তিনটি এক দিনের ম্যাচে ৩৫২ রান। শেষ দুই ম্যাচে শতরান। নিকটতম ক্রিকেটারও পিছিয়ে ১১২ রানে। ভারতের মাটিতে এসে ভারতের বিরুদ্ধে শেষ কবে কোনও বিদেশি ব্যাটার এই দাপট দেখিয়েছেন, তা অনেকেই মনে করতে পারছেন না। ২০২৪ সালের টেস্ট সফরে যদি নিউ জ়িল্যান্ড মনে রাখে উইল ইয়ংকে, তা হলে ২০২৬-এর সফর প্রতিষ্ঠা দিল ড্যারিল মিচেলকে। কাকতালীয় হলেও সত্যি, এই ভারত সফরে এসেই ১২ বছর আগে ভেঙেছিল মিচেলের আত্মবিশ্বাস। সেই শিক্ষা এখন তাঁকে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের ক্রিকেটারে পরিণত করেছে।
গোটা সিরিজ়ে কুলদীপ যাদব, রবীন্দ্র জাডেজাদের শাসন করেছেন মিচেল। যেমন খেলেছেন পেস, তেমনই খেলেছেন স্পিন। ভারতের কোনও বোলারকে দাঁড়াতে দেননি। কী ভাবে সফল হলেন তিনি? জানতে গেলে একটু পিছনে যেতে হবে।
২০১৩-য় নিউ জ়িল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল খেলে ‘এ’ দলে নির্বাচিত হয়েছিলেন মিচেল। ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় আট সপ্তাহের সফরে পাঠানো হয়েছিল তাঁকে। মিচেলের কাছে সেটি ছিল দুঃস্বপ্নের সফর। প্রতিটি ম্যাচে স্পিনারদের বলে আউট হয়েছিলেন। যে কুলদীপকে এক দিনের সিরিজ়ে একের পর এক ছক্কা মেরেছেন, সেই মিচেলই এক সময় স্পিনের বিরুদ্ধে ল্যাজেগোবরে হয়ে গিয়েছিলেন।
ওই যে নিউ জ়িল্যান্ডের দল থেকে বাদ পড়লেন, ফিরতে আট বছর লেগেছিল। ভারত সফর তাঁকে সরিয়েছিল জাতীয় দল থেকে। এখন ভারতের মানুষের কাছেই প্রশংসিত তিনি। ভারত ভেঙেছিল তাঁর জেদ। এখন ভারতেই তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিকতার প্রশংসা হচ্ছে।
আধুনিক ক্রিকেটে এমন ব্যাটার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি ক্রমাগত ‘ভি’ অঞ্চল (মিড-অন থেকে মিড-অফের মাঝের এলাকা) দিয়ে শট খেলতে পারেন। স্পিন হোক বা পেস, অনায়াসে ‘ভি’ এলাকার উপর দিয়ে শট খেলেন তিনি। ১২ বছর আগে স্পিনারদের বল বুঝতেই পারতেন না। বলের দিকে এগিয়ে যেতেন, আগে থেকে শট খেলার চেষ্টা করতেন এবং অবধারিত আউট হতেন।
নিজের সেই অধ্যায় নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে মিচেল বলেছিলেন, “নিউ জ়িল্যান্ড এবং পার্থে (অস্ট্রেলিয়া) বড় হয়েছি। ওখানে এ রকম পরিস্থিতি কখনও দেখতে পাইনি। ওই সফর আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। তার পর থেকেই বিভিন্ন পরিস্থিতির কথা ভেবে আগে থেকেই তৈরি হতাম। বুঝেছিলাম যে কোনও একটা পরিবেশে খেলার মতো করে নিজেকে তৈরি করলে চলবে না। আমি জেদি ছিলাম। নিজের টেকনিক, খেলার ধরন, দায়িত্ব কখনও বদলাতে চাইতাম না। তবে ভাল স্পিনারের বিরুদ্ধে যদি ক্রিজ়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন তা হলে আউট হবেনই। দু’বছর লেগেছিল নিজেকে মানিয়ে নিতে।”
মিচেলকে সাহায্য করেছেন তাঁর বাবা জনও। নিউ জ়িল্যান্ডের হয়ে রাগবি দলে দীর্ঘ দিন খেলেছেন। পরে কিউয়ি এবং ইংল্যান্ড দলকে কোচিং করিয়েছেন। তবে সাফল্যের মাঝে এসেছে ব্যর্থতাও। এই ব্যর্থতার সময়টাই তিনি কাজে লাগিয়েছেন ছেলের উন্নতিতে। কোচিং জীবনের ফাঁকে যে সময়টা পেয়েছেন, সেটা দিয়েছেন ছেলেকে।
প্রথম ঘটনা ২০০০ সালের। ইংল্যান্ডকে ‘সিক্স নেশন্স’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন করার পরেও জনকে কোচ হিসাবে না রাখায় তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। তখন মিচেলের বয়স ৯। এক দিন ছেলের নতুন স্কুলে ডেভেলপমেন্ট অফিসারের কাছে গিয়ে শুনলেন, ছেলের মধ্যে ব্যাটার হওয়ার সব রকম গুণ রয়েছে। অপেক্ষা করছেন বাবার অনুমতির। মিচেলের উন্নতির জন্য তাঁর বাবারও সাহায্য চাইলেন ওই শিক্ষক। টেকনিক্যাল দিকগুলি দেখিয়ে দেবেন, সেই প্রতিশ্রুতি দিলেন মিচেলের বাবা।
বাড়ির পিছনের উঠোনে তৈরি করা হল ক্রিকেটের নেট। তৈরি হল নিয়ম। স্লিপে বল লাগলে আউট। অনসাইডে শট খেলতে হবে কোমরের উচ্চতার নীচে। জোরে শট না মারলেও চলবে। বেড়ার ও পারে বল গেলে ছয় ঠিকই। তবে বল কুড়িয়ে আনতে হবে প্রতিবেশীর কুকুরের তাড়া সামলে।
মিচেলের সামনে নতুন অঙ্ক সাজিয়ে দেন তাঁর বাবা। ১২ বলে ১৫ রান তুলতে হবে। ছ’টি বল হবে জোরে। ছ’টি বল আস্তে। মিচেলের বাবা বলেছেন, “ও কী ভাবে শট খেলবে সেটা ওকেই ঠিক করতে দিতাম। যতটা সম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করতাম। প্রয়াত হওয়ার আগে সময় দিত ওর ঠাকুর্দাও। ভাল এবং খারাপ দিন সকলের যায়। সেটা পেরিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দিতাম মিচেলকে। ওকে নিজের মতো পথ খুঁজে নিতে বলতাম। ও নিজেই নিজের দক্ষতায় শাণ দিয়েছে। মানসিক প্রস্তুতির কৃতিত্ব পুরোটাই ওর নিজের।”
আরও পড়ুন:
নিউ জ়িল্যান্ড রাগবি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারার পর দ্বিতীয় বার মিচেলের বাবার সামনে সুযোগ আসে। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার পার্থে চাকরি পান। মিচেল প্রথমে যেতে চাননি। তবে পার্থের সবুজে ঘেরা ক্রিকেট মাঠ এবং অনুশীলনের সুবিধা দেখে উৎসাহিত হন। সেখানেই পরিচয় হয় মার্কাস স্টোইনিস এবং মার্কাস হ্যারিসের সঙ্গে, যাঁরা দু’জনেই পরে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন। জাস্টিন ল্যাঙ্গার এবং তাঁর কোচ নডি হোল্ডারের কাছেও ব্যাটিংয়ের পাঠ নিয়েছেন মিচেল।
সব কিছুই থমকে গিয়েছিল ২০১৩-য় ওই ভারত সফরের পর। মিচেল বলেছেন, “বিপক্ষ দলগুলো বেছে বেছে আমার বিরুদ্ধেই স্পিনারদের বল করাত।” ধীরে ধীরে সেই বল খেলতে শিখে যান মিচেল। কী ভাবে পা ব্যবহার করতে হবে, কী ভাবে খুচরো রান নিতে হবে, কী ভাবে মারতে হবে— সব শিখে যান। নিউ জ়িল্যান্ডের হয়ে ২০১৮-১৯ সালে খেলতে শুরু করার পর থেকে সব বদলে যায়।