ভারতের মাটিতে স্পিনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানদের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেব নেওয়ার সময় তাঁর পারফরম্যান্সও দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়। বছর চারেক আগে অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তার পর থেকে স্পিন পরামর্শদাতা হয়ে কাজ করে চলেছেন। অস্ট্রেলিয়া ভারতে পা দেওয়ার আগেই ছকে নিয়েছিলেন কী ভাবে তৈরি হবেন চলতি সিরিজের জন্য। কেরল থেকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছেন চায়নাম্যান বোলারকে। যাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানেরা ময়দানে নামার আগেই রিস্ট স্পিনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্র্যাক্টিসটা পেয়ে যায়। মিডিয়ার সামনে তাঁকে প্রায় আনাই হয় না, এক-আধটা প্রথাগত সাংবাদিক বৈঠক ছাড়া। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একটা ব্যাপার ছাড়া। অনেক চেষ্টার পরে, আনন্দবাজারের কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে এ বার রাজি হলেন শ্রীধরন শ্রীরাম। অস্ট্রেলিয়ার স্পিন পরামর্শদাতা। 

প্রশ্ন: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা কী করে হল?

শ্রীরাম: এর জন্য আমি আইপিএলকে ধন্যবাদ দেব। আইপিএলে আমি যখন দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের (এখন দিল্লি ক্যাপিটালস) সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তখন ওই দলে ছিল মার্কাস স্টোয়নিস আর ট্র্যাভিস হেড। ওই দু’জনের সঙ্গে কাজের সূত্রেই আমার ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ। তার পরে আস্তে আস্তে ‘এ’ দল থেকে শুরু করে সিনিয়র দলের সঙ্গে আমি কাজ শুরু করি।

প্র: অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে স্পিনারদের নিয়ে কাজ করা, ব্যাটসম্যানদের উপমহাদেশের স্পিনারদের বিরুদ্ধে তৈরি করা। কতটা শক্ত ছিল এই চ্যালেঞ্জ?

শ্রীরাম: আমি এক দিক দিয়ে খুব সৌভাগ্যবান যে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ সমর্থন সব সময় পেয়েছি। দলের প্রধান কোচ এবং ক্রিকেটারেরা আমার পাশে থেকেছে এবং আছে। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবি না। আমি আমার ক্রিকেটীয় চিন্তাধারাটা দলের কোচকে জানিয়ে দিই। তার পরে সেখান থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়।

প্র: এই মুহূর্তে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিশ্চয়ই ভারতের মাটিতে যুজবেন্দ্র চহাল আর কুলদীপ যাদবের মতো রিস্ট স্পিনারদের সামলানো?

শ্রীরাম: ওরা দু’জনই খুব ধুরন্ধর বোলার। যে রকম দক্ষতা, সে রকমই ক্রিকেটীয় মস্তিষ্ক।

প্র: সুনীল গাওস্কর থেকে শুরু করে হরভজন সিংহ, সবাই প্রায় একটা কথা বলেন। বল ছাড়ার সময় রিস্ট স্পিনারদের হাত দেখে স্পিনটা ধরতে পারে না বিদেশি ব্যাটসম্যানরা। যে কারণে ওদের পক্ষে স্পিন খেলা কঠিন হয়ে যায়। আপনি এত দিন অস্ট্রেলিয়া দলটার সঙ্গে আছেন। কেন বিদেশি ব্যাটসম্যানরা বোলারের গ্রিপ দেখে স্পিনটা বুঝত পারছেন না? কেন বল পিচে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে?

শ্রীরাম: বিশ্ব জুড়ে এখন দেখা যায় ব্যাটসম্যানেরা দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেনিং করছে। আর এই ট্রেনিংয়ের অনেকটা সময় যাচ্ছে প্রচুর থ্রোডাউন (যেখানে অল্প দূরত্ব থেকে ব্যাটসম্যানের দিকে বল ছুড়ে মারছেন কোনও থ্রোডাউন বিশেষজ্ঞ) সামলাতে। এতে একটা সমস্যা হচ্ছে। ডেলিভারির সময় বোলারের হাত দেখার অভ্যাসটা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। যেটা রিস্ট স্পিনারদের খেলার ক্ষেত্রে ব্যাটসম্যানদের সমস্যার কারণ হয়ে উঠছে। 

তৃপ্ত: ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিং দেখে সন্তুষ্ট শ্রীরাম। ফাইল চিত্র

প্র: এ ছাড়া আর কী সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের?

শ্রীরাম: ওই যে বললাম, রিস্ট স্পিনাররা এখন খুব স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে। ওরা অনেক সময়ই বুঝতে দিচ্ছে না বল ছাড়ার সময় গ্রিপটা কী রকম হচ্ছে। পাশাপাশি একটা ডেলিভারি করার কায়দা করে অন্য একটা ডেলিভারি করছে। রিস্ট স্পিনাররাও নিজেদের বদলে নিচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী।

প্র: সীমিত ওভারের ক্রিকেটে রিস্ট স্পিনারদের গুরুত্ব তো এখন ভীষণ ভাবে বাড়ছে?

শ্রীরাম: অবশ্যই। সাদা বলের ক্রিকেটে রিস্ট স্পিনারদের সফল হওয়ার আরও একটা কারণ আছে। সাদা বলের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় বলের সেলাইটা সে রকম চওড়া বা উঁচু নয়। ফ্লাড লাইটে সেই সিমের অবস্থান বোঝাটা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে ব্যাটসম্যানদের জন্য। যে কারণেও স্পিনটাও বোঝা কঠিন হচ্ছে।

প্র: তা হলে কুলদীপ, চহালের মোকাবিলায় কী ভাবে তৈরি করছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের?

শ্রীরাম: আমি কয়েকটা জিনিস করার চেষ্টা করি। এক, প্র্যাক্টিসে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করি, যেটা ব্যাটসম্যানদের মাঠে নেমে সামলাতে হবে। দুই, ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে খুটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলি। ওদের বোঝাই, বোলারদের অ্যাকশন থেকে কী ভাবে আন্দাজ করা যেতে পারে বল কোন দিকে স্পিন নেবে। তিন, প্রচুর ভিডিয়ো ক্লিপিংস দেখানো হয় ব্যাটসম্যানদের। এটাকে বলি ভিডিয়ো স্টাডি। খুব খুঁটিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করা হয়, বলের রোটেশন কী রকম হতে পারে। বোলাররা কোনও ক্লু দিচ্ছে কি না বলটা কী করবে, সে ব্যাপারে। কোচের কাজই হল, এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যাটসম্যানরা সব রকম ভাবে তৈরি হতে পারবে।

প্র: টি-টোয়েন্টি সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের, বিশেষ করে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিং দেখে তো মনে হল, আপনার পরামর্শ খুব কাজে দিয়েছে।

শ্রীরাম: কৃতিত্ব দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

প্র: এ বার ওয়ান ডে সিরিজ। এখানে স্পিনাররা আরও বেশি বড় ভূমিকা নেবে বলেই তো মনে হয়?

শ্রীরাম: অবশ্যই। ভারতীয় দলে দু’জন রিস্ট স্পিনার আছে। তবে আমাদের ব্যাটসম্যানেরাও তৈরি। আমাদের স্পিনাররাও যথেষ্ট ভাল।

প্র: ওয়ান ডে সিরিজে কুলদীপ যাদব দলে ফিরছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে কুলদীপ তো খুব ভাল করল।

শ্রীরাম: সেটাই কুলদীপের সব চেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট। শুধু ভারতেই নয়, বিদেশে গিয়েও সফল হচ্ছে।

প্র: কোচ হিসেবে আপনি এখন একটা জায়গা করে নিয়েছেন। কাদের কৃতিত্ব দেবেন এই জায়গায় পৌঁছনোর জন্য?

শ্রীরাম: আমার পরিবার। আমার আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর। অবশ্যই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, ট্রয় কুলিকে (যিনি একটা সময় ইংল্যান্ডের বোলিং কোচ ছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়ারও বোলিং কোচ হন) এবং গ্রেগ চ্যাপেলকে।