মুস্তাফিজুর-বিতর্কে পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এক কর্তার রোষে তামিম ইকবাল। বাংলাদেশের প্রাক্তন অধিনায়ককে ‘ভারতের দালাল’ বলে সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ করেছেন বিসিবির অন্যতম পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। নতুন এই বিতর্কে তামিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ-সহ জাতীয় দলের একাধিক সদস্য। বিভক্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটমহল।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) মুস্তাফিজুরকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে লিটন দাসের দলকে ভারতে পাঠাতে রাজি নয় বিসিবি। তা নিয়ে জয় শাহের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার (আইসিসি) সঙ্গে দড়ি টানাটানি চলছে বিসিবি কর্তাদের। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতের স্বার্থে আইসিসির সঙ্গে লড়াইয়ে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তামিম। দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটমহল।
এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রাক্তন অধিনায়ক বলেছেন, বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তামিম মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিসিবির আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আইসিসির তহবিল থেকেই। তাঁর এই মতামতের পর সমাজমাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন নাজমুল। তিনি সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘‘এ বার আরও এক জন পরীক্ষিত ভারতীয় এজেন্টের আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দু’চোখ ভরে দেখল।’’ পরে তিনি দ্বিতীয় একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘‘মুস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ভারতের মাটিতে ঝুঁকিতে। মাননীয় ক্রীড়া উপদেষ্টা বিষয়টা আন্দাজ করে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করার ব্যাপারে আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন বিসিবিকে। মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টাও সমর্থন করেছেন ক্রীড়া উপদেষ্টার সিদ্ধান্তকে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের আবেগের বাইরে গিয়ে ভারতীয়দের হয়ে ব্যাট করছেন এক জন। যিনি বাংলাদেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৫ হাজারের বেশি রান করা এক কিংবদন্তি ক্রিকেটার।’’ নাজমুল আরও লিখেছেন, ‘‘এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। দয়া করে কেউ অন্য ভাবে নেবেন না।’’
বিসিবি পরিচালকের এমন পোস্ট দেখে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ। তামিমের মতো ক্রিকেটার সম্পর্কে এমন অবমাননাকর মন্তব্য তাঁরা ভাল ভাবে নিচ্ছেন না। তামিম এ ব্যাপারে মুখ না খুললেও পাশে পেয়েছেন একাধিক সতীর্থকে। বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘প্রাক্তন জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বক্তব্যে আমি হতবাক। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার সম্পর্কে বোর্ড পরিচালকের এমন শব্দচয়ন শুধু রুচিহীনই নয়, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিপন্থী।’’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘‘এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। দায়িত্বশীল একটি পদে থেকে প্রকাশ্য এ ধরনের মন্তব্য বোর্ডকর্তাদের পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও আচরণবিধি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট পরিচালককে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। তাঁকে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’’
প্রতিবাদ করেছেন তাসকিনও। বাংলাদেশে অন্যতম সেরা জোরে বোলার সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রাণ। সেই ক্রিকেটে বড় অবদান রাখা প্রাক্তন এক অধিনায়ককে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য অনেককে ভাবিয়েছে। দেশের একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার সম্পর্কে এমন মন্তব্য দেশের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক নয় বলেই মনে করি। আশা করি, সংশ্লিষ্ট জনেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবেন।’’
আরও পড়ুন:
সরব হয়েছেন বাংলাদেশের আর এক প্রাক্তন অধিনায়ক মোমিনুল হকও। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘প্রাক্তন অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের ক্রিকেটসমাজের প্রতি অপমানজনক। একজন ক্রিকেটারের প্রতি এমন আচরণ বোর্ডের দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ন্যূনতম সম্মানও দেওয়া হয়নি। বরং তাঁকে প্রকাশ্যে ইচ্ছাকৃত ভাবে অপমান করা হয়েছে। এত বড় দায়িত্বে থেকে কোথায় এবং কী ভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিষ্টাচারও এ ধরনের মন্তব্যে দেখা যায়নি। আমি এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া ও তাঁকে জবাবদিহি করতে বলার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। বিসিবিকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’’
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সংগঠনও তামিমের অপমানে ক্ষুব্ধ। তারা বিসিবিকে প্রতিবাদপত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টিকে তারা বাংলাদেশের সব ক্রিকেটারের পক্ষেই অপমানজনক হিসাবে দেখছে। বোর্ডকর্তাদের রুচি এবং আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।