Advertisement
E-Paper

দিনে ৫০০০ বল খেলে ১৯ বছরে ১২৫ শতরান, স্বচ্ছল পরিবারে জন্মেও বাঙালি অভিজ্ঞানকে রাত কাটাতে হয়েছে স্টেশনের মেঝেতে!

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে ধারাবাহিক অভিজ্ঞান কুন্ডু। এই বাঙালি ক্রিকেটারের নেপথ্যে রয়েছেন রমাকান্ত আচরেকরের ছাত্র চেতন যাদব।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৯
cricket

অভিজ্ঞান কুন্ডু। ছবি: সংগৃহীত।

ছোট্ট অভিজ্ঞান এক মিনিটও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত না। ঘরে থাকলে সারা দিন দৌড়ে বেড়াত। আর বাইরে গেলে ক্রিকেট। সকাল থেকে দুপুর পেরিয়ে কখন সন্ধ্যা হয়ে যেত, মনে থাকত না। চোখে ছিল না ঘুম। ছেলে যাতে রাতে অন্তত শান্তিতে ঘুমোয়, সেই আশায় চেতন যাদবের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবা অভিষেক। বাকিটা ইতিহাস। ১৯ বছরের মধ্যে ১২৫ শতরানের মালিক সে। চেতন বলছেন, তাঁর ছাত্র ভবিষ্যতের তারকা। কারণ, শুধু ক্রিকেট নয়, অভিজ্ঞানকে জীবনের পাঠ দিয়েছেন রমাকান্ত আচরেকরের ছাত্র চেতন।

অভিজ্ঞানকে দেখে চেতন বুঝে গিয়েছিলেন, এই ছেলেকে শুধু ক্রিকেটের টেকনিক শেখালে হবে না। তার বাইরেও অনেক কিছু শেখাতে হবে। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান অভিজ্ঞানের যাপনে কোনও সমস্যা ছিল না। তাই চেতন তাঁকে ট্রেনের অসংরক্ষিত কামরায় নিয়ে যেতেন। রাতে স্টেশনের মেঝেতে ঘুমোতে হত। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা ছেলেদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নিতে হত অভিজ্ঞানকে। ছাত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৮০ রান করে দলকে জেতানোর পর চেতন বলেন, “শুধু ক্রিকেট শেখালে হত না। ওকে জীবনের পাঠ নিতে হত। সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।”

নবি মুম্বইয়ে চেতনের অ্যাকাডেমিতে অভিজ্ঞানের সব পরিসংখ্যান রাখা আছে। পাতার পর পাতা কাগজ। সেখানে অভিজ্ঞানের প্রতিটি শতরান, অর্ধশতরানের হিসাব লেখা। শুধু তাঁর ব্যাটিংয়ের ফুটেজ রয়েছে ৬০০০ জিবি মেমরিতে। সেই ফুটেজ দেখিয়ে আজও কোচ তাঁকে বোঝান, কোথায় ভুল করেছেন তিনি। কোথায় তাঁকে আরও উন্নতি করতে হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অর্ধশতরান করেছেন অভিজ্ঞান। কিন্তু তাঁর ইনিংসে খুশি নন কোচ চেতন। তার একমাত্র কারণ, অভিজ্ঞানের স্ট্রাইক রেট। অনেক মন্থর ব্যাট করেছে সে। চেতন বলেন, “১৩ বছর বয়সে ও দুটো চারশো ও দুটো ত্রিশতরান করে ফেলেছিল। ১৪ বছরের মধ্যে ওর ১০০টা শতরান হয়ে গিয়েছিল। তাই বিশ্বকাপে ওর খেলার ধরন দেখে অবাক লাগছিল। ও এমন ব্যাটার যে ৯৪ বলে ৩২০ রান করেছে।”

cricket

কোচ চেতন যাদবের (বাঁ দিকে) সঙ্গে অভিজ্ঞান কুন্ডু। ছবি: সংগৃহীত।

গত মাসে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপেও মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ১২৫ বলে ২০৯ রান করেছিলেন অভিজ্ঞান। ছাত্রের খেলায় খুশি না হলেও তাঁর খেলার ধরনের কারণ বুঝতে পেরেছেন চেতন। তিনি বলেন, “আমার মোবাইলে ওর ১০০-র বেশি শতরান রেকর্ড করা আছে। আমার মনে হচ্ছে, ও এখন অনেক দায়িত্ব নিয়ে খেলছে। শুধু নিজের রানের কথা ভাবছে না। তবে আমি জানি, সুযোগ পেলেই নিজের স্বাভাবিক খেলা ও খেলবে।”

অভিজ্ঞানের বাবা ইঞ্জিনিয়ার। মা চিকিৎসক। চেতন জানিয়েছেন, তিনি এমন পরিবারের সন্তানদেরই কোচিং করান, যাদের বাবা-মায়েরা চাকরি করেন। তাঁর একটিই শর্ত। ছেলেদের খেলায় নাক গলানো যাবে না। অভিজ্ঞানের বাবা-মা সেটাই করেছেন। চেতন বলেন, “ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জানিয়েছিলাম, অনুশীলনে নাক গলানো যাবে না। কারণ, মুম্বইয়ে অনেক বাবা-মা সন্তানদের খেলায় নাক গলান। তাতে সমস্যা হয়।”

সচিন তেন্ডুলকরের গুরু আচরেকরের ছাত্র চেতন। তাঁর কোচিংয়ের ধরনও আচরেকরের মতো। প্রতিদিন ৫০০০ বল খেলতে হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনুশীলন চলে। অভিজ্ঞানও তাই করেছেন। তিনি বলেন, “পাঁচ বছর বয়সে প্রথম অ্যাকাডেমিতে যাই। সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনুশীলন হত। সেখানেই নিজের ফিটনেস নিয়ে খেটেছি। তাই লম্বা ইনিংস খেলতে সমস্যা হয় না।” শতরান করা জলভাতে পরিণত করেছেন অভিজ্ঞান। তিনি বলেন, “১০ বছর বয়সে প্রথম শতরান করি। এখন ১২৫টা শতরান হয়ে গিয়েছে।”

অল্প বয়সেই স্থানীয় ক্রিকেটে নজর কাড়েন অভিজ্ঞান। অবিনাশ সালভি ফাউন্ডেশনের হয়ে খেলতেন তিনি। পরে ডিওয়াই স্পোর্টস অ্যাকাডেমির হয়ে খেলা শুরু করেন। দক্ষিণ মুম্বইয়ে স্কুল বদলের পর তাঁর স্কুল ক্রিকেটের কেরিয়ারও ভাল হয়। স্কুল ক্রিকেট খেলতে গিয়েই ভারতের প্রাক্তন পেসার আবে কুরুভিল্লার চোখে পড়েন অভিজ্ঞান। ১৩ বছরের মধ্যে প্রায় ২৯,০০০ রান করে ফেলেছিলেন অভিজ্ঞান। তার মধ্যে ২৭ শতরান ও ১২৭ অর্ধশতরান ছিল। দু’বার ৪০০, দু’বার ৩০০ ও ন’বার ২০০-র বেশি রান করেন তিনি।

অভিজ্ঞানের এই রানের খিদে মুগ্ধ করে চেতনকে। তিনি বলেন, “ওর রানের খিদে মারাত্মক। সারা দিন ধরে ব্যাট করতে পারে। ওর সবচেয়ে ভাল বিষয় হল, ১০০, ২০০ বা ৩০০ রানই করুক না কেন, কখনও নিজেকে জাহির করে না। শুধু মন দিয়ে ব্যাট করে। এক বার ক্লাব ক্রিকেটে আমার সঙ্গে অভিজ্ঞান ওপেন করেছিল। ওর চেয়ে বয়সে অনেক বড় বোলারদের সামনেও ভয় পায়নি। সে দিনই বুঝেছিলাম, ও অনেক দূর যাবে।”

ধারাবাহিকতার কারণে মুম্বইয়ের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট খেলেছেন অভিজ্ঞান। এখন ভারতের ছোটদের দলে নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার তিনি। পাশাপাশি দলের উইকেটরক্ষকও তিনি। চেতন বলেন, “আমার কাছে আসার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ৭২২ ম্যাচ খেলেছে অভিজ্ঞান। তার মধ্যে ৬০০ ম্যাচে ও কিপিংও করেছে। এক থেকেই বোঝা যায়, ওর শারীরিক ক্ষমতা কতটা। এ ভাবেই ওকে তৈরি করেছি।”

ছেলের খেলা নিয়ে কোনও দিন নাক না গলালেও অভিজ্ঞানের বাবা-মায়ের একমাত্র চিন্তা তাঁর পড়াশোনা নিয়ে। খেলা নিয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখাপড়ায় ফাঁকি দেননি তিনি। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পেয়েছেন ৮২ শতাংশ নম্বর। এখন বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছেন তিনি। বিশ্বকাপের মাঝেও সুযোগ পেলে পড়াশোনা করছেন। কারণ, পরের মাসেই তাঁর দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা। ছাত্র যে সেখানেও ভাল নম্বর পাবে তা জানেন চেতন। তিনি বলেন, “ওর বাবা-মা ছেলের পড়াশোনা নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান কঠিন। কিন্তু আমি জানি ও ভাল করবে।”

এখনও কেরিয়ার শুরুই হয়নি অভিজ্ঞানের। যাত্রা অনেক বাকি। সেটা জানেন চেতন। কিন্তু ছাত্রের প্রতি তাঁর বিশ্বাস রয়েছে। কারণ, অভিজ্ঞানকে শুধু ক্রিকেটের পাঠ তিনি দেননি। দিয়েছেন জীবনের পাঠ।

Abhigyan Kundu India Under 19 India Cricket
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy