Advertisement
E-Paper

বিধি ভেঙে ছবি তোলার নেশায় ধ্বংস হচ্ছে বাসা! পশ্চিমঘাট পর্বতের সেই বিরল ‘গ্যালাক্সি ফ্রগ’ বিলুপ্তির মুখে

বনভূমি ধ্বংস, পাহাড়ের ধস, দূষণ-সহ নানা কারণে দীর্ঘ দিন ধরেই সঙ্কটে গ্যালাক্সি ব্যাঙ। সম্প্রতি দেখা দিয়েছে নতুন এক বিপদ— অতি উৎসাহী আলোকচিত্রীদের উৎপাত। তাঁদের হামলায় একসঙ্গে সাতটি ব্যাঙের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের গবেষক রাজকুমার কেপি।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ১১:৫০
গ্যালাক্সি ফ্রগ

গ্যালাক্সি ফ্রগ ছবি: সংগৃহীত।

তাদের পিঠে ‘আঁকা রয়েছে’ ব্রহ্মাণ্ডের ছবি। মিশমিশে কালো ত্বকে নীল রঙের অসংখ্য ফোঁটা যেন ছায়াপথে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান। চার পায়ের লাগোয়া আগুনে-কমলা রঙের ছাপ মনে পড়ায় সুপারনোভা বিস্ফোরণের দৃশ্য। তাই পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কয়েকটি বিচ্ছিন্ন চিরহরিৎ বনভূমিতে টিকে থাকা ব্যাঙের প্রজাতিটির বিজ্ঞানসম্মত ল্যাটিন নাম ‘মেলানোব্যাকট্রাকাস ইন্ডিকাস’ হলেও বিশ্ব জুড়ে তার পরিচিতি ‘গ্যালাক্সি ফ্রগ’ নামে। কিন্তু মেলানোবাট্রাচিন উপ-পরিবারের একমাত্র টিকে থাকা প্রজাতিটি এ বার অস্তিত্বের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছে এক অভিনব কারণে।

বনভূমি ধ্বংস, পাহাড়ের ধস, দূষণ-সহ নানা কারণে দীর্ঘ দিন ধরেই সঙ্কটে গ্যালাক্সি ব্যাঙ। সম্প্রতি দেখা দিয়েছে নতুন এক বিপদ— অতি উৎসাহী আলোকচিত্রীদের উৎপাত। তাঁদের হামলায় একসঙ্গে সাতটি ব্যাঙের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের গবেষক রাজকুমার কেপি। ২০২০ সালের গোড়ায় কেরলে পশ্চিমঘাটের বনাঞ্চলে সেগুলির সন্ধান পেয়েছিলেন রাজকুমার। কিন্তু করোনার কারণে সেখানে আর যাওয়া হয়নি। অতিমারি-পর্ব শেষে ফিরে গিয়ে দেখেন, ব্যাঙগুলো উধাও। রাজকুমারের লেখা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এই প্রজাতির ব্যাঙেদের আশ্রয় ও প্রজননস্থল হল গভীর জঙ্গলের ভিতরে পড়ে থাকা বড় কোনও গাছের গুঁড়ি। এ ক্ষেত্রেও তেমনই ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় বার গিয়ে তিনি দেখেন, গুঁড়িটি উল্টে ফেলে বেশ কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। আশপাশের ঝোপঝাড়ও মাড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, বেজি বা ভামজাতীয় প্রাণীর কাজ। কিন্তু রাজকুমারের সঙ্গী গাইড জানান, এত বড় গুঁড়ি উল্টে ফেলা ভাম বা বেজির পক্ষে দুঃসাধ্য। এর পরে রাজকুমার অনুসন্ধানে নেমে জানতে পারেন, বন্যপ্রাণ আলোকচিত্রীর কয়েকটি দল সেখানে গিয়েছিল। তারা গুঁড়ি উল্টে, বাসা ভেঙে ব্যাঙগুলিকে বার করে হাতে ধরে তাদের ছবি তুলেছিল। আর তার পরিণতি হয়েছে মর্মান্তিক। ‘হার্পেটোলজি নোটস’ জার্নালের সাম্প্রতিক সংখ্যায় রাজকুমার, তাঁর সহ-গবেষক জ্যোতি দাস ও সন্দীপ দাস এবং জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের কিউরেটর বেঞ্জামিন ট্যাপ্লি সেগুলি তুলে ধরেছেন। তাঁদের সহযোগিতা করেছেন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার জীববৈচিত্র স‌ংরক্ষণের কাজে জড়িত বন্যপ্রাণপ্রেমী সংগঠন অরণ্যকম নেচার ফাউন্ডেশনের কর্ণধার পিএল এশা।

প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, দুই থেকে সাড়ে তিন সেন্টিমিটার লম্বা উভচর গোত্রের এই প্রাণীদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষেত্রে ত্বকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সংস্পর্শে সেই ত্বক মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। হাতে নিয়ে ছবি তোলার ফলে সবগুলি ব্যাঙেরই মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা। বস্তুত, দীর্ঘ এক মাস ধরে খোঁজাখুঁজি করেও পশ্চিমঘাটের চিরহরিৎ অরণ্যে একটিও গ্যালাক্সি ফ্রগের সন্ধান পাননি তাঁরা! আর তাদের প্রতিটি আগেকার বাসস্থানেই দেখা গিয়েছে ‘ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফার’দের তাণ্ডবের চিহ্ন। রাজকুমার বলেন, ‘‘পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র পশ্চিমঘাটের কেরল -তামিলনাড়ুর অরণ্যে গ্যালাক্সি ফ্রগ দেখা যায়। এমনটা চলতে থাকলে অচিরেই তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে। আমি যখনই সমাজমাধ্যমে এই প্রজাতির ব্যাঙের কোনও ছবি দেখি, যন্ত্রণায় আমার মুখটা কুঁকড়ে যায়। যেমনটা ওরা কুঁকড়ে যায় মানুষের হাতের ছোঁয়ায়।’’

Frog Western Ghats Toxic Toad wildlife
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy