মৃত্যুর পর দেহ কবর দেওয়ার রীতি অতিপ্রাচীন। কিন্তু চিতায় তুলে মৃতদেহ দাহ করার রীতি চালু হল কবে থেকে? কী কী নিয়ম মানা হত প্রাচীন শ্মশানে? সম্প্রতি তেমনই এক নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। একে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দাহকার্যের এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম নিদর্শন বলা হচ্ছে।
পূর্ব আফ্রিকার মালাওই শহরের কেন্দ্রে সাড়ে ন’হাজার বছরের পুরনো দগ্ধ দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, ওই দেহাবশেষ কোনও এক মহিলার। তাঁর বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে পারে। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ দাহের জন্য যত্নে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তার পর দীর্ঘ ক্ষণ ধরে দেহটি জ্বলেছিল। কয়েক ঘণ্টা ধরে চিতাটিকে জ্বালিয়ে রাখার জন্যেও বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল, মিলেছে প্রমাণ। আমেরিকার ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল নৃতত্ত্ববিদ আফ্রিকায় এই সংক্রান্ত গবেষণা চালিয়েছেন। দলের নেতৃত্বে ছিলেন নৃবিজ্ঞানী জেসিকা সেরেজ়ো-রোমান। তাঁর কথায়, ‘‘আফ্রিকায় আন্তর্জাতিক দাহকার্যের এটাই প্রাচীনতম নিদর্শন। এটাই বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাপ্তবয়স্কের চিতা।’’
আরও পড়ুন:
এমন একটি জায়গায় এই চিতার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যেটি নৃতত্ত্ববিদদের চেনা ঠিকানা। এই মালাওইতে এর আগেও বিবিধ প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। স্থানটিকে প্রাচীন কালে মৃতদেহ সৎকারের জন্যই ব্যবহার করা হত। আট হাজার বছরের সৎকারের ইতিহাস রয়েছে আফ্রিকার মালাওইতে। এর আগে এখান থেকে একাধিক কবর এবং দেহাবশেষ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে প্রাপ্তবয়স্কের চিতার খোঁজ এই প্রথম।
যে সময়ের চিতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, মানুষ তখন মূলত শিকারি বা খাদ্যসংগ্রাহক। খাদ্যের উৎপাদন তখনও তারা শেখেনি। শিকারিদের অন্ত্যেষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে আফ্রিকার আবিষ্কার থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতটা জটিল মনে করা হয়েছিল, শিকারিদের অন্ত্যেষ্টি তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল হতে পারে। একটি বিষয় পরিষ্কার, চিতা সাজাতে প্রচুর পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম করা হয়েছিল। বিশেষ ভাবে দাহ্য পদার্থ জোগাড় করা হয়েছিল, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে চিতা জ্বলতে থাকে, তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। প্রচুর পরিমাণে কাঠ সরবরাহ করা হয়েছিল শ্মশানে। সৎকারস্থল থেকে মিলেছে ৩০ কেজি ওজনের ছাই, যা কাঠ, ঘাস ও পাতার সংমিশ্রণে তৈরি।
মৃত্যুর পর মানুষের দেহ সচেতন ভাবে সমাধিস্থ করার প্রাচীনতম নিদর্শন প্রায় ৭৮ হাজার বছরের পুরনো। দেহ মাটিতে পুঁতে দেওয়ার ধারণা আদৌ আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) পূর্বপুরুষেরা প্রথম আবিষ্কার করেছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই আদিমানবেরা মৃত্যুর পর দেহ সমাধিস্থ করত। কিন্তু শবদাহের রীতি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। সাত হাজার বছরের আগে প্রাপ্তবয়স্কের জন্য চিতা সাজানোর কোনও প্রমাণই এত দিন মেলেনি। সম্প্রতি আবিষ্কৃত মহিলার দেহাবশেষ সাড়ে ন’হাজার বছরের পুরনো হওয়ায় তাকে প্রাচীনতম বলা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
চিতা সাজিয়ে দেহ দাহ করা না হলেও দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার উদাহরণ অবশ্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লেক মুঙ্গোতে পাওয়া দেহাবশেষ ৪০ হাজার বছরের পুরনো। মৃত্যুর পর সেই দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রমাণ পেয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাতে কোনও চিতার চিহ্ন ছিল না। প্রাপ্তবয়স্কের চিতা আবিষ্কারের অনেক আগে আলাস্কায় এক শিশুর দাহকার্যের হদিস পেয়েছিলেন নৃতত্ত্ববিদেরা। তা প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বছরের পুরনো। বিশেষ ভাবে সাজানো চিতায় তার দেহ শোয়ানো ছিল। সেটা এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের প্রাচীনতম চিতা।
বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, মালাওইতে মাউন্ট হোরা নামের একটি জায়গায় ১৬ হাজার থেকে ৮ হাজার বছর আগের সময়কালে অন্তত ১১টি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খোঁজ মিলেছে। জায়গাটি সৎকারের জন্য ব্যবহার করা হত, তাতে সন্দেহ নেই। এঁদের মধ্যে মধ্যে এক জনের দেহ প্রথমে দাহ করা হয়, তার পর তা সমাধিস্থ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও দেহাবশেষ মহিলার। খোঁড়াখুঁড়ির পর মিলেছে তাঁর কোমর, মেরুদণ্ড এবং কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হাড়গোড় এবং প্রচুর পরিমাণে ছাইয়ের নমুনা। হাড়গোড় বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা হয়েছিল। কয়েকটি কাটাছেঁড়ার দাগ থেকে প্রমাণিত হয়, দাহের আগে দেহের কোনও কোনও অংশ কেটে নেওয়া হয়েছিল। এখান থেকেই দাহকার্যের প্রাচীন রীতির পরিচয় মেলে। দাহের সময় দেহটিকে প্রয়োজনমতো উল্টেপাল্টেও দেওয়া হয়েছিল।
এই মহিলার দাঁত বা মাথার খুলির কোনও অংশ পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, দাহের আগে তাঁর মাথা কেটে নেওয়া হয়েছিল। অন্য কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রেও এই নিদর্শন মিলেছে। মনে করা হচ্ছে, এটা সৎকারের কোনও রীতির অংশ।