মাত্র আট দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত বদলে ভারতের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। কী ভাবে বরফ গলল, কী করে সম্ভব হচ্ছে ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ, তার নেপথ্য কাহিনী প্রকাশ্যে এল।
সংবাদসংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডর (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নকভি নিজেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বলেছিলেন, তাঁরা যেন একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে যেন লেখা থাকে যে, বিসিবি-ই পাক বোর্ডকে অনুরোধ করছে ভারত-ম্যাচ খেলার জন্য।
গত ১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার জানিয়ে দিয়েছিল, তারা বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটি খেলবে না। এরপর থেকে নাটক, বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ড পাকিস্তানের উপর চাপ তৈরি করে এই ম্যাচ খেলার জন্য। কারণ, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচই যদি না হয়, তা হলে আইসিসির প্রচুর টাকা ক্ষতি হবে। এবং এর ফলে সব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, যে লাভের টাকা আইসিসি বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভাগ করে দেয়, সেই অঙ্কও কমবে।
চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে পাকিস্তানের উপর। বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বোর্ডও পাকিস্তানকে চিঠি দেয়। পাক বোর্ড বুঝতে পারে, তাদের সিদ্ধান্ত বদল করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সরাসরি নিজেদের আগের অবস্থান থেকে ঘুরে গিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারত-ম্যাচ খেলতে রাজি হলে মান থাকত না। পিটিআইয়ের খবর, সেই কারণেই নকভি বাংলাদেশ বোর্ডকে বলেছিলেন, তাঁরা যেন চিঠি দিয়ে জানান যে, পাকিস্তান ভারত-ম্যাচ খেলুক। সেই চিঠিকে সামনে রেখেই নকভি দাবি করেন, একমাত্র বাংলাদেশ অনুরোধ করেছে বলেই তারা খেলতে রাজি হয়েছে।
সোমবার রাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক হয় নকভির। তার আগে রবিবার আইসিসি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক হয় নকভির। সেই বৈঠকের ব্যাপারে নকভি জানান শরিফকে। সেখানেই তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের তরফে পাকিস্তানকে অনুরোধ করা হয়েছে ভারত ম্যাচ খেলার জন্য। একই অনুরোধ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং শ্রীলঙ্কা থেকেও। এই অনুরোধের পর পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার বিবৃতি দিয়ে জানায়, ‘‘বিভিন্ন আলোচনার নির্যাস এবং বন্ধু দেশগুলির অনুরোধের পর পাকিস্তান সরকার সে দেশের ক্রিকেট দলকে ভারতের বিরুদ্ধে ‘মাঠে নামার’ নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ক্রিকেটের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা এবং সদস্য দেশগুলির মধ্যে ক্রিকেটকে আরও বেশি করে জনপ্রিয় করে তোলার কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দেশের ক্রিকেট দলকে শুভেচ্ছা জানান। তাঁর আশা, মাঠে খেলোয়াড়োচিত আচরণ বজায় রাখবেন ক্রিকেটারেরা।
ঘটনাচক্রে, সোমবার রাতে বিসিবি-র তরফেও প্রথমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক ভাবে পাকিস্তানকে ভারত-ম্যাচ খেলার অনুরোধ জানানো হয়। বাংলাদেশ বোর্ড বিবৃতিতে লেখে, “সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তাতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, আইসিসি এবং বাকি সব পক্ষের ইতিবাচক ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে চায় বিসিবি। বিশেষ করে কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন রাজা নকভি, তাঁর বোর্ড এবং পাকিস্তানের সমর্থকদের।”
বিসিবি-র বিবৃতিতে আমিনুল বলেন, “এই কঠিন সময়ে যে ভাবে নিজেদের সামর্থ্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে পাকিস্তান, তাতে আমরা গভীর ভাবে উৎসাহিত। আমাদের ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘজীবী হোক।”
তিনি আরও বলেন, “গত কাল স্বল্প সময়ে পাকিস্তানে যাওয়া এবং আলোচনা থেকে যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলার জন্য আমরা পাকিস্তানকে অনুরোধ করছি। এতে ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্রই উপকৃত হবে।”
পাকিস্তানের বিদ্রোহের কারণ ছিল, বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বহিষ্কার করা। আইসিসি-ও সোমবার রাতে বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, ‘‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে কোনও আর্থিক, ক্রীড়াভিত্তিক বা প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ দরকারে সমস্যা সমাধান কমিটির কাছে আবেদন করতে পারে। সদস্য দেশগুলির প্রতি নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি। শাস্তির বদলে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।’’
বৈঠকে হওয়া আলোচনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছর, অর্থাৎ ২০৩১-এর মধ্যে বাংলাদেশে একটি আইসিসি প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০৩১ এক দিনের বিশ্বকাপের আগেই এই প্রতিযোগিতা হবে। বড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করার জন্য বাংলাদেশ যে দক্ষ এবং সক্ষম, এ ব্যাপারে বিশ্বাস রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি।
আইসিসি-র মুখ্য কর্তা সংযোগ গুপ্ত বলেন, “টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না থাকার আক্ষেপ থেকে যাবে। তবে বাংলাদেশকে ক্রিকেটীয় দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে সরবে না আইসিসি। বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় ভাবে কাজ করে চায় আইসিসি, যাতে ভবিষ্যতে সে দেশে ক্রিকেট উন্নতি করতে পারে।”