Advertisement
E-Paper

জোড়া গোল করতেই স্কুটার

বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি ছিলেন আতঙ্ক। অথচ ফুটবল জীবনে ডার্বির আগে আশ্চর্য রকম উদ্বেগহীন থাকতেন আই এম বিজয়নআমি বুঝতে পারতাম না, আলাদা করে কী ভাবব? তখন কেউ কেউ শোনাল, ডার্বির আগে তাদের প্রস্তুতির কথা। কেউ ম্যাচের আগে ধ্যান করত। কেউ অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে থাকত।

শেষ আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ ২২:২৯
আকর্ষণ: মোহনবাগান মাঠে অনুশীলনের ফাঁকে কোচ অমল দত্তের সঙ্গে চিমা ও বিজয়ন (ডান দিকে)। ফাইল চিত্র

আকর্ষণ: মোহনবাগান মাঠে অনুশীলনের ফাঁকে কোচ অমল দত্তের সঙ্গে চিমা ও বিজয়ন (ডান দিকে)। ফাইল চিত্র

যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বসে ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান আই লিগের ডার্বি দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কাজের চাপে এই মুহূর্তে কেরলের বাইরে যাওয়া অসম্ভব।
কলকাতা থেকে এত দূরে থাকলেও ডার্বির উত্তেজনা অনুভব করছি। সেই সঙ্গে মনে ভিড় করে আসছে অতীতের স্মৃতি। কলকাতায় খেলতে যাওয়ার আগে শুনেছিলাম, দুই প্রধানের কাছেই ডার্বি মর্যাদার লড়াই। কিন্তু একটা ম্যাচকে কেন্দ্র করে পুরো আবহটাই বদলে যেতে পারে, তার কোনও ধারণা ছিল না। ম্যাচের কয়েক দিন আগে থেকেই দেখতাম, কলকাতার ফুটবলারদের শরীরী ভাষাই বদলে গিয়েছে। সর্বত্র থমথমে একটা পরিবেশ। আমি খুবই খোলামেলা মনের ছেলে। কোনও কিছুতেই ভয় পাই না। ড্রেসিংরুমে বরাবরই মজা করতাম অন্যদের সঙ্গে। সকলেই তা দারুণ উপভোগ করত। তারাই ডার্বির আগে অদ্ভুত ভাবে বদলে যেত। দেখতাম, কারও মুখে হাসি নেই। প্রত্যেকেই যেন যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। আমাকে বলত, ‘‘ম্যাচটা নিয়ে ভাবো। মনঃসংযোগ করো। এই ম্যাচ কিন্তু জীবন বদলে দেয়।’’
আমি বুঝতে পারতাম না, আলাদা করে কী ভাবব? তখন কেউ কেউ শোনাল, ডার্বির আগে তাদের প্রস্তুতির কথা। কেউ ম্যাচের আগে ধ্যান করত। কেউ অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে থাকত। কেউ কেউ আবার সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দিত। আমি এর কোনওটাই করিনি। বরং ডার্বির আগের রাতে কখনও শরাফ আলি, ভিপি সত্যেন, কখনও আবার জো পল আনচেরির সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতাম।
ডার্বি যে এক জন ফুটবলারের জীবন বদলে দেয়, তা বুঝেছিলাম প্রথম গোলের পরে। রাতারাতি তারকা হয়ে গিয়েছিলাম। এখনও মনে আছে, সমর্থকদের কাঁধে চড়ে সে-দিন ড্রেসিংরুমে ফিরেছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন, স্বপ্ন দেখছি। বাড়ি ফিরে ঠিক করলাম, পরের দিন সকালে অনুশীলনে যাওয়ার তাড়া নেই। তাই অনেক ক্ষণ ঘুমোব। কিন্তু সাতসকালেই ঘুম ভেঙে গেল চিৎকারে। কী ব্যাপার? দরজা খুলে দেখলাম, আমাদের বাড়ির সামনে শ’খানেক মোহনবাগান সমর্থক হাজির। কারও হাতে ফুল। কেউ এনেছেন মিষ্টির হাঁড়ি। কেউ কেউ আবার তাঁদের বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন। চিরস্মরণীয় অনুভূতি। ভ্যাগ্যিস, সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না! যদি থাকত, নিশ্চয়ই নিজস্বী তোলার ধুম পড়ে যেত। রবিবারের ডার্বির পরে হয়তো এই অভিজ্ঞতা হতে পারে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ফুটবলারদের।
শুধু ফুটবলার নয়, সমর্থকদেরও একই অবস্থা হত। আমাদের অনুশীলন দেখতে মোহনবাগান মাঠের গ্যালারি প্রায় ভর্তি হয়ে যেত। এটাও আমার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। কেরলেও ফুটবল ম্যাচে প্রচুর দর্শক হয়। কলকাতায় খেলতে এসে দেখলাম, অনুশীলনেও গ্যালারি গমগম করছে। সকলের এক আবদার— ডার্বিতে গোল করতেই হবে।
যখন মোহনবাগানে খেলতাম, তখন শুনতাম— ইস্টবেঙ্গলকে হারাতেই হবে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখেছি লাল-হলুদ জার্সি গায়ে খেলার সময়। উন্মাদনা ও উত্তেজনা এমন জায়গায় পৌঁছত যে, বাইরে বেরোনোই যেত না। প্রথম কলকাতায় খেলতে এসেছি। অনুশীলনের পরে সারা দিন কোনও কাজ থাকত না। আমি হেঁটে হেঁটে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। সেখানেও এক ছবি। ঘিরে ধরে সমর্থকেরা বলতেন, ‘‘ডার্বিতে তোমাকে গোল করতেই হবে।’’ ডার্বি নিয়ে আমার কোনও দিনই টেনশন ছিল না। আমি ভয় পেতাম সমর্থকদের।

ডার্বির সেরা পাঁচ গোলদাতা

ভাইচুং ভুটিয়া: ১৯ গোল (ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ১৩, মোহনবাগানের ৬)
জোসে ব্যারেটো: ১৭ গোল
(সবকটিই মোহনবাগানের হয়ে)
চিমা ওকোরি: ১৫ গোল (ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ১০, মোহনবাগানের হয়ে ৫)
মহম্মদ হাবিব: ১০ গোল
(সবকটিই ইস্টবেঙ্গলের হয়ে)
শিশির ঘোষ: ১০ গোল (মোহনবাগানের হয়ে ৭, ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ৩)

মনে পড়ছে, এক বার ডার্বির আগের রাতে আনচেরির সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছি। সিনেমা হলে অন্ধকারের মধ্যেও আমাকে চিনে ফেলল কয়েক জন। শুরু হয়ে গেল আবদার— বিজুভাই ডার্বি জিততেই হবে। তোমার হ্যাটট্রিক দেখতে চাই। অবস্থা এমন হল যে, সিনেমা অর্ধেক দেখেই পালিয়ে এলাম।
আবেগে ভাসতেন ক্লাবের শীর্ষ কর্তারাও। একটা মজার গল্প মনে পড়ে গেল। আমি তখন মোহনবাগানে। কোচ ছিলেন সৈয়দ নইমুদ্দিন। ডার্বির আগের দিন নিজের বাড়িতে আমাকে ডাকলেন ক্লাবের এক শীর্ষ কর্তা। গিয়ে দেখলাম, বিশাল ড্রয়িংরুমে নইমদাও বসে আছেন। পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই সবুজ-মেরুনের শীর্ষ কর্তা আমাকে বললেন, ‘‘প্রতিজ্ঞা করো, তুমি কাল ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করবে।’’ বললাম, হ্যাটট্রিক হবে কি না, জানি না। তবে অবশ্যই চেষ্টা করব গোল করার। অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম, আমার উত্তর পছন্দ হয়নি। বললেন, ‘‘না, তোমাকে কথা দিতে হবে যে, হ্যাটট্রিকই করবে।’’ অবাক হয়ে গেলাম।
পাড়ার খেলাতেও কেউ আগে থেকে বলতে পারে না যে, হ্যাটট্রিক করবে। এ তো ইস্টবেঙ্গলের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলা। নইমদাকে বললাম, আপনি কিছু বলুন। হ্যাটট্রিক কি এ ভাবে বলে বলে করা যায়? কিন্তু আমার কোচ কিছুই বললেন না। এ বার ক্লাবের সেই কর্তা বললেন, ‘‘ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করলে তোমাকে মোটরবাইক উপহার দেব।’’ কলকাতায় খেলতে আসার পর থেকেই দেখেছি, তারকা ফুটবলারেরা সকলেই মোটরবাইক চালায়। আমিও স্বপ্ন দেখতাম, মোটরবাইক চালিয়ে কলকাতার রাস্তায় ঘুরছি। কিন্তু কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। অতিকষ্টে লোভ সংবরণ করলাম।
মোটরবাইকের লোভে প্রতিজ্ঞা করে যদি তা রাখতে না-পারি, তখন কী হবে? এ বার আমি বললাম, চেষ্টা করব হ্যাটট্রিক করার। পরের দিন যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলাম। তবে হ্যাটট্রিক না-করেও উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম নতুন স্কুটার। যা এখনও চলছে। আমার এক ভাইকে দিয়েছি। ও-ই এখন চালাচ্ছে সেই স্কুটার। এই ডার্বির আকর্ষণেই অন্য দল ছেড়ে আমি বার বার কলকাতায় ফিরে এসেছি।
ডার্বিতে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল এক বার। আমি মোহনবাগানে। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিরণ খোংসাই ছিল ইস্টবেঙ্গলে। যুবভারতীর সেই ডার্বিতে গোল করেছিল কিরণ। ম্যাচের পরে ইস্টবেঙ্গল ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলাম ওকে অভিনন্দন জানাতে। সেই সময় এত কড়াকড়ি ছিল না। সমর্থকেরা ঢুকে পড়তেন ড্রেসিংরুমে। আমাকে দেখেই খেপে গেলেন ওঁরা। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, মোহনবাগানের কাউকে ঢুকতে দেবো না। শেষ পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল কর্তারা আমাকে ড্রেসিংরুমের ভিতরে নিয়ে যান। আমি মনে করি, লড়াই হবে মাঠের মধ্যে। মাঠের বাইরে যেন তার কোনও প্রভাব না-পড়ে।

সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুলিখন: শুভজিৎ মজুমদার

I.M. Vijayan Kolkata Derby Kolkata Football Mohunbagan East Bengal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy