ফুটবলের প্রতি ভালবাসা শৈশব থেকেই। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দুই প্রধানের ফুটবলারদেরই ছবি কেটে দেওয়ালে আটকাতাম। সেই সময় শ্যামনগরে গিরিজাপ্রসন্ন শিল্ড ছিল খুব বিখ্যাত। আমার কাকা ইউনাইটেড ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। ১৯৫৮ সালে তিনি আমাকে তাঁর অফিস দলের হয়ে খেলাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালে প্রতিপক্ষ জিএসআই। সেই দলের লেফ্ট ব্যাক ছিলেন কিংবদন্তি শৈলেন মান্না। আমি ছিলাম রাইট আউট। মান্নাদা তখন খেলোয়াড় জীবনের শেষ প্রান্তে। সেই বছরই রোভার্স কাপে টাটার বিরুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে ফিরেছে মোহনবাগান। এখনও মনে আছে, গিরিজাপ্রসন্ন শিল্ডের ফাইনালে মান্নাদাকে আমি নাজেহাল করে দিয়েছিলাম। দেশ ভাগের পরে শ্যামনগরে তখন পূর্ববঙ্গের প্রচুর মানুষ থাকতেন। আমাকে নিয়ে তাঁরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। 

পরের বছর এরিয়ানে সই করলাম। সেই সময় বার্নপুরে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান খেলতে যেত। কিংবদন্তি অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের দাদা এন আর দত্ত ছিলেন তখন ইস্কোর জেনারেল ম্যানেজার। তিনিই প্রত্যেক বছর কলকাতার দুই প্রধানকে নিয়ে যেতেন। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলা পড়ল এরিয়ানের। মান্নাদা স্টপারে। আমি সেন্টার ফরোয়ার্ডে। সেই ম্যাচেও মান্নাদাকে সমস্যায় ফেলেছিলাম। বেশ কয়েক বার পড়েও গিয়েছিলেন তিনি। পরের বছর সেই মান্নাদা বলাইদাস চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। তখন থাকতাম কালীঘাটে। বললেন, ‘‘তুমি আমার বিরুদ্ধে উইং, সেন্টার ফরোয়ার্ড দুটো পজিশনেই খেলেছো। সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেই তোমার খেলা বেশি ভাল লেগেছে। তাই ওই পজিশনেই তোমাকে আমার চাই।’’

মোহনবাগানে সই করলাম। নিয়মিত খেলতেও শুরু করলাম। লিগের পঞ্চম ম্যাচে ইস্টার্ন রেলের বিরুদ্ধে ০-২ হেরে গেলাম। দ্বিতীয়ার্ধে পিছিয়ে থাকার সময়ে চুনীদাকে (চুনী গোস্বামী) জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি রাইট আউটে খেলব? মান্নাদার সঙ্গে কথা বলাই ছিল, যদি সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে ব্যর্থ হই, তা হলে অন্তত একটা ম্যাচে রাইট আউট পজিশনে খেলাতে হবে। দিপু (দিপু দাস) চলে এল আমার পজিশন, অর্থাৎ সেন্টার ফরোয়ার্ডে। বিপক্ষের ফুটবলারদের কাটিয়ে উইং দিয়ে উঠে একের পর এক পাস করলাম। যদিও িজতিনি। তার পর থেকে রাইট আউটে খেলা শুরু। আমার পাস থেকে কখনও চুনীদা, কখনও অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় গোল করেছেন। 

১৫তম ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়ে দু’মাসের জন্য ছিটকে গেলাম। দিপু দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটাল। হেডে টানা গোল করতে শুরু করল। ফিট হয়েও প্রথম একাদশে ঢুকতে পারছি না। আইএফএ শিল্ডের সময়ে বলা হল, লেফ্ট আউটে খেলতে হবে। আমি রাজি। প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রথম দলে ঢোকা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ মহমেডান। আমি মাঠে নামার জন্য তৈরি। আমাদের কোচ ছিলেন অরুণ সিনহা। উনি হঠাৎ বললেন, ‘‘তুমি কুড়ি মিনিট পরে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসবে!’’ বিস্মিত হয়ে বললাম, তা হলে তো সবাই ভাববে আমি ফিট হইনি। না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে জার্সি খুলে ফেললাম। ড্রেসিংরুমে বসে কাঁদলাম। খেলাই দেখলাম না। খেলা শেষ হওয়ার পরে কেম্পিয়া অবশ্য আমাকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল।

সেই সময় গোরক্ষপুরে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা চলছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দল চলে গিয়েছে খেলতে। মান্নাদাকে বললাম, আমাকে আজ রাতেই পাঠিয়ে দিন গোরক্ষপুরে। পরের দিন পটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জ়োনাল ফাইনাল। সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলে গোল করলাম। তার পরে নাগপুরে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন। খবরের কাগজে আমার প্রচুর প্রশংসা হল। মোহনবাগান কর্তাদেরও টনক নড়ল। কলকাতায় ফেরার পরে তাঁরা বললেন, ‘‘রোভার্স, ডুরান্ডে খেলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নাও।’’ রোভার্সে লেফ্ট আউট হিসেবে খেলে প্রথম ম্যাচে গোল করলাম। দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ টাটার দল। অলিম্পিয়ান লতিফ ছিল দলে। গোল হচ্ছে না দেখে দ্বিতীয়ার্ধে রাইট আউটে চলে গেলাম। ১-০ জিতেছিলাম। পরের দিন সব কাগজে লেখা হল, প্রথম শ্রেণির ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন লতিফ। সঙ্গে আমার প্রশংসা। ডুরান্ডেও দুর্দান্ত খেললাম।

ডুরান্ড শেষ হওয়ার পরেই কালিকটে (এখন কোজ়িকোড়) সন্তোষ ট্রফি। তার পরে মোহনবাগানের হয়ে তিন মাসের জন্য পূর্ব আফ্রিকা সফরে যাওয়ার কথা। তার আগে সন্তোষ ট্রফি। এখান থেকেই আমার জীবন নাটকীয় মোড় নিল। সন্তোষ ট্রফি খেলতে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারেরা আগেই চলে গিয়েছিল। মোহনবাগানের আমরা পাঁচ জন—জার্নেল, কেম্পিয়া, দিপু, অমল ও আমার বিমানে যাওয়ার কথা। এখনও মনে আছে, সে দিন সরস্বতী পুজো ছিল। মনটা তাই এমনিতেই একটু খারাপ। সন্ধেবেলা হঠাৎ মোহনবাগানের এক কর্তা এসে হাতে ট্রেনের টিকিট দিলেন। বললাম, আমাদের তো বিমানে যাওয়ার কথা। ট্রেনের টিকিট কেন? কোনও উত্তর নেই। ফের জিজ্ঞেস করলাম, বাকি চার জনও কি ট্রেনে যাচ্ছে? এ বারও উত্তর নেই। রাগে টিকিটটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিলাম। বলে দিলাম, খেলব না সন্তোষ ট্রফি। ঘণ্টাখানেক পরে ফের বিমানের টিকিট নিয়ে হাজির সেই কর্তা। কেন শুধু আমাকেই ট্রেনে পাঠানোর পরিকল্পনা হয়েছিল, আজও তা আমার কাছে রহস্য। সে দিনই সিদ্ধান্ত নিলাম, আর মোহনবাগান নয়। ইস্টবেঙ্গলে সই করব।

সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে হেরে কলকাতায় ফেরার সময় চুনীদা বললেন, ‘‘ক্লাব তাঁবুতে চলে আয়, পূর্ব আফ্রিকা সফরের জন্য টিকা দেওয়া হবে।’’ কিন্তু আমি যাইনি। কারণ, তত ক্ষণে ইস্টবেঙ্গলে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়ে ফেলেছি। বিকেলবেলা কালীঘাটের রোয়াকে বসে যখন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছি, মান্নাদা এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সকালে কেন টিকা নিতে যাইনি? বললাম, শরীরটা ঠিক নেই। কিন্তু বিশ্বাস হল না মান্নাদার। বললেন, ‘‘আমার আঙটি ছুঁয়ে বল, ইস্টবেঙ্গলে সই করবি না।’’ সে দিন আঙটি ছুঁয়ে মিথ্যে কথা বলেছিলাম মান্নাদাকে। তখন আমার শরীর রীতিমতো কাঁপছিল। মান্নাদা বললেন, ‘‘গাড়িতে উঠে পড়। এক্ষুনি চল ক্লাব তাঁবুতে। বিকেলেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।’’ মান্নাদাকে আশ্বস্ত করে বললাম, আপনি এগোন, আমি আসছি। এর পরেই একটা কাণ্ড করেছিলাম। ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন ফুটবল সচিব মন্টু বসুকে ফোন করে বললাম, আমাকে যদি চান, এক্ষুনি বাড়ি থেকে নিয়ে যান। মন্টুদা জানালেন, দশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে। ঠিক তাই হল। আমাকে নিয়ে চলে গেলেন। পরের দিন কয়েকটা খবরের কাগজে লেখা হল, সুকুমার সমাজপতিকে অপহরণ করা হয়েছে!

ইস্টবেঙ্গলকে পাকা কথা দিয়েছিলাম সন্তোষ ট্রফি চলাকালীনই। কোঝিকোড়ের এক হোটেলে কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়। ১৯৬১ সালে ইস্টবেঙ্গলে সই করলাম। কেউ চাইছিল না মোহনবাগান ছাড়ি। বলছিল, সামনেই পূর্ব আফ্রিকা সফর। এখন যেন ইস্টবেঙ্গলে সই না করি। বললাম, পরের বছরই বিদেশে যাব ভারতের হয়ে খেলতে। সেটাই সত্যি হয়েছে। টানা ছয় বছর লাল-হলুদ জার্সি গায়ে খেলাটা আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। মঙ্গলবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আরও এক বার মুগ্ধ হলাম। অতীত ও বর্তমান প্রজন্মকে যে ভাবে একমঞ্চে হাজির করে সম্মানিত করা হল তা বিশ্বের কোনও ক্লাবের ইতিহাসে হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। অনবদ্য।