করছিল! ওরা কাঠ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এবং প্রকাণ্ড কিছু তৈরি করে ফেলেছিল!’’ কাঠে এই নকশা তৈরি করতে বুদ্ধিমত্তা, ভাবনা এবং দক্ষতা প্রয়োজন বলে মনে করেন বারহ্যাম। তাঁর মতে, আগে যা ছিল না এবং যা আগে কখনও চোখেই দেখিনি, তা তৈরি করতে প্রয়োজনীয় কল্পনাশক্তি এই আদিম মানুষদের মধ্যে ছিল।

মানুষের পূর্বসূরিদের নিয়ে বিজ্ঞানমহলে একাধিক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, আদিম মানুষের মধ্যে কোনও উদ্ভাবনী শক্তি ছিলই না। বিবর্তনের রেখা সরল থেকে ক্রমে জটিল হয়েছে। কালাম্বো জলপ্রপাত থেকে আবিষ্কৃত কাঠ সেই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। এই কাঠের নকশায় আদিম মানুষেরই নির্দিষ্ট ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। কাঠ কেটে একটির সঙ্গে অন্যটি জুড়ে নির্দিষ্ট কাঠামো তারা তৈরি করেছিল। বিজ্ঞানীদের একাংশ এই আবিষ্কারের পর ‘প্রস্তর যুগ’ নামটি নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। পাথর ছাড়াও অন্য উপাদানের এমন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার প্রাচীন যুগকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তাই সেই সময়টিকে কেবল পাথরের নামে নামকরণ করলে অন্য উপাদানগুলিকে অবহেলা করা হয় বলে মনে করেন তাঁরা।

Pre Historic Wooden structure Homo Sapiens
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy