বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে। তিনি ঘটনাচক্রে বাংলার ফুটবল সংস্থা আইএফএ-র সহ-সভাপতিও। স্বরূপ গ্রেফতার হওয়ার পরেই তাঁর এবং অরূপের বিভিন্ন দুর্নীতিমূলক কাজকর্ম নিয়ে সরব হলেন আইএফএ সচিব অনির্বাণ দত্ত। তাঁর দাবি, জোর করে বৈঠক ভেস্তে দেওয়া, স্পনসর আসতে না দেওয়া, এমনকি যুবভারতীর জেনারেটর নিয়েও সিন্ডিকেটবাজি করা হয়েছে।
আনন্দবাজার ডট কম-কে অনির্বাণ বললেন, “সল্টলেক স্টেডিয়ামে যারাই খেলা আয়োজন করে, তাদের জেনারেটর ভাড়া নিতে হয়। অথচ সরকারের চারটে জেনারেটর রয়েছে। তবু সেগুলো ব্যবহার করা হয় না। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী এবং স্বরূপের চেনাজানা লোকের থেকে সেটা ভাড়া নিতে হত। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, আইএফএ— সবাইকে একই কাজ করতে হয়েছে। বাইরে থেকে কাউকে ডেকে আনা সম্ভব ছিল না। কারণ ওঁদের লোক পুরো সেট-আপ জানত।”
২০২৩ সালে অনির্বাণ সচিব নির্বাচিত হওয়ার সময় স্বরূপও সহ-সভাপতি হয়েছিলেন। শোনা যায়, তাতেও প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীর চাপ ছিল। অনির্বাণ বললেন, “এটা মানতেই হবে যে, সরকার ছাড়া বাংলায় খেলাধুলো চালানো সম্ভব নয়। একটা ম্যাচ করতে হলেও স্টেডিয়াম লাগবে। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীর ‘অনুরোধ’ সেই সময়ে রাখা হয়েছিল। উনি বলেছিলেন, আমার ভাই কেন থাকতে পারবে না? ওকেও রাখতে হবে।”
স্বরূপ নিজে থেকে কলকাঠি নাড়তেন না। পুরো ব্যাপারটিই করতেন আইএফএ-র গভর্নিং বডিতে থাকা স্বরূপের ‘কাছের লোকেরা’। অনির্বাণ নাম করে তাঁদের ভূমিকার তুলোধনা করলেন। বললেছন, “স্বরূপের সঙ্গে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা দিনের পর দিন আইএফএ-কে বিরক্ত করেছেন। রবীন ঘোষ, নজরুল ইসলাম, সৌরভ পালেরা লাগাতার আইএফএ-কে অকারণে চিঠি দিয়েছেন, মামলা করেছেন। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছেন গভর্নিং বডির বৈঠকে।”
অনির্বাণের সংযোজন, “শেষ বৈঠকেই সিএমএস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কোনও ভাবে সব তথ্য মুছে গিয়েছিল। আমরা সব তথ্য ফেডারেশনকে জানিয়েছিলাম এবং তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেটাই গভর্নিং বডিকে বলছিলাম। হঠাৎ ওঁদের তিন জন প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করে ঝামেলা শুরু করে দিয়েছিলেন। বলছিলেন, ‘আমরা এ সব আলোচনা করতে দেব না’। বাকিরা জানতে চাইছিলেন। তখনও ওঁরা ঝামেলা করে যাচ্ছিলেন। বৈঠক বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কোনও মতে বাকিরা ওঁদের থামিয়েছিলেন।”
আইএফএ সচিবের দাবি, তিনি দায়িত্বে আসার পর প্রথম থেকে এতটা অসহযোগিতা ছিল না। আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে। অনির্বাণের দাবি, “প্রথমে হয়তো ওঁদের ধারণা হয়েছিল যে, আইএফএ-তে আমি হাতের পুতুল হয়ে থাকব। ওঁরা ইচ্ছেমতো দাপাদাপি করবেন। যখন দেখলেন সেটা হচ্ছে না, তখন ঝামেলা করা শুরু করলেন। প্রথম বছর থেকেই ঝামেলা শুরু হয়েছিল। আইএফএ-র ঘরে বসে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ওঁরা। অতীতে এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কখনও এমন ঘটেনি। স্পনসর সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্রীড়ামন্ত্রী সব জানতেন। কিছু সুবিধা হয়নি। ছ’জন ভূমিপুত্র খেলানোর সিদ্ধান্ত প্রায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোচেস কমিটির বৈঠকে ওঁদের প্রতিনিধিরা বলেছেন, বিশেষ এক জনকেই কোচ করতে হবে। তা হলে কোচেস কমিটির ভূমিকা কী?”
অনির্বাণ দত্ত।
এতই যখন অভিযোগ, তা হলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানাননি কেন? অনির্বাণের জবাব, “মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যত বার দেখা হয়েছে তা আনুষ্ঠানিক। সেখানে দাঁড়িয়ে কি ক্রীড়ামন্ত্রীর নামে অভিযোগ জানানো ঠিক? ওটা অশোভনীয়। অভিযোগ করলে ক্রীড়ামন্ত্রী নিশ্চয়ই জানতে পারতেন। তার প্রভাব পড়ত আইএফএ-র কাজকর্মে। কোনও ক্রীড়া প্রশাসন সরকার ছাড়া চলতে পারে না। পুলিশ থেকে স্টেডিয়াম, সব ক্ষেত্রে ওদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। লিয়োনেল মেসি আসার দিনে তো পুলিশের জন্যই মাঠে অত লোক ঢুকেছিল।”
স্বরূপ গ্রেফতার হওয়ার পর কি তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে? অনির্বাণ জানালেন, এত দ্রুত সব হওয়া সম্ভব নয়। আইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অনির্বাণের কথায়, “দু’দিন আগে এআইএফএফ-এর খসড়া সংবিধান এসেছে। যখন সেটা প্রযোজ্য হবে তখন আমরাও সেটা চালু করে দিয়ে নির্বাচন করতে পারব। এক বার আইন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করব। দ্রুত বৈঠক ডাকা হবে। তার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমাদের সংবিধানে পদাধিকারীকে সরানোর ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। আইন কমিটি যা মত দেবে সেই ভাবে এগোনো হবে।”
আরও পড়ুন:
রাজ্যে নতুন সরকার আসায় তারা খেলাধুলোর দিকে নজর দেবে বলে অনির্বাণ আশাবাদী। তিনি বলেছেন, “ক্রীড়ামন্ত্রীর (নিশীথ প্রামাণিক) সঙ্গে এখনও দেখা হয়নি। অ্যাপয়েনমেন্ট চেয়ে চিঠি দিয়েছি। আশা করি খেলাধুলোর দিকে আরও নজর দেওয়া হবে। আমি আশাবাদী, ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ওঁদের জানাব নিজেদের চিন্তাভাবনার কথা। ওঁদের ভাবনাও জানার চেষ্টা করব। আমরা ক্রীড়ামন্ত্রীর সাহায্য চাইব যাতে বাংলার ফুটবলকে আরও এগোনো যায়।”