আবার সরাসরি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও পাকিস্তানের মন্ত্রী তথা সে দেশের ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভিকে নিশানা করেছেন ইমরান খান। ২০২৩ সাল থেকে জেলবন্দি ইমরান। জেলেই তাঁকে মারার ছক কষেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির, এমনটাই অভিযোগ পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর। ইমরানের বোনেদের অভিযোগ, তাঁদের লাগাতার হুমকি দিচ্ছেন নকভি।
জেলবন্দি ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁর পরিবার। ইমরানের দুই বোন উজ়মা খান ও আলিমা খানকে জেলে গিয়ে দাদার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। একটি সাংবাদিক বৈঠকে খুনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। উজ়মা বলেন, “দাদা কয়েক দিন আগেই আমাদের বলেছে, ‘এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে খুনের ছক কষাও হয়ে গিয়েছে।’” উজ়মার অভিযোগ, পাকিস্তানে বিরোধীদের সঙ্গে কী হবে, তার সব সিদ্ধান্ত মুনির নিচ্ছেন। তাঁকে মদত দিচ্ছেন নকভি।
উজ়মা জানিয়েছেন, জেল থেকে ইমরান তাঁদের বার্তা পাঠিয়েছেন যে, তাঁর শরীর ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের জেলে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাঁর। প্রকাশ্যে এই বিষয়ে কথা বলায় নকভি তাঁদের ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন উজ়মা। যদিও নকভি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এর মাঝেই ইমরানের একটি পুরনো ভিডিয়ো সামনে এসেছে। সেখানে মুনিরকে ‘চোর’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। গত বছর এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ভারত তাঁর হাত থেকে ট্রফি নিতে না চাওয়ায় নকভি ট্রফি নিয়ে হোটেলে চলে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। তার পরেই একটি ভিডিয়োবার্তা দিয়েছিলেন ইমরান। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানের ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন নকভি। ও অবশ্য এটা নতুন করছে না। ২০০৮ সালে উনি প্রচুর টাকা চুরি করেছিল। সেই চুরি ধামাচাপা দিতে ন্যাব (ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো)-কে ৩৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন। তাতে উনি বেঁচে যান। চুরির অভ্যাস ওঁর অনেক দিনের।” পাকিস্তানের ক্রিকেটের ‘কপ্তান’ আরও অভিযোগ করেন, “শুধু ক্রিকেট নয়, সেই সঙ্গে আমার দলকেও একটু একটু করে শেষ করে দিয়েছেন নকভি। আর সেটা উনি করেছেন মুনিরের নির্দেশে।”
২০২৩ সালের অগস্ট মাস থেকে আদিয়ালা জেলে বন্দি পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ইমরান। গত বছরের ২৪ মার্চ ইসলামাবাদ হাই কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, সপ্তাহে দু’দিন জেলে গিয়ে ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। ইমরানের বোন আলিমার অভিযোগ, হাই কোর্টের ওই নির্দেশের পরেও পরিবারের কাউকে ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। আদিয়ালা জেলের সুপারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ জানিয়েছেন ইমরানের বোন। ইসলামাবাদ হাই কোর্টে সেই আবেদন বিবেচনাধীন। তার মধ্যেই চোখের সমস্যায় ভুগছেন ‘কপ্তান’।
ইমরানের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন পাক সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত প্রতিনিধিরা। তাঁরা জানান, প্রাক্তন পাক ক্রিকেট অধিনায়কের ডান চোখে আর মাত্র ১৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি অবশিষ্ট রয়েছে। আদালতের নির্দেশে ইমরানের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সোমবারই পাক সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যেরা রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে গিয়ে ৭৩ বছরের ইমরানের সঙ্গে দেখা করেন। এর আগে গত রবিবার তাঁর চোখের কিছু পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ইমরানের চোখের অবস্থার উন্নতির কথা জানান চিকিৎসকেরা।
সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইমরানের চোখের অবস্থা আগের তুলনায় ভাল আছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত রবিবার পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স-এর চিকিৎসক মহম্মদ আরিফ খান এবং আল-শিফা ট্রাস্ট আই হাসপাতালের চিকিৎসক নাদিম কুরেশি আদিয়ালা জেলে গিয়ে ইমরানকে পরীক্ষা করেন।
রিপোর্টে বলা আছে, চশমা ছাড়া ইমরানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ছিল ৬/২৪ (আংশিক) এবং বাঁ চোখের ৬/৯। তবে চশমা ব্যবহারের পর তা উন্নত হয়ে যথাক্রমে ৬/৯ (আংশিক) এবং ৬/৬-এ দাঁড়িয়েছে। আরও বলা আছে, ইমরানের ডান চোখের রেটিনার নীচের অংশের ফোলাভাব ৫৫০ মাইক্রন থেকে কমে ৩৫০ মাইক্রন হয়েছে, যা মেডিক্যাল বোর্ড একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসাবে দেখছে। চিকিৎসকেরা তাঁকে নির্দিষ্ট ‘আইড্রপ’ ব্যবহার করতে বলেছেন। তা ছাড়া আরও দু’টি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
জানা গিয়েছে, ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আসিম ইউসুফ এবং খুরম মির্জাকে গোটা বিষয়টি ফোনে জানানো হয়েছে। বাকি দুই চিকিৎসকের সঙ্গে ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। আসিমের দাবি, ইমরানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত। পাশাপাশি জানান, তাঁকে এবং ফয়সাল সুলতানকে ইমরানের শারীরিক পরীক্ষার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এই উন্নতির বিষয়টি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারছেন না।
এই পরিস্থিতিতে জেলবন্দি ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন বিভিন্ন দেশের ১৪ প্রাক্তন অধিনায়ক। শাহবাজ় শরিফ সরকারকে চিঠি লিখেছেন তাঁরা। সেই তালিকায় রয়েছেন, সুনীল গাওস্কর, কপিল দেব, গ্রেগ চ্যাপেল, মাইকেল আথারটন, অ্যালান বর্ডার, মাইক ব্রিয়ারলি, ইয়ান চ্যাপেল, বেলিন্ডা ক্লার্ক, ডেভিড গাওয়ার, কিম হিউজ, নাসের হুসেন, ক্লাইভ লয়েড, স্টিভ ওয় ও জন রাইট। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইমরানের বিরুদ্ধে খেলেছেন। কিন্তু কঠিন সময়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের পাশে তাঁরা।
চিঠিতে গাওস্করেরা লিখেছেন, “পাকিস্তানের প্রাক্তন অধিনায়ক, কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। ক্রিকেট ওঁর অবদান অপরিসীম। অধিনায়ক হিসাবে উনি পাকিস্তানকে ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। আমাদের মধ্যে অনেকেই ইমরানের বিরুদ্ধে খেলেছি। কিন্তু ওঁর প্রতিভা, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। বিশ্বক্রিকেটের সেরা অলরাউন্ডারদের মধ্যে ইমরান একজন। ক্রিকেটের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও উনি সামলেছেন। তাঁর রাজনৈতিক মনোভাব যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে উনি বড় নাম।”
২০২৩ সাল থেকে পাকিস্তানের জেলে বন্দি রয়েছেন ইমরান। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। জেলে থাকাকালীন ইমরানের শরীর খারাপের খবর বাইরে এসেছে। সেই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রাক্তন ক্রিকেটারেরা লিখেছেন, “গত আড়াই বছর ধরে জেলে থাকাকালীন ইমরানের শরীর খারাপের খবর সামনে এসেছে। বিশেষ করে ওঁর দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার খবর পেয়েছি। আমরা মনে করি, ইমরানের মতো এক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রেখে আচরণ করা হোক।” চিঠিতে আরও লেখা, “আমরা পাকিস্তানের সরকারকে অনুরোধ করছি, ইমরানকে দ্রুত ও যথোপযুক্ত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হোক। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুক প্রশাসন। ওঁর সঙ্গে নিয়মিত পরিবারকে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হোক। ওঁর শারীরিক অবস্থার কথা প্রতিনিয়ত সকলকে জানানো হোক।” গাওস্করদের এই চিঠি নিয়ে অবশ্য পাকিস্তান সরকার এখনও কিছু জানায়নি।