লক্ষ লক্ষ বছর আগে যেখানকার বাসিন্দা ছিল, যেখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল, অবশেষে সেখানেই ফিরল সেই জীবাশ্ম। উদ্ধার হওয়ার প্রায় ১৩০ বছর পরে ইন্দোনেশিয়ায় ফেরানো হল জাভা মানব বা হোমো ইরেকটাসের জীবাশ্ম। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর ফলে নতুন আলোয় দেখা হবে, লেখা হবে ইতিহাস। একটু হলেও ক্ষুণ্ণ হবে পশ্চিমের দেশগুলির প্রাধান্য। আরও এক বার প্রমাণ হয়ে গেল, যে ইউরোপের বাইরেও অস্তিত্ব ছিল আদিম মানবের।
পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে হোমো ইরেকটাস। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর প্রতিবেদন বলছে, এই জাভা মানবের জীবাশ্ম হল হোমো ইরেকটাস প্রজাতির প্রথম জীবাশ্ম-প্রমাণ। লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়ানো এই প্রজাতির জীবাশ্ম একশো বছরের বেশি সময় ধরে ছিল নেদারল্যান্ডে। অবশেষে তা ফিরল ইন্দোনেশিয়ায়। এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী ফাদি জ়োন।
কী ভাবে বিবর্তন হল আদিম মানবের, কী ভাবে বিলুপ্ত হল তারা, এ সব নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে জাভা মানবের। ১৮৯০ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার জীবাশ্ম উদ্ধার করেছিলেন ডাচ জীবাশ্মবিদ ইউজিন ডুবোয়া। ১৮৯১ সালে এই জাভা মানবের জীবাশ্মটি সেখানে উদ্ধার করেছিলেন তিনি। পরে গবেষণা করে জানা যায়, ওই করোটি এবং ঊরুর হাড়ের জীবাশ্ম আসলে হোমো ইরেকটাসের। ১০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে বেঁচে ছিল তারা। বিজ্ঞানীরা প্রথম বুঝতে পারেন, ইউরোপের বাইরেও ছিল আদিম মানবের বাস।
উদ্ধার হওয়া সেই জীবাশ্ম পাঠিয়ে দেওয়া হয় নেদারল্যান্ডে। তার স্থান হয় নেদারল্যান্ডের লেডেনে ন্যাচরালিস বায়োডাইভারসিটি সেন্টারে। সেখানে ওই জীবাশ্ম নিয়ে নতুন করে শুরু হয় গবেষণা। তার পরে গত একশো বছরে বহু বার ইন্দোনেশিয়া সেই জীবাশ্ম ফেরত চেয়েছে। কিন্তু কখনও কূটনৈতিক, কখনও আইনি জটে সেই প্রক্রিয়া আটকে গিয়েছে। ‘ঔপনিবেশিক’ ক্ষমতার বলে অনেক সময়ই ইউরোপের দেশগুলি এশিয়া বা আফ্রিকার দেশ থেকে আনা ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরাতে অস্বীকার করে। এ বার সেই জীবাশ্ম ফেরত পেয়েছে ইন্দোনেশিয়া। রাজধানী জাকার্তার জাতীয় জাদুঘরে রাখা হয়েছে সেটি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত একশো বছর ধরে জাভা মানবের জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদিম মানবের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে হোমো ইরেকটাস হল সবচেয়ে সফল। ১০ লক্ষ বছরেরও বেশি আগে আফ্রিকা এবং এশিয়ায় তাদের বাস ছিল। জাভা মানবের ঊরুর হাড়ের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, তারা ঋজু হয়ে হাঁটত। তাদের করোটি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আধুনিক মানুষের তুলনায় হোমো ইরেকটাসের মস্তিষ্ক ছোট হলেও তার আগের হোমিনিনসের থেকে বড় ছিল। এ বার এই গবেষণাই আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন ইন্দোনেশিয়ার বিজ্ঞানীরা। নিজেদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা নতুন তথ্য পেতে পারেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ইন্দোনেশিয়ার এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, এত দিন সে দেশের পড়ুয়ারা জাভা মানবের কথা শুনে এসেছেন। এ বার নিজের চোখে দেখতেও পাবেন। বিজ্ঞানীদের একটা অংশ বলছেন, বিজ্ঞানের উপর পশ্চিমের দেশগুলির ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ একটু হলেও খণ্ডিত হল। ইন্দোনেশিয়ার বিজ্ঞানী হিলমার ফারিদ জানান, বহু বছর ধরে বিজ্ঞান, ইতিহাসকে ইউরোপের মানুষের চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে। ইউরোপের বাইরের মানুষদের অবদান সেখানে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। এ বার সেটাই হবে। এশিয়ার মানুষজনও নিজের মতো করে নিজেদের ইতিহাস উদ্ধার করবেন।