কোচিং জীবনে তাঁদের সেরা ছাত্রের নাম মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। এক জন ছবি দেখে খুব খুশি। অন্য জন কিছুটা বিষণ্ণ। এক জনের মতে, ধোনির স্কুল জীবনকে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অন্য জন জানালেন, ধোনির বায়োপিকে অনেক কিছুই যেন ‘আনটোল্ড’ থেকে গেল। তাঁরা— ধোনির স্কুল জীবনের দুই ক্রিকেট কোচ কেশব বন্দ্যোপাধ্যায় ও চঞ্চল ভট্টাচার্য।
দু’জনেই বাঙালি এবং রাঁচির বাসিন্দা। কেশববাবু ছিলেন ধোনির স্কুল জেভিএম শ্যামলীর স্পোর্টস টিচার। চঞ্চলবাবু ওই স্কুলেই ক্রিকেট কোচিং করাতে আসতেন। রাঁচির মাল্টিপ্লেক্সে ধোনির বায়োপিক দেখতে এসে দু’জনেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন।
পর্দায় দেখানো হচ্ছিল স্কুলছাত্র ধোনিকে প্র্যাকটিসে ব্যাট করতে না দিয়ে বারবার কিপিং করতে বলছেন কোচ কেশবববাবু। ম্যাচে ধোনিকে সাতে বা আটে নামাচ্ছেন বলে বেশির ভাগ ম্যাচেই ধোনি ব্যাট করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এই দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে কেশববাবুর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘‘সত্যিই বুঝতে পারিনি ধোনির ব্যাটে এমন আগুন রয়েছে। ও ব্যাট করতে চাইলে রেগে যেতাম।’’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘‘গোলকিপার ধোনিকে আমি যে ভাবে ক্রিকেটে নিয়ে এলাম, সেই জায়গাটা হুবহু ফুটিয়ে তুলেছে। মনে হচ্ছে এই তো সে দিনের ঘটনা। মাহি এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল?’’
চঞ্চলবাবুর মতে সেই সময়ে ধোনির বেশ কয়েক জন সহ খেলোয়াড়ও খুব ভাল খেলছিল। তাদেরও সিনেমায় আনা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘‘ধোনির সঙ্গে সাবির আলি নামে রাঁচির একটা ছেলে খেলত। ধোনির থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। স্কুলের একটা ম্যাচে ধোনি-সাবির ৩১৭ রানের পার্টনারশিপ করে। ওদের মধ্যে একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার টক্করটা ছিল দেখার মতো। সেটা দেখালে ছবিটা আরও জমত।’’
পর্দায় দেখানো হয়েছে ইস্ট জোনের আগরতলার ম্যাচে ধোনি আগরতলা পৌঁছতেই পারেননি। দমদম বিমানবন্দরে দেরিতে পৌঁছনোয়। চঞ্চলবাবু জানান, বাস্তবে কিন্তু ধোনি আগরতলায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু টিমে সুযোগ পাননি। কারণ তখন দীপ দাশগুপ্ত এত ভাল কিপিং করছিলেন যে ধোনির সুযোগ হয়নি।
দুই কোচেরই মতে, বায়োপিকে দেখানো উচিত ছিল সেই সময়ের ইস্ট জোনের কোচ কার্সন ঘাউড়িকে। দেওধর ট্রফির সেন্ট্রাল জোন বনাম ইস্ট জোন ম্যাচে ধোনি করেছিলেন ১১৪। যে ম্যাচটা তাঁর কেরিয়ারে খুব গুরুত্বপূর্ণ। চঞ্চলবাবু বলেন, ‘‘সেই সময় কার্সন ঘাউড়ি ধোনি সম্পর্কে বলেছিলেন, এই ছেলেটা লম্বা রেসের ঘোড়া। এই সার্টিফিকেট ধোনির কেরিয়ার অনেকটা এগিয়ে দেয়।’’
ছবিতে কেশববাবুর সঙ্গে ধোনির নানা টুকরো টুকরো ঘটনা দেখানো হয়েছে। সেই জায়গায় চঞ্চলবাবু ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন অনেকটাই। তাই হয়তো তিনি কিছুটা বিষণ্ণ। চঞ্চলবাবু জানান, তাঁর বুলেটেই ধোনির বাইক চালানো শেখা। তার পর নিজে বুলেট কিনে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যান রাঁচির দেউরি মন্দিরে।’’
বায়োপিকে নেই ধোনির দাদা নরেন্দ্র সিংহ ধোনি। কেন তাঁকে দেখানো হল না, এই নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও ঘনিষ্ঠমহলে নরেন্দ্র জানিয়েছেন, ধোনির চেয়ে তিনি দশ বছরের বড়। ভাইয়ের বড় হওয়ার সময়টায় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। ধোনি যখন স্কুল ক্রিকেট খেলছেন, তখন তিনি স্কুল জীবন শেষ করে ফেলেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়া।
তবে এ সব বিতর্ক সরিয়ে রেখে ধোনির বায়োপিক কিন্তু রাঁচির মাল্টিপ্লেক্সে একের পর এক ছক্কা মেরেই যাচ্ছে। শুধু রাঁচির আমজনতাই নয়, শুক্রবার ছবি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে ধোনির স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে ছবি দেখতে আসছে। ধোনির এক একটা হেলিকপ্টার শট দেখে যে ভাবে হাততালিতে ফেটে পড়ছে ওরা মনে হচ্ছে যেন সিনেমা হলে নয়, মাঠে খেলা হচ্ছে।
দশম শ্রেণির এক ছাত্র রবীন্দ্র যাদব তো বলেই ফেলল, ‘‘এই নিয়ে সিনেমাটা তিন বার দেখা হয়ে গেল। সিনেমায় দেখাচ্ছে ধোনি তার এক বন্ধুকে শিঙাড়া খাইয়ে হেলিকপ্টার শট শিখেছেন। আর আমি ধোনির বায়োপিকটা বারবার দেখে হেলিকপ্টার শট শেখার চেষ্টা করছি। দেখি শিখতে পারি কি না!’’