স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (প্রাইমেট) একটা বড় অংশের মধ্যে খুব সহজ, স্বাভাবিক ভাবেই এসেছে সমকামিতা। জীবনযুদ্ধে তাদের টিকিয়ে রাখতেও সাহায্য করেছে এই সমকামিতা। এমনটাই মনে করছেন কয়েক জন বিজ্ঞানী। তাঁরা মানুষ ছাড়া প্রায় ৫০০ প্রজাতির হনুমান, এপের উপর সমীক্ষা করেছে, আর তাতেই দেখেছে, কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে, শত্রুর মোকাবিলা করতে স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সমকামী আচরণ দেখা যায়।
‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভলিউশন’ পত্রিকায় এই গবেষণা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক ভিনসেন্ট সাভোলাইনেন জানান, আগে অনেকেই মনে করতেন, পশুদের মধ্যে সমকামিতা বিরল। চিড়িয়াখানার পশুদের মধ্যেই মূলত দেখা যায় সমকামিতা। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রাইমেটদের ‘সাধারণ সামাজিক জীবনের অংশ’ হল সমকামিতা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নিয়ে গবেষণা কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে। বাঁদর, হনুমান-সহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ীদের মাঝে মধ্যেই সমকামী আচরণ করতে দেখেছেন তাঁরা। কখনও কোনও পুরুষ পশুকে অন্য কোনও পুরুষের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করতে দেখা গিয়েছে। দেখা গিয়েছে ঘনিষ্ঠ হতেও। প্রায় ১৫০০টি পশুকে এ ধরনের আচরণ করতে দেখেছেন বিজ্ঞানীদের ওই দল। তাঁরা বলছেন, গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের লেখাতেও সে বিষয়ের উল্লেখ মিলেছে। তবে বহু বিজ্ঞানী এই বিষয়টি মানতে চাননি। তাঁদের যুক্তি ছিল, স্তন্যপায়ী পশুদের মধ্যে সমকামিতা চার্লস ডারউইনের বিবর্তনের মতবাদের পরিপন্থী। কারণ, তা হলে বংশবৃদ্ধি থমকে যাবে। এক প্রজন্মের জিন পরবর্তী প্রজন্মে পরিবাহিত হতে পারবে না।
তবে সম্প্রতি এক দল বিজ্ঞানী বলছেন অন্য কথা। ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ লন্ডনের গবেষক ভিনসেন্ট সাভোলাইনেন বলছেন, পশুদের ‘বৈচিত্রমূলক যৌন আচরণ’ খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। সন্তান লালন বা শত্রুর মোকাবিলা করার মতোই। ভিনসেন্ট এবং তাঁর দল গত আট বছর ধরে পুয়ের্তো রিকোয় রেসাস মাকাকেসদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের উপরে নজর রাখছেন। তাঁরা লক্ষ করেছেন, এই প্রজাতির পুরুষেরা প্রায়ই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ ভাবে তারা মহিলা মাকাকেসদের আকৃষ্ট করে। ২০২৩ সালে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, এই সমকামিতা মাকাকেসরা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের থেকে জিন সূত্রে পেয়েছে।
ভিনসেন্টরা মানুষ ছাড়া ৪৯১টি প্রাইমেট প্রজাতির আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের মধ্যে ৫৯টি প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সমকামী আচরণ লক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেই ৫৯টি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে লেমুর, গ্রেট এপ, বাঁদর। আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়ায় সে সব গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। সর্বত্রই এই প্রজাতির প্রাণীদের সমকামী আচরণ করতে দেখেছেন তাঁরা। এর পরেই তাঁরা গবেষণা করেছেন যে, ওই প্রাণীদের এই আচরণের জন্য পরিবেশ, সামাজিক সংগঠন কতটা দায়ী। ভিনসেন্টরা দেখেছেন, যে প্রাণী যত কঠিন পরিবেশে থাকে, খাবারের জন্য যাদের যত লড়াই করতে হয়, তাদের মধ্যে সমকামী আচরণ বেশি লক্ষ করা গিয়েছে। যেমন বারবারি মাকাকেস। তারা যেখানে থাকে, সেখানে খাবার খুব কম। ভারভেট বাঁদরদেরও এই সমকামী আচরণ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা আফ্রিকার যেখানে থাকে, সেখানে তাদের সাপ, সিংহের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়।
গবেষণাকারীরা মনে করেন, খুব চাপের পরিস্থিতিতে ওই প্রাণীদের উদ্বেগ কাটাতে সাহায্য করে সমকামী যৌনতা। স্তন্যপায়ীদের যে সব প্রজাতিতে পুরুষ এবং মহিলার আকারের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে, তাদেরও সমকামী আচরণ করতে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। যেমন মাউন্টেন গোরিলা। যে সব পশুর স্ত্রী এবং পুরুষের আকার সমান, তারা সাধারণত সব সময়ে একসঙ্গে থাকতেই পছন্দ করে। তাই বিজ্ঞানীদের মতে, এই সমকামী আচরণ কিছু স্তন্যপায়ীর ‘সামাজিক কৌশল’ হিসাবে দেখা যেতে পারে। ‘পরিবেশগত বা সামাজিক চাপের’ মোকাবিলায় বা সংঘাতের মধ্যে জোট গড়তে সমকামী আচরণ করে থাকতে পারে তারা।