ব্যাটিংয়ের ধরন বদলেছেন বিরাট কোহলি। রোহিত শর্মাও। শুরুতে একটু ধরে খেলা কোহলি এখন প্রথম বল থেকে মারছেন। আর শুরু থেকে চালিয়ে খেলা রোহিত এখন একটু ধরে খেলছেন। প্রথম জন সফল, দ্বিতীয় জন ব্যর্থ।
‘সামনে গিরে গা তো দেতা হুঁ না!’ কোহলিকে বলেছিলেন রোহিত। অর্থাৎ, ব্যাটের গোড়ায় বল পড়লে চালিয়ে খেলবেন তিনি। রোহিতের এই খেলার ধরনই যে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল, তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞেরা। সেই ধরনটাই উধাও নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ে। তিন ম্যাচে রান পাননি অনভিজ্ঞ বোলারদের বিরুদ্ধে। তবে কি রানের খিদেটাই চলে গিয়েছে তাঁর? প্রশ্ন উঠছে।
পছন্দের শটেই পড়ছে উইকেট
আগে যে শট চোখ বন্ধ করে খেলতেন সেই শটেই এখন উইকেট পড়ছে। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম দুই ম্যাচে ক্রিজ় ছেড়ে বেরিয়ে কভারের উপর দিয়ে চালিয়ে খেলতে গিয়ে আউট হয়েছেন। তৃতীয় ম্যাচে পুল শট মারতে গিয়ে হারিয়েছেন উইকেট। পছন্দের শটে যখন সমস্যা হয়, তখনই প্রশ্ন ওঠে সেই ক্রিকেটারের মানসিকতা নিয়ে।
রোহিত ৩.০
২০২৩ সালের বিশ্বকাপে প্রথম বার খেলার ধরন বদলেছিলেন রোহিত। জানিয়েছিলেন, তিনি শুরু থেকে চালিয়ে খেলবেন। করেও দেখিয়েছিলেন তা। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপ, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও তা দেখা গিয়েছে। রোহিতের এই আগ্রাসী ব্যাটিং কঠিন ম্যাচেও ভারতকে জিতিয়েছে। নিজের মাইলফলকের কথা না ভেবে খেলেছেন তিনি।
কিন্তু নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ে তাঁর খেলার ধরন আবার বদলেছে। তিনটি ম্যাচেই জড়তা দেখা গিয়েছে। আগ্রাসন উধাও। শুরুতে সময় নিচ্ছেন। বোলারের ছন্দ ঘেঁটে দেওয়ার সেই চেষ্টাই যেন নেই। তবে কি রোহিত ৩.০ তাঁকে সমস্যায় ফেলছে?
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে আউট হয়ে ফিরছেন রোহিত শর্মা। —ফাইল চিত্র।
অধিনায়কত্ব যেতেই অন্য শর্মা
২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ সালে রোহিত যখন আগ্রাসী ব্যাটিং করতেন, তখন তিনি ছিলেন দলের অধিনায়ক। কিন্তু এখন তা নন। নতুন অধিনায়ক হয়েছেন শুভমন গিল। তার পরেই ধরন বদলেছেন রোহিত। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউ জ়িল্যান্ড তিনটি সিরিজ়েই তা দেখা গিয়েছে। প্রথম ২০ বলে রোহিতের ডট বল প্রায় ৮০ শতাংশ। অধিনায়ক থাকার সময় রোহিত জানতেন, দলে তাঁর জায়গা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু অধিনায়কত্ব যেতে কি জায়গা হারানোর ভয় পাচ্ছেন রোহিত? সেই কারণেই এই বদল?
তেমনটা অবশ্য মনে করছেন না ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অরুণ লাল। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি বললেন, “সব ব্যাটারই প্রয়োজনে খেলার ধরন বদলায়। বিরাটও বদলেছে। তা হলে রোহিত বদলালে সমস্যা কোথায়? ওর হয়তো মনে হয়েছে, একটু সময় নিয়ে খেলব। বুঝতে হবে, রোহিত এখন শুধু একটা ফরম্যাট খেলছে। তাই ক্রিজ়ে যত বেশি সম্ভব সময় কাটাতে চাইছে। তাই হয়তো শুরুতে ধরে খেলছে।”
রানের খিদে কমেছে রোহিতের?
নিউ জ়িল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেটার সাইমন ডুল তেমনটাই মনে করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার মনে হয়, রান তাড়া করার সময় রোহিতের একটা লক্ষ্য থাকে। সেটা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হোক বা এক দিন। কিন্তু নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ে সেটা চোখে পড়েনি। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের এখনও অনেক দেরি। এখনও কি ওর মধ্যে রানের খিদে আছে?”
একটি সিরিজ়ে রান না পেলেও রোহিতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও জায়গা নেই বলে মনে করেন আর এক প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়। তিনি বললেন, “ফর্ম সাময়িক। কিন্তু ক্লাস চিরস্থায়ী। রোহিতের ক্লাস নিয়ে কথা হবে না। এই সিরিজ়ে ও রান পায়নি। সেটা যে কোনও ক্রিকেটারের হতে পারে। খেলতে গেলে তো আউট হবেই। তাই বলে রোহিতের রানের খিদে নেই, এই কথাটা ভুল। তিনটে ম্যাচ দেখেই গেল গেল রব তোলার কোনও মানে নেই।”
গম্ভীরের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন রোহিত!
প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর আগেই জানিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে কোহলি ও রোহিতের জায়গা পাকা নয়। বোর্ড নির্দেশ দিয়েছে, ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে যেতে হবে দুই ক্রিকেটারকে। এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট, তাঁদের দিকে সব সময় নজর রয়েছে বোর্ডের। সাময়িক খারাপ ফর্মও তাঁদের বাদ দেওয়ার কারণ হতে পারে। নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ের ব্যর্থতা কি গম্ভীরের হাতে অস্ত্র তুলে দিল?
আরও পড়ুন:
রোহিতের ‘রক্ষাকবচ’
সমালোচনা হলেও রোহিতকে এখনই ব্যর্থদের দলে ফেলে দেওয়া যায় না। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ়ে সবচেয়ে বেশি ২০২ রান করেছিলেন রোহিত। হয়েছিলেন সিরিজ়ের সেরা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৪৬ রান করেছিলেন। অর্থাৎ, এমন নয় যে, ধারাবাহিক ভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। তাই হয়তো আরও এক-দু’টি সিরিজ়ে জায়গা পাবেন। সেখানে ব্যর্থ হলে বাদ পড়ার জল্পনা আরও জোরাল হবে।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার কথা বলেছেন অরুণও। তিনি বললেন, “ভারতীয় ক্রিকেটে একটা সিস্টেম আছে। চাইলে কাউকে বাদ দেওয়া যায় না। পর্যাপ্ত কারণ থাকতে হয়। আর রোহিতের মতো ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত সহজে বোর্ড মেনে নেবে না। ধারাবাহিক ভাবে ব্যর্থ না হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
ছ’মাস বিশ্রামে কি সমস্যা বাড়বে?
আপাতত ছ’মাস এক দিনের ক্রিকেট খেলবে না ভারত। অর্থাৎ, মাঠের বাইরেই থাকতে হবে রোহিতকে। মাঝে আইপিএল খেললেও তার সঙ্গে দেশের হয়ে খেলার বিস্তর ফারাক। ফলে এই ছ’মাসে নিজেকে তৈরি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কাজটা সহজ নয়। সেটাই করতে হবে রোহিতকে।
এই বিরতি রোহিতকে সমস্যায় ফেলতে পারে বলে মনে করেন ডুল। তিনি বলেছেন, “সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ভারতের এক দিনের সিরিজ় ছ’মাস পর। একটা ফরম্যাট খেললে এটাই সমস্যা হয়। বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া যায় না। তাতে অনেক সময় ছন্দ চলে যায়।”
রোহিত শর্মা। —ফাইল চিত্র।
অভিজ্ঞ রোহিত দলের বড় সম্পদ
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি এই দলে রোহিতের আরও একটি ভূমিকা রয়েছে। মাঠে শুভমনকে সাহায্য করা। যতই তাঁকে সরিয়ে শুভমনকে অধিনায়ক করা হোক না কেন, কঠিন সময়ে রোহিতই যে ভরসা তা দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ়ে দেখা গিয়েছে। একটি ম্যাচে লোকেশ রাহুলের বদলে কার্যত অধিনায়কত্ব করেছেন রোহিতই।
বিশ্বকাপে তারুণ্যের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। এই দলে কোহলি ও রোহিতের থেকে অভিজ্ঞতা কারও বেশি নেই। তাই বিশ্বকাপে রোহিতের খেলা উচিত বলেই মনে করেন শরদিন্দু। তিনি বললেন, “রোহিত এই দলের জন্য কত কিছু করেছে। ও মাঠে থাকলে শুভমনও ভরসা পাবে। কঠিন সময়ে রোহিতের থেকে ভাল পরামর্শদাতা আর কে আছে? তাই বিশ্বকাপে ভাল খেলতে হলে রোহিতকে ভারতের লাগবেই।”
গম্ভীর ভারতীয় কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বার বার ‘ট্রানজিশন’ বা রূপান্তর দেখেছে ভারতীয় ক্রিকেট। সে লাল বলের টেস্ট হোক বা সাদা বলের এক দিন ও টি-টোয়েন্টি। পুরনোদের ফেলে তরুণদের উপরেই ভরসা দেখিয়েছেন গম্ভীর। তাঁর একের পর এক সিদ্ধান্ত অবাক করেছে। টেস্ট থেকে যে ভাবে রোহিত ও কোহলি অবসর নিয়েছেন, তা ভারতীয় ক্রিকেটে হওয়ার কথা ছিল না। অনেকে বলেন, গম্ভীরের চাপেই ছেড়েছেন দুই ক্রিকেটার। ফলে এক দিনের ক্রিকেটেও যে সেই ছবি দেখা যাবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ের পর কোহলিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। তবে রোহিতকে নিয়ে আছে। সেই প্রশ্নই উঠতে শুরু করেছে।