E-Paper

গৃহযুদ্ধের মধ্যেই সাম্রাজ্য রক্ষার লড়াই রোনাল্ডোর

এই গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ডিআর কঙ্গো ম্যাচের পরে সংবাদিক সম্মেলনে আসা জোয়াও নেভেসের একটি মন্তব্য থেকে।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৬:৪০
সঙ্কট: ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন রোনাল্ডো? ফ্লরিডায় অনুশীলনে।

সঙ্কট: ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন রোনাল্ডো? ফ্লরিডায় অনুশীলনে। ছবি: রয়টার্স।

মঙ্গলবার বিশ্বকাপের ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর প্রতিপক্ষ কে? উজ়বেকিস্তান নাকি তাঁর নিজেরদল পর্তুগাল?

দেখেশুনে মনে হবে পরেরটাই। বিশ্বকাপে মাত্র একটা ম্যাচে তাঁর ব্যর্থতার পরে যে রকম তোলপাড় চলছে, তা আর কাউকে নিয়ে হচ্ছে না। বিশেষ করে সমাজমাধ্যমে যে রকম ঝড় উঠেছে, নজিরবিহীন। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ঝামেলা তো লেগেই গিয়েছে। একদিকে ক্রিশ্চিয়ানো ভক্তরা, অন্যদিকে তাঁর বিরোধীরা। কিন্তু পর্তুগাল দলের জন্য সব চেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, কার্যত গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছে সি আর সেভেনকে নিয়ে এবং এমনকি ফুটবলারদের পরিবার, স্ত্রী, বান্ধবীরাও তাতে জড়িয়ে পড়েছেন।

এই গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ডিআর কঙ্গো ম্যাচের পরে সংবাদিক সম্মেলনে আসা জোয়াও নেভেসের একটি মন্তব্য থেকে। এক সাংবাদিক নেভেসকে প্রশ্ন করেন, ‘‘এই পর্তুগাল দল খুব প্রতিভাবান। অনেক ভাল ফুটবলার রয়েছে। আবার এটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর শেষ বিশ্বকাপ। কী ভাবে সব কিছু সামলাচ্ছেন আপনারা?’’ যাঁর গোলে পর্তুগাল সে দিন আরও বড় বিপর্যয় ঠেকাতে পেরেছিল, সেই নেভেস জবাব দেন, ‘‘আমরা সকলে জানি পর্তুগালের এবং বিশ্ব ফুটবলে ক্রিশ্চিয়ানোর কী অবদান। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, ক্রিশ্চিয়ানো বাকি সকলের মতোই দলের আর এক জন সদস্য। অন্য কারও চেয়ে ও আলাদা কেউ নয় এবং বাকিরা যেমন এই বিশ্বকাপে দলের প্রতি অবদান রাখার চেষ্টা করছে, তেমনই ক্রিশ্চিয়ানোওনিশ্চয়ই করবে।’’

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এসে ব্যক্তির উর্দ্ধে দলকে রাখার এই বার্তা অনেকেই দেন। আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনিকে সাংবাদিক সম্মেলনে মেসিকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখান না। মেসির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখিয়েও ধরিয়ে দেন, ফুটবল দলগত খেলা। আরও অনেকের নাম তিনি করেন, বোঝানোর চেষ্টা করেন বাকিদেরও ভুলে যাবেন না। কার্লো আনচেলোত্তি কি নেমারের নাম শুনে লাফালাফি করেন? একদমই করেন না। বরং বিশ্বকাপে দল ঘোষণার দিন, যখন তিনি নেমারের নাম উচ্চারণ করলেন আর সারা ব্রাজ়িল উৎসব শুরু করে দিল, তখনও আনচেলোত্তি বলেছেন, ‘‘নেমার বাকিদের মতোই দলের আর এক ফুটবলার। ওকে লড়াই করে প্রথম একাদশে জায়গা করে নিতে হবে।’’ সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে নেভেসের মন্তব্যের মধ্যে রোনাল্ডোর প্রতি কোনও খোঁচা ছিল না। কিন্তু সমাজমাধ্যমে ঝড় তুলে রোনাল্ডো ভক্তরা তাঁকে তীব্র আক্রমণ করতে শুরু করেন। তাঁরা নেভেসের মন্তব্যের ব্যাখ্যা করতে থাকেন যে, তিনি রোনাল্ডোকে ‘অতি সাধারণ’ ফুটবলার হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

নেভেসের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে সেই সাংবাদিক সম্মেলনের কিছু ছবি দেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে তীব্র আক্রমণ করে মন্তব্য করতে থাকেন রোনাল্ডো-ভক্তরা। পর্তুগালের আরও কয়েকজন ফুটবলার সমাজমাধ্যমে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ডিআর কঙ্গো ম্যাচের পরে রোনাল্ডোকে নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠে পড়ে যে, ফুটবলকে আর দেওয়ার মতো কিছু আর সি আর সেভেনের মধ্যে অবশিষ্ট আছে কি না। ইংল্যান্ডের সংবাদপত্র ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ সেই ম্যাচের শিরোনাম দেয়, ‘টেন ফুটবলার অ্যান্ড ওয়ান স্ট্যাচু’। অর্থাৎ পর্তুগাল দল যেন দশ জন ফুটবলারে খেলল আর এক জন শুধুই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। থিয়েরি অঁরি কার্যত রোনাল্ডোকে ‘স্বার্থপর’ আখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করলেন, ‘‘তোমার গোল করাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, দলের গোল করাটা গুরুত্বপূর্ণ।’’ অর্থাৎ, তুমি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বল ধরে নিজের কেরামতি দেখানোর চেষ্টা না করে পাস বাড়াও, তাতেই দলের উপকার হবে। অঁরি যখন খেলেছেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ছিল না। এখন আছে। বিশেষ করে তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে মত প্রকাশের পরে তাঁর ফ্যান ব্রিগেড ঠ্যাঙারে বাহিনীর মতো এমন হা রে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে যে, পালিয়ে কুল পাওয়া যাবে না। ভারতীয় ক্রিকেটে বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাকে নিয়ে যেমন হয়। ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার্সের সংখ্যায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এক নম্বরে। তাঁর ভক্তরা পাল্টা প্রচার করতে থাকেন যে, রোনাল্ডোকে যথেষ্ট বলই বাড়ানো হয়নি সেই ডিআর কঙ্গো ম্যাচে। ম্যাচের ছোট ছোট অংশ তুলে ধরে দেখানোর চেষ্টা হয়, তিনি ফাঁকায় দাঁড়িয়ে বারবার বল চাইছেন কিন্তু সতীর্থরা তাঁকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে হয় নিজেরা বল নিয়ে এগনোর চেষ্টা করছেন নয়তো অন্য কাউকে পাস বাড়িয়ে দিচ্ছেন। রোনাল্ডো ফ্যান ব্রিগেড পাল্টা হুঙ্কার দিতে থাকে— ‘‘ওহে নেভেস, ওহে ব্রুনো ফার্নান্দেস, তোমরা ক্রিশ্চিয়ানোকে বলটা বাড়াও। এত বড় এক জন ফুটবলার এমনি এমনি হয় না। তাঁকে সম্মান জানাতে শেখো। তাতেই পর্তুগালের মঙ্গল।’’

বাগ্‌যুদ্ধ এখানে থেমে থাকলে ঠিক ছিল। কিন্তু খুব তিক্ত হয়ে ওঠে যখন এর মধ্যে নেভেস এবং রোনাল্ডোর পরিবার জড়িয়ে পড়ে। নেভেসের পার্টনার, পর্তুগালের অভিনেত্রী ম্যাডালেনা আরাগাও একটি ছবি দেন তাঁর এবং নেভেসের। ব্যস, সেখানে তাঁকে লক্ষ্য করেও আপত্তিকর মন্তব্য করতে থাকেন রোনাল্ডো-ভক্তরা। ম্যাডালেনাকে বাধ্য হয়ে ‘প্রাইভেসি সেটিং’ পাল্টে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয় যাতে জনতা সেখানে মন্তব্য করতে না পারে। এর পরে ম্যাডালেনার নামে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেখান থেকে একটি মন্তব্য তুলে দেওয়া হয়। তাতে নাকি নেভেসের পার্টনার লিখেছেন, ‘‘তোমাদের গোটকে এ বার অবসর নিতে বলো।’’

এ বার আসরে প্রবেশ রোনাল্ডোর পার্টনার জর্জিনা রদ্রিগেসের। এই মন্তব্য আসল ধরে নিয়ে তার স্ক্রিনশট তুলে দিয়ে জর্জিনা পাল্টা লেখেন, ‘‘বাহ্‌, বাহ্‌। দেখো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী শিক্ষা দিয়ে বড় করা হয়েছে।’’ কেউ নিশ্চয়ই জর্জিনাকে জানায় যে, ম্যাডালেনা সত্যিই এমন কিছু লেখেননি। ভুয়ো অ্যাকাউন্ট থেকে এ সব ছড়ানো হচ্ছে। জর্জিনা দ্রুত তাঁর মন্তব্য মুছে ফেলেন। কিন্তু তত ক্ষণে অনেকে তা দেখে ফেলেছে এবং সারা ফুটবলবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে যে, পর্তুগাল শিবিরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে এবং তার কেন্দ্রে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ক’দিন আগেও যিনি ছিলেন দলের ত্রাতা, উদ্ধারকর্তা, মহানায়ক তিনিই এখন পর্তুগাল ফুটবলে কুরুক্ষেত্রের দামামা বাজিয়ে দেওয়ার কারণ হয়ে উঠেছেন।

আর অদৃষ্টের এমনই খেলা যে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিয়োনেল মেসি যখন বিশ্বকাপে উড়ছেন তখন তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এতকাল ধরে এত লড়াই, পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, অধ্যবসায় দিয়ে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য লড়াই করছেন। মঙ্গলবার হিউস্টনে ফুটবল ম্যাচ নয়, তাঁর জন্য জীবনযুদ্ধের লড়াই। পর্তুগালের জন্য পরিবার রক্ষার লড়াই! ফুটবল— যেমন রাজা বানাতে পারে তেমন ফকিরও করে দিয়েযেতে পারে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Portugal Cristiano Ronaldo Uzbekistan

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy